গ্রুপের সমীকরণ বদলে দিতে পারে কাতার–সুইজারল্যান্ড ম্যাচ


চার বছর আগে নিজেদের মাটিতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে হতাশার এক অধ্যায়ের সাক্ষী হয়েছিল কাতার। স্বাগতিক হয়েও গ্রুপ পর্বের তিনটি ম্যাচেই হেরে বিদায় নিতে হয়েছিল মধ্যপ্রাচ্যের দেশটিকে। বিশ্বকাপের ইতিহাসে কোনো স্বাগতিক দেশের জন্য এমন শুরু ছিল নজিরবিহীন। সেই দুঃস্বপ্ন পেছনে ফেলে এবার নতুন আশা নিয়ে বিশ্বকাপ মিশন শুরু করতে যাচ্ছে এশিয়ার বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা।
শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকো বে এরিয়া স্টেডিয়ামে ‘বি’ গ্রুপের ম্যাচে কাতারের প্রতিপক্ষ সুইজারল্যান্ড। বাংলাদেশ সময় রাতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ম্যাচটি দুই দলের জন্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ গ্রুপের অন্য ম্যাচে কানাডা এবং বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা ১-১ গোলে ড্র করায় জয়ী দল শুরুতেই গ্রুপের শীর্ষে উঠে যাওয়ার সুযোগ পাবে।
প্রথম বিশ্বকাপ পয়েন্টের খোঁজে কাতার
বিশ্বকাপ ইতিহাসে কাতারের স্মৃতি খুব সুখকর নয়। ২০২২ সালে স্বাগতিক হিসেবে প্রথমবার বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে তিন ম্যাচের তিনটিতেই পরাজিত হয়েছিল তারা। পুরো আসরে মাত্র একটি গোল করতে সক্ষম হয় দলটি। তবে সেই হতাশার পর কাতার নিজেদের নতুন করে গুছিয়ে নিয়েছে। ২০২৩ সালে এশিয়ান কাপ জিতে টানা দ্বিতীয়বারের মতো মহাদেশের শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখে তারা। এরপর বাছাইপর্বে সংযুক্ত আরব আমিরাতকে ২-১ গোলে হারিয়ে নিজেদের সামর্থ্যেই নিশ্চিত করে ২০২৬ বিশ্বকাপের টিকিট।
দলের এই পরিবর্তনের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছেন স্প্যানিশ কোচ হুলেন লোপেতেগি। ২০২৫ সালের মে মাসে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি কাতারের খেলায় নতুন প্রাণ ফিরিয়ে আনেন।
ম্যাচ-পূর্ব সংবাদ সম্মেলনে লোপেতেগি বলেন, ‘এক বছর আগে যখন আমরা এই যাত্রা শুরু করি, তখন আমাদের লক্ষ্য ছিল বিশ্বকাপে জায়গা করে নেওয়া। আল্লাহর রহমতে আমরা তা অর্জন করেছি। এই দল ইতিহাস সৃষ্টি করেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘কিন্তু আমরা এখানে থামতে চাই না। আমরা জানি আমাদের প্রতিপক্ষ কতটা শক্তিশালী। আমরা জানি আমরা বিশ্বকাপে আছি। তারপরও আমরা আমাদের স্বপ্নের পেছনে ছুটতে চাই। এখানে কেউ কাউকে কিছু উপহার দেয় না। তাই প্রথম ম্যাচ থেকেই আমরা নিজেদের সর্বোচ্চ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ অবস্থায় দেখতে চাই।’
নতুন উচ্চতায় পৌঁছানোর স্বপ্ন সুইজারল্যান্ডের
অন্যদিকে সুইজারল্যান্ড এবার টানা ষষ্ঠ বিশ্বকাপে অংশ নিচ্ছে। ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে শুধু ফ্রান্স, স্পেন, ইংল্যান্ড, পর্তুগাল ও জার্মানির সঙ্গে এই কীর্তিতে নাম লিখিয়েছে তারা। তবে ধারাবাহিকভাবে বিশ্বকাপে অংশ নিলেও বড় সাফল্যের অভাব রয়েছে সুইসদের। গত ছয় বিশ্বকাপের পাঁচটিতেই শেষ ষোলো থেকে বিদায় নিতে হয়েছে তাদের। সর্বশেষ ১৯৫৪ সালে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছিল দলটি।
সেই আক্ষেপ ঘোচাতেই এবার বিশ্বকাপে এসেছে সুইজারল্যান্ড। বাছাইপর্বে অপরাজিত থেকে এবং মাত্র দুটি গোল হজম করে তারা বিশ্বকাপ নিশ্চিত করেছে।
অধিনায়ক গ্রানিত জাকা বলেন, ‘আমরা শুধু আমাদের সেরা খেলাটা খেলতে চাই। দেশের জন্য, পরিবারের জন্য খেলতে চাই। আগামীকালের ম্যাচ থেকেই আমরা বড় পদক্ষেপ নিতে চাই। এটি আমাদের সেরা বিশ্বকাপ হতে পারে। আমরা আর অপেক্ষা করতে পারছি না। আমরা প্রস্তুত। শারীরিকভাবে প্রস্তুত, মানসিকভাবেও প্রস্তুত।’
গ্রুপের সমীকরণ
‘বি’ গ্রুপে রয়েছে কাতার, সুইজারল্যান্ড, কানাডা এবং বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা। ৪৮ দলের নতুন বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো ৩২ দলের নকআউট পর্ব চালু হয়েছে। ১২টি গ্রুপের প্রতিটি থেকে শীর্ষ দুই দল সরাসরি পরের পর্বে উঠবে। এ ছাড়া তৃতীয় হওয়া দলগুলোর মধ্যে সেরা আটটিও নকআউট পর্বে জায়গা পাবে। কানাডা ও বসনিয়া ইতোমধ্যে একটি করে পয়েন্ট সংগ্রহ করায় কাতার ও সুইজারল্যান্ডের জন্য এই ম্যাচের গুরুত্ব আরও বেড়ে গেছে।
মুখোমুখি লড়াইয়ে এগিয়ে কাতার
দুই দল এর আগে মাত্র একবার মুখোমুখি হয়েছে। ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত সেই প্রীতি ম্যাচে চমক দেখিয়ে ১-০ গোলে জয় পেয়েছিল কাতার। সুইজারল্যান্ডের তুলনায় ফিফা র্যাংকিংয়ে ৮৮ ধাপ পিছিয়ে থেকেও ম্যাচটি জিতেছিল মধ্যপ্রাচ্যের দেশটি। ম্যাচের ৮৮তম মিনিটে আকরাম আফিফের গোলই গড়ে দিয়েছিল পার্থক্য। মজার বিষয় হলো, সেই ম্যাচের নায়ক আফিফ এখনও কাতার দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র।
কাতারের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স খুব ভালো না। সর্বশেষ পাঁচ ম্যাচে তাদের ফলাফল ২টি ড্র, ৩টি পরাজয় তবে কোনো জয় নেই। বিশ্বকাপ প্রস্তুতিও খুব ভালো হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল ও ইরানকে ঘিরে চলমান আঞ্চলিক উত্তেজনার কারণে সার্বিয়া ও আর্জেন্টিনার বিপক্ষে নির্ধারিত দুটি প্রীতি ম্যাচ স্থগিত হয়ে যায়। চলতি বছরে মাত্র দুটি ম্যাচ খেলেছে কাতার। আয়ারল্যান্ডের কাছে ১-০ গোলে হেরেছে এবং এল সালভাদরের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র করেছে।
অন্যদিকে সুইজারল্যান্ডের সর্বশেষ পাঁচ ম্যাচের ফলাফল ১ জয়, ৩ ড্র ও ১ পরাজয়। বিশ্বকাপের আগে শেষ প্রস্তুতি ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করেছে তারা।
দল নির্বাচন নিয়ে স্বস্তিতে দুই কোচ
কাতার শিবিরে কোনো চোট সমস্যা নেই। পুরো দলকে নিয়েই পরিকল্পনা সাজাতে পারছেন লোপেতেগি। তিনি সম্ভবত তিন ফরোয়ার্ড নিয়ে আক্রমণাত্মক ছকে মাঠে নামবেন। আক্রমণভাগে থাকবেন ইউসুফ আবদুরিসাগ, আকরাম আফিফ ও এদমিলসন জুনিয়র।
অন্যদিকে সুইজারল্যান্ড কোচ মুরাত ইয়াকিনেরও বড় কোনো দুশ্চিন্তা নেই। তার একমাত্র চিন্তা আক্রমণভাগে কাদের দিয়ে শুরু করবেন। দলের অভিজ্ঞ হিসেবে থাকছেন গ্রানিত জাকা, মানুয়েল আকাঞ্জি ও রিকার্দো রদ্রিগেজ। এই তিনজনের আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার সংখ্যা মিলিয়ে ৩৬৫।
সম্ভাব্য একাদশ
কাতার:
মাহমুদ আবুনাদা; আয়ুব আল-ওয়াই, বুয়ালেম খুখি, পেদ্রো মিগেল, হোমাম আহমেদ; ইসা লায়ে, আহমেদ ফাতি, জাসিম গাবের; ইউসুফ আবদুরিসাগ, আকরাম আফিফ, এদমিলসন জুনিয়র।
সুইজারল্যান্ড:
গ্রেগর কোবেল; সিলভান ভিডমার, মানুয়েল আকাঞ্জি, নিকো এলভেদি, রিকার্দো রদ্রিগেজ; গ্রানিত জাকা, রেমো ফ্রয়লার; রুবিন ভার্গাস, ফাবিয়ান রিডার, দান এনদোয়ে; জেকি আমদৌনি।
সূত্র: আল-জাজিরা
















