“সন্ধ্যার ঠিক আগ মুহূর্তে একটা বেল হেলিকপ্টার এসে আহত জেসিও, দু’জন জোয়ান ও শহীদ নিজামের লাশ নিয়ে চলে গেল। আমরা লাশের পাশে শুয়ে থেকে রাতটা পার করে দিলাম।”
ক্যাপ্টেন নিজামসহ বিডিআরের ১২ জন সদস্য শহিদ হয়েছিলেন

অপারেশন কুকিছড়া

fec-image

স্যার আমাকে আশ্বস্ত করে দৃঢ়তার সাথে বললেন ‘আমি বলছি, তুমি পারবে। তুমি রাঙামাটি ব্রিগেড মিলিটারি ও বিডিআর আরএমওদের মধ্যে বেস্ট। সব ব্যাটালিয়নে হয় ম্যালেরিয়ায় অথবা শান্তি বাহিনীর আঘাতে ক্যাজুয়ালিটি আছে। আমার ব্যাটালিয়নে নেই। এর আসল কৃতিত্ব তোমার ও তোমার মেডিকেল টিমের। আমি খোঁজ নিয়েছি, তোমার ছেলেরা ম্যালেরিয়ার প্রিভেনটিভ ডোজগুলো খাওয়াতে সৈনিকদের বাধ্য করে। আমার ব্যাটালিয়নের সবাই তোমার ও তোমার টিমের উপর হ্যাপি। তুমি পারবে। বই থাকলে পড়াশোনা শুরু করো। আর না থাকলে কিনে এনে দ্রুত পড়তে বসো। চান্স তোমাকে পেতেই হবে। কোন সাব্জেক্টে পরীক্ষা দেব? সেটা তোমার চয়েজ। বাট ইউ মাস্ট এপিয়ার।

আমি অধিনায়ক স্যারের এমন আন্তরিক গাইড লাইনের জন্য খুশি হলাম। অবাক হলাম এজন্য যে, কে কোথায় কখন কী করছে সব খবর রাখছেন তিনি। নিজস্ব বুদ্ধি বিবেচনা আর জ্ঞান দিয়ে যাচাই বছাই করার লোকজন কমে গেছে। এখানেও স্যার ব্যতিক্রম।

আমি বই কিনলাম। পড়াশোনা শুরু করলাম। পরীক্ষা দেয়ার জন্য আবেদন করলাম। তিনটা চয়েজ দিতে বলেছে, সাইকিয়াট্রিসহ তিনটা চয়েজ দিলাম। এতো পড়া কীভাবে পড়বো? যাদের সাথে প্রতিযোগিতা তারা খুব জাদরেল স্টুডেন্ট। আমার ভয়ই লাগলো। বিলাইছড়ি ছিল মুসা খান। আরও যে যেখানে ছিল তাদের সাথে ওয়ারলেসে কথা বলে সাহস সঞ্চয়ের চেষ্টা করলাম। বুঝলাম, তাদের প্রিপারেশনের কাছাকাছিও আমি নেই। সাহস সঞ্চয়ের পরিবর্তে আমি হতাশ হয়ে গেলাম। কিন্তু বারবার কর্নেল আকবরের কথা মনে পড়ছিল। আমার জন্য স্যারের লজ্জায় পড়তে হবে ভাবতেই পারি না। এজন্য ঘোড় দৌড়ের মতো। কার ঘোড়া দৌড়ে ফার্স্ট হয় সেই সোয়ারীর কৃতিত্বে, ঘোড়ার নয়। যাই হোক, ঘোড়া হলেও আমাকে দৌড়াতেই হবে। ডুব দিলাম, কঠিন ডুব। যে প্রশ্নগুলো হবে বা হতে পারে আইডিয়া নিয়ে সেসব বই পড়া শুরু করলাম। আর আমার মৌলিক বিশেষত্বটাকে জাগিয়ে তুললাম।

আমার মতোই অন্যরাও পরীক্ষা দেবে। একই বই পড়বে। অনেকেই টিকবে- কিছু অতিরিক্ত প্রার্থী রাখবে যাদের ভাইভায় বাদ দেবে। হবে না কেন? অবশ্যই হবে। হতেই হবে। রাত জেগে পড়ি সকালে এক ঘণ্টা সিগনাল সেন্টারে বসে ওই সব আরএমওদের প্রশ্ন করি। তারা না পারলে আমি সাহস দিয়ে উত্তর বলে দেই। তাদের থেকে প্রশ্ন চাই। তারা যেসব প্রশ্ন করে আমি কিছু পারি কিছু পারি না। এভাবে দিন দশ কাটানোর পর দেখলাম বিশাল প্রশ্নব্যাংক তৈরি হয়ে গেছে। আমার আস্থাটা বাড়তে শুরু করলো। রাঙামাটি ব্রিগেডের বাইরে ছড়িয়ে গেল ‘ওহাবের দারুণ প্রিপারেশন’। যাক সেটা মন্দ না। ভুল হোক, তবুও সবাই এটা জানুক অসুবিধা কি? এর মাঝে পরীক্ষার তারিখ পিছিয়ে গেল। এলো আমাদের জীবনে কঠিন বিপদ। জানুয়ারি মাসের ১৪ তারিখ ফেরোশাস ফোরটিনের রেইজিং ডে। কিন্তু দিনটা আমরা সেদিন উৎযাপন করতে পারলাম না। ১৩ জানুয়ারি পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় ঘটনা ঘটে গেল। সেটা সেনাবাহিনীর জন্য, তৎকালীন বিডিআরের জন্য ছিল এক বিষাদময় অধ্যায়। পরাজয়ের গ্লানির দিন। স্বজন হারানোর দিন। মুর্ষতায় ঝিমিয়ে পড়ার দিন। সেদিনটাকে মনে করলে আমি আর পৃথিবীতে থাকি না। রাঙামাটিতে পোস্টিং হবার পর আমার এতদিনের অর্জন, ভালো লাগা সব নিমিষেই ম্লান হয়ে গেল। আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। সেই ১৩ জানুয়ারি আমাদেরকে বার বার আঘাত করে।

১৯৯০ থেকে অনেকদিন পর আজও মনে পড়লে পাহাড়ি অঞ্চলের সে শীতের সকাল বুকটাকে দীর্ণ করে দেয়। আহা ক্যাপ্টেন নিজাম! আর বিডিআরের এগারজন জোয়ান। তোমরা কি আমাদের ক্ষমা করতে পারবে? নিজামের আহত সাদা কুকুরটা?

মেজর হাসনাত নিয়মিত আমার বাসার সামনে ব্যাডমিন্টন খেলতে আসতেন। তার উপঅধিনায়ক ক্যাপ্টেন জাহিদ খুব কম আসতো আমাদের ব্যাটালিয়ন হেড কোয়ার্টারে। ক্যাপ্টেন নিজাম আর্টিলারি অফিসার। অস্থায়ী কর্তব্যে অন্যান্য অফিসারদের মতো কয়েকমাসের জন্য এসেছে। পদাতিক বাহিনীর ও ইঞ্জিনিয়ার্সের ছাড়া অন্যান্য রেজিমেন্ট বা কোরের অফিসারদের অস্থায়ী ডিউটিতে বিডিআর বা সেনাবাহিনীর সাথে দেয়া হয় হিল অরিয়েন্টেশনের জন্য। নিজামের আগে এই কুকিছড়া ক্যাম্পে ছিল সিগন্যালের এক অফিসার। খেলতে এসে খেয়াল করতাম মেজর হাসনাত স্যারের সাথে বিডিআর ব্যাটালিয়নের নানা সমস্যা সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলতেন। স্যার রেগুলার পেট্রোল হয় কিনা, জঙ্গল কাটা হয় কিনা খোঁজ নিতেন। এসব প্রশ্নে মেজর হাসনাতের উত্তর ছিল হ্যাঁবোধক।

ক্যাপ্টেন নিজাম ছিল এগার লংয়ের অফিসার। পাকিস্তানের একটা কোর্সে তার নাম আসে। হাসনাত স্যার নিজামকে ছেড়ে দেয়ার জন্য একটা লিংক পেট্রোলের জন্য পীড়াপীড়ি করতে থাকেন। স্যার রাজি হন না। ঐ সময়টাতে হাসনাত স্যার প্রায়ই খেলতে আসতেন। নিজামের সাথে জীবিতাবস্থায় কখনো দেখা হয়নি। তবে এটা খুব স্বাভাবিক ব্যাপার, যারা অস্থায়ী ডিউটিতে এই দুর্গম এলাকায় আসে যেকোনো উপায়ে ছাড়া পেলে এখানে আর এক মুহূর্ত কেউ থাকতে চায় না। নিজামের সেই ব্যস্ততার জন্য চরম খেসারত দিতে হয়েছে তাকে এবং এগারজন বিডিআর সৈনিককে। কী মর্মান্তিক কী ভয়াবহ ঘটনা! লোমহর্ষক বর্ণনার অযোগ্য সে ঘটনা। বিডিআর মেডিকেল অফিসার ক্যাপ্টেন জুলফিকর ছুটিতে ছিল। তার বদলে আমি তার কাজ চালিয়ে যেতাম।

১৯৯০ সালের ১৩ জানুয়ারি সকালে একটা লিংক পেট্রোলের অনুমতি পেয়ে বিডিআরের অধিনায়ক আর দেরী করলেন না। নওয়াপাড়া কালা পাহাড়ের উপরের ক্যাম্প থেকে একটা পেট্রোল বের হয়ে ভারতীয় বর্ডারের নিকটের ক্যাম্প কুকিছড়ার একজন অফিসারকে নিয়ে আসবে। এমন লিংক পেট্রোল অনেকদিন পরপর হয়। একাধিক কারণ ছাড়া এমন পেট্রোল সাধারণত করা হয় না। এ সমস্ত এলাকায় শান্তিবাহিনীর চলাচল বেশি আর তারা লোকাল পাহাড়িদের ভয় দেখিয়ে অথবা আপোসে সমর্থন আদায় করে। দু’দিক থেকে দুটো পেট্রোলের কমপক্ষে ত্রিশজন লোক কাছাকাছি হয়ে ক্যাপ্টেন নিজামকে এক পক্ষ অন্য পক্ষের কাছে দিয়ে দেবে। দু’দিকের পাহাড়ি এলাকা এসে অপেক্ষাকৃত সমতল ভূমিতে একটা ভিটার মতো জায়গায় মিশে গেছে, যার পূর্ব দিকটায় ছড়া। পূব দিক থেকে কুকিছড়ার পেট্রোলটার জোয়ানরা যখন ছড়া অতিক্রম করে ভিটার উপর অর্ধেক উঠে যায় তখন শান্তিবাহিনীর অপেক্ষমান টিম অতর্কিত গুলি ছুড়ে। হতচকিত অপ্রস্তুত বিডিআর বাহিনী কোনো অ্যাকশনেই যেতে পারেনি। পুরো পেট্রোলটাই আক্রমণের শিকার হয়। বিপরীত দিক থেকে আসা দ্বিতীয় পেট্রোলটা হেরাসিং ফায়ার করলে শান্তিবাহিনী পালিয়ে যায়।

সংবাদ পেয়ে সকাল নয়টায় আমরা প্রস্তুতি নেয়া শুরু করি। বারবার লে. ইকবাল আমার সাথে আসতে চাইলে আকবর স্যার নিষেধ করলেন। মেজর আতিয়ার স্যার ছুটির জন্য মাইনীতে এসেছেন। তাকে অধিনায়ক কমান্ডার বানিয়ে অপারেশন কুকিছড়ায় পাঠানোর জন্য তৈরি করে রাখলেন। আমার সাথে মেডিকেল অ্যাসিস্টেন্ট আবু বকর ছিল। সে কেবল হিলে এসেছে। কোনো এক ক্যাম্পে পাঠাব সেজন্য অপেক্ষমান। আমরা করাত, কুঠারসহ হেলি প্যাড বানানোর নানান প্রস্তুতি নিলাম। শীতের জ্যাকেটও নিলাম। আমি পর্যাপ্ত পরিমাণ সেল ড্রেসিং মরফিন ইনজেকশন ও স্যালাইন নিলাম। সুচার ম্যাটারিয়াল সাথে নিলাম। বারোটার দিকে একটা রাশান পেট মোটা এমআইএইট হেলিকপ্টার আমাদের নিয়ে কুকিছড়া হেলিপ্যাডে নামিয়ে দিল। যারা কুকিছড়া ক্যাম্পে অপেক্ষমান ছিল তাদের কাছ থেকে সংক্ষেপে ঘটনাটা শুনে আমরা ঘটনাস্থলের দিকে রওয়ানা হলাম।

প্রথমদিকের পথ মোটামুটি সহজ হলেও পরবর্তীতে বুকসমান ছনের মধ্য দিয়ে বেশ কিছুটা পথ চলতে হলো। নির্জীব পথ। আশেপাশের দু’ কিলোমিটারেও কোনো লোকালয় নেই। আমরা ঘটনাস্থলের কাছাকাছি পৌঁছাতেই দূর থেকে শান্তিবাহিনীর লোকেরা হ্যারাসিং ফায়ার করছে। আমাদের সামনে এসে দুর্বল বুলেট ছড় ছড় করে পড়ছে। আতিয়ার স্যার সামনে ছিলেন। আমি পিছনে থেকে সবাইকে মাটিতে শুয়ে যেতে বললাম। কিন্তু নিজে পজিশন নিতে ভুলে গেলাম। নায়েক হাবিব আমার পা ধরে টান দিয়ে ফেলে দিল। চিৎকার করে বলছে, ‘আপনি পজিশন নেন স্যার’। আমরাও ফায়ারের তীব্র জবাব দিলাম। গ্রেনেড চার্জ করলাম। কিছুক্ষণ পর ওদের ফায়ার বন্ধ হলে আমরা দ্রুত ছড়া পার হয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছলাম। মেজর আতিয়ার বিডিআর জোয়ানদের লাশ সংগ্রহ করে উপরে আনতে বললে তারা অস্বীকার করলো। মেজর আতিয়ার এসএমজি তাক করে রেগে বললেন- ‘কথা না শুনলে মেরে ফেলবো’। মারেন স্যার। মরেই তো গেছি। ওদের লাশ টানার মানসিক শক্তি আমাদের নাই। পরিবেশ এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে দেখে আমি বললাম, স্যার আর্মি আর বিডিআর মিশিয়ে দেন। আমি আহতদের চিকিৎসা দিচ্ছি।

স্যার চারটা পয়েন্টে মোট আটজন বিডিআর ও আর্মির লোক পাঠিয়ে আমাদের লোকেশানকে নিরাপদ করলেন। বাকীদের দু’ভাগ করে একভাগকে লাশ বহন করার জন্য বললেন এবং অন্যদের লাগালেন হেলিপ্যাড বানানোর জন্য। সন্ধ্যার আগেই হেলিপ্যাড বানিয়ে লাশগুলো পাঠিয়ে দিতে হবে। আমাদের আগমনের আগে মৃতের সংখ্যাও নিশ্চিত ছিল না। আমরা সংবাদ পাঠালাম, ক্যাপ্টেন নিজামসহ মৃতের সংখ্যা বারো।

আমি একজন আহত জেসিওকে চিকিৎসা দিচ্ছি। তার পায়ের মাংস ছিড়ে গেছে। ব্লিডিং হচ্ছে। আমি সেল ড্রেসিং দিয়ে রক্ত ঝড়া বন্ধ করলাম। মরফিন দিলাম ও দু’হাতে পায়ে স্যালাইন লাগালাম। কারণ, তার বিপি পাওয়া যাচ্ছিল না। শকে চলে গেছে। সেসময় আবার ফায়ার, আমাদের সামেন এসে বুলেট পড়লো। জেসিওকে টেনে নিয়ে অন্যদিকে গেলাম। তার বিপি বাড়তে শুরু করলো। কথার জবাব দেয়ার চেষ্টা করছে। আর দু’জন সৈনিক চিৎকার চেঁচামেচি করতে শুরু করলো। তাদের কোনো ইনজুরি নেই। তারপরও বলছে, কান গেল। আরও এলোমেলো অর্থহীন কথা। তাদের মানসিক প্রবলেম হয়েছে। ভয় পেয়েছে বুঝেছি, তখন জানতাম না এটাকে একুট স্ট্রেস রিয়াকশন বলে। লাশগুলো পাশাপাশি শুইয়ে রাখা হলো। সন্ধ্যার ঠিক আগ মুহূর্তে একটা বেল হেলিকপ্টার এসে আহত জেসিও, দু’জন জোয়ান ও শহীদ নিজামের লাশ নিয়ে চলে গেল। আমরা লাশের পাশে শুয়ে থেকে রাতটা পার করে দিলাম।

লেখক: আব্দুল ওহাব মিনার। চিকিৎসক, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ। অধ্যাপক। অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা। ২০০৩ সালে সেনাবাহিনী থেকে স্বেচ্ছায় অবসরে গিয়ে কাজ করেছেন জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

three × one =

আরও পড়ুন