আদিবাসী বিতর্ক ও সূফী-পীরদের মাজারে হামলার সংষ্কৃতি : নয়ন চ্যাটার্জি


গতকালকে একটা ভিডিও দেখলাম ব্যারিস্টার কায়সার কামালের। যেখানে কায়সার কামাল নেত্রকোনায় গিয়ে বলছে, “তাদের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বলবেন না, তারা আদিবাসী। তারা প্রথমে আবাস গড়েছিলো, পরে আমরা বাঙালরা সেখানে গিয়েছি।”
নেত্রকোনায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বলতে আসলে দুটি গোষ্ঠী প্রধান। একটি গাড়ো, অন্যটি হাজং। গাড়োরা প্রায় সবাই খ্রিস্টান ধর্মের অনুসারী, অন্যদিকে হাজংরা হিন্দু ধর্মের। এই সম্প্রদায় দুটো আদিনিবাস প্রথমে তিব্বত, পরে ভারত আসাম, মেঘালয়। তাদের সামাণ্য কিছু অংশ ভারত থেকে বিতাড়িত হয়ে কয়েকশ’ বছর ধরে নেত্রকোনায় আশ্রয় নিচ্ছে। এখন তাদেরকে বাংলাদেশের সীমানার ভেতরের কোন জেলার আদিবাসী বললে, ঐ জেলার মালিকানা পেয়ে যাবে ভারতীয় গাড়ো-হাজংরা। ব্যারিস্টার কায়সাল কামাল সুপ্রীম কোর্টে বড় আইনজীবি, উনি অবশ্যই জানে- জাতিসংঘের আদিবাসী অধিকার ঘোষণাপত্র-এ কী আছে, তাদের আদিবাসী স্বীকৃতি দিলে কী সমস্যা, তারপর উনি কেন মিডিয়ার সামনে এত জোর দিয়ে আদিবাসী শব্দ বললো, সেটা অবশ্যই রহস্যের বিষয়।
যাই হোক, আপনি যদি কোন ভূমির মালিকানা দেখাতে চান, তবে তারজন্য আপনাকে জমির দলিল দেখাতে হয়। কিন্তু জাতিগত জমির ভূমির মালিকানা দেখানোর জন্য অতি আদি দলিল দেখানোটা কঠিন, তখন বিভিন্ন প্রাচীন স্থাপনা, ঐতিহাসিক দলিল, ইতিহাস দেখতে হয়। বাবরি মসজিদের নিচের রামের জন্মস্থান ছিলো কী ছিলো না, এটা বানোয়াট হলেও তার স্বপক্ষে উচ্চ আদালতে কিন্তু প্রদর্শন করতে হয়েছে। যেহেতু বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ মুসলমান, তাই এ অঞ্চলের ভূমির মালিকানা ধরে রাখতে গেলে মুসলমানদের পক্ষে ঐতিহাসিক দলিল বা স্থাপত্য দলিল লাগবে।
একটা উদাহরণ দেই, নেত্রকোণার (নাটেরকোনা) ইতিহাসের সাথে জড়িয়ে আছে, সুফি সাধক হযরত শাহ সুলতান কমর উদ্দিন রুমী (র.) এর ইতিহাস। নেত্রকোনা এক সময় শাসন করতো মদন কোচ নামক এক হিন্দু রাজা। আজ থেকে প্রায় হাজার বছর আগে (১০৫৩ সাল) শাহ সুলতান কমর উদ্দিন রুমী (র.) প্রায় শতাধিক সুফী সাধক নিয়ে নেত্রকোণায় এসেছিলেন। অনেক ইতিহাস ও ঘটনার পর সেই মদনকোচ স্বপরিবারে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং নেত্রোকোনায় ক্ষমতায় আসে মুসলমানদের হাতে। এবং ঐ এলাকায় মুসলমানদের ব্যাপক প্রচার ঘটে। যদিও বলা হয়, ১২০৪ সালে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বখতিয়ার খিলজির মাধ্যমে বাংলায় মুসলমান শাসনের আগমন ঘটে, কিন্তু নেত্রকোনায় মুসলমান শাসনের ইতিহাস আরো ২শ’ বছর পুরাতন।
শাহ সুলতান কমর উদ্দিন রুমী (র) এর মাজার এখনও নেত্রকোনায় অবস্থিত। এখন ঐ মাজার কিন্তু ঐ অঞ্চলে মুসলমানদের হাজার বছরের পুরাতন ইতিহাস বহন করছে। কিন্তু একদল ইসলাম-নামধারী লোক গিয়ে যদি ঐ মাজারে গিয়ে ভাংচুর করে কিংবা বলে, মাজারে কিছু নেই, সব ভণ্ড, তখন কিন্তু মুসলমানরাই তাদের হাজার বছরের ইতিহাস অস্বীকার করে বসলো।
আবার গাড়ো বা হাজং সম্প্রদায় তাদের ব্রিটিশ বিরোধী অবস্থান খুব প্রচার করে। কিন্তু ইতিহাস বলছে, নেত্রোকোনা অঞ্চলে ব্রিটিশ বিরোধী যুদ্ধ বলতে ইতিহাসে ফকির বিদ্রোহ, পাগলপন্থী বিদ্রোহ বা কৃষক বিদ্রোহের ইতিহাস পাওয়া যায়। বর্তমানে ফকির বলতে বুঝায় ভিক্ষুক, কিন্তু ঐ সময় ফকির বলতে বুঝাতো দুনিয়া বিরাগি সুফী-দরবেশ। এরকম পাগলেরও আলাদা সংজ্ঞা ছিলো। যাই হোক ঐ সব ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব ছিলো পীর করম শাহ ও তাঁর ছেলে টিপু শাহ (টিপু পাগলা) এর নেতৃত্বে। তাদের নেতৃত্বেই গাড়ো বা হাজংরা ইস্ট ইন্ডিয়ার কোম্পানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। তো বর্তমানে একটা দল যদি সেই পীর করম শাহ বা টিপু পাগলার মাজার পেলেই হামলা করে, ভাংচুর করে কিংবা ভণ্ড বলে অস্বীকার করে, তখন তারা কিন্তু নিজেদের ইতিহাসটাই হারায় এবং গাড়ো হাজংদের হাতে ইতিহাস তুলে দেয়।
তাই বর্তমানে সূফী-পীরদের মাজারে হামলা ভাংচুরে আলটিমেট ক্ষতিগ্রস্ত হবে মুসলমানরাই। তারা এর মাধ্যমে এ অঞ্চলে ঐতিহাসিক মালিকানা হারাবে। কারণ মুসলমানরা যে এ অঞ্চলে হাজার বছর ধরে আছে, সেই ইতিহাস তারা দেখতে পারবে না। অপরদিকে বিভিন্ন জাতিরা কয়েকশ’ বছরের ইতিহাস বা ঐতিহাসিক স্থাপনা দেখিয়ে ভূমির মালিকানা দাবী করে বসবে, নিজেদের আদিবাসী দাবী করবে, যা বিপরীতে মুসলমানরা কিছুই দেখাতে পারবে না।
উৎসঃ নয়ন চ্যাটার্জি৯ ফেসবুক থেকে সংগৃহীত। ( ১৮ মে ২০২৬)

















