ইরানের প্রতিরোধ যুদ্ধ আমাদের জন্য কি শিক্ষনীয়  বার্তা বহন করে?

fec-image

সকল সামরিক পন্ডিতদের বিবেচনায় ৬ সপ্তাহের যুদ্ধে ইরানের জয় হয়েছে।  এই যুদ্ধে ইরানের জয় যুদ্ধের তিন স্তরে: স্ট্র্যাটেজিক, অপারেশনাল এবং ট্যাকটিক্যাল ফ্রন্টে। ভূরাজনৈতিক পন্ডিতদের মতে এটা সিভিলাইজেশ্যনের জয় ওভার নেশন স্টেট – আমেরিকা।

আজ প্রাচীন পারস্য সভ্যতার ধারক ইরানের সাথে পশ্চিমা দেশগুলোর মাস্টার মাইন্ড আমেরিকার যুদ্ধ আমাদেরকে এই বিশ্বাস দেয় – একটি দেশ তার হাজার বছরের Resilience বা পুনঃপুন সংগ্রামের ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে দাঁড়ালে আপাততঃ বিশাল দৈতাকায় শত্রুকে দীর্ঘ মেয়াদি যুদ্ধ বা Strategic patience এর মাধ্যমে হীনবল করে দেওয়া যায়।

আমেরিকা ইসরায়েল গং ভেবেছিলো তাদের একচ্ছত্র এয়ার পাওয়ার এর মাধ্যমে দিন কয়েকের মধ্যে ইরানকে ধ্বংস করে দিতে পারবে।

Iran wins if Iran can survive অর্থাৎ টিকে থাকলেই ইরান জিতে যাবে। সময় যত গড়াবে শত্রুর রিসোর্স তত বেশি কমবে। ইরান তার ভৌগোলিক অবস্থানের শক্তিকে কার্যকর ব্যবহার অর্থাৎ হরমুজ প্রণালীর উপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা বিশ্ব অর্থ নীতির রাশ টেনে ধরা সামরিক পরিভাষায় Asymmetric war এর মাধ্যমে পারমাণবিক শক্তি কে অগ্রাহ্য করে পশ্চিম এশিয়ার ভূরাজনীতির মূল চালকের আসনে বসে আজ আলোচনার টেবিলে এসেছে।

উপরে উল্লেখ্য বিষয়গুলো আমরা সকলেই জানি। ইরান-ইসরায়েল + আমেরিকার যুদ্ধ থেকে আমাদের জন্য কি নতুন কোন ভাবনার জন্ম দেয়  না? আমরা বিশাল প্রতিবেশীর পারমানবিক বুলি কে আমাদের জায়গা থেকে কিভাবে মোকাবিলা করার প্রস্তুতি নেব সে ভাবনা কি করবো না?

আমরা ৬ সপ্তাহের বা তারো আগের ইরানের সাথে আমেরিকা প্লাস ইসরায়েলের যুদ্ধে জাতিসংঘের অসহায়ত্ব দেখেছি।  জাতিসংঘ যে কোন ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের সার্বোভৌমত্ব বা কোন রূপ সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ তা আজ খুবই স্পষ্ট।  জাতিসংঘ কার ইশারায় চলে তা সকলেই জানি। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল ইরানকে তার প্রতিবেশী দেশে আক্রমণে প্রস্তাব আনে। কিন্তু ইরানের প্রধান ধর্মীয় নেতার মৃত্যুর প্রতিবাদ স্বরূপ কোন প্রস্তাব আনতে সাহস করে না।

অথচ আটলান্টিক চার্টারের মাধ্যমে যে জাতিসংঘের জন্ম তার মূল Preamble ছিলো জাতি রাষ্ট্র সমূহকে ঔপনিবেশিকতা থেকে মুক্তি,  নিজেদের পছন্দের সরকার বেছে নেওয়া এবং সার্বজনীন মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করা জাতিসংঘ এসবে ব্যর্থ। ইরান দেখিয়েছে নিজেকে সুরক্ষিত রাখার জন্য নিজের উপরই ভরসা করতে হবে- নিজের শক্তি: সামরিক,  অর্থনৈতিক, জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সহযোগিতা এসবই আত্মরক্ষার ভিওি।

এবার আসি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে। আমার সামরিক শিক্ষা কার্যক্রমে জেনেছি আমাদের মূল প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে আমাদের কনভেনশনাল যুদ্ধটি হবে ২১ দিনের। ১৯৭১ সালে ওরা ১৩ দিনে ঢাকা এসেছিলো। আমরা সেই সক্ষমতাকে আরো ১ সপ্তাহ বাড়িয়ে ৩:১ অনুপাতে হিসেব করে এরকম একটা Stalemate বা “না হারা না জয়” অবস্থানে এসে আমাদের বন্ধু প্রতীম দেশ এবং জাতিসংঘের দ্বারস্হ হয়ে চূড়ান্ত পর্যায়ে একটা কূটনীতিক বোঝাপড়ায় গিয়ে শত্রুকে পশ্চাৎপদাসনে বাধ্য করে টিকে থাকবো। শত্রুকে দেশের সর্বত্র বিস্তৃত করে কনভেনশনাল যুদ্ধের সাথে আন কনভেনশনাল যুদ্ধের ( জনযুদ্ধ  বা গেরিলা যুদ্ধ)   মিশ্রন ঘটিয়ে শত্রুকে হীনবল বা ব্যতিব্যস্ত করে তাকে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে নিন্দিত করে পরোক্ষ জয় আনা। অর্থাৎ বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতা এমন করা যেন এখানে কোন সামরিক অভিলাষ ১৯৭১’র মতো সহজ ওয়াক ওভার না হয়।

আমি যদি আমাদের মূল প্রতিপক্ষকে তার অন্য সেক্টরে তার কতটা শক্তি আটকে ( Tied down)  থাকবে  সেটা ধর্তব্যের মধ্যে না আনি, কোন বহি শক্তি আমাদের সাহায্যে এগিয়ে আসবে না,  কোন জাতিসংঘের রেজুলেশন আসবে না ধরে নিয়ে ১:১ বেসিসে হিসাব করি তবে আমাদের কি রনকৌশল হওয়া উচিত, কি রকম যুদ্ধাস্ত্র/ সামগ্রী  থাকা উচিত তা কি ইরানের অভিজ্ঞতার আলোকে একটু ভাববো না?

ইরান গত ২০ বছর প্রস্তুতি নিয়েছে আমেরিকা ইসরায়েলের সাথে যুদ্ধের জন্য।  ইরান তার সকল প্রতিরক্ষা ভূগর্ভস্থ টানেলে নিয়ে গেছে তার হাজার মাইল ব্যাপী টানেল পাহাড়ের চূড়া থেকে ৫০০ মিটার গভীরে।  একটা ২ হাজার কিলো বাংকার বাষ্ট বোমা মাটির( কনংক্রিটের) ৬০ মিটার ভেদ করতে পারে। গত জুনের আমেরিকার বি-৫২ বোমারু বিমান ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্রে একই সাথে ( same coordinate) পরপর দুটো বোমা ফেলে মাটির প্রায় শত মিটার গভীরে প্রবেশ করে বিস্ফোরণ ঘটায়।

ইরানকে আমরা হুবহু অনুকরণ করতে পারবো না। ইরান যুদ্ধ করেছে Asymmetrical Warfare Doctrine ( যেখানে শত্রু দূর্বল সেখানে আঘাত করা) আর Mosaic Command System বা Decentralised Command Structure এর মাধ্যমে।   ৩১ টি প্রভিন্সের কমান্ডাররা  পূর্ব নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুসারে নিজ নিজ আক্রমণ ও প্রতিরক্ষার সিদ্ধান্ত নিতো। তাদের যোগাযোগ ও রসদ পরিকল্পনা এবং যুদ্ধকালীন সময়েও যুদ্ধাস্ত্র ও গোলাবারুদ তৈরী অব্যাহত ছিলো যে কোন সময়েই সরবরাহের ঘাটতি না হয়। ইরানের মত বিশাল দেশ বাংলাদেশ নয়। যার আছে বিস্তৃত পর্বতমালা, মরুভূমি ও সমুদ্র উপত্যকার নিরাপদ স্হান।

সে তুলনায় বাংলাদেশ অত্যন্ত ছোট দেশ যার কোন ভূমির গভীরতা নেই, এবং সমতল ও খোলামেলা এবং জনবহুল।  কিন্তু আমাদের আছে অসংখ্য  নদী ও জলাভূমির ফাঁদ।  এই ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতাকে আধুনিক ও কার্যকরী অস্ত্র ও রনকৌশল ব্যবহারের মাধ্যমে দীর্ঘ মেয়াদি যুদ্ধের পরিকল্পনা করতে হবে।

ইরানের  আমেরিকার সাথে কনভেনশনাল পাওয়ার ডিনামিক্সে যায়নি। ইরানের লং ডিস্টেন্স ফাইটার জেট নেই। কারন তার জেট বিমান হাজার মাইল দূরে ইসরায়েলকে আঘাত করতে ৬টি গাদ্দার আরব ভূমির উপর দিয়ে যেতে হতো। ফাইটার জেট অতদূরে আঘাত করে মাঝ আকাশে রিফুয়েলিং না করে ফিরতে পারতো না। ইরানের সেই রিফুয়েলিং ক্ষমতা না থাকা সে বিভিন্ন পাল্লার মিসাইল ও কয়েক ধাপের এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমের উপর নির্ভর করেছে।  আর মৌমাছির মত ঝাঁকে ঝাঁকে শাহেদ ড্রোন তো গেম চেন্জার হিসাবে মর্ডান ওয়ার ফেয়ারে স্হান করে নিয়েছে।

ইরানের নেভী বলতে ফাস্ট মুভিং স্পীড বোট, স্বল্প গভীরতার সাবমেরিন আর  ড্রোন নির্ভর।  আমেরিকার বিশালাকৃতির এয়ারক্রাফট কেরিয়ার আগামী দিনগুলোতে পারস্য উপসাগরের “চোক পয়েন্ট গুলোতে জলে ভাসা হাঁসের মত উচ্চ প্রযুক্তি সম্পন্ন হাইপার সনিক মিসাইলগুলির কাছে অসহায়। এসব দৈতাকার রনতরী হরমুজ প্রণালীর মত চিকেন নেকে স্থলভূমির স্বল্প দূরত্বের রকেট এমনকি দূরপাল্লার আর্টিলারির আঘাতের লক্ষ্য বস্তু হয়ে উঠেছে।

ইরানের সাথে আমেরিকার ক্ষমতার যে ভারসাম্যহীনতা, ভারতের সাথে আমাদের একই রকম তফাৎ।

ভারতের কতটি ট্যাংক আছে, রাফায়েল যুদ্ধ বিমান আছে কত লক্ষ সৈন আছে, তার ব্যালেস্টিক মিসাইল কতদূরে আঘাত করতে পারে বা সে পারমাণবিক শক্তিশালী দেশ ভেবে আমরা চুপসে যেতে পারিনা। পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার  যে সহজ নয়, এটা যে শুধু বুলি বা ভয় দেখানোর একটি উপায় মাএ তা তো আমরা দেখলাম। তাই  ভারত পারমাণবিক শক্তিশালী দেশ বলে সমীহ করার কিছু নাই।  সে আমার সাথে কনভেনশনাল অস্ত্র নিয়েই কিছু করতে আসবে। এখন ভারতের সাথে পাল্লা দিয়ে আমাদের উচ্চমূল্যের ফাইটার জেট কয়টা কিনতে পারবো, কি ডেটারেন্স (  Deterrence)  বা সমীহ পাবো তা ভাবতে হবে।

ভারত তার আক্রমণাত্বক সক্ষমতা দিয়ে যুদ্ধের প্রথম ঘন্টায় আমাদের উড্ডয়ন সক্ষমতা নষ্ট করে দিবে। আমাদের যুদ্ধ বিমানগুলো কতক্ষণ বা কতটা সমীহ অর্জন করতে পারবে ভারতের এিমাএিক আকাশ প্রতিরক্ষার বিরুদ্ধে।

ইউক্রেন যুদ্ধে দেখা গেছে রাশিয়ার ট্যাংক বহরগুলি এফপিভি ড্রোনের এবং জ্যাভলিন এন্টিট্যাংক মিসাইলের ছোবল থেকে আত্মরক্ষার জন্য ছুটাছুটি করে মরতে।

আজ ২০ হাজার ডলারের শাহেদ ড্রোনের কাছে ৪ মিলিয়ন ডলারের অত্যাধুনিক ইন্টারসেপ্টর মিসাইল আকাশ প্রতিরক্ষায় ব্যর্থ।

আমরা শত বা হাজার কোটি টাকা দামের যুদ্ধ জাহাজ কয়টি কিনতে পারবো। নাকি ইরানের মত দ্রুতগতি সম্পন্ন ফাস্ট স্পীড বোট যা স্বল্প বা মাঝারি পাল্লার মিসাইল ছুঁড়তে সক্ষম তেমন কম দামের বেশি স্পীড বোট কিনে আমাদের নৌসক্ষমতা বাড়ানো যাবে কিনা তাই ইরানের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা শিক্ষা নিতে পারি। মিলিটারি ডকট্রিনে ‘ইকোনমি অফ ইফোর্ট ‘ বলে একটা তত্ব আছে। আমরা পুরাতন দশকের টেকনোলজি দিয়ে আধুনিক যুদ্ধ কিভাবে করতে পারি যখন প্রযুক্তি আমার মাঝারি অত্যাধুনিক যুদ্ধ বিমান আর আধুনিক ট্যাংকগুলোকে খেলনার মত আকাশ থেকে মাটিতে, মাটি থেকে ধূলায়  মিশিয়ে দিচ্ছে।

ইরানের Asymmetrical warfare Doctrine

এর অন্যতম উপাদান ছিলো প্রক্সী: হিজবুল্লাহ, হামাস, হুথী। যা ইসরায়েলকে তার সামরিক শক্তিকে বিস্তৃত অন্চলে বা একাধিক ফ্রন্টে আটকে রেখেছে। যার কারনে ইসরায়েলকে রিজার্ভ কে কল করতে হচ্ছে। তরুণদের সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করতে সামাজিক ও রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে নেতানিয়াহুর সরকার কে।

বাংলাদেশের এমন কোন প্রক্সী নেই যা দিয়ে প্রতিপক্ষকে একাধিক ফ্রন্টে বিস্তৃত করা যেতে পারে। আমাদের হয়েছে উল্টো।  আমাদের তথাকথিত আদিবাসীরাই সময় সুযোগ পেলে প্রতিপক্ষের প্রক্সী হয়ে ব্যবহৃত হতে পারে। ইরানের উওর-পশ্চিমান্চলে আছে কুর্দি বিদ্রোহী আমাদের দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলের “কুর্দিরা” ১৯৭৬ সালের মত আমাদের বিরুদ্ধে পুনরায় প্রক্সী হিসাবে যেন ব্যবহৃত না হয় তা আমাদের ভাবনায় রাখতে হবে।

ইরানের আছে হরমুজ প্রনালী। বিশ্বের সামরিক ও অর্থনীতির সব হিসাব নিকেষ পাল্টে দিয়েছে ২১ মাইল দীর্ঘ এই চোক পয়েন্ট। ৩০ মিটার গভীরতার এবং প্রকৃত অর্থে ২ মাইল জাহাজ চলাচলের উপযোগী এই সংকীর্ণ পথে ২৯ মিটার দীর্ঘ ডিজেল চালিত স্বল্প মূল্যের ডজনখানেক গেডার সাবমেরিন বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী নৌশক্তিকে অকার্যকর করে দিয়েছে।  আমাদের ভেবে দেখা উচিত “ Old Fancy Second War Era type সামরিক সরঞ্জাম বাদ দিয়ে শাহেদ ড্রোন, MANPAD, গেডার সাবমেরিন, মিসাইল ভিওিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্হা গড়ে তোলা। যা আমরা যুদ্ধকালীন সময়েও উৎপাদন করতে সক্ষম হবো।।

প্রকৃতপক্ষে ইরান যুদ্ধ এবং নিকটতম সময়ের পাকিস্তান  আমাদের এই শিক্ষাই দেয় দূর্বলের কোন সম্মান নাই,  আঘাত আসলে লড়তে হবে হ্যানি বেজারের মত। কামড় দিছিতো দিছিই ছাড়ুম না। এই কারনেই আফ্রিকার নৃশংসতায় অনন্য হায়েনার দলও হানিবেজার কে সামলে চলে।

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: ইরান যুদ্ধ, ইসরাইল, প্রবন্ধ
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন