এমআইটিতে বাংলাদেশের প্রথম পাহাড়ি তরুণী মং রানি

fec-image

অসংখ্য নির্ঘুম রাত—আবেদন করা আর প্রত্যাখ্যাত হওয়া। অবশেষে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে (এমআইটি) সুযোগ মিলল রানি উখেংচিং মারমার। বাংলাদেশে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে এমআইটিতে ভর্তির সুযোগ পাওয়া প্রথম ব্যক্তি তিনি। খাগড়াছড়ি মং সার্কেলের অষ্টম এই মং রানির সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন পিন্টু রঞ্জন অর্ক।

উখেংচিংয়ের জন্ম খাগড়াছড়ির মহালছড়ি উপজেলার চোংড়াছড়ি গ্রামে। তবে মা-বাবার চাকরিসূত্রে তাঁর শৈশব-কৈশোর কেটেছে খাগড়াছড়ি সদরে। দুই ভাই-বোনের মধ্যে তিনি বড়। নতুন কুঁড়ি ক্যান্টনমেন্ট হাই স্কুল থেকে ২০০৯ সালে এসএসসি এবং খাগড়াছড়ি ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে ২০১১ সালে এইচএসসি পাস করেছেন।

এরপর ভর্তি হয়েছেন চট্টগ্রামের এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনে; জনস্বাস্থ্য বিভাগে। তবে সেখানে সুযোগ পাওয়া সহজ ছিল না উখেংচিংয়ের জন্য। বলছিলেন, ‘এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনে ইংরেজি মাধ্যমে পড়ানো হয়। আর ইংরেজি আমাদের তৃতীয় ভাষা। মাতৃভাষার পর আমাদের বাংলা শিখতে হয়। তারপর ইংরেজি। আমার জন্য বাংলাটা যেমন কঠিন, ইংরেজিটা আরো কঠিন। তা ছাড়া দেশের নামকরা সব কলেজ থেকে শিক্ষার্থীরা আসে এখানে। আমাদের জন্য কোনো কোটাও নেই। ফলে ভর্তি পরীক্ষায় অন্যদের সঙ্গে লড়াই করেই আসতে হয়েছে। ’
২০১৭ সালে স্নাতক শেষে মানবাধিকার বিষয়ে সুইডিশ ইনস্টিটিউট থেকে ডিপ্লোমাও করেছেন ওই বছর। ২০১৮ সালে যোগ দিয়েছিলেন জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচিতে (ডাব্লিউএফপি)। রিসার্চ অ্যাসোসিয়েটস হিসেবে উখেংচিংয়ের কাজ ছিল গবেষণা ও লেখালেখি করা। সেখানে কাজ করেছেন সাড়ে চার বছরের মতো।

এর মধ্যে ২০২০ সালে বসেছেন বিয়ের পিঁড়িতে। বর খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার মং সার্কেল চিফ রাজা সাচিং প্রু চৌধুরী । এর মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের মং সার্কেলের অষ্টম রানি হয়েছেন উখেংচিং।

তবে চাকরি কিংবা সংসারজীবনে প্রবেশ করলেও উখেংচিংয়ের পড়ালেখার ক্ষুধাটা মরেনি। সব সময় চেয়েছেন দেশের বাইরে গিয়ে উচ্চতর ডিগ্রি নেবেন। ২০২০ সালে কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলম্বিয়ায় ইন্ডিজেনাস পাবলিক হেলথ ট্রেনিং বিষয়ে একটা কোর্স করেছেন। অবশ্য এমআইটিতে সুযোগ পেতে বেশ কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। ২০২০ সালে একবার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সফল হননি। পরের বছর আবারও আবেদন করলেন। এবার ভাগ্যের দেবী মুখ তুলে চাইল। চলতি বছরের এপ্রিলের শেষের দিকে একদিন এমআইটি থেকে ই-মেইল পেলেন। পড়তে গিয়ে নিজের অজান্তেই চোখের কোণে জল এলো। উখেংচিংকে অভিনন্দন জানিয়ে সেই মেইলে লেখা ছিল ‘এমআইটিতে আপনাকে স্বাগত’। এরপর ভিসার জন্য আবেদন করলেন। পেয়েও গেলেন সহজে। বাকি সব প্রস্তুতি সেরে আগস্টের প্রথম দিকে উড়াল দিলেন আমেরিকার উদ্দেশে।

এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ ২৮ আগস্ট ২০২২। উখেংচিং মারমার জীবনে এমন দিন কমই এসেছে। এদিন ওরিয়েন্টেশনের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এমআইটির জীবন শুরু হলো তাঁর। আর এতেই ইতিহাসের পাতায় উঠে গেল উখেংচিংয়ের নাম—বাংলাদেশে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মধ্যে এমআইটিতে সুযোগ পাওয়া প্রথম ব্যক্তি তিনি। ওরিয়েন্টেশনের পর এমআইটির প্রেসিডেন্ট রাফায়েল রেইফের সঙ্গে ছবিও তুলেছেন। সেই ছবি ফেসবুকে পোস্ট করে লিখেছেন, ‘সিএইচটি (পার্বত্য চট্টগ্রাম) থেকে এমআইটি—কী এক যাত্রা ছিল এটা! অসংখ্য নির্ঘুম রাত, আবেদন করা, প্রত্যাখ্যাত হওয়া; অবশেষে স্বপ্নের পথে যাত্রা। এই দিনটির জন্য মনের কোণে কত স্বপ্নই না বুনেছিলাম। চেষ্টা করার আগ পর্যন্ত বুঝতে পারবেন না আপনি আসলে কী করতে সক্ষম। ’

এমআইটিতে লিঙ্গুইস্টিক অ্যান্ড ফিলোসফি বিষয়ে মাস্টার্স প্রগ্রামে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন উখেংচিং। বিভাগ থেকে ফুল ফান্ডেড স্কলারশিপ পেয়েছেন। সঙ্গে দুই বছরের ফেলোশিপ। প্রথম বছর কোর্সওয়ার্ক করবেন, দ্বিতীয় বছরে গবেষণা। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ভাষা, কৃষ্টি, সংস্কৃতি সংরক্ষণের জন্য টেকনোলজিকে কিভাবে কাজে লাগানো যায়, টেকনোলজির বাইরে আর কী কী করা দরকার সে বিষয়ে গবেষণার ইচ্ছা আছে বলে জানালেন তিনি। বললেন, ‘যে ব্যাকগ্রাউন্ড থেকেই যান না কেন, এমআইটিতে দেখা হয় আপনি নতুন কী উদ্ভাবন করতে পারবেন। কোনো শিক্ষার্থীকে ভর্তি করার সময় মূলত এই বিষয়টা ওরা দেখে। সঙ্গে সহশিক্ষা কার্যক্রম। ’

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

seventeen − 17 =

আরও পড়ুন