এমরিপ-এর অনুগামী হয়ে ভূমির উপর গবেষণা করার আহ্বান জেএসএস প্রতিনিধির

fec-image

পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস) প্রতিনিধি অগাস্টিনা চাকমা ফলো-আপ প্রচেষ্টা হিসাবে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের ভূমি সমস্যার উপর নতুন গবেষণা পরিচালনার জন্য বিশেষজ্ঞ কর্মব্যবস্থার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

তিনি মঙ্গলবার (৫ জুলাই) জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর অধিকার বিষয়ক বিশেষজ্ঞ কর্মব্যবস্থা (এমরিপ)-এর ১৫তম অধিবেশনে “এজেন্ডা আইটেম ৫: ইন্টারসেশনাল কার্যক্রম এবং প্রতিপাদ্য বিষয়ভিত্তিক গবেষণা ও পরামর্শ” শীর্ষক আলোচনায় অংশগ্রহণের সময় এই আহ্বান জানান।

তার বিবৃতিতে অগাস্টিনা চাকমা বলেন, সমগ্র বিশ্বে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের রক্ষা করতে জাতিসংঘের উদ্যোগ অত্যন্ত প্রশংসিত এবং ফলস্বরূপ, অনেক জাতি বা দেশ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের স্বীকৃতি দিয়েছে। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সরকার আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী তথা জুম্ম জনগোষ্ঠীর স্বশাসন ব্যবস্থা প্রবর্তনের জন্য ১৯৯৭ সালে পিসিজেএসএস এর সাথে চুক্তি করলেও এটি এখনও বাস্তবায়ন থেকে অনেক দূরে রয়ে গেছে।

তিনি আরও বলেছেন যে,ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী জনগণের স্বশাসন এবং ভূমি, বন ও পাহাড়ের উপর তাদের অধিকারের মধ্যে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক রয়েছে। যতক্ষণ না পর্যন্ত ভূমি ও ভূখণ্ডের উপর ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের অধিকার নিশ্চিত করা যাবে , ততক্ষণ পর্যন্ত আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার নিশ্চিত করা যাবে না। তাই ১৯৯৭ সালে স্বাক্ষরিত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমির সমস্যা নিরসনের পাশাপাশি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী জুম্ম জনগোষ্ঠীর জমি ফিরিয়ে দেওয়ার বিধান করা হয়েছে।

১৯৭৮ থেকে ১৯৮২ সালের মধ্যে বাংলাদেশ সরকার সমতল জেলা থেকে প্রায় পাঁচ লক্ষ বাঙালি সেটেলার পাহাড়ি অঞ্চলে নিয়ে আসে যেখানে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী জুম্ম জাতি কয়েক শতাব্দী ধরে বসবাস করছে এবং এই সেটেলাররা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের ব্যাপক ভূমি অবৈধভাবে দখল করে চলেছে। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমির সমস্যা আরও জটিল হয়ে ওঠে।

তিনি আরো বলেন যে, ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি অনুযায়ী, ১৯৯৯ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন গঠিত হয়। শেখ হাসিনা সরকারের উদাসীনতা বিশেষ করে ২০১৬ সাল থেকে কমিশনের বিধিমালা প্রণয়নের কাজ ঝুলিয়ে রাখার কারণে এই ২০২২ সাল পর্যন্ত এই ভূমি কমিশন কাজ করতে পারেনি।

মিস চাকমা উল্লেখ করেন যে, আজ পর্যন্ত কমিশন চেয়ারম্যানের পদ তিনজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারক গ্রহণ করেছেন এবং তাদের কেউ এমন কিছু করেননি যা পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের কষ্ট দূর করতে পারে। বস্তুত এটা শেখ হাসিনা সরকারের একটা কালক্ষেপণের কৌশল, যাতে মুসলিম সেটেলারদের কর্তৃক বেদখলকৃত ভূমি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী প্রকৃত মালিকদের নিকট ফিরিয়ে দেওয়া না হয়। প্রয়োজনীয় জনবল, তহবিল ও পরিসম্পদের অভাবের ফলে বর্তমানে ভূমি কমিশন অচল অবস্থায় রয়েছে। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি সমস্যা সমাধান না করে জুম্ম জনগোষ্ঠীর উপর হামলা, গ্রামে গ্রামে অগ্নিসংযোগ, জমি দখল ও পৈত্রিক ভূমি থেকে উচ্ছেদ সংঘটিত হচ্ছে।

জনসংহতি সমিতির প্রতিনিধি উল্লেখ করেন, বান্দরবান জেলার চিম্বুক পাহাড় ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পাঁচ তারকা হোটেল ও বিনোদন পার্ক নির্মাণ করছে। এই প্রকল্প চারটি গ্রামকে প্রত্যক্ষভাবে এবং পরোক্ষভাবে ম্রো জনগোষ্ঠীর ৭০-১১৬ গ্রামকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে, যা প্রায় ১০,০০০ জুম কৃষককে উদ্বাস্তু হওয়ার ঝুঁকিতে ফেলবে। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ, ইবগিয়া, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এর মত অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থা, জাতীয় এনজিও, বুদ্ধিজীবী এবং স্থানীয় সম্প্রদায় প্রতিবাদ করেছে এবং এই ধরনের হোটেল ও বিনোদন পার্ক নির্মাণ না করার আহ্বান জানিয়েছে, কিন্তু তারা এ ব্যাপারে কোন মনোযোগ দেয় নি। এমনকি সরকারও এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ নীরব।

সেনাবাহিনী যেখানে খুশি সেখানে সড়ক নির্মাণ করছে এবং এতে বন ধ্বংস হচ্ছে যা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী জুম্ম জাতির পরিবেশ ও সংস্কৃতি ধ্বংস ছাড়া আর কিছুই নয়। প্রকৃতপক্ষে, এটা হচ্ছে সামরিক বাহিনীর সহজ চলাচল এবং ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের সহজে দমন করার জন্য কৌশল। তিনি ক্ষোভের সাথে উল্লেখ করেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে সেটেলার বা সামরিক বাহিনী কর্তৃক ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের কাছ থেকে ভূমি দখল করা একটি সাধারণ ঘটনা।

অগাস্টিনা চাকমা অনুগামী (ফলো-আপ) প্রচেষ্টা হিসাবে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের ভূমি সমস্যার উপর নতুন গবেষণা পরিচালনার জন্য বিশেষজ্ঞ মেকানিজমের প্রতি আহ্বান জানান।

জেএসএস প্রতিনিধি অবশেষে উল্লেখ করেছেন যে, ভূমি নিয়ে গবেষণা পরিচালনার পাশাপাশি, জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাই কমিশনের অফিসের সাথে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করা উচিত যে, যখনই সরকার এবং ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের মধ্যে একটি চুক্তি সম্পাদিত হয়, ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি তত্ত্বাবধানের ক্ষেত্রে জাতিসংঘকে অবশ্যই সম্পৃক্ত করতে হবে, যাতে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদেরকে তাদের ভূমি অধিকারের ক্ষেত্রে ন্যায্যতা প্রতিপাদন করা হয়।

গতকাল ৪ জুলাই ২০২২ সোমবার থেকে সুইজারল্যান্ডের জেনেভাস্থ জাতিসংঘের অফিসে এমরিপের ১৫তম অধিবশেন শুরু হয়েছে এবং বিভিন্ন এজেন্ডার ওপর অধিবেশনটি চলবে ৮ জুলাই পর্যন্ত। উক্ত অধিবেশনে জনসংহতি সমিতির প্রতিনিধি ছাড়াও বাংলাদেশি এক ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ফোরামের প্রতিনিধি হিসেবে নিটল চাকমাও অংশগ্রহণ করছেন।

এমরিপ-এর ১৫তম অধিবেশনে চেয়ার নির্বাচিত হলেন বাংলাদেশের বিনোতাময় ধামাই। এর আগে ২০২০ সালে ৩ বছরের জন্য তিনি এমরিপ-এর এশিয়া বিশেষজ্ঞ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন। ২০২১ সালের ১৪তম অধিবেশনে তিনি কো-চেয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া এবারের ১৫তম অধিবেশনে কো-চেয়ার হিসেবে নির্বাচিত হন মিজ শেরিল লাইটফুট (কানাডা) ও মিজ ভালমেইনে টকি (নিউজিল্যান্ড)।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

thirteen − 12 =

আরও পড়ুন