এরশাদের নির্দেশ অমান্য করলেন সুলাইমান শেঠ: খাগড়াছড়িতে সবকূল হারালেন কুজেন্দ্র লাল

পার্বত্যনিউজ রিপোর্ট :

নেতাকর্মীদের প্রবল চাপ সত্ত্বেও দলীয় নির্দেশে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে নিজের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নিলেন খাগড়াছড়ি সংসদীয় আসনে আওয়ামীলীগ মনোনীত প্রার্থী ও জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিনে শুক্রবার বিকেলে নিজের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নিয়েছেন তৃণমুলের কাছে জনপ্রিয় এ নেতা। বিকাল ৫টার কিছু সময় পূর্বে জেলা আওয়ামীলীগের যুব বিষয়ক সম্পাদক মংশেপ্রু চৌধুরী অপু তার পক্ষে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার পত্রে স্বাক্ষর করেন বলে জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ও দলীয় সূত্র নিশ্চিত করেছেন। এর মধ্য দিয়ে খাগড়াছড়ির নির্বাচনী লড়াইয়ে কুজেন্দ্র ‘আউট’ এবং সোলেমান শেঠ ‘ইন’ করলেন।

ধারণা করা হচ্ছে, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জোটগত মেরুকরণের অংশ হিসেবে জাতীয় পার্টির সাথে আওয়ামীলীগের আসন ভাগাভাগির সমঝোতায় পার্বত্য খাগড়াছড়ি সংসদীয় আসনটি জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য সুলাইমান শেঠকে ছেড়ে দেয়ার কারণে দলের সর্বোচ্চ মহলের নির্দেশে নিজের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নিলেন কুজেন্দ্র। খাগড়াছড়ির এ আসন নিয়ে আওয়ামীলীগের সাথে সমঝোতার মাধ্যমে পার্টি চেয়ারম্যানের নির্দেশ অমান্য করে নির্বাচনে রয়ে গেলেন সুলাইমান শেঠ, এতে করে কপাল পুড়লো আওয়ামী লীগ প্রার্থী কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরার। আর সবকূল হারালেন কুজেন্দ্র। মনোনয়নও জুটলো না, মাঝখানে জেলাপরিষদ চেয়ারম্যানের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদ হারালেন।

সদ্য স্বেচ্ছায় পদত্যাগকৃত সাবেক পাজেপ চেয়ারম্যান কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরার প্রার্থীতা প্রত্যাহারের বিষয়টি সকাল থেকে জেলা শহরের সর্বত্র আলোচনায় থাকলেও নানা নাটকীয়তা অবসান ঘটায় আওয়ামী পরিবারে চরম হতাশা দেখা দিয়েছে। ফলে খাগড়াছড়ির আসনে বিএনপি’র অংশগ্রহন না থাকলেও নির্বাচনে মাঠে জাতীয়পার্টির সোলায়মান আলম শেঠ ও আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল ইউপিডিএফ প্রার্থী প্রসীত বিকাশ খীসার নির্বাচনী লড়াই কতটুকু জমে উঠবে তা নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন।

খাগড়াছড়িতে আওয়ামীলীগ-সুলাইমান শেঠ সমঝোতার বলি হওয়ার পাশাপাশি তার একুল-ওকুল দুই-ই গেল বলে মনে করছেন জেলার রাজনৈতিক সচেতন মহল। সকল আশঙ্কা কাটিয়ে আগামী সংসদ নির্বাচনে খাগড়াছড়ি সংসদীয় আসনে আওয়ামীলীগ সমর্থিত প্রার্থী হিসেবে লড়বেন জাতীয় পার্টির (এরশাদ) প্রেসিডিয়াম সদস্য ও চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির আহ্বায়ক আলহাজ্ব সোলায়মান আলম শেঠ। তবে লাঙ্গল প্রতীক না দেয়া বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের কাছে এরশাদের চিঠি প্রেক্ষিতে তিনি লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে না নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করবেন তা এখনো পরিস্কার নয়।

এ ব্যাপারে সোলাইমান শেঠের সাথে টেলিফোনে কথা হয় গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে। তিনি নিজেকে মহাজোটের মনোনীত প্রার্থী বলে দাবী করেন। মহাজোট অনেক আগেই অবলুপ্ত হয়ে গেছে, কাজেই তিনি কি করে নিজেকে মহাজোটের প্রার্থী দাবী করছেন- এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বিব্রত হয়ে বলেন, আমরা মহাজোটের প্রার্থী নয়.  জাতীয় পার্টি থেকে নির্বাচন করছি। জাতীয় পার্টি কোন গ্রুপ থেকে নির্বাচন করছেন- এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, এরশাদ-রওশান এরশাদ গ্রুপ থেকে করছি। কাজী জাফর তো প্রশ্নই ওঠে না। সে তো এখন জাতীয় পার্টির কেউ নয়। সে বহিস্কৃত এখন। এরশাদ সাহেব তো নমিনেশন তুলে নিতে বলেছেন, তাহলে আপনি কি করে নিজেকে এরশাদ গ্রুপের প্রার্থী হিসাবে নিজেকে দাবী করছেন? উনি যাদেরকে তুলে নিতে বলেছেন তারা তুলে নেননি। প্রেসিডিয়ামের দুইএকজন ছাড়া সবাই রয়ে গেছে। ২০০’র উপর নমিনেশন দেয়া হয়েছিল। যাদের নমিনেশন দেয়া হয়নি এমনকিছু লোক প্রত্যাহার করেছে। বাকিরা তো সবাই রয়ে গেছে। ৪৮ জনের আমি একজন। কেউ খাবে কেউ খাবেনা তা হবে তা হবে না। এখানে কিছু কিছু স্বার্থবাদী লোকেরা নির্বাচন করছে না। যাদের নিজেদের স্বার্থ আছে, দুই নম্বরী করতে পারবে তারা করছে না। যারা নিজেদের পকেটের টাকা খরচ করেছে, কোটি কোটি টাকা দিয়ে দল চালিয়েছে তারা কেন নির্বাচন করবে না? কিন্তু এরশাদ সাহেব তো তুলে নেয়ার সিদ্ধান্তে অটল, তাহলে কি আপনি চেয়ারম্যানের নির্দেশের থেকে রওশন এরশাদের নির্দেশকে বেশী গুরুত্ব দিচ্ছেন- এমন প্রশ্নের উত্তরে শেঠ বলেন, এটা তো আমরা জানি না। বাট ম্যাডাম বলেছে ইলেকশন করো, বাস করলাম। আমি মনে করি ৯৫% প্রেসিডিয়াম সদস্য মনোনয়ন প্রত্যাহার করেননি। স্যারের আপন আপন লোকেরাও করেনি। স্যার বলে প্রত্যাহার করতে হবে, ম্যাডাম বলে করো না। এখন কার কথা শুনবো বলেন? দুইজনই তো প্রথম দ্বিতীয়। আমরা তো দোটানায় পড়ে গেছি।

মনোনয়ন প্রত্যাহারের বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগ প্রার্থী কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা মুঠোফোনে জানান, দল আমাকে মনোনয়ন দিয়েছিল তবে শেষ সময়ে এসে আসন ভাগাভাগির কারণে দলের হাই কমান্ডের নির্দেশে মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নিয়েছেন তিনি। এছাড়াও তিনি ব্যক্তিগত কিছু সমস্যার কথা বলেন।

অপরদিকে, এ আসনের সাংসদ যতীন্দ্র লাল ত্রিপুরা মুঠোফোনে এ প্রতিনিধিকে জানান,  আওয়ামীলীগ কেন্দ্রীয় ভাবে প্রার্থী চূড়ান্ত করার সময় তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় ভারত থাকায় এ সুযোগে কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরার লোকজন কেন্দ্রে এসে কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরাকে প্রার্থী করিয়ে নেন।  ২০ নভেম্বর তিনি দেশে ফিরে এসে এ আসনের প্রার্থী নিশ্চিত থাকলেও পরক্ষণে প্রার্থীতা পাননি বলে তিনি কিছুটা হতাশ থাকলেও কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরার প্রার্থীতা প্রত্যাহার হওয়ায়ও তিনি হতাশ বলে ব্যক্ত করেন।

২৯৮ পার্বত্য খাগড়াছড়ি সংসদীয় আসনে আওয়ামীলীগের কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা ও ইউপিডিএফ‘র উজ্জ্বল স্মৃতি চাকমা মনোনয়ন পত্র প্রত্যাহার করায় নির্বাচনী মাঠে রইলেন ইইউপিডিএফ‘র প্রসীত বিকাশ খীসা, জাতীয় পার্টিও (এরশাদ) আলহ্জ্ব সোলায়মান আলম শেঠ এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (এমএনলারমা)’র প্রকৌশলী মৃনাল কান্তি ত্রিপুরা।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন