জামায়াতের আমির কেন মুক্তিযুদ্ধের নতুন ইতিহাস সামনে আনলেন?


মুক্তিযুদ্ধে কর্নেল অলি প্রথম উই রিভোল্ট বলে বিদ্রোহ করেছিলেন- জামাতের আমিরের এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে জিয়াউর রহমানের অবদান প্রতিষ্ঠিত। রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের উদ্দেশ্যে আওয়ামী লীগ তাকে নানাভাবে বিতর্কিত করতে চেয়েছে। তাতে কোন ফায়দা হাসিল হয়নি আদতে। ৩৬ জুলাই বিপ্লবের পর জামাতে ইসলামী তারেক রহমানকে নিয়ে অনেক নেতিবাচক বক্তব্য রাখলেও জিয়াউর রহমান সম্পর্কে শ্রদ্ধা দেখি আসছেন বলে দাবি করে থাকে। তাহলে হঠাৎ কি এমন ঘটল যে জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার মহান ঘোষক বলে আমাদের ইতিহাসে অবিসম্বাদিত হয়ে রয়েছেন, তার পাশে একজন তারই অধস্তন সহকর্মী কর্নেল ওলিকে প্রথম বিদ্রোহ কারী হিসেবে দাঁড় করাতে গেল?
১৯৭১ জামায়াতের ইসলামের রাজনীতিতে একটি দুঃস্বপ্নের কালো অধ্যায়। যা তাকে সব সময় তাড়া করে বেড়ায়। অনেক চেষ্টা করেও এই অধ্যায়টি মুছে দিতে তারা সক্ষম হয়নি। সে কারণে ৩৬ জুলাই অভ্যুত্থানের পর জামায়াতের পক্ষ থেকে ১৯৭১ বিপক্ষে ২০২৪, মুক্তিযোদ্ধার বিপক্ষে জুলাই যোদ্ধা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরুদ্ধে জুলাইয়ের চেতনা এবং স্বাধীনতার বিপক্ষে দ্বিতীয় স্বাধীনতা নানা বয়ান হাজির করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু এই ন্যারেটিভ গুলো দেশের মানুষের কাছে সেভাবে গ্রহণযোগ্য হয়নি।
যেকোনো বিপ্লবী রাজনৈতিক দল তাদের সাথে সম্পর্কিত ঘটনা প্রবাহে অত্যন্ত পজেসিভ থাকে। জামাত মুখে গণতন্ত্রের কথা বললেও ভিতরে দলটি আপাদমস্তক একটি বিপ্লবী চেতনায় উজ্জীবিত রাজনৈতিক দল। কাজেই এ ধরনের বিপ্লবী রাজনৈতিক দল ১৯৭১ সম্পর্কেও তাদের একটা প্রজেসিভনেস দাঁড় করাতে চাইবে এটা খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। সে কারণে সারা জীবন জামায়াতের কট্টর সমালোচক থাকা মুক্তিযোদ্ধা মেজর আখতারুজ্জামানকেও দলে টেনে নিয়েছে। এমনকি জামাতের সাথে জোট করে বিএনপি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরুদ্ধে যাওয়ার প্রতিবাদ করে যে অলি আহাম্মদ বিএনপি ভেঙে এলডিপি গঠন করেছিলেন, তাকেও তাদের জোটে আশ্রয় দিয়েছে। এ দুটো ঘটনা থেকে বোঝা যায় জামাত মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপারে তাদের একটি পজেসিভ বয়ান দাঁড় করাবে। এর প্রথম নতিজা পাওয়া যায়, কয়েকদিন আগে জামাতের আমিরের একটি বক্তব্য থেকে, যেখানে তিনি বলেছিলেন ১৯৭১ সালে তারা বুক চেতিয়ে লড়াই করেছিলেন। অথচ ১৯৭১ সালে জামায়াতের ভূমিকা সর্বজনবিদিত। এবং এ ভূমিকার জন্য জামাত আমির নিজেও একাধিকবার প্রকাশ্যে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। কাজেই কর্নেল অলি কে মুক্তিযুদ্ধের প্রথম বিদ্রোহী হিসেবে দাঁড় করানো জামাত আমিরের কোন মুখ ফসকে বেরিয়ে আসা কোন কথা নয়। বরং বোঝা যাচ্ছে, তারা মুক্তিযুদ্ধকে তাদের পাশে শক্তি হিসেবে দাঁড় করাতে চাইছে। সে কারণে খ্যাতিমান মুক্তিযোদ্ধাদের তাদের দলে টানা এবং নতুন মুক্তিযুদ্ধের প্রথম বিদ্রোহী আবিষ্কার করা।
প্রশ্ন উঠতে পারে, কর্নেল অলি আসলেই কী মুক্তিযুদ্ধের প্রথম বিদ্রোহী? ইতিহাস কী বলে?
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস আমি মোটামুটি ভালোভাবেই পড়ার চেষ্টা করেছি। একটি বিষয়ে আমার কাছে সবচেয়ে লক্ষণীয় মনে হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সবচেয়ে বেশি গড়গড় করেছেন বিখ্যাত মুক্তিযোদ্ধারাই। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধে নিজেদের ভূমিকা বয়ান করার সময় তারা এমনভাবে বয়ান করেছেন, যেন মুক্তিযুদ্ধে তিনিই নেতৃত্ব দিয়েছেন। তার নেতৃত্বেই সবকিছু হয়েছে। এটা বেশিরভাগ বীর মুক্তিযোদ্ধা যারা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আত্মজীবনী অথবা মুক্তিযুদ্ধে নিজেদের ভূমিকা নিয়ে লিখেছেন, তারা সচেতনভাবে এই কাজটি করেছেন। এমনকি শুরুতে যেটা বলেছেন, বেশ কয়েক বছর পরে এসে সেটি তারা পরিবর্তন করেছেন।
সন্দেহ নেই বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রথম ডাক এসেছিল চট্টগ্রাম থেকেই। যদিও তার পূর্বেই রাজারবাগে হামলা হয়েছিল এবং সেখানে থাকা পুলিশ সদস্যরা সেই হামলার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। কিন্তু সেই প্রতিরোধ কোনোভাবেই স্বাধীনতার ডাক ছিল না, ছিল আত্মরক্ষা।
মেজর জেনারেল সুবিদ আলী ভূঁইয়া স্বাধীনতার প্রাক্কালে চট্টগ্রামেই ছিলেন। তিনি সেখান থেকেই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন শুরুর দিকে। সুবিদ আলী ভূঁইয়া চাকরির শেষ প্রান্তে বেগম খালেদা জিয়ার প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার হয়েছিলেন, ১৯৯৬ সালে জেনারেল নাসিমের বিদ্রোহ দমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন, এবং চাকরির শেষে বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছিলেন। কিন্তু তার সংসদীয় আসন ও ডঃ খন্দকার মোশাররফ হোসেনের একই হওয়ায় বেগম খালেদা জিয়া তাকে মনোনয়ন দিতে না পারায় তিনি আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। যদিও প্রথম দিকে তার পরিবার এই যোগদানের সন্তুষ্ট ছিল না। পরবর্তীকালে তিনি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সংসদীয় কমিটির সভাপতিও হয়েছিলেন।
তিনি একসময় ইনকিলাবে নিয়মিত লিখতেন এবং সেই সুবাদে তার সাথে আমার যথেষ্ট ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল। তার বাসাতেও নিয়মিত যাতায়াত ছিল। আওয়ামী লীগের যুক্ত হওয়ার পর সেই সম্পর্কে ছেদ পড়ে। তিনি বিএনপির রাজনীতির সাথে যুক্ত থাকাকালে মুক্তিযুদ্ধে তার ভূমিকা নিয়ে একটি বই লিখেছিলেন। সেই বইয়ের শিরোনাম ছিল, ‘আমি কেন স্বাধীনতার ঘোষক নই?’ এই বইয়ে তিনি নিজেকে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে দাবি করেছিলেন। যদিও এতে তার বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত থাকা নিয়ে কেউ কোনো প্রশ্ন তোলেনি। বিএনপি আসলে এইসব বই পুস্তক নিয়ে যদি সিরিয়াস হত তাহলে এতসব বই লেখার পরে মওদুদ আহমেদ বিএনপির এত উচ্চ পর্যায়ের নেতা থাকতে পারতেন না কিংবা আবু সাঈদ এর মত লোক বিএনপিতে যোগ দিতে পারতেন না। কিন্তু আওয়ামী লীগ এ ব্যাপারে অত্যন্ত সিরিয়াস ছিল। আওয়ামী লীগের যোগদানের পর আমি তাকে বলেছিলাম, আপনার বই তো আপনার জন্য কাল হয়ে দাঁড়াবে আওয়ামী রাজনীতিতে। বিএনপি কিছু না বললেও আওয়ামী লীগ এই বিষয়ে মেনে নেবে না। সে কারণে জেনারেল সুবিদ আলী ভূঁইয়া আওয়ামী লীগে যোগদানের পর মার্কেট থেকে এই বই সম্পন্ন তুলে নেন। এবং বইয়ের শিরোনাম এবং বেশ কিছু জায়গা পরিবর্তন করে নতুন নামে বই বাজারে আনেন। এটা আমি অবশ্য অনেক পরে শুনেছিলাম বাংলাবাজারের এক প্রকাশকের নিকট থেকে। এই পুস্তকে তিনি ১৯৭১ সালের ২৬ শে মার্চ সন্ধ্যায় কুমিরায় তার নেতৃত্বে যুদ্ধ পরিচালনার দাবি করেছেন। এছাড়াও কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে তার নামে একটি ঘোষণা প্রচার করা হয়েছিল বলে তিনি দাবী করেছেন। যেখানে বলা হয়েছিল সবাইকে অস্ত্র নিয়ে তার কাছে রিপোর্ট করার জন্য। অথচ স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিল পত্রে তিনি এই ঘটনাটি ২৮ মার্চের বলে নিজেই বর্ণনা করেছেন। আর মুক্তিযুদ্ধের বিদ্রোহ ২৫ শে মার্চ মাঝরাত থেকেই শুরু হয়েছে।
কয়েকদিন আগে এক ভিডিওতে শুনলাম, কর্ণেল অলি বলছেন, দুপর একটার দিকে ঢাকায় রাজারবাগে পাক বাহিনী হামলা করেছিল। এটা ছিল সম্পূর্ণ মিথ্যা তথ্য। কেননা রাজারবাগে হামলা হয়েছিল রাত আনুমানিক সাড়ে দশটা থেকে সাড়ে এগারোটার মধ্যে। সে সময় ইপিআরে মেজর হিসেবে দায়িত্ব ছিলেন রফিকুল ইসলাম বীর উত্তম। মেজর রফিক নিজে তার বইয়ে লিখেছেন, ২৫ মার্চ বিকেল থেকেই চট্টগ্রামের ইপিয়ারের সাথে ঢাকার পিলখানার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। অথচ অনেক মুক্তিযোদ্ধা দাবি করেছেন, এখানেই নাকি শেখ মুজিব তার স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠিয়ে ছিলেন। মেজর রফিকের বর্ণনায়, তিনি মোটামুটি সন্ধ্যা থেকেই বিদ্রোহের কার্যক্রম শুরু করেন। অথচ তিনিই আবার বলেছেন, ঢাকায় সেনাবাহিনী ক্র্যাক ডাউন শুরু করার খবর পেয়ে তারা চট্টগ্রামে বিদ্রোহ শুরু করেন। কিন্তু ঢাকায় সেনাবাহিনী ক্রাক ডাউন শুরু করে রাত সাড়ে দশটার পর। উনারা এভাবেই এক এক সময় এক এক তথ্য দিয়ে জাতিকে বিভ্রান্ত করেছেন এবং বিতর্কের মধ্যে পতিত করেছেন। তার বই পড়লে মনে হয়, তিনি বার্তা দিয়ে অষ্টম ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টকে বিদ্রোহ করতে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন।
কিন্তু অষ্টম ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টে দায়িত্বরত অন্য কোন অফিসার বা জেসিও’র বর্ণনায় এমন তথ্য সমর্থিত হয় না। বরং জিয়াউর রহমানের বর্ণনায় পাওয়া যায় তারা বিদ্রোহ করার পর মেজর রফিককে এই তথ্য জানানোর জন্য তিনি নিজে চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সংযোগ পাননি। কেননা ইতিমধ্যেই তিনি ইপিআর সৈন্যদের নিয়ে স্থান ত্যাগ করে চলে গিয়েছিলেন।
অষ্টম বেঙ্গল রেজিমেন্টে জিয়াউর রহমানের জুনিয়র ছিলেন মেজর মীর শওকত আলি। একমাত্র তিনি বলেছেন, জিয়াউর রহমান বাঙালি সৈনিক ও অফিসারদের অষ্টম বেঙ্গল রেজিমেন্টে এড্রেস করেছিলেন, একটি তেলের ড্রামের উপরে দাঁড়িয়ে। অথচ অন্যরা বলেছেন তিনি একটি টেবিলের উপরে দাঁড়িয়ে এই ঘোষণা দিয়েছিলেন।
কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণার সাথে বেতার কর্মী বেলাল মোহাম্মদের নাম জড়িত। তিনি এমনভাবে লিখেছেন যেন তার অনুরোধে জিয়াউর রহমান তাৎক্ষণিক স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু অষ্টম ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের যে সমস্ত অফিসাররা তখন বিদ্রোহ করে ক্যান্টনমেন্টের বাইরে চলে গিয়েছিলেন তাদের কারো বক্তব্যেই এটা সমর্থিত নয়। বরং কর্নেল অলি আহমদ সহ অন্যান্য যারা লিখেছেন, তাদের বর্ণনায় দেখা যায়, তারা স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েই সেখানে গিয়েছিলেন।
অলি আহমদ বিএনপি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর যেগুলো বলছেন, এবং এমন ভাবে বলছেন, যেন তারা জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে বাধ্য করেছিলেন অথবা তাদের চাপে বাধ্য হয়ে জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। এবং জিয়াউর রহমানের সিদ্ধান্তের পূর্বেই অষ্টম ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈনিকদের নিয়ে তিনি বিদ্রোহ ঘোষণা করে দিয়েছিলেন। এটা সম্পূর্ণ অবাস্তব ও অগ্রহণযোগ্য। কেননা তৎকালীন সিগন্যালস অফিসার ক্যাপ্টেন অলি আহমদ অষ্টম ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের সবচেয়ে সিনিয়র অফিসার ছিলেন না। ব্যাটালিয়ন কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল জানজুয়ার পরবর্তী সিনিয়র অফিসার বা ব্যাটালিয়ন টু আইসি ছিলেন মেজর জিয়াউর রহমান, এরপর ছিলেন মেজর মীর শওকত আলী। এরা সবাই কর্নেল ওলির সিনিয়র অফিসার ছিলেন। তাদের অনুপস্থিতিতে বা তাদের সিদ্ধান্ত ছাড়া কর্নেল অলির পক্ষে রিভল্ট করা কোনভাবেই সম্ভব ছিল না। এমনকি জিয়াউর রহমান চট্টগ্রাম বন্দরের পথে রওনা হওয়ার পর ব্যাটালিয়নের বাঙালি অফিসারদের মধ্যে মোস্ট সিনিয়র ছিলেন মেজর মীর শওকত আলী, তারা ব্যাটেলিয়ানেই উপস্থিত ছিলেন। তাদের সিদ্ধান্ত ছাড়া কর্নেল অলির পক্ষে বিদ্রোহ ঘোষণা করা সম্ভব ছিল না। লজিক্যালি ধরে নিলাম তিনি ওই রিভোল্ট বলে জিয়াউর রহমান এবং মীর শওকতকে না জানিয়েই বিদ্রোহ করে দিয়েছেন। কিন্তু জিয়াউর রহমান এবং মীর শওকত এসে যদি তার সাথে একমত না হত, কিংবা তার কাছে চেইন অফ কমান্ড সম্পর্কে প্রশ্ন করতো, তখন ওই ব্যাটেলিয়ানে কী পরিস্থিতি তৈরি হতো সেটা কর্নেল অলির অজানা ছিল না।
প্রকৃত বাস্তবতা হচ্ছে, ক্যাপ্টেন ওলি যেহেতু সিগনাল অফিসার ছিলেন। কাজেই চট্টগ্রাম বন্দরে যাওয়ার পূর্বে মেজর জিয়াউর রহমান তাকে সকল পরিস্থিতির উপরে নজর রাখা এবং কোন অস্বাভাবিক পরিস্থিতি দেখলে তাকে দ্রুত জানানোর জন্য নির্দেশ দিয়ে যান। সে মোতাবেক ক্যাপ্টেন অলি যখন ঢাকায় ক্রাক ডাউন শুরু হওয়ার খবর পান তখন তিনি ক্যাপ্টেন খলিকুজ্জামানকে জিয়াউর রহমানের কাছে এই বার্তা পৌঁছে দেয়ার জন্য পাঠান। ক্যাপ্টেন খলিকুজ্জামান আগ্রাবাদের কাছাকাছি জিয়াউর রহমানকে এই বার্তা পৌঁছে দেন। জিয়াউর রহমান কয়েক মুহূর্ত সময় নিয়ে ক্যাপ্টেন খলিকুজ্জামানকে বলেন, উই রিভোল্ট। তুমি ব্যাটেলিয়য়ে ফিরে গিয়ে সবাইকে আমার সিদ্ধান্ত জানাও এবং অলিকে বলো সবাইকে প্রস্তুত করতে।
এরপর যে ট্রাক নিয়ে জিয়াউর রহমান গিয়েছিলেন সেখানে থাকা পাঞ্জাবি সৈনিকদের তিনি বলেন, নতুন নির্দেশ এসেছে আমাদের ফিরে যেতে হবে। তারা কোন রূপ সন্দেহ ছাড়াই জিয়াউর রহমানের এই সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে ব্যাটেলিয়নে ফিরে আসেন। ব্যাটালিয়নে ফিরে আসার পর জিয়াউর রহমান তার সাথে থাকা পাকিস্তানি সৈনিকদের বন্দি করেন। অলি আহমদকে বলেন, মেজর শওকতকে খবর দিতে। তিনি নিজে যান সিও লেফটেন্যান্ট কর্নেল জান্জুয়াকে আটক করতে। জানজুয়াকে আটক করে ফিরে এসে মীর শওকতকে দেখার পর বলেন, শওকত উই রিভোল্ট, তুমি আমাদের সাথে যোগ দেবে? মেজর শওকত হাসিমুখে এই প্রস্তাব মেনে নেন এবং বিদ্রোহে যোগ দেন। রহমানের নির্দেশে ইতোমধ্যেই সকল পাকিস্তানি সৈনিকদের আটক করা হয়েছিল এবং বাঙালি সৈনিকদের এক জায়গায় জড়ো করা হয়েছিল। এরপর সকল বাঙালি অফিসার ও সৈনিকদের উদ্দেশ্যে মেজর জিয়া তাদের উদ্দেশ্যে বিদ্রোহের কথা এবং স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরুর ঘোষণা দেন। সিগন্যাল অফিসার ক্যাপ্টেন অলিকে দায়িত্ব দেন ক্যান্টনমেন্টের বাইরের বিভিন্ন স্থানে থাকা বাঙালি সেনা ও ইপিআর ইউনিটগুলোকে এবং আওয়ামীলীগ নেতৃবৃন্দকে এই তথ্য জানানোর জন্য যে অষ্টম ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্ট বিদ্রোহ ঘোষণা করে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু করেছে। এই বক্তব্য দ্বারা বোঝা যায়, ইপিআর অফিসার মেজর রফিকের কার্যক্রমের কথা তখনও ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টে এসে পৌঁছায়নি। এগুলো প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তার বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘একটি জাতির জন্ম’ তে সবিস্তারে উল্লেখ করেছেন। এটি স্বাধীনতার পরপরই এবং শেখ মুজিবের শাসনামলেই প্রকাশিত হয়েছিল। এখানকার লেখা প্রতিটা বর্ণ নিয়ে কেউ কোনো বাদ বা বিবাদ ৫৫ বছরে করেনি।
এরপর মেজর জিয়াউর রহমান কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রে যান। তার সাথে ক্যাপ্টেন অলিও ছিলেন। সেখানে তিনি নিজেকে প্রথম অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রধান হিসেবে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। এই ঘোষণা শোনার পর চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ তার কাছে বার্তা পাঠান শেখ মুজিবের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়ার জন্য। তিনি এই বার্তা সানন্দে মেনে নেন এবং পরবর্তী ঘোষণা পরিবর্তন করে শেখ মুজিবের পক্ষে এবং নিজেকে মুক্তিবাহিনীর প্রধান দাবি করে পুনরায় স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। এটাই প্রকৃত ইতিহাস। এই ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র মেজর শওকত, ক্যাপ্টেন খলীকুজ্জামান, ক্যাপ্টেন অলি আহমদ। এরা সবাই সেদিন নিজ নিজ জায়গা থেকে অসামান্য ভূমিকা পালন করেছিলেন দেশ মাতৃকার মুক্তির সংগ্রামে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। ক্যাপ্টেন অলি আহমেদ, ক্যাপ্টেন খলিকুজ্জামানকে পাঠিয়ে জিয়াউর রহমানকে রাস্তায় আটকে দিয়েছিলেন। জীবন রক্ষার মালিক আল্লাহ। কিন্তু ক্যাপ্টেন অলি যদি সেদিন খলিফুজ্জামানকে না পাঠাতেন এবং জিয়াউর রহমান চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছে যেতেন তাহলে সেখানকার প্রাণহানির সংশয় ছিল। এছাড়াও তার এই বার্তার কারণেই জিয়াউর রহমান মূলত ফিরে এসে অষ্টম ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের দায়িত্বভার গ্রহণ করে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছেন। কাজেই কর্নেল অলির এই ভূমিকাটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এটাও সত্য যে, সিনিয়র অফিসার মেজর জিয়ার কাছ থেকে যদি ইঙ্গিত না থাকতো তাহলে এই ধরনের বিদ্রোহের বার্তা তিনি তার কাছে পাঠাতে সাহস করতেন না। তাই এদের কাউকে ছোট বা কাউকে বড় করার প্রয়োজন নেই। ইতিহাসে যার যা প্রাপ্য তাকে সেটা দিতেই হবে।
















