পাহাড় ধসের উচ্চঝুঁকিতে মানুষ

টানা বর্ষণে খাগড়াছড়িতে জনজীবন বিপর্যস্ত

fec-image

টানা চারদিনের ভারী বর্ষণ ও বৈরী আবহাওয়ায় কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ির স্বাভাবিক জনজীবন। মঙ্গলবার (৭ জুলাই) সকাল থেকে শুরু হওয়া মুষলধারে বৃষ্টি দিনভর অব্যাহত থাকায় চেঙ্গী নদীসহ জেলার বিভিন্ন ছড়া-খালের পানি আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে নিম্নাঞ্চলের সড়ক, বসতবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে পড়েছে। জেলার বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হওয়ায় শতাধিক পরিবার পানিবন্দী হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে।

জেলা সদরের মুসলিমপাড়া, আরামবাগ, মেহেদীবাগসহ বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল পানিতে তলিয়ে গেছে। অনেক এলাকায় হাঁটুসমান পানি জমে যাওয়ায় যানবাহন ও মানুষের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। অসংখ্য পরিবার ঘরবন্দি হয়ে পড়েছে। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে রয়েছেন শিশু, নারী, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিরা।

অন্যদিকে মহালছড়ি উপজেলার মাইসছড়ি বাজার ও স্লুইচগেট পাড়া এলাকার সড়ক পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় স্থানীয়দের চলাচলে চরম দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে। দীঘিনালা-লংগদু সড়কের আটারকছড়া এলাকায় সড়ক প্লাবিত হওয়ায় ওই সড়কে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। ফলে যোগাযোগ ব্যবস্থায়ও বিরূপ প্রভাব পড়েছে।

অবিরাম বৃষ্টির কারণে জেলার বিভিন্ন উপজেলা এবং সদর উপজেলার মধ্য শালবন, সবুজবাগ, শালবনসহ কয়েকটি এলাকায় বিক্ষিপ্তভাবে পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটেছে। এখন পর্যন্ত বড় ধরনের প্রাণহানি বা ক্ষয়ক্ষতির খবর না মিললেও টানা বর্ষণ অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলা প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি, আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা এবং পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসরত পরিবারগুলোকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।

খাগড়াছড়ি সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারিয়া সুলতানা জানান, টানা বৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত ও পানিবন্দী পরিবারগুলোর খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দাদের জন্য ২৫টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পাশাপাশি পাহাড় ধসের ঝুঁকিতে থাকা শতাধিক পরিবারকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

খাগড়াছড়ির অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) হাসান মারুফ বলেন, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। পাহাড় ধসের ঝুঁকিতে থাকা এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে মাইকিং করা হচ্ছে এবং পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।

এদিকে মঙ্গলবার বিকেলে খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাত, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শেফালিকা ত্রিপুরা, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) হাসান মারুফ, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারিয়া সুলতানাসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জলাবদ্ধ নিম্নাঞ্চল ও পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসরত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো পরিদর্শন করেন এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসরত পরিবারগুলোর খোজঁখবর নেন। এ সময় তারা স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলেন, সার্বিক পরিস্থিতির খোঁজখবর নেন এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরে যাওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সার্বক্ষণিক তদারকি ও জরুরি সেবায় প্রস্তুত থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়।

জেলা প্রশাসন পাহাড়ের পাদদেশ, ঝুঁকিপূর্ণ ঢাল এবং নদী-ছড়ার তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দাদের অপ্রয়োজনে ঘর থেকে বের না হওয়ার পাশাপাশি যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দিয়েছে।

স্থানীয়দের আশঙ্কা, আগামী কয়েকদিনও যদি ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকে, তাহলে জলাবদ্ধতা আরও বিস্তৃত হওয়ার পাশাপাশি পাহাড় ধসের ঝুঁকি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। তাই প্রশাসনের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও সর্বোচ্চ সতর্ক থেকে সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: খাগড়াছড়ি
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন