“৪৭ বছর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ছাত্র হিসেবে জাতির পিতার সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাতের যে দুর্লভ সৌভাগ্য হয়েছিল, তার কোনো ছবি আমাদের কারও কাছে নেই। কিন্তু জীবনে চলার পথে হাজারো স্মৃতির ভীড়ে ১৯৭৩ সালের ৬ জুন সন্ধ্যায় বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে অবিস্মরণীয় সাক্ষাতের স্মৃতি হৃদয়ের গভীরে সোনালি অক্ষরে সঞ্চয় হয়ে আছে এখনো, থাকবে আজীবন।”

বঙ্গবন্ধুর সাথে অবিস্মরণীয় সাক্ষাৎ

fec-image

১৯৭০ সালে রাঙামাটির শাহ হাইস্কুল থেকে এসএসসি পাস করে ঢাকায় রেসিডেনসিয়াল মডেল স্কুল এন্ড কলেজে ভর্তি হই। আবাসিক স্কুল-কাম-কলেজের অবরুদ্ধতা ও কড়াকড়ি পছন্দ না হওয়ায় কয়েক মাস পর ওই সময়ের দেশসেরা ঢাকা কলেজে ভর্তি হই। উঠি মাইনরিটি হোস্টেলে। ‘মাইনরিটি’ কথাটি পছন্দ না হওয়ায় আমরা নিজেরাই হোস্টেলের নাম পরিবর্তন করে ‘ওয়েস্ট হোস্টেল’ রাখি। ওই সময়ে ঢাকা কলেজে আরও তিনটি হোস্টেল ছিল: নর্থ, সাউথ ও ইন্টারন্যাশনাল হোস্টেল। তখনো থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া প্রভৃতি দেশ থেকে ছাত্ররা ঢাকায় পড়তে আসত। তাদের জন্যই ইন্টারন্যাশনাল হোস্টেল। এর পাশেই ছিল আমাদের মাইনরিটি তথা ওয়েস্ট হোস্টেল। ওই সময় কলেজে পড়াশোনার মাধ্যম ছিল ইংরেজিতে। বাংলা ছাড়া অন্য সব বিষয় ইংরেজিতে পড়ানো হতো। এ জন্যই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ছাত্ররা পড়তে আসত।

সময়টা ছিল অগ্নিগর্ভ। উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান ও ছাত্র আন্দোলনে স্বঘোষিত ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের দশকব্যাপী রাজত্ব শেষ হয়। বৈষম্য ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছিল জনতা। কলেজে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের মিছিল-মিটিং লেগে থাকত। মূলত ছাত্র সংগঠন ছিল দুটি, ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন। চীনাপন্থী বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়নের হাতে গোনা কিছু ছাত্র মাথায় লাল পট্টি বেঁধে মাঝেমধ্যে মিটিং-মিছিল করে নিজেদের অস্তিত্বের জানান দিত। ঢাকা কলেজে ইসলামী ছাত্রসংঘেরও (স্বাধীনতার পর যা ইসলামী ছাত্রশিবির নামে আত্মপ্রকাশ করে) কিছু তৎপরতা ছিল।

ওই সময়ের ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের প্রথম সারির নেতারা ঢাকা কলেজে এসে নতুন ছাত্রদের সঙ্গে মতবিনিময় করতেন এবং নিজেদের দলে টানার চেষ্টা করতেন। এখানে পরিচয় হয় আ ফ ম মাহবুবুল হক, স্বপন চৌধুরী, তাজুল ইসলাম, র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী প্রমুখ উদীয়মান ছাত্রনেতার সঙ্গে। রাজনীতিমনস্ক হলেও প্রত্যক্ষ ছাত্ররাজনীতিতে তেমন সম্পৃক্ত হইনি কখনো। তবু ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে সহপাঠী গোলাম রব্বানী, প্রিন্স আমার নাম দিয়ে দেয়। একুশে ফেব্রæয়ারিতে আমার সম্পাদনায় ‘রক্তে আনো লাল’ নামে ছাত্রলীগ, ঢাকা কলেজ শাখার পক্ষ থেকে একটি সংকলন প্রকাশিত হয়।

সত্তরের নির্বাচনের আগে বঙ্গবন্ধু সারাদেশে নির্বাচনী জনসভা করেছিলেন। একদিন খবর পেলাম, আমাদের কলেজের পাশে নিউমার্কেটে বঙ্গবন্ধুর একটি নির্বাচনী পথসভা হবে। কলেজের হোস্টেল থেকে আমরা উৎসাহী কয়েকজন দলবেঁধে সভাস্থলে হাজির হই। বিকেলের দিকে একটি খোলা জিপে করে বঙ্গবন্ধু সভাস্থলে হাজির হন। সঙ্গে গাজী গোলাম মোস্তফা। গাজী গোলাম মোস্তফা সম্ভবত ওই সময় ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন। হোস্টেলে আমরা যারা থাকতাম, সবাই মফস্বল থেকে এসেছি। বঙ্গবন্ধুকে কখনো সামনাসামনি দেখার সুযোগ হয়নি। সবার মধ্যে প্রিয় নেতাকে স্বচক্ষে দেখার উত্তেজনা কাজ করছিল। বঙ্গবন্ধু গাড়ি থেকে ১০-১২ মিনিটের সংক্ষিপ্ত ভাষণ দিয়ে আজিমপুরের দিকে চলে যান। তিনি কী বলেছিলেন, সেসব কথা এখন আর মনে নেই। তবে একটি কথা মনে আছে, তিনি সমবেত জনতাকে বলেছিলেন, ‘আপনারা ঈদের ছুটিতে বাড়ি গেলেও ভোটের আগে ফিরে আসবেন এবং নিজ নিজ ভোট নৌকা মার্কায় দিবেন। একটি ভোটও যেন নষ্ট না হয়।’ ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচন ৫ অক্টোবর অনুষ্ঠানের কথা থাকলেও বন্যার কারণে পিছিয়ে তা ৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

পরের ইতিহাস সবার জানা। বঙ্গবন্ধুর দল আওয়ামী লীগ সত্তরের নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বিজয়ী দলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করার জন্য নানা ফন্দি ও ষড়যন্ত্র করতে থাকে। কুচক্রী ভুট্টো সামরিক জান্তার সঙ্গে হাত মিলিয়ে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির পাঁয়তারা করতে থাকে। দিন দিন রাজনৈতিক পরিবেশ উত্তপ্ত হতে থাকে। পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের ইতোমধ্যে ঘোষিত অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করা হলে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনসাধারণ ক্ষোভে-বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনে মানচিত্র খচিত স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। ঢাকা কলেজের বিভিন্ন হোস্টেল থেকে আমরা লাঠি হাতে নিয়ে তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতা উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরীর নেতৃত্বে মিছিল করে কলাভবনের পতাকা উত্তোলন অনুষ্ঠানে যোগদান করি। কলাভবনের দোতলার বারান্দায় আমি আর সহপাঠী অরবিন্দ (বর্তমানে নিউইয়র্ক প্রবাসী) ঠেলাঠেলি করে জায়গা করে নেই। ঢাকার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে মিছিল করে আসা ছাত্ররা কলাভবনের বটতলার আঙিনা ভরিয়ে ফেলে।

পরিস্থিতি অবনতি হতে থাকলে হোস্টেলের ছাত্ররা যার যার জেলায় ফিরে যেতে থাকে। ঢাকায় আমরা তখন হাতে গোনা যে কয়জন পাহাড়ি ছাত্রছাত্রী ঢাকা কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ ইত্যাদিতে পড়াশোনা করতাম, তারা একত্র হয়ে ৫ কিংবা ৬ মার্চ রাতের মেইল ট্রেনে করে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যাই। খাগড়াছড়ির সাবেক সংসদ সদস্য যতীন্দ্র লাল ত্রিপুরা তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের শেষ বর্ষের ছাত্র। থাকতেন জগন্নাথ হলে। তিনিও আমাদের সঙ্গে ছিলেন। চট্টগ্রাম থেকে বাসে করে রাঙামাটি চলে যাই। তখন যাতায়াত ব্যবস্থা, রাস্তাঘাট ভালো ছিল না। গাড়ি ও যাত্রীর সংখ্যাও ছিল অনেক কম। এখন যেমন সব জায়গায় ঠেলাঠেলি, ভীড়াভীড়ি, তখন তা ছিল না।

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ইতিহাস সৃষ্টিকারী ভাষণের পর রাজনৈতিক পারদের ঊর্ধ্বমুখী গতি ২৬ মার্চ গিয়ে বিস্ফোরিত হয় বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণায়। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য পার্বত্য এলাকা থেকে আমরা সপরিবার আশ্রয় নেই পার্শ্ববর্তী ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে। আগরতলায় দেখা হয় কলেজের বহু বন্ধুর সাথে। অনেকেই ইতোমধ্যে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য নাম লিখিয়েছে। একদিন শুনি আমাদের কলেজের ছাত্রলীগ নেতা রবিউল ভাই রণাঙ্গনে গুলিবিদ্ধ হয়ে আগরতলায় গোবিন্দ বল্লভ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। আমরা তাকে দেখতে ছুটে যাই। আমার সঙ্গে ঢাকা কলেজের বন্ধু অরবিন্দ। হাসপাতালে কলা ও বিস্কুট নিয়ে গেলে রবিউল ভাই (বর্তমানে সংসদ সদস্য উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী) ব্যান্ডেজ করা পা নিয়ে শুয়ে থাকা অবস্থায় হেসে বলেছিলেন, ‘ওরা আমার যথেষ্ট যতœ নিচ্ছে। খাওয়া-দাওয়ার কোনো সমস্যা নাই। তোমরাই খেতে পাওনা এখন। এগুলি কেন এনেছ, তোমরাই খাও।’ আমরা অভিভূত হই।

বড় ভাই রণ বিক্রম কিশোর ত্রিপুরা তাতু ২৬ মার্চের আগেই মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। জুলাই কিংবা আগস্ট ঠিক মনে নেই। একদিন আগরতলার হাপানিয়া যুবশিবিরে তাতুদা শেখ ফজলুল হক মনির কাছে আমাকে নিয়ে যান। মনি ভাই কী কারণে জানি তখন খুবই উত্তেজিত ছিলেন। ওনার তাঁবুর বাইরে আমরা পাঁয়চারি করতে থাকি। কাদের জানি তিনি উচ্চস্বরে ধমকাচ্ছিলেন। বেশ কিছুক্ষণ পর আমাদের ডাক এলো। ততক্ষণে তিনি কিছুটা শান্ত হয়েছেন। তাতুদা আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন, ‘আমার ছোট ভাই নব বিক্রম। ঢাকা কলেজের ছাত্র।’ মনি ভাই সৌজন্যমূলক দু-একটা কথা বলে তাতুদাকে বললেন, ‘ওকে মুজিব বাহিনীতে নিয়ে নাও। তোমার সুবিধে হবে।’ শুরু হয়ে গেল আরেক অধ্যায়। মুজিব বাহিনী নিয়ে পরবর্তী সময়ে বিস্তারিত লিখব। কেননা, এ বাহিনী নিয়ে নানা অপপ্রচার ও বিভ্রান্তি ছিল, এখনো আছে। আগরতলা থেকে অনিয়মিতভাবে মনি ভাই ‘বাংলার বাণী’ পত্রিকা প্রকাশ করতেন। এত বছর পরও ওই দিনের ‘বাংলার বাণী’ শিরোনামটি মনে আছে- ‘আপোষ, কিসের আপোষ?’ তখন কিছু বুঝতে পারিনি। অনেক পরে জেনেছি মার্কিনীদের মধ্যস্ততায় পাকিস্তানের সঙ্গে মোশতাক চক্রের কনফেডারেশন গড়ার ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে ছিল বাংলার বাণীর ওই প্রতিবেদন। দেশ শত্রæমুক্ত হওয়ার পর মুজিব বাহিনীর প্রধান প্রশিক্ষক মেজর জেনারেল সুজন সিং উবানকে নিয়ে মনি ভাই হেলিকপ্টারে ১৮ ডিসেম্বর রাঙামাটি কোর্ট বিল্ডিং মাঠে অবতরণ করেছিলেন এবং স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধের পর আবার কলেজে ফিরে আসি। এইচএসসি শেষ করে ১৯৭৩ সালে ভর্তি হই ঢাকা বিশ্বদ্যিালয়ে। অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও ইংরেজি বিভাগের মধ্যে কোনটিতে ভর্তি হব, এ নিয়ে দ্বিধান্বিত ছিলাম। সাতপাঁচ ভেবে ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়ার সিদ্ধান্ত নিই। মনে হয় ভুল করিনি। এখানে শিক্ষক হিসেবে পাই কবীর চৌধুরী, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, রাজিয়া খান আমিন, হোসনে আরা হক, সুরাইয়া খানম, ইনারী হক, ইমতিয়াজ হাবিব, এম এ মুনিম, সদরুল আমিন, কায়সার হক, কাশীনাথ রায়, ফকরুল আলম, এ জি স্টক, সেলিম সারোয়ার, রেজাউর রহমান, খন্দকার আশরাফ হোসেন প্রমুখকে। উঠেছি জগন্নাথ হলের পূর্ব বাড়ির নিচতলার ২৩ নম্বর রুমে। চারজনের সিটে থাকি ৯ জন, একজন ফ্লোরিং করে। রুমমেটরা ছিলেন দীপংকর তালুকদার, গৌতম দেওয়ান, অনুতোষ সাহা, জ্ঞানেন্দ্রিয় চাকমা, অরবিন্দ রায়, সঞ্জয় সাহা, বিভূতি ভূষণ বালা ও শচীন সরকার। দীপংকর তালুকদার, সাবেক প্রতিমন্ত্রী, বর্তমানে সংসদ সদস্য। গৌতম, সাবেক জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, অনুতোষ ও অরবিন্দ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী, সঞ্জয় কলকাতায়, বিভূতিবালা প্রয়াত, জ্ঞানেন্দ্রিয় ও শচীন সরকার অবসরপ্রাপ্ত। ‘কফি হাউসের আড্ডাটা আজ আর নেই….।’ ২৩ নম্বর রুমের আড্ডা নিয়ে ওই সময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় সাপ্তাহিক ‘বিচিত্রা’য় আমার একটি ছোট লেখা বেশ সাড়া জাগিয়েছিল। জগন্নাথ হলের পূর্ব বাড়ির বর্তমান নাম ড. সন্তোষ চন্দ্র ভট্টাচার্য হল। তিনি ১৯৭১ সালে শহীদ হন।

১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের দুটি সংসদীয় আসনে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা ও চাই থোয়াই রোয়াজা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন। ১৫নং সংরক্ষিত মহিলা আসনে সুদীপ্তা দেওয়ানকে সংসদ সদস্য হিসেবে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনীত করা হয়। তিনি রাঙামাটি পৌরসভার প্রথম নির্বাচিত চেয়ারম্যান ডা. এ কে দেওয়ানের স্ত্রী। শপথ গ্রহণের পর ১৯৭৩ সালের ৬ জুন শ্রীমতি দেওয়ান বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে এলাকার নানা সমস্যা, বিশেষত শিক্ষাসংক্রান্ত সমস্যাবলি নিয়ে সাক্ষাতের সময় নেন। যেহেতু শিক্ষা বিষয়ে আলোচনা হবে, তাই ঢাকায় পড়াশোনারত শিক্ষার্থী আমাদের কয়েকজনকে শ্রীমতি দেওয়ান ডেলিগেশনের সদস্য হিসেবে নির্বাচন করেন। মজার বিষয় হচ্ছে, আমরা ছিলাম সবাই একই ব্যাচের, সত্তরের এসএসসি। গৌতম দেওয়ান, ঝর্ণা চাকমা, পরিতোষ খীসা, পদ্মরঞ্জন চাকমা, প্রবীর চাকমা ও শ্যাম প্রসাদ দেওয়ান। আরও কেউ থাকতে পারে। তবে তাদের নাম এখন আর মনে নেই। পরিতোষ এখন বার্লিনে, পদ্মরঞ্জন ক্যানবেরায়।

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে মুখোমুখি সাক্ষাতের আকস্মিক সুযোগ পেয়ে আমাদের হৃদকম্প শুরু হয়ে গেল। কী পোশাক পরে যাব, কী বলব ইত্যাদি নিয়ে আমাদের ভেতর একধরনের উত্তেজনা কাজ করছিল। নির্ধারিত তারিখে অর্থাৎ ১৯৭৩ সালের ৬ জুন সন্ধ্যায় আমরা সবাই একত্র হয়ে নারী সাংসদের নেতৃত্বে সংসদ ভবনে পৌঁছে গেলাম। আমাদের নামে আগেই পাস করানো ছিল। ওই সময় অবশ্য এখনকার মতো নিরাপত্তা ও প্রটোকলের কড়াকড়ি তেমন ছিল না। বঙ্গবন্ধুর নির্ধারিত কক্ষের কাছাকাছি একটি বড় ওয়েটিং রুমে আমরা অপেক্ষা করছিলাম। অপেক্ষার প্রহর নাকি দীর্ঘ হয়। আমরা বসে আছি তো আছিই। ডাক আর আসে না। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা হবে, এই উত্তেজনায় আত্মহারা হয়ে আমরা পাহাড়ের কয়েকজন নবীন ছাত্রছাত্রী অপেক্ষমান থাকি। অবশেষে এলো সেই বহু প্রতীক্ষিত ক্ষণ। সুদীপ্তা কাকির পেছনে পেছনে আমরা ক’জন করিডোর ধরে এগোতে থাকি। একজন প্রটোকল কর্মকর্তা আমাদের নিয়ে যাচ্ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর কক্ষ থেকে ওই সময় বেরোলেন আইনমন্ত্রী মনোরঞ্জন ধর এবং আরও কয়েকজন। বাকীদের চিনি না। সুদীপ্তা দেওয়ান মন্ত্রী মনোরঞ্জন ধরকে পা ছুঁয়ে প্রণাম করলেন। ওনার দেখাদেখি আমরাও তাই করলাম।

বঙ্গবন্ধুর সংসদ ভবনের অফিস কক্ষে ঢুকে দেখি তিনি চেয়ারে বসে আছেন। সঙ্গে আরও কয়েকজন আশপাশে। আমরা সবাই একে একে তাঁর পদধূলি নিলাম। বঙ্গবন্ধুকে একটু ক্লান্ত দেখাচ্ছিল। সেদিন নাকি আরও অনেক সাক্ষাৎপ্রার্থী ছিল। তবে আমরাই ছিলাম ওই দিনের সর্বশেষ সাক্ষাৎকারী। সবাই বঙ্গবন্ধুর সামনে রাখা চেয়ারে বসলাম। তিনি হাসিমুখে ¯েœহের সুরে আমাদের সঙ্গে কথা বলছিলেন। কোন শার্ট পরে যাব, ভাবতে ভাবতে আমি পরিতোষের ক খ গ ঘ ইত্যাদি লেখা একটি শার্ট পরেছিলাম। তখন বয়স ছিল কম। শিষ্টাচার, রাষ্ট্রাচার ইত্যাদি বুঝি না। এখন হলে নিশ্চয়ই ওই শার্ট পরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে যেতাম না। আমার শার্ট জাতির পিতার দৃষ্টি এড়ালো না। তিনি মৃদু হেসে কৌতুক করে বলেছিলেন, ‘তুই তো দেখি অক্ষর শার্ট পরেছিস?’ আমি একটু লজ্জা পেলাম। একে একে সবার নাম ও কুশল জিজ্ঞাসার পর চা-নাশতা এলো। বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘তোরা অনেকক্ষণ ধরে বসেছিলি। এখন একটু চা-নাশতা খেয়ে নে।’

এরপর শ্রীমতি সুদীপ্তা দেওয়ান পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয়দের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনগ্রসরতা, বিশেষত শিক্ষার ক্ষেত্রে অনগ্রসরতার বিষয়ে বঙ্গবন্ধুর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। ভর্তির ক্ষেত্রে কোটা, ছাত্রাবাস ইত্যাদির জন্য আবেদন জানান। বঙ্গবন্ধু প্রতিটি কথা মনোযোগ সহকারে শুনলেন। পিছিয়ে থাকা পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয়দের কল্যাণে যা কিছু প্রয়োজন করা হবে মর্মে আশ্বাস দিলেন। সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎকার শেষে আমরা আবার জাতির পিতার চরণধূলি নিয়ে ফিরে আসি।

৪৭ বছর পর এখনো সেই অবিস্মরণীয় সাক্ষাৎকারের ঘোর লেগে আছে। বঙ্গবন্ধুর সাথে ওটাই ছিল আমার প্রথম ও শেষ সরাসরি সাক্ষাৎ। অবশ্য বঙ্গবন্ধুর জনসভায় যোগ দিয়ে দূর থেকে তাঁকে বেশ কয়েকবার দেখেছি ও তাঁর বজ্রকণ্ঠের ভাষণ শুনেছি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ১৯৭২ সালের ১৮ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ইন্দিরা মঞ্চে বঙ্গবন্ধু ও ইন্ধিরা গান্ধীর ভাষণ শোনা। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের কাছেই জগন্নাথ হল। মঞ্চের কাছাকাছি বসার জন্য আমরা কয়েকজন বেশ আগেই সেখানে গিয়ে বসেছিলাম। সে কারণে কাছ থেকে ইন্দিরা গান্ধী ও বঙ্গবন্ধুকে দেখার ও তাঁদের ভাষণ শোনার সৌভাগ্য হয়েছিল।

বাংলাদেশে অবস্থানকারী ভারতীয় সেনারা ঢাকা স্টেডিয়ামে বিদায়ী প্যারেডের আয়োজন করেছিল, যার সালাম নিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। ওই প্যারেডও স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে বসে প্রত্যক্ষ করেছি। সাল-তারিখ মনে নেই। ১৯৭২ কিংবা ১৯৭৩ হবে। পরদিন ৭ জুন দৈনিক পূর্বদেশ ও গড়ৎহরহম ঘবংি পত্রিকায় এবং ৮ জুন ইধহমষধফবংয ঙনংবৎাবৎ-এ সাক্ষাতের সংবাদ প্রকাশিত হয়। বঙ্গবন্ধু উপজাতীয় ছাত্রছাত্রীদের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজে ৩টি, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে ২টি, ময়মনসিংহে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩টি, শেরেবাংলা কৃষি কলেজে ২টি এবং পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ৫টি করে আসন সংরক্ষণের নির্দেশ দেন।

৪৭ বছর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ছাত্র হিসেবে জাতির পিতার সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাতের যে দুর্লভ সৌভাগ্য হয়েছিল, তার কোনো ছবি আমাদের কারও কাছে নেই। কিন্তু জীবনে চলার পথে হাজারো স্মৃতির ভীড়ে ১৯৭৩ সালের ৬ জুন সন্ধ্যায় বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে অবিস্মরণীয় সাক্ষাতের স্মৃতি হৃদয়ের গভীরে সোনালি অক্ষরে সঞ্চয় হয়ে আছে এখনো, থাকবে আজীবন।

নব বিক্রম কিশোর ত্রিপুরা
সাবেক চেয়ারম্যান, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

fourteen − 6 =

আরও পড়ুন