বিশুদ্ধ পানির সংকটে দুমদুম্যার বাসিন্দারা

fec-image

পাহাড়ি জেলা রাঙামাটির অন্যতম দুর্গম উপজেলার নাম জুরাছড়ি উপজেলা। আদমশুমারী অনুযায়ী এই এলাকায় প্রায় ২৫হাজার মানুষের বসবাস। তবে বেসরকারি হিসেব মতে এর সংখ্যা আরও বেশি। জেলা সদরের সাথে উপজেলাটির যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম হলো নৌ-পথ। এই উপজেলাটি চারটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত হয়েছে।

এই উপজেলার ইউনিয়নগুলো অত্যন্ত দুর্গম এবং গিরিপথ নিয়ে গঠিত। এর মধ্যে দুমদুম্যা ইউনিয়নটি এই উপজেলার সবচেয়ে বড় ইউনিয়ন এবং দুর্গম এলাকা। উপজেলা সদরের সাথে এই ইউনিয়নটির যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম হলো নৌ-পথ। আর যোগাযোগের জন্য পানি পথে বরকল উপজেলার ঠেগামুখ হয়ে স্থানীয়দের পাড়ি দিতে হয় প্রায় ২০০কিলোমিটার। যেজন্য এলাকাটির বাসিন্দাদের উপজেলা সদরের সাথে যোগাযোগে সময় লেগে যায় প্রায় তিনদিনের কাছাকাছি।

আর কাপ্তাই হ্রদের পানি শুকিয়ে গেলে পায়ে হেঁটে কঠিন গিরিপথ মাড়িয়ে তবে উপজেলা সদরের সাথে যোগাযোগ করতে হয়। তাই জরুরী প্রয়োজনে হেলিকপ্টার ছাড়া এই ইউনিয়নের সাথে যোগাযোগের আর কোন বিকল্প পথ নেই।

এই ইউনিয়নে প্রায় ছয় হাজার মানুষের বসবাস। সরকারি-বেসরকারি প্রায় ১৭টি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এই ইউনিয়নে মোবাইল নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা নেই, নেই বিদ্যুৎ। এই এলাকার প্রধান সমস্যা হলো- তীব্র বিশুদ্ধ পানির সংকট।

অধিকাংশ স্থানীয়রা পাহাড়ি ছড়া (পাহাড়ি ঝরণা), কুয়া থেকে খাওয়ার পানি সরবরাহ করে। অনেকে আবার নদীর পানি ব্যবহার করে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে সেখানে নিরাপদ পানির প্রকট আকার ধারণ করে। একটু বৃষ্টি হলেই ময়লা-আবর্জনা এসে কুয়ার পানিগুলোকে অপরিষ্কার করে দেয়। যে কারণে সেখানকার অধিকাংশ শিশুরা বিভিন্ন সময়ে ডায়েরিয়া, টাইপয়েড, জন্ডিসসহ নানা প্রকার পানিবাহিত দুরারোগ্য রোগে ভুগে এবং চিকিৎসার অভাবে মারা যান।

জুরাছড়ি উপজেলার সমাজকর্মী ও আলোক চিত্রী শিল্পী রকি চাকমা বলেন, দুমদুম্যা ইউনিয়নটি বেশ দুর্গম। উপজেলা সদরের সাথে ওই ইউনিয়নের বাসিন্দাদের যোগাযোগ করা অত্যন্ত দূরহ ব্যাপার। উপজেলা সদরের সাথে যোগাযোগের জন্য স্থানীয়দের নৌ-পথ এবং পাহাড়ি গিরিপথ মাড়িয়ে তিনদিন সময় লাগে।

তিনি আরও বলেন, এই এলাকায় নেই কোন মোবাইল নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্যসন্মত টয়লেট নেই, নেই বিদ্যুৎ । এই এলাকার অন্যতম সমস্যা হলো বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকট। বিশুদ্ধ খাবার পানি না থাকায় স্থানীয় শিশুরা নানা ধরণের পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হয় এবং যথাযথ চিকিৎসার অভাবে মারা যান।

তিনি জানান, এ অঞ্চলে স্থানীয়দের কথা চিন্তা করে এবং তাদের দুর্ভোগ লাঘবে সরকারের উচিত গভীর নলকূপ স্থাপন করে দিয়ে এ সমস্যার সমাধান করা।

স্থানীয় সংবাদ কর্মী স্মৃতি বিন্দু চাকমা বলেন, আমাদের জুরাছড়ি উপজেলাটি এমনিতে দুর্গম এলাকা। এরমধ্যে ইউনিয়নগুলো আরও দুর্গম। গ্রীষ্মকালে কাপ্তাই হ্রদের পানি শুকিয়ে গেলে জেলা সদরের সাথে আমাদের যোগাযোগ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। আর উপজেলা সদরের সাথে ইউনিয়নগুলোর যোগাযোগ করা আরও কঠিন। এ এলাকাগুলোতে অনেক সমস্যা রয়েছে। সমস্যাগুলো মধ্যে অন্যতম হলো বিশুদ্ধ খাবার পানি সংকট।

তিনি আরও বলেন, দুমদুম্যা ইউনিয়নটি বেশ দুর্গম। এই এলাকার মানুষেরা সুপিয় খাবার পানির সংকটে ভোগছেন বহু বছর ধরে। পানি সংকট নিরসনে অতীতে সরকার কয়েকটি গভীর নলকূপ স্থাপন করে দিলেও যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে এগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। যে কারণে মানুষ দীর্ঘদিন ধরে বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকটে ভুগছে।

দুমদুম্যা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সাধন কুমার চাকমা বলেন, জন্মলগ্ন থেকে আমাদের এলাকার অন্যতম সমস্যা হলো বিশুদ্ধ পানির সংকট। যে কারণে প্রতি বছর শত শত শিশু পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হয় এবং অনেক শিশু বিনা চিকিৎসায় মারা যায়।

চেয়ারম্যান সাধন আরও বলেন, আমরা সরকারের উর্ধ্বতন মহলকে এই ব্যাপারে একাধিকবার অনুরোধ করেছি। তারাও আমাদের সমস্যা নিরসনে এগিয়ে আসার কথা বলেছেন। কিন্তু দীর্ঘ বছর পার হলেও এই সমস্যার কোন সমাধান হয়নি।

সাধন কুমার চাকমা জানান, এখানে পানির লেয়ার পাওয়া অত সহজ নয়। প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ফুট গভীরে গেলে পানির সন্ধান মিলে। এখানে বিদ্যুৎ নেই। তাই জেনারেটর এর ব্যবস্থা করতে হবে। সর্বপরী একটি নলকূপ স্থাপন করতে হলে এই প্রায় চার লাখ টাকার কাছাকাছি খরচ পড়ে। যে কারণে দরিদ্রপীড়িত মানুষের পক্ষে এত টাকা খরচ করে নলকূপ স্থাপন করা সম্ভবপর হয়ে উঠে না।

তিনি আরও জানান, সরকার যদি এই এলাকায় একটু সুনজর দেন তাহলে এলাকার মানুষের বিশুদ্ধ পানির সংকট দূর হয়ে যাবে।

জুরাছড়ি উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহফুজুর রহমান বলেন, দুমদুম্যা ইউনিয়নটি অত্যন্ত দুর্গম সীমান্তবর্তী এলাকা। বিভিন্ন সমস্যা জর্জরিত পুরো এলাকা জুড়ে। দুর্গমতার কারণে যথাসময়ে সরকারি নানা সুবিধা প্রদান করা সম্ভব হয়ে উঠে না। এখানে কাজ করতে হলে চরম বেগ পেতে হয়। তীব্র বিশুদ্ধ পানির সংকটে ভোগে স্থানীয়রা।

ইউএনও আরও বলেন, এই এলাকার মূল প্রাণ হলো বগাখালী। তাই আমি এলাকার মানুষের কথা ভেবে নিজে স্ব-উদ্যোগী হয়ে এডিবি’র অর্থায়নে বগাখালী এলাকায় একটি গভীর নলকূপ স্থাপন করার ব্যবস্থা করেছি। এই বছরের বর্ষা মৌসুমের শুরুতে নলকূপ স্থাপনের কাজটি শুরু করা হবে বলে ইউএনও যোগ করেন।

ইউএনও মাহফুজুর রহমান জানান, নলকূপ স্থাপনের কাজটি মূলত জেলা পরিষদ করে থাকে। এই এলাকায় একটি নলকূপ স্থাপন করতে হলে প্রায় চার থেকে পাঁচলাখ টাকা খরচ পড়ে। তাই জেলা পরিষদ যদি এই এলাকার মানুষের কথা ভেবে সুনজর দেয় তাহলে অতিসত্ত্বর এলাকার মানুষের বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকট নিমিষে দূর হয়ে যাবে।

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: দুমদুম্যার, বাসিন্দারা, বিশুদ্ধ পানির
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

19 + 7 =

আরও পড়ুন