ব্রয়লার চিকেনগুলো কি ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়ন’ রোগে আক্রান্ত?

fec-image

তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠনের সময় শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে যারা আনম এহসানুল হক মিলন ভাইকে দেখতে চেয়েছিলেন তাদের মধ্যে আমিও ছিলাম। নিজের ফেসবুক পেইজে বেশ জোরের সাথে এ ব্যাপারে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে লিখেছিলাম। যদিও এ নিয়ে তার সাথে আগে পরে কোন আলোচনা হয়নি। মন্ত্রী হওয়ার পর প্রথম দেড় মাসে তিনবার তার সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করতে গিয়েছি তার কার্যালয়ে। আমি বিষ্ময়ে দেখেছি, পুরো অফিস যেন ফুলের দোকান। ভেতরে এত মানুষ, সারা দেশের পরিচিত, অপরিচিত, স্বল্প পরিচিত বহু নেতা কর্মী আমলা শিক্ষক শিক্ষক নেতা লোকে লোকারণ্য। কারো সাথে সৌজন্যতা বিনিময়ের সুযোগ তার নেই। দূর থেকে দেখেই চলে এসেছি। তবুও তার সাফল্য কামনা করেছি সব সময়। তার ঘনিষ্ঠ অনেক সাংবাদিকের কাছে শুনেছি, মিলন ভাই তার অতীতের কাছের ও ঘনিষ্ঠ মানুষদের অনেককেই এখন আর চিনতে পারছেন না। সে কারণে আর যাইনি ধারে কাছে।

শেখ হাসিনার আমলে পরীক্ষা ব্যবস্থা বলে কিছু ছিল না। প্রথমবারের নকলের মহামারী যেটা মিলন ভাই নিজে বন্ধ করেছিলেন। দ্বিতীয়বারে প্রশ্ন ফাঁস, সহজ প্রশ্ন, পরীক্ষার হলে শিথিল গার্ড, ঢিলেঢালা খাতা দেখা, গ্রেসমার্ক দিয়ে জিপিএ ফাইভ এর ছড়াছড়ি- বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করে দিয়েছিল। ছাত্র-ছাত্রীদের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ ও চাপ সম্পূর্ণ নস্যাৎ করে দিয়েছিল। মিলন ভাই দায়িত্ব নিয়ে চেষ্টা করলেন ছাত্র-ছাত্রীদের পড়াশোনার প্রতি মনোযোগী করতে, শিক্ষার গুণগত মান বাড়াতে। এতে এতদিন যে সকল ছাত্ররা হেসে খেলে পড়াশোনা করেছে তারা প্রমাদ গুনতে শুরু করলেন। মিলন ভাইকে নিয়ে নানা ধরনের টিকটক, রিল, ট্রল, যাচ্ছেতাই গালিগালাজ করে ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করতে শুরু করলেন।

আমাদের ছাত্র জীবনে আমরা কখনো শিক্ষকের নাম মুখে আনিনি শ্রদ্ধায় ও ভয়ে। কিন্তু এরা শিক্ষক তো দূরের কথা খোদ শিক্ষামন্ত্রীর নাম ধরে স্কুল লেভেলের ছাত্রীরা যেভাবে অশ্লীল ভিডিও, তুইতোকারি, গালিগালাজ করে ছেড়েছে, আমি অবাক হতাম এদের বাবা-মা ও শিক্ষকরা কি নেই এটা ভেবে। মূলত পড়াশোনা ও পরীক্ষা পদ্ধতি কঠোর করার কারণে মিলন ভাই ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে চরমভাবে অজনপ্রিয় হয়ে পড়ে।

গ্রেসমার্ক বা অটোপাস সিস্টেমে অভ্যস্তরা কঠোর পড়াশোনায় মনোযোগী হতে আগ্রহী নয়। এরা ভিডিও গেম, টিকটক, রিলস, ইনস্টাগ্রাম, ফেইসবুক, সর্টস দেখা প্রজন্ম। এরা প্রশ্নের উত্তর নোট ও এসাইনমেন্ট বানায় চ্যাট জিপিটি ব্যবহার করে। বোর্ড বই পাঠ্য বইয়ে অনীহা। রেফারেন্স বই তো দুর কি বাত। ফলে তাদের মধ্যে একটি ক্ষোভ জমা হচ্ছিল।

টানা বর্ষণে সারাদেশে যেভাবে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে সেখানে সাধারণ পরীক্ষার্থীদের পক্ষে নির্ধারিত সময়ে গিয়ে পরীক্ষা দেয়া খুবই কষ্টকর ছিল। বিশেষ করে যে সকল মেয়েরা কোমর পানি পর্যন্ত ভিজে বা মাড়িয়ে পরীক্ষার হলে গেছে তাদের পক্ষে দীর্ঘ সময় ভেজা পোশাক নিয়ে পরীক্ষা দেয়া অত্যন্ত কঠিন। উচ্চমাধ্যমিকে পড়া অনেক মেয়ে স্বাভাবিক অসুস্থ থাকতে পারে। শিক্ষামন্ত্রীর এটা বোঝা উচিত ছিল। তিনি দুই তিন দিন পরীক্ষা পিছিয়ে দিলে এমন মহাভারত অশুদ্ধ হতো না। শিক্ষামন্ত্রী হয়ে আজকে ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে ক্ষমা চাইতে হতো না। এটা তার একটা চরম ভুল। কিন্তু তিনি গর্হিত অপরাধ যেটি করেছেন তা হচ্ছে, এই সমস্ত ছাত্র ছাত্রীদের ব্রয়লার মুরগির সাথে তুলনা করে। এমনকি ব্যক্তিগত আলাপচারিতাতেও এটি বলা ঠিক হয় নাই। ক্ষমতায় গেলে অনেকেই প্রকৃত শত্রু এবং মিত্র বাছাই করতে পারেনা। স্তবকতা তখন এত মধুর লাগে যে, মিত্রের সহচর্য বা সমালোচনার চেয়ে শত্রু বা গুপ্ত শত্রুর স্তবকতা বেশি পছন্দ হয়। এই সুযোগ নিয়ে সুযোগ-সন্ধানীরা ক্ষমতার কেন্দ্রের ঘনিষ্ঠ হয় এবং সময়মতো নাড়ি কাটে। মিলন ভাই সেই ট্রাপে পড়েছেন।

কিছুদিন আগে মধ্যম সারির একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় আমাকে বলেছিলেন, বিএনপি জুলাই সনদ মানতে চাইনি কিন্তু আমরা তাকে মানতে বাধ্য করেছি। এখন তারা নির্বাচিত হয়ে মনে করছে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করে পার পেয়ে যাব, সেটা হবে না। আমরা হতে দেব না। বিএনপিকে জুলাই সনদ মানতে বাধ্য করা হবে। আমরা জানি সেটা কীভাবে করতে হয়। সংবিধান সংশোধনে বিএনপি ১৭ সদস্যের একটি জাতীয় কমিটি গঠন করেছে। পার্লামেন্টের আসন অনুপাতে এই শত জনের মধ্যে বিএনপি ১২ জনের নাম ঘোষণা করেছে এবং বিরোধী দলের জন্য পাঁচটি সদস্য পদ রেখেছে। তবে বিরোধীদল এই পাঁচজন সদস্যের নাম ঘোষণা করে সংবিধান সংস্কারের প্রস্তাবনায় নিজেদের যুক্ত করেনি, তারা পার্লামেন্ট থেকে পদত্যাগ করেছে। পূর্বের কথা মনে থাকায়, আমি নিশ্চিত ছিলাম বিষয়টি এখানেই শেষ হবে না এবং এ নিয়ে রাজপথ চরমভাবে উত্তপ্ত হবে। কিন্তু কোথা থেকে বা কীভাবে হবে তা সম্পর্কে ধারণা ছিল না। ‘রাজাকারের নাতি পুতি’ আখ্যা দেয়া যেমন শেখ হাসিনার ক্ষমতার আগুনে ঘি ঢেলেছিল, স্ফুলিঙ্গ জ্বেলেছিল, ঠিক তেমনি এহসানুল হক মিলনের এই ব্রয়লার মুরগি উক্ত পরিকল্পনায় স্ফুলিঙ্গ জেলে দিয়েছে।

যদিও বাইরের দৃশ্যমান ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা এই আন্দোলন করছে, কিন্তু বিষয়টা এত সহজ নয়। এর ভিতরে ব্যাপক হারে গুপ্তের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। এছাড়াও ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগের ভিতরে যেমন গুপ্ত ছিল এবারে গুপ্তের মধ্যে আওয়ামী লীগ রয়েছে। সব মিলিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে এই আন্দোলন রাজপথে অবস্থান নিয়েছে এবং রাতভর তারা থাকার ঘোষণা দিয়েছে। ভারতের ককরোজ জনতা পার্টির আদলে তারাও এই আন্দোলনের নাম দিয়েছে রয়লার চিকেন পার্টি।

আমি অনেকটাই নিশ্চিত শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ করলেও এই ছাত্ররা ঘরে ফিরবে না এবং এটি জুলাই সনদ বাস্তবায়নে বিরোধী দলের ডিজাইন সরকারকে মেনে নেয়ার জন্য একটি বার্গেনিং এজেন্ট হিসেবে ব্যবহৃত হবে। তবে রাজনীতির ভিতরে যেমন রাজনীতি থাকে, তেমনি খেলার ভেতরেও আরেক খেলা লুকিয়ে থাকে। তাই যারা ডিসেম্বর নিয়ে ইতিমধ্যেই উদ্বেলিত তারাও এর ভেতরে নিজেদের ছক চালতে ভুল করবে না মোটেও। এর সাথে যারা বাংলাদেশের চায়না মুখী নীতি পছন্দ করছেন না তারাও তাদের ঘুঁটি চালতে কসুর করবে না। মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে আন্দোলন কেন সংসদ মুখি হল সেটা বিবেচনা করলে অনেক কিছুই পাওয়া যাবে। আমার এই বিশ্লেষণ যদি কারো অবিশ্বাস্য মনে হয়, তাহলে বিএনপিকে বলুন ওরা যেভাবে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন চায় সেভাবে মেনে নিতে, দেখবেন সব আন্দোলন থেমে গেছে- এটা গ্যারান্টি।

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: মেহেদী হাসান পলাশ
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন