ভোটকেন্দ্রের বাইরে পাওয়া গেল ‘নৌকা’ প্রতীকে সিলযুক্ত ব্যালট পেপার

fec-image

কক্সবাজারে কুতুবদিয়া উপজেলার লেমশীখালী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রশাসনের কতিপয় কর্মকর্তাদের যোগসাজশে ‘নৌকা প্রতীকের’ চেয়ারম্যান প্রার্থীর পরাজয় নিশ্চিত করার অভিযোগ উঠেছে।

এ নিয়ে আওয়ামী লীগের মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থীর অভিযোগ, নির্বাচনের দিন রাতে ভোট গণণাকালে শুধুমাত্র ‘নৌকা প্রতীকে’ সিলমারা বেশকিছু ব্যালেট পেপার কয়েকটি ভোটকেন্দ্রের বাইরে বিচ্ছিন্নভাবে পাওয়া গেছে। এ নিয়ে উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তাকে প্রার্থী লিখিতভাবে অভিযোগ জানালেও কোন ধরণের ব্যবস্থা নেননি।

নির্বাচনে লেমশীখালী ইউনিয়নের রিটার্নিং অফিসার মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন স্বাক্ষরিত বেসরকারিভাবে ফলাফল ঘোষণার একটি নথিতে দেখা গেছে, নির্বাচনে ইউনিয়নটিতে ৭ জন চেয়ারম্যান প্রার্থীর মধ্যে ‘চশমা প্রতীকের’ স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. আকতার হোছাইনকে ২৯৯ ভোটে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়েছে। এতে তার প্রাপ্ত ভোট ৪ হাজার ৩৪১ ভোট। আর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের মনোনীত মো. রেজাউল করিম ‘নৌকা প্রতীকের’ পেয়েছেন ৪ হাজার ৪২ ভোট।

বেসরকারিভাবে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়া মো. আকতার হোছাইন লেমশীখালী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি এবং কুতুবদিয়া উপজেলা বিএনপির সহ সভাপতির দায়িত্বে আছেন। গত নির্বাচনেও তিনি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন।

এছাড়া অপর পাঁচজন প্রার্থীর মধ্যে ‘দুইটি পাতা’ প্রতীকে স্বতন্ত্র প্রার্থী আবু মজিদ আব্দুল্লাহ পেয়েছেন ১ ভোট, ‘আনারস’ প্রতীকে স্বতন্ত্র প্রার্থী ওয়াকি মনি পেয়েছেন ২১৪ ভোট, ‘ডাব’ প্রতীকে বাংলাদেশ কংগ্রেস মনোনীত প্রার্থী ফিরোজ আহমেদ পেয়েছেন ১৩ ভোট, ‘ হাত পাখা’ প্রতীকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মনোনীত প্রার্থী মোহাম্মদ শরীফ পেয়েছেন ২৫০ ভোট এবং ‘ঘোড়া’ প্রতীকে স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. সরওয়ার আলম পেয়েছেন ১০ ভোট।

ইউনিয়ন রিটার্নিং কর্মকর্তা স্বাক্ষরিত নির্বাচনী ফলাফল নথিতে প্রদত্ত ভোটের সংখ্যা দেখানো ৯ হাজার ১৬৬ টি। এতে মোট বৈধ ভোটের সংখ্যা ৮৮৬৯ টি। আর বাতিল ভোট দেখানো হয়েছে ২৯৭ ভোট।

নির্বাচনী ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সাতজন চেয়ারম্যান প্রার্থীর প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা ৮ হাজার ৮৭১টি। আর চেয়ারম্যান প্রার্থীদের প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যার সাথে বাতিল ২৯৭ ভোট যোগ করলে মোট প্রদত্ত ভোটের সংখ্যা ৯ হাজার ১৬৮টি। এতে ইউনিয়ন রিটার্নিং কর্মকর্তার স্বাক্ষরিত ফলাফলের প্রদত্ত মোট ভোটের সংখ্যার চাইতে ২টি বেশি। এই দুইটি ভোট আর বাতিল ভোটের সংখ্যা যোগ করলে দাঁড়ায় ২৯৯টি। যা বেসরকারিভাবে বিজয়ী ও পরাজিত ঘোষণা করা প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থীদের ভোটের ব্যবধানের সমান।

এছাড়া ভোটকেন্দ্রের বাইরে যে ব্যালেট পেপারগুলো পাওয়া গেছে তাতে ইউনিয়নটিতে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারি ৭ জন প্রার্থীরই প্রতীকই রয়েছে। আর ব্যালেটগুলোতে শুধু ‘নৌকা’ প্রতীকেই সিলমারা রয়েছে।

এ নিয়ে বেসরকারিভাবে ঘোষিত নির্বাচনী ফলাফলে ভোটের সংখ্যা অমিলের পাশাপাশি কয়েকটি ভোটকেন্দ্রের বাইরে বিচ্ছিন্নভাবে বেশকিছু সিলমারা ব্যালেট পাওয়া যাওয়ায় এবং লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পরও উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা কোন ধরণের ব্যবস্থা না নেওয়ায় নির্বাচনে অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ তুলেছেন আওয়ামী লীগের মনোনীত ‘নৌকা’ প্রতীকের প্রার্থী মো. রেজাউল করিম।

রেজাউল দাবি করেন, নির্বাচনের দিন রাতে ভোট গণনাকালে লেমশীখালী ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের এম রহমান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র, ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সতরুদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্র এবং ৯ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ লেমশীখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের বাইরে বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকটি জায়গায় শুধুমাত্র ‘নৌকা’ প্রতীকে সিলমারা বেশকিছু ব্যালোট পেপার পাওয়া যায়। স্থানীয় লোকজন ব্যালোট পেপারগুলো ঝোপঝাড়ে ও মাটিতে পড়ে থাকতে দেখে তাকে (রেজাউল ) খবর দেয়। পরে খবর পেয়ে এসব ব্যালেট পেপার সংগ্রহ করা হয়।

শুধুমাত্র ‘নৌকা’ প্রতীকে সিলমারাযুক্ত অন্তত ৭০টি ব্যালট পেপার আমার নিকট এবং আমার নির্বাচনী এজেন্টদের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে। এছাড়া এ ধরণের ব্যালট পেপার স্থানীয় বিভিন্ন লোকজনের কাছেও রয়েছে।

‘নৌকা’ প্রতীকের এ প্রার্থী বলেন, “শুধুমাত্র ‘নৌকা’ প্রতীকে সিলমারা ব্যালট পেপার কেন্দ্রের বাইরে বিচ্ছিন্নভাবে কুড়িয়ে পাওয়ার পরপরই কুতুবদিয়া উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা জামশেদুল ইসলামের বরাবরে লিখিত একটি অভিযোগ দায়ের করি। অভিযোগে আবেদন জানাই, বেসরকারিভাবে ফলাফল ঘোষণা স্থগিত রাখার। তবে এ ব্যাপারে কোন ধরণের ব্যবস্থা গ্রহণের এখতিয়ার তার ( উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ) নেই বলে অবহিত করেন। ”

রেজাউল অভিযোগ করে বলেন, “আমি লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পরও উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা কোন ধরণের ব্যবস্থা না নেওয়া এবং অভিযোগের ব্যাপারে যাচাই-বাছাই না করে তড়িগড়ি ভোটের ফলাফল ঘোষণা করেছেন। মূলত কথিত বিজয়ী ঘোষণা করা ‘চশমা’ প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী মো, আকতার হোছাইনের সঙ্গে যোগসাজশ করে নির্বাচনী ফলাফল পাল্টে দেয়া হয়েছে। ”

“বাতিল দেখানো ২৯৭টি ভোটের সবক’টি ভোট ‘নৌকা’ প্রতীকে সিলমারা। ভোটকেন্দ্রের বাইরে যতটি ব্যালট পেপার ফেলে দেওয়া হয়েছে ততটি ভোটে ‘নৌকা’ প্রতীকের কম ভোট দেখানো হয়েছে। ”

নৌকা প্রতীকের চেয়ারম্যান প্রার্থী অভিযোগে জানান, আওয়ামী লীগের মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থীকে হারানোর জন্য নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে আঁতাত করেছে অনিয়ম ও কারচুপির এ ঘটনা ঘটিয়েছে।

এ নিয়ে নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে অভিযোগের পাশাপাশি আইনি ব্যবস্থা নেবেন বলে জানান রেজাউল করিম।

এ ব্যাপারে কুতুবদিয়া উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা জামশেদুল ইসলাম বলেন, এ ধরণের অভিযোগের ব্যাপারে কোন ধরণের ব্যবস্থা নেয়ার এখতিয়ার তার নেই। ঘটনার পরপরই যদি অভিযোগকারী প্রার্থী সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসার বরাবরে অভিযোগ জানাত তাহলে ব্যবস্থা নিতে পারতেন।

তারপরও নির্বাচন সংক্রান্ত যদি কোন ধরণের অভিযোগ থাকে অভিযোগকারী চেয়ারম্যান প্রার্থী নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালের আশ্রয় নিতে পারেন বলে জানান উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

17 − two =

আরও পড়ুন