মসলা চাষে পাহাড়ী কৃষকদের ভাগ্য ফিরাতে চায় সরকার

fec-image

উচ্চ মূল্যের মসলা চাষের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের কৃষদের ভাগ্য ফেরাতে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার । এ লক্ষ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে চার বছর মেয়াদী একটি পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৪ কোটি ৮৭ লক্ষ ২৫ হাজার টাকা ।

এর মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের কৃষি ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন আসবে বলে মনে করছেন কৃষিবীদরা।আর স্থানীয় কৃষকরা মষলা চাষের মাধ্যমেই সফলতার স্বপ্ন দেখছেন । মিল কারখানা না থাকায় পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের জীবিকা অনেকটা কৃষি নির্ভর । এখানকার চাষীরা তাদের আদিপদ্ধতি , প্রথাগত ও ঝুম চাষে অভ্যস্ত । বনায়নের পাশাপাশি পার্বত্য চট্টগ্রামের কৃষকরা বেশীরভাগ আম , কাঠাল , আনারস , কলা , তরমুজ জাতীয় ফসল বেশি উৎপাদন করে থাকেন । পাশাপাশি মসলা বলতে এখানে আদা , হলুদ এবং বিলাতি ধনিয়া পাতা চাষ করেন চাষীরা। কিন্তু এসব চাষে পাহাড়ি কৃষকরা সফল হতে পারছেন না।

সংশ্লিষ্টদের মতে তার অন্যতম কারণ হলো উৎপাদিত এসব ফসল বেশিরভাগ পচনশীল ও ভারি হওয়ায় সহজে পরিবহন , সংরক্ষণ করা সম্ভব হয় না । ফলে বাজারজাত করতে না পারায় অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হতে পারছেন না কৃষকরা । পাহাড়ের কৃষিতে সমৃদ্ধি আসছে না । পাহাড়ের কৃষি ব্যবস্থার এমন সংকটকালীন পার্বত্য চট্টগ্রামে উন্নয়ন বোর্ড হাতে নিয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত এলাকায় উচ্চ মূল্যের মসলা চাষ নামের একটি প্রকল্প । প্রকল্পটি পাইলট পর্যায়ে বাস্তবায়িত হচ্ছে ।

২০১৮ সালের জুন থেকে এ প্রকল্পটি শুরু হয় যা চলবে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত । ১ পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছেন , এ প্রকল্পের আওতায় তিন পার্বত্য জেলা ২ হাজার ৬’শ জন কৃষককে মসলা চাষের সাথে সম্পৃক্ত করা হয়েছে । প্রকল্পের মাধ্যমে চাষীদের বিনামূল্যে উচ্চ মূল্যের মসলা যেমন দারুচিনি , তেজপাতা , আলুবোখারা , গোলমরিচ , জুম মরিচ , ধনিয়া , বিলাতি ধনিয়া ইত্যাদির বীজ , চারা ও কলম বিতরণ করা হচ্ছে । পাশাপাশি তাদেরকে প্রয়োজনীয় কৃষি যন্ত্রপাতি , সার ও রোপন কৌশল সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেয়া হয় । এসব মসলা চাষের সাথে স্বল্প সময়ে আয়ের জন্য কৃষকদেরকে সাথী ফসল হিসাবে পেঁপে চারা , উন্নত জাতের পেয়ারা ও জলপাই চারাও প্রদান করা হয়েছে ।

পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের মসলা চাষ প্রকল্পের রাঙামাটি সদর উপজেলার মাঠ সংগঠক জগদীশ্বর চাকমা জানান , পার্বত্য অঞ্চলের কৃষকরা আগে জুম চাষ করতো মসলা চাষ সম্পর্কে তাদের কোন ধারনা ছিলনা । এই প্রকল্পটি শুরু হওয়ার পর কৃষকদেরকে প্রথমে আমরা উদ্বুদ্ধ করি জুম চাষের পরিবর্তে মসলা চাষ করতে । তিনি বলেন “ কৃষকদরে আমরা কিভাবে চারা রোপন করতে হয় , জৈব সার দিতে হয় এগুলো হাতে কলমে প্রশিক্ষণ দিয়েছি ।

রাঙামাটি সদর উপজেলার মগবান ইউনিয়নের বরাদম এলাকার মসলা বাগান সৃজনকারী চাষী যুদ্ধমনি চাকমা জানান , পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড থেকে আমাকে উচ্চ মূল্যের মসলা চাষ করার জন্য দারুচিনি , গোলমরিচ , তেজপাতার চারা সার ও সেচ যন্ত্রপাতি দিয়েছে । আমি এখন জুমচাষ বাদ দিয়ে মসলা চাষ করছি । আশা করছি এই মসলা চাষে আমি লাভবান হব । বরাদম এলাকার কৃষক রতন চাকমা বলেন , উন্নয়ন বোর্ডের সহযোগিতায় আমি আমার বাগানে দারুচিনি , আলুবোখরা ও পেঁপে এবং পেয়ারা বাগান করেছি । প্রকল্প পরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম বলেন , পাহাড়ে এখনো অনেক অনাবাদী জমি রয়েছে যেখানে মসলা চাষের প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে । দেশে মসলার যে চাহিদা এবং আমদানীর মধ্যে অনেক ঘাটতি রয়েছে । এ ঘাটতি পূরণ করার জন্য বর্তমান সরকার এ প্রকল্পটি হাতে নিয়েছে । এই মসলা চাষ প্রকল্পটি রাঙমাটি , খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলায় বিদ্যমান।

তিনি আরও বলেন এসব মসলার চাহিদা আমাদের দেশে অনেক বেশি । এর চাহিদা পূরণ করতে পারলে আমরা দেশে আমদানি নির্ভরতা কমাতে পারবো । পাহাড়ের কৃষকরা কিন্তু খুবই উৎসাহী মসলা চাষে । অনেক কৃষক ইতিমধ্যে আলু বোখরার নার্সারী করে চারা কলম নিজেরা বিক্রয় করছে । এ প্রসঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান নিখিল কুমার চাকমা বলেন , পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি বর্তমানে আর্থ – সামজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে কৃষিভিত্তিক বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে । এরই ধারাবাহিকতায় পার্বত্য চট্টগ্রামের দূর্গম এলাকায় উচ্চ মূল্যের মসলা চাষ তেমনই একটি পাইলট প্রকল্প । এ প্রকল্পটি সফল হবে আশা ব্যক্ত করে তিনি বলেন ভবিষ্যতে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড কৃষিতে আরো বড় ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে ।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

19 − five =

আরও পড়ুন