রোহিঙ্গা ক্যাম্প কার নিয়ন্ত্রণে?

fec-image

রোহিঙ্গাদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব বড় উদ্বেগ তৈরি করছে আমাদের জন্য। রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহ হত্যাকাণ্ডের এক মাস পার না হতেই রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে এই হত্যাকাণ্ড ভাবিয়ে তুলেছে বাংলাদেশকে।

কক্সবাজারের এই ক্যাম্পগুলোতে এর আগেও বিভিন্ন সময়ে গোলাগুলি ও সংঘর্ষ হয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সেগুলোকে রোহিঙ্গা ডাকাত বা চোরাকারবারিদের কাজ বলা হয়েছে পুলিশের পক্ষ থেকে। তবে রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহ খুন হওয়ার পর ক্যাম্পে সক্রিয় বিভিন্ন পক্ষের অনেক বিষয় এখন আন্তর্জাতিক পর্যায়েও আলোচনায় আসছে।

২০১৭ সালে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে লাখ লাখ রোহিঙ্গার স্রোত নামার পর গত চার বছরে এরকম আতঙ্কজনক পরিস্থিতি আর কখনো তৈরি হয়নি। হামলার ভয়ে রোহিঙ্গাদের অনেক নেতা ভয়ে আত্মগোপনে চলে গেছেন।

তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন বলেছেন, যারা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন চায় না তারাই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে। তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে অনেকটা অগ্রগতি হলেও কিছু লোক চায় না তারা নিজ দেশে ফেরত যাক। তাদের স্বার্থে আঘাত লাগে। আগে মুহিবুল্লাহ হত্যা এবং এখন ক্যাম্পে মারামারি করে মানুষ খুন করার পেছনে এদের হাত থাকতে পারে। এ বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছে সরকার।’

এটি খুব সাধারণ পর্যবেক্ষণ। প্রকৃত অর্থে এখানে কোন গোষ্ঠী কোন খেলা খেলছে সেটা বের করাই জরুরি। স্থানীয়রা বলছেন, ক্যাম্পের ভেতরে দিনের বেলায় এক রকম চিত্র থাকলেও রাতের বেলায় চিত্র পুরোপুরি পাল্টে যায়। ক্যাম্পের ভেতরে একটা কথা প্রচলিত আছে, ক্যাম্প দিনের বেলায় বাংলাদেশের আর রাতের বেলায় সশস্ত্র গোষ্ঠীর। এটা এখন ওপেন সিক্রেট।

রাতের আঁধার নামার সাথে সাথেই রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সশস্ত্র পদচারণা শুরু হয়। এমন অনেক জায়গা আছে যেখানে পৌঁছাতে পাহাড়ি উঁচু-নিচু রাস্তায় অনেকক্ষণ হাঁটতে হয়। ফলে যেকোনো অপরাধ করে দ্রুত পালিয়ে যাওয়া সম্ভব। রাতের বেলায় এসব জায়গায় যেতে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরাও নিরাপদ বোধ করেন না।

মুহিবুল্লাহর হত্যাকাণ্ড, আগের ও এবারের খুনের ঘটনাগুলো প্রমাণ করে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ভেতরে একাধিক সশস্ত্র গ্রুপ সক্রিয় যারা একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে মরিয়া। স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ক্যাম্পে দ্বন্দ্বের নানামুখী কারণ আছে। রেজিস্টার্ড এবং নন-রেজিস্টার্ড রোহিঙ্গাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব অনেক পুরনো। এর বাইরে সশস্ত্র আরসার অবস্থানের বিষয়টি ধোয়াশাচ্ছন্ন হলেও বেশকিছু সন্ত্রাসী সংগঠন সক্রিয় আছে ক্যাম্পে। মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর পক্ষে কাজ করে এমন কয়েকটি গ্রুপও রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

২০১৭ সালে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ঢল যখন নামে তখন বলেছিলাম, ‘এরা হবে বাংলাদেশের আজ ও আগামীর সবচেয়ে বড় মাথা ব্যথা।’ সেটিই হতে চলেছে। এদের ফিরে যাওয়ার নাম নেই, ফেরানোর উদ্যোগ নেই। রোহিঙ্গা সমস্যা একটি আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সমস্যা। লক্ষ লক্ষ মানুষ, অধিকাংশই নারী ও শিশু, বাংলাদেশে আশ্রিত। কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কোনো ভাবনা নেই।

কক্সবাজার পুলিশ প্রশাসন বলছে, আগস্ট ২০১৭ থেকে মে ২০২০ এর মধ্যে ৫৮ হাজার রোহিঙ্গাকে ক্যাম্প থেকে পালানোর সময় গ্রেফতার করা হয়। এছাড়া এই সময়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রায় ৩ হাজার রোহিঙ্গাকে উদ্ধার করা হয়। পুলিশ বলছে, নানা অপরাধে আগস্ট ২০১৭ থেকে আগস্ট ২০২০ পর্যন্ত ১ হাজার ৬৬৪ জন রোহিঙ্গার বিরুদ্ধে ৭২৫টি মামলা হয় কক্সবাজারের বিভিন্ন থানায়। এছাড়া এ সময়ে নারীসহ ১০৩ জন রোহিঙ্গা নানা ঘটনায় নিহত হয়েছে।

কক্সবাজার অঞ্চলের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সাথে রোহিঙ্গাদের ভাষাগত ও শারীরিক গঠনে মিল থাকায় ক্যাম্পের বাইরে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সাথে তারা মিশে যাচ্ছে, যা আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি। এর মধ্যে শুরু হয়েছে একের পর এক হত্যাকাণ্ড।

সবার আগে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকেই গুরুত্ব দিতে হবে। যদিও প্রত্যাবাসন নিয়ে আমাদের সামনে শুধুই আশাহত খবর। কিন্তু রোহিঙ্গা ক্যাম্পে একের পর এক খুনের ঘটনাকে নিয়ে ভাবতে হবে বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীকে। রাতের বেলা কেন ক্যাম্প খুনিদের দখলে চলে যায় তার উত্তর খুঁজতে হবে।

বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনী ও আন্তর্জাতিক চাপের মুখে আরসা কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। আরসার নেতাদের সমর্থনে গড়ে উঠেছে আরও একটি চরমপন্থী সংগঠন—আল ইয়াকিন। এটিকে আরসার ‘ছায়া সংগঠন’ বলেই মনে করছেন অনেকে। এই সংগঠনটি রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রত্যাবাসনের ঘোর বিরোধী।

তাদের নেতারা কখনো মিয়ানমারে ফিরে যেতে চায় না। সেকারণে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের পক্ষে যেসব সংগঠন কাজ করছে সেগুলোর সঙ্গে তাদের একটা বিরোধ রয়েছে এবং এজন্য তাদের নেতাদের টার্গেট করা হয়। রোহিঙ্গাদের দেশে ফিরে যাওয়ার বিরুদ্ধে ইসলামি মাহাত নামের আরও একটি সংগঠনও শরণার্থী ক্যাম্পগুলোতে তৎপর রয়েছে। এদের কার্যক্রম সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অল্প কয়েকটি ক্যাম্পে শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে।

প্রায় ২০টি সশস্ত্র গ্রুপ সক্রিয় আছে পুরো অঞ্চলে। এরা বাংলাদেশে নাগরিকদের অপহরণ করছে, টাকা দাবি করছে, হত্যা করছে। টেকনাফ ও উখিয়ার ৩৪টি ক্যাম্প থেকে রোহিঙ্গা শরণার্থী ও স্থানীয় লোকজনকে অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করাই অপহরণকারী বাহিনীর কাজ।

ক্যাম্পে আধিপত্য বিস্তার ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য এসব গ্রুপের মধ্যে প্রায়শই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে থাকে। অপহরণের পাশাপাশি এসব গ্রুপ ইয়াবা ও আইসের মতো মাদক ও অস্ত্রের পাচার, ব্যবসা, চোরাচালান ও রোহিঙ্গা নারীদের দিয়ে যৌন ব্যবসার সাথেও জড়িত এরা। সামগ্রিক পরিস্থিতি দেখে এক কথায় বলা যায়, ক্যাম্পগুলোর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো নয়। রোহিঙ্গারা যেন কাঁটাতার ডিঙিয়ে বাইরে যেতে না পারে, সে ব্যাপারে তৎপরতা চালাতে হবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাকে।

ক্যাম্পের ভেতরে রোহিঙ্গাদের বড় বড় যে ১০ হাজারের অধিক দোকানপাট রয়েছে। শরণার্থীদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করছে বাংলাদেশ সরকার, অথচ তারা ব্যবসা করছে। এই ব্যবসা ঘিরেই যত সমস্যা। তারা ব্যবসা করে, মাদক ও সোনার চোরাচালান করে চাহিদার অতিরিক্ত টাকা পাচ্ছে, সে টাকায় অস্ত্র কিনছে, অবৈধ পথে খরচ করছে, সঙ্গে বাংলাদেশের ঝুঁকিও বাড়ছে। এই ব্যবসা বন্ধ করতে হবে এবং রাতের বেলার নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাকে নিতে হবে।

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা ।। প্রধান সম্পাদক, জিটিভি

সূত্র: Dhakapost

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

eight − one =

আরও পড়ুন