ফলোআপ

রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহ’র মৃত্যুতে দুঃশ্চিন্তা বাড়লো স্থানীয়দের

fec-image

কক্সবাজারের উখিয়ায় কুতুপালং ক্যাম্পের ভেতরে গত বুধবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে একদল মুখোশধারী সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হয়েছেন রোহিঙ্গাদের শীর্ষ নেতা ও আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের (এআরএসপিএইচ) চেয়ারম্যান মাস্টার মুহিবুল্লাহ।

রোহিঙ্গাদের এই শীর্ষ নেতার মৃত্যুতে রোহিঙ্গা ক্যাম্প অধ্যুষিত এলাকার স্থানীয় বাসিন্দাদের দুঃশ্চিন্তা বাড়ছে। স্থানীয়রা মনে করছেন, মুহিবুল্লাহ’র মৃত্যুতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া আরো পিছিয়ে যাবে। কারণ স্থানীয়রা বিশ্বাস করতো রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন করাতে এই নেতার ব্যাপক ভূমিকা থাকবে।

বাংলাদেশে ২০১৭ সালের রোহিঙ্গা ঢলের আগে থেকে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা এখানে বসবাস করছে, তাদের নিয়ে এ দুঃশ্চিন্তা ছিল না স্থানীয় বাসিন্দাদের। কিন্তু ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টে সাত লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফে আশ্রয় নেয়। সেসময় এসেছিলেন ৪৮ বছর বয়সী মুহিবুল্লাহ। সেই ২০১৭ সালের পর থেকেই মূলত রোহিঙ্গাদের নিয়ে আলাদা দুঃশ্চিন্তা বেড়েছে স্থানীয়দের। রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন বা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু হলেই এ দুঃশ্চিন্তা কাটতো তাদের।

রোহিঙ্গাদের নেতা মুহিবুল্লাহ’র সংগঠন আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস (এআরএসপিএইচ) মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ হওয়া রোহিঙ্গাদের অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে শরণার্থী শিবিরে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর দাবি-দাওয়া তুলে ধরার প্রচেষ্টায় কাজ করতো।

মুহিবুল্লাহ’র নেতৃত্বে ২০১৯ সালের ২৫ আগস্ট উখিয়ার কুতুপালং শিবিরের ফুটবল মাঠে কয়েক লাখ রোহিঙ্গার ‘মিয়ানমারে গণহত্যা’ বিরোধী এক মহাসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। গণহত্যাবিরোধী ওই সমাবেশ বিশ্ববাসীর নজর কেড়েছিল। ওই সমাবেশের লক্ষ্য ছিল রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব প্রদানের বিষয় এবং তাদের মিয়ানমারে ফেরত যাবার ক্ষেত্রে শর্তগুলো বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরা।

তার এই বিষয়গুলো স্থানীয় জনগোষ্ঠী পছন্দ করতো। কারণ রোহিঙ্গারা এখন স্থানীয়দের কাছে বিষফোড়া। তারা খুব করে চাইছেন যেন দ্রুত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন হয়। রোহিঙ্গাদের আগমনে স্থানীয়রা বহুমুখী সমস্যায় রয়েছেন এবং সেসব সমস্যা দিনদিন গুরুতর হচ্ছে। নিজেদের ভূমি, অস্তিত্ব ও অদূর ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয়ে রয়েছেন স্থানীয় জনগোষ্ঠী। কিন্তু হঠাৎ করে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরানোর চেষ্টা করা এই নেতাকেই গুলি করে হত্যা করেছে রোহিঙ্গাদেরই একটি সন্ত্রাসী গ্রুপ। মূলত এরপর থেকেই রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে দুঃশ্চিন্তা বাড়ছে।

সূত্রে জানা গেছে, ওই সন্ত্রাসীরা চায় না সাধারণ রোহিঙ্গাদের পক্ষে মুহিবুল্লাহ বিভিন্ন অঙ্গনে কথা বলুক। এমনকি তারা চায় না রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন হোক। তার এই হত্যাকাণ্ডের পেছনের কারণ হিসেবে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরুর প্রচেষ্টা করা বলে মনে করা হচ্ছে।

রোহিঙ্গারা বলেন,”মাস্টার মুহিবুল্লাহ বিভিন্ন অঙ্গনে রোহিঙ্গাদের অধিকার ও স্বার্থ নিয়ে কথা বলতেন। এ কারণে অনেকের রোষানলে পড়তেন। এর আগেও তাকে হত্যার হুমকি দিয়েছিল রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা। তারা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন থামিয়ে দিতে চায়।”

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিষয়ে সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা ব্যাপক। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা এবং স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, এই সশস্ত্র গোষ্ঠী ক্যাম্পের ভেতরে তাদের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে চায়।

জানা যায়, মুহিবুল্লাহ হত্যাকাণ্ডসহ রোহিঙ্গাদের মধ্যে গত দুই বছরে ক্যাম্পের ভেতরে যারা কিছুটা প্রভাবশালী হয়ে উঠেছেন তাদের বেশ কয়েকজনকে হত্যা কারা হয়েছে। কারণ রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা চায় না যে অন্য কেউ প্রভাবশালী হয়ে উঠুক।

পুলিশের একটি সূত্র বলছে, ক্যাম্পের ভেতরে রোহিঙ্গাদের নিজেদের মধ্যে গত দুই বছরে অন্তত ৪৫টি খুন হয়েছে, যার বেশকিছু পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। শুধু নিজেরা নিজেদের নয়, রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা গত কয়েকবছরে অনেক স্থানীয়দের হত্যা ও অপহরণ করেছে।

সবচেয়ে উদ্বেগের জায়গা হলো উখিয়া এবং টেকনাফে এখন রোহিঙ্গারাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। স্থানীয় বাসিন্দারা সেখানে এখন সংখ্যালঘু। সে কারণেই শরণার্থী ক্যাম্পের পরিস্থিতি কতদিন নিরাপত্তা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকবে সে উদ্বেগ রয়েই যাচ্ছে স্থানীয় বাসিন্দাদের মনে।

তবে স্থানীয় প্রশাসন বলছে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের চারপাশে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ, বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং সিসি ক্যামেরা স্থাপনসহ বেশ কিছু পদক্ষেপ নেবার সুপারিশ করেছে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ। এ বিষয়গুলো মাথায় রেখে শুরু থেকেই রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নিরাপত্তা ও নজরদারি বাড়িয়েছে সরকার।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ভেতরে থাকা স্থানীয় বাসিন্দারা বলছে, রোহিঙ্গাদের কারণে ভবিষ্যতে হয়তো এই এলাকা ছাড়তে হবে। ওরা আমাদেরকেই এলাকা ছাড়া করবে। অনেকের ধারণা, অদূর ভবিষ্যতে কক্সবাজার দখলের চিন্তা করছে ওই সন্ত্রাসী গ্রুপ। কারণ প্রায়শই অনেক রোহিঙ্গা মুখে বলে থাকেন চট্টগ্রাম রাখাইন রাজ্যের অংশ। এই মুখের কথা নিয়ে কাজ করতে চায় ওই সন্ত্রাসী গ্রুপ।

রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর উপর বিরক্তি ও ক্ষোভ প্রকাশ করে এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন,”রোহিঙ্গা একটি খারাপ জাতি। এই ১১ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাদের মধ্যে একজন রোহিঙ্গাই ভাল লাগতো আমাদের, সেটা মুহিবুল্লাহকে। কারণ এই একজনকেই আমাদের সভ্য মনে হতো, বিবেকবান মনে হতো। তাকেই কি-না স্বদেশীরা মেরে ফেললো।”

রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকা পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম কমিটির নেতা এম. গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, “যেখানে আশ্রিত নাগরিকদের বেপরোয়া চলাচল ও একজন অপরজনকে হত্যা করছে, সেখানে নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে সন্দেহে আছি। আমরা দ্রুত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন চাই।”

প্রসঙ্গত, রোহিঙ্গা শরণার্থীর ঢল যখন বাংলাদেশে আসে তখন আন্তর্জাতিক সংস্থার যেসব প্রতিনিধি ও কর্মকর্তা রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে গিয়েছিলেন, তখন তাদের সাথে কথা বলার মত একমাত্র ব্যক্তি ছিলেন মুহিবুল্লাহ। ক্যাম্পে মুহিবুল্লাহ ছিলেন জনপ্রিয়তার তুঙ্গে। শুধু তাই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও রোহিঙ্গাদের প্রতিনিধি হিসাবে তার নাম ছড়িয়ে পড়েছিল।

জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলে বক্তব্য রাখার জন্য ২০১৯ সালে আমন্ত্রিত হয়েছিলেন মুহিবুল্লাহ। সেসময় সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে সাক্ষাতের জন্য হোয়াইট হাউসেও গিয়েছিলেন তিনি।

মাস্টার মুহিবুল্লাহ ৯ সন্তানের জনক ছিলেন ও মিয়ানমারে থাকতে তিনি একটি স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। রোহিঙ্গাদের নেতা হতে পারার একটি কারণ ছিল তার উচ্চশিক্ষা। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমার সেনাদের হাত থেকে প্রাণে বাঁচতে মংডু টাউনশিপের সিকদার পাড়া গ্রাম থেকে পালিয়ে এসে বাংলাদেশে উখিয়ার কুতুপালং লম্বাশিয়া ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছিলেন তিনি।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

10 + 13 =

আরও পড়ুন