শান্তিচুক্তির দুই যুগে পাহাড়ে খুন ১২০০, অপহরণ ২ হাজার

fec-image

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির দুই যুগে পাহাড়ে সংঘাতে প্রাণ হারিয়েছেন ১ হাজার ২০০ জনের বেশি। এ ছাড়া অপহরণের শিকার হয়েছেন ২ হাজার ১১৮ জনের বেশি। সরকারি একটি সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে।

সূত্রটির তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ বছরে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সংঘাতে নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ৭৬৫ জন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর। অন্যান্য গোষ্ঠীর রয়েছে ৪৩৬ জন। অপহরণের শিকার হয়েছেন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ১ হাজার ৪৭৩ জন সদস্য। অন্যান্য ৬৪৫ জন।

এ ছাড়া তিন পার্বত্য জেলায় সংঘাতে লিপ্ত চারটি সংগঠন এ সময়ের মধ্যে অসংখ্য চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রতিবছর সংগঠনগুলো সাধারণ মানুষের কাছ থেকে প্রায় ৪০০ কোটি টাকার চাঁদা আদায় করে বলে জানিয়েছে সরকারি সংস্থাটি। তবে বিবদমান গোষ্ঠীগুলোর কেউ এসব ঘটনার দায় নিতে রাজি নন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পার্বত্য চট্টগ্রামে কর্মরত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, পাহাড়ে খুন, অপহরণ ও চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত সংগঠনের সংখ্যা চারটি নয়, পাঁচটি। মগ লিবারেশন পার্টি (এমএলটি) নামে নতুন একটি সশস্ত্র সংগঠন নতুন করে সৃষ্টি হয়েছে। রাঙামাটির কাপ্তাই, রাজস্থলী ও চন্দ্রঘোনা এলাকায় এদের কার্যক্রম রয়েছে।

সর্বশেষ গত ২৯ নভেম্বর রাঙামাটি সদরের বন্দুকভাঙার কিচিং এলাকায় প্রতিপক্ষের গুলিতে নিজ বাড়িতেই খুন হন জেএসএস সামরিক কমান্ডার আবিষ্কার চাকমা।

পার্বত্য চুক্তির পর ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ), পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (সংস্কার বা এমএন লারমা) ও ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ-গণতান্ত্রিক) নামে চারটি সংগঠন তৈরি হয়। এগুলো পার্বত্য চুক্তিবিরোধী। তবে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (মূল দল সশস্ত্র) পার্বত্য চুক্তির আগে থেকেই ছিল।

পুলিশ ও পার্বত্য এলাকায় কর্মরত প্রশাসনের সবার দাবি, পার্বত্য এলাকায় সশস্ত্র এই চার সংগঠনই নানা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের জেলা-উপজেলা পর্যায়ের অন্তত ১৪ নেতা-কর্মী খুন হয়েছেন। এদের চাপের মুখে প্রত্যন্ত এলাকায় আওয়ামী লীগের কমিটি থেকে পদত্যাগ করেছেন ৩৫৫ জন নেতা।

বিষয়টি সরকারের উচ্চমহলকে জানানোর পর ২০১৯ সালের ১৬ ও ১৭ নভেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম সফর করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল। এ সময় তিনি রাঙামাটিতে বিশেষ আইনশৃঙ্খলা-বিষয়ক সভা করেন। এতে রাঙামাটির সাংসদ দীপংকর তালুকদার, খাগড়াছড়ির সাংসদ কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা, র‍্যাবের তৎকালীন মহাপরিচালক বেনজির আহমেদ, সেনাবাহিনীর তৎকালীন চট্টগ্রামের জিওসি মেজর জেনারেল মতিউর রহমান, বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল সাফিনুল ইসলাম, তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান উপস্থিত ছিলেন।

সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেছিলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামকে অশান্ত করতে দেওয়া হবে না। এ অঞ্চলের শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় প্রয়োজনীয় সবকিছু করা হবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন ঘোষণার কয়েক মাসের মধ্যে সশস্ত্র সংগঠনগুলো আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। গত বছরের ৭ জুলাই বান্দরবানের রাজবিলা ইউনিয়নের বাঘমারা বাজারপাড়ায় অস্ত্রধারীদের গুলিতে জেএসএসের (এমএন লারমা বা সংস্কার) ছয়জন নিহত ও তিনজন আহত হন। নিহতদের মধ্যে দলের তিনজন কেন্দ্রীয় নেতা ও জেলা শাখার সভাপতি ছিলেন।

এর আগে ২০১৭ সালের ডিসেম্বর থেকে গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত পাহাড়ে অন্তত ৮৮ জন নিহত হন। এদের মধ্যে ইউপিডিএফের ৩৮, জেএসএসের (লারমা) ৩৬, জেএসএসের ১৩ ও ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিকের ১ জন। এ সময় আরও ২০ জন সাধারণ মানুষ খুন হন।

জানতে চাইলে রাঙামাটি পুলিশ সুপার মীর মোদদাছছের হোসেন বলেন, ‘পার্বত্য জেলাগুলোতে প্রতিনিয়ত সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা হত্যা, অপহরণ, চাঁদাবাজিসহ নানা কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। এরপরও এখানে অনেক উন্নয়ন হচ্ছে। দুর্গম এলাকা হওয়ায় অনেক সময় আমাদের পক্ষে এসব সন্ত্রাসীর বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব হয় না। পার্বত্য চুক্তির দুই যুগপূর্তিতে আমি এসব বিপথগামী সন্ত্রাসী সংগঠনের সদস্যদের অনুরোধ করব, তাঁরা যেন এই সব কর্মকাণ্ড থেকে ফিরে আসেন।’

পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক কমিটির সভাপতি ও রাঙামাটি জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান গৌতম দেওয়ান বলেন, হত্যা, অপহরণ ও চাঁদাবাজি সারা দেশেই হয়। একইভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামেও হয়। তবে পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন ও রাজনৈতিক সমাধান হওয়া দরকার।

খাগড়াছড়ি জেলা দায়রা জজকোর্টের সাবেক সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) ও মানবাধিকার কর্মী মনজুর মুর্শেদ বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বিবদমান পক্ষগুলোর চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বন্দুকযুদ্ধে জনমনে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। এ ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পর্যটন শিল্প বিকাশের অন্তরায়। পার্বত্য চুক্তিতে কিছু ধারা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, গত দুই যুগে অনেক অর্জন হয়েছে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক রহমান নাসির উদ্দিন মনে করেন, নিজেদের আধিপত্য, পাহাড়িদের মধ্যে নেতৃত্বের কোন্দল ও চুক্তি বাস্তবায়নে হতাশার কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামে সশস্ত্র গ্রুপের মধ্যে সংঘাত ঘটে।

পার্বত্য চুক্তির পর ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ), পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (সংস্কার বা এমএন লারমা) ও ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ-গণতান্ত্রিক) নামে চারটি সংগঠন তৈরি হয়। এগুলো পার্বত্য চুক্তিবিরোধী ও পাহাড়ে সক্রিয়।

সূত্র: আজকের পত্রিকা।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

3 × five =

আরও পড়ুন