সরকারি কর্মকর্তাদের শাস্তি হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রামে পাঠানো হয় কেন

fec-image

বাংলাদেশের একটি বিজ্ঞাপনচিত্রের সংলাপ পার্বত্য অঞ্চলের বিষয়ে জনমনে বিরূপ ধারণা সৃষ্টি করতে পারে- এমন আশঙ্কা থেকে বিজ্ঞাপনটির প্রচার বন্ধ করার পাশাপাশি এ বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি।

বাংলাদেশের বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে দীর্ঘদিন ধরে একটি চা-পাতার বিজ্ঞাপন প্রচারিত হয়ে আসছে।

যেখানে প্রভাবশালী ভূমিকায় থাকা এক ব্যক্তি একজন সরকারি কর্মকর্তাকে হুমকির স্বরে বলেন, তার কাজ না হলে “ওভারনাইট বান্দরবানে পাঠিয়ে দেবো।”

টেলিভিশন বিজ্ঞাপনে প্রচারিত ওই সংলাপের ফলে পার্বত্য অঞ্চলের বিষয়ে মানুষের মনে বিরূপ ধারণা সৃষ্টি হতে পারে, এ কারণে বিজ্ঞাপনটি বন্ধ করার সুপারিশ করেছেন কমিটির সদস্যরা।

গত বুধবার সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত ওই সংসদীয় কমিটির বৈঠকে এ বিষয়ে আলোচনা হয়।

তার পরিপ্রেক্ষিতে সংসদীয় কমিটি ওইসব এলাকার চাকরি নিয়ে এ ধরণের অপপ্রচার বন্ধ করার কথা জানায়।

এ নিয়ে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি দূর করতে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার জন্য তথ্য মন্ত্রণালয়কে সুপারিশ করেছে কমিটির সদস্য।

কমিটির সদস্য এবং খাগড়াছড়ি আসনের সংসদ সদস্য কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা জানিয়েছেন যে, “পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলেও এ ধরণের বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে এই অঞ্চলকে অবজ্ঞা করা হচ্ছে, যা গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা অবজ্ঞার পাত্র হতে চাই না।”

কিন্তু নানা সময়ে দেখা গিয়েছে যে কোন সরকারি কর্মকর্তা তার দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে কিংবা অপরাধ করে ধরা পড়লে তার শাস্তিস্বরূপ পার্বত্য এলাকায় বদলি করা হয়, তারপর থেকেই ওই অঞ্চলগুলো ‘শাস্তিমূলক কর্মস্থল’ হিসেবে পরিচিতি পেয়ে আসছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সরকারি কর্মকর্তা জানান, পার্বত্য এলাকাগুলোয় থাকা, খাওয়া, চিকিৎসা, বিশেষ করে যোগাযোগের ব্যবস্থা সমতলের অঞ্চলগুলোর চাইতে বন্ধুর।

নীরব পরিবেশের কারণে অনেকের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়েও আতঙ্ক কাজ করে। এ কারণে বেশিরভাগ কর্মকর্তা বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটির মতো জায়গায় কাজ করতে আগ্রহী হন না।

এ কারণে শাস্তিস্বরূপ এই দুর্গম এলাকাগুলোয় কর্মকর্তাদের বদলি করা হয়ে থাকে বলে তিনি জানান।

তিনি বলেন, “ধরেন, আপনার মোবাইলের চার্জারটা নষ্ট হয়ে গেল। একটা উপজেলা শহরে কিছুদূর হেঁটে গেলেই হয়তো সেটা পেয়ে যাবেন, কিন্তু পাহাড়ের বিষয়টা ভিন্ন। এখানে সব জিনিষ এতো সহজে মেলে না।”

“তাছাড়া এখানে ভালো স্কুল নেই, হাসপাতাল নেই – একারণে অনেকের পক্ষেই পরিবার নিয়ে থাকা কঠিন হয়ে যায়।”

সরকারি কর্মকর্তাদের শাস্তি হিসেবে পার্বত্য এলাকায় পাঠানোর আরেকটি কারণ সেখানে অন্যান্য জেলার সরকারি কর্মকর্তাদের মতো স্বাধীনতা ভোগ করা যায় না।

তবে সেই দৃশ্যপট আগের চাইতে এখন অনেকটাই বদলেছে বলে জানান ওই সরকারি কর্মকর্তা।

পার্বত্য শান্তি চুক্তির পর, ওই এলাকায় পর্যটকদের আনাগোনা বাড়ার সাথে সাথে থাকা, খাওয়া ও যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নতি হয়েছে।

“আগে তো মানুষের ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ভয় ছিল। কিন্তু এখন পর্যটকরা আসার পর স্বাভাবিকভাবেই সবকিছু আগের চাইতে উন্নত হয়েছে। এখন পাহাড়ি এলাকা রাতের বেলাতেও গমগম করে,” বলেন তিনি।

এরপরও পার্বত্য অঞ্চলগুলোয় কাজ করতে না চাওয়ার আরেকটি বড় কারণ সমতলের চাইতে পাহাড়ি এলাকাগুলোয় সরকারি প্রকল্প থাকে হাতে গোনা।

তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ধরেন নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলায় ১৬টি ইউনিয়ন আছে। অন্যদিকে, খাগড়াছড়ির রামগড় উপজেলায় ইউনিয়ন আছে মাত্র ২টি।

“স্বাভাবিকভাবে যার অধীনে এতো বেশি ইউনিয়ন, তার অধীনে মানুষ বেশি, ফলে তিনি অনেক বেশি সরকারি প্রকল্প পেয়ে থাকেন। প্রকল্প বেশি মানে কাজ বেশি, টাকা বেশি। সেই সুযোগ বা প্রভাব পাহাড়ি অঞ্চলে নেই।”

আবার চরাঞ্চল অনেক দুর্গম হলেও সেখানে অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্প বেশি থাকে। এ কারণে চরাঞ্চলে বদলি হতে কারও আপত্তি থাকে না। যতোটা না ওই পাহাড়ি এলাকায় পদায়নের ক্ষেত্রে থাকে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মকর্তা বলেন, “সাধারণত যাদের বিরুদ্ধে কোন সরকারি প্রকল্পের কাজে গাফিলতি বা দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে তাদেরকেই পার্বত্য এলাকায় পদায়ন করা হয়। কারণ সেখানে বাড়তি টাকা পাওয়ার অর্থাৎ ঘুষ দুর্নীতির সুযোগ অনেক সীমিত।”

যেসব সরকারি কর্মকর্তা শাস্তি হিসেবে পাহাড়ি এলাকায় বদলির মুখে পড়েন, তাদের চাকরি জীবন জুড়েই এর মাসুল দিতে হয় বলে জানা গেছে।

ওই কর্মকর্তা জানান, কোন সরকারি কর্মকর্তাকে পদন্নোতি দিতে গেলে যখন তার পূর্ব অভিজ্ঞতা যাচাই করা হয়, সেখানে পাহাড়ে বদলির রেকর্ড থাকলে সেটা তার ক্যারিয়ারের উন্নতিতে যথেষ্ট নেতিবাচক প্রভাবে ফেলে।

এই একটি কারণে কারও পদোন্নতির সুযোগ বাতিল হয়ে যেতে পারে।

এ প্রসঙ্গে কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা বলেন, পাহাড়ি এলাকার মানুষ এই দেশেরই নাগরিক। কিন্তু সরকারি কর্মকর্তারা কিছু করলে তাদেরকে পার্বত্য অঞ্চলে পাঠিয়ে দেয়া হয় শাস্তি হিসেবে। যা এই জায়গার জন্য অসম্মান বয়ে আনছে। ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করছে।

বর্তমানে পার্বত্য এলাকায় পর্যটকরা যেভাবে ভিড় করছেন এতে অচিরেই এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হবে বলে আশা করছেন তিনি।

“এখন পাহাড়ি এলাকাগুলো আগের অবস্থায় নেই। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ এখানে ঘুরতে আসছে। এটা শাস্তির জায়গা হতে পারে না। সরকারি কর্মকর্তারা বরং খুশি হয়েই এখানে থাকতে চাইবেন।”

সূত্র, বিবিসি

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

eleven + eight =

আরও পড়ুন