ব্যবসায়ী অপহরণ ও মুক্তিপণ মামলা

৭ ডিবি পুলিশের সাজা, নির্যাতনে মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে গেছেন মামলার বাদী

fec-image

অপহরণ করে ১৭ লক্ষ টাকা মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগে ডিবি পুলিশের ৭ সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা করে এখন প্রায় মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে গেছেন বাদী গফুর আলম। সুস্থ ও স্বাভাবিক চলার পথ অনেকটা রুদ্ধ। যে কারণে রায়ের দিন তিনি আদালতে পর্যন্ত আসতে পারেননি।

মঙ্গলবার (২০ সেপ্টেম্বর) কক্সবাজার আদালত প্রাঙ্গণে এসব কথা বলেন বাদী গফুর আলমের বড় ভাই মনিরুজ্জামান।

তিনি বলেন, ডিবি পুলিশের ৭ সদস্যের পৃথক ধারায় ১২ বছর সাজা হয়েছে। রায়ে আমরা সন্তুষ্ট নই।

অপরাধের ধরণ অনুযায়ী আসামিদের সর্বোচ্চ সাজা আশা করেছিলাম। রায়ে কিছুটা অনুগ্রহ দেখিয়েছেন আদালত। আমরা উচ্চ আদালতে আপিল করব।

মনিরুজ্জামান বলেন, এই ঘটনার পর থেকে আমরা নানাভাবে হয়রানি ও হুমকি-ধমকির শিকার হয়ে আসছি। ওসি প্রদীপ থাকতে আমাদের বিরুদ্ধে অনেক মিথ্যা মামলা দিয়েছে। সহায়-সম্বল, ব্যবসা-বাণিজ্য যা ছিল সব শেষ হওয়ার পথে।

তিনি বলেন, ঘটনা ও মামলার পর আমার ভাই গফুর আলমকে প্রচুর পরিমাণ নির্যাতন করেছে পুলিশ। সে এখন অনেকটা মানসিক ভারসাম্যহীন। সবদিক থেকে আমরা কী পরিমাণ ক্ষতির শিকার তা বর্ণনাতীত। আমরা জানমালের নিরাপত্তা চাই।

প্রসঙ্গত, টেকনাফের ব্যবসায়ী গফুর আলমকে অপহরণ করে ১৭ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায়ের মামলায় জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের ৭ সদস্যের ১২ বছর কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত।

এক ধারায় পাঁচ বছর, আরেক ধারায় সাত বছর কারাদণ্ড দিলেও উভয় সাজা একসঙ্গে কার্যকর হয়ে ৭ বছর কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে তাদের। সেই সঙ্গে পৃথক ধারার রায়ে ৩ লক্ষ টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরো ৩ বছর করে কারাদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়েছে।

দণ্ডিত আসামিরা হলেন, সাবেক এসআই মো. আবুল কালাম আজাদ, এসআই মো. মনিরুজ্জামান, এএসআই ফিরোজ আহমদ, এএসআই আলাউদ্দিন, কনস্টেবল মোস্তফা আজম, কনস্টেবল আল আমিন এবং এএসআই মো. গোলাম মোস্তফা।

মঙ্গলবার (২০ সেপ্টেম্বর) দুপুর সোয়া ১২টার দিকে কক্সবাজার জেলা দায়রা ও জজ আদালতে এসটি মামলা নম্বর-১০২১/২০১৯ শুনানি শেষে রায় ঘোষণা করেন বিচারক মোহাম্মদ ইসমাইল।

উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের ২৪ অক্টোবর কক্সবাজার সদর মডেল থানার পেছনের সড়কের হোটেল আল গনির সামনে থেকে ডিবি পুলিশ পরিচয়ে সাদা পোশাকধারী ব্যক্তিরা টেকনাফের ব্যবসায়ী আবদুল গফুরকে মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যান। এরপর ‘ক্রসফায়ারে’ মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে তার স্বজনদের কাছে ১ কোটি টাকা মুক্তিপণ দাবি করেন। দেনদরবারের পর ১৭ লাখ টাকা দিতে রাজি হয় পরিবার। টাকা পৌঁছে দেওয়া হলে পরদিন ভোর রাতে গফুর আলমকে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের শামলাপুরে ছেড়ে দেওয়া হয়।

বিষয়টি গফুর আলমের স্বজনেরা টেকনাফের লম্বরী সেনাবাহিনীর চেকপোস্টে জানায়।

সেনা সদস্যরা মুক্তিপণ আদায়কারী ডিবি পুলিশের সদস্যদের বহনকারী মাইক্রোবাসটি তল্লাশি করে ১৭ লাখ নগদ টাকা পান। এসময় এসআই মো. মনিরুজ্জামান মাইক্রোবাস থেকে পালিয়ে গেলেও বাকি ৬ পুলিশ সদস্যকে আটক করেন সেনা সদস্যরা।

অপহরণের ঘটনায় ব্যবসায়ী গফুর আলম বাদী হয়ে ডিবি পুলিশের ৭ সদস্যের বিরুদ্ধে ফৌজদারী দণ্ডবিধির ৩৬৫/৩৮৫/৩৮৬/৩৪ ধারায় টেকনাফ থানায় মামলা করেন। যার থানা মামলা নম্বর -৩৮/২০১৭, জিআর মামলা নম্বর-৭৮৯/২০১৭ এবং এসটি মামলা নম্বর-১০২১/২০১৯।

ঘটনার প্রায় ১০ মাসের মাথায় ২০১৮ সালের আগস্টের প্রথম সপ্তাহে ৭ আসামির বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

৭ আসামি বিভিন্ন সময়ে আদালত থেকে জামিন লাভ করেন।

মামলাটির যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে গত ৫ সেপ্টেম্বর তাদের জামিন বাতিল করে কারাগারে প্রেরণের আদেশ দেন বিচারক মোহাম্মদ ইসমাইল। সেই সঙ্গে ২০ সেপ্টেম্বর মামলার রায়ের দিন ধার্য করেন।

পুলিশ সূত্র জানায়, ব্যবসায়ী অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনায় গ্রেপ্তার ডিবি পুলিশের ৭ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। সেই সঙ্গে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলার সুপারিশও করেন তদন্ত কমিটি।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

13 + 2 =

আরও পড়ুন