অর্গানিক সুস্বাদু ফল ও মধুর পাশাপাশি মিলছে পাহাড়ি জুমের সুগন্ধি চাল ও মসলা


‘পাহাড়ি ফলের ঘ্রাণ, বৈচিত্র্যময় প্রাণ’ প্রতিপাদ্য নিয়ে রাজধানীর বেইলি রোডের চলছে পাহাড়ি ফল মেলা ২০২৫। আজ মেলার চতুর্থ দিন। মেলা চলবে আগামীকাল শনিবার রাত ৮টা পর্যন্ত।
পাহাড়ি ফল মেলা উপলক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রাম কমপ্লেক্স প্রাঙ্গণ সেজেছে রঙিন সাজে। পুরো কমপ্লেক্স জুড়ে উৎসবের আমেজ। সন্ধ্যা নামলেই শুরু হয় পাহাড়ি শিল্পীদের মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। পাহাড়ে উৎপাদিত নানা জাতের ফল, মসলা, মধু, সুগন্ধি চাল, তেল, আদা, শাক, সবজিসহ নানা রকমের শুকনো খাবার ও পিঠা।
পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে উদ্যোক্তাদের এনে তাদের পণ্যসামগ্রি ঢাকার মানুষের কাছে তুলে ধরার বা সমতলের মানুষের সাথে পাহাড়ি ফলের পরিচয় করিয়ে দেবার এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগটি নিয়েছে সরকারের পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়। তারা বেইলি রোডের এই নান্দনিক পার্বত্য চট্টগ্রাম কমপ্লেক্সটি পরিণত করেছে এক টুকরো পাহাড়ে।
রাজধানীবাসীর মোবাইলে এসএমএসের মাধ্যমে পাহাড়ি ফল মেলার আমন্ত্রণ পাঠিয়েই দায়িত্ব শেষ করেনি মন্ত্রণালয়। তারা রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে বিলবোর্ড, ব্যানার ও প্রচারপত্র বিলি করেছে। তাছাড়া পার্বত্য উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমা নিজে এই মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করে তিনি রাজধানীর মানুষকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। তিনি সমতলের মানুষদের সাথে পাহাড়িদের একটা মেলবন্ধন ঘটাতে চান এই মেলার মাধ্যমে। তাছাড়া তিনি পাহাড়ি ফল রাজধানীবাসীর কাছে সারাবছর পৌঁছে দেয়ার জন্য নানা উদ্যোগের কথা জানান দিচ্ছেন।
উপদেষ্টা বলছেন, তিনি ঢাকায় একটা পাহাড়ি ফলের হাব তৈরি করবেন। যেখানে পার্বত্য এলাকা থেকে ফল এসে জমা হবে, যেখান থেকে ঢাকা সহ সারাদেশের মানুষের কাছে সহজে পৌঁছে দেয়া যায়। তিনি তাজা, অর্গানিক ফলের চাহিদা পূরণে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এ কাজ হাতে নেবেন বলে ঘোষণা করেছেন। তার এ ঘোষণা বাস্তবায়িত হলে ফরমালিনমুক্ত ফলের স্বাদ পাবে সমতলবাসী। একই সাথে পাহাড়ের জুম চাষী থেকে শুরু করে সকল শ্রেণির উদ্যোক্তার আর্থ-সামাজিক পরিবর্তন ঘটবে বলে আশা করছেন অনেকে। মেলায় ৩০টি স্টলে ফল ও কৃষিজ পণ্য বিক্রি ও প্রদর্শনীর যারা এসেছেন তাদের জন্য পার্বত্য কমপ্লেক্সেই থাকার ব্যবস্থা করেছেন। পাহাড় থেকে ফল আনার যাবতীয় খরচ বহণ করেছে পার্বত্য মন্ত্রণালয়।
মেলা ঘুরে দেখা গেছে, স্টলগুলো থরে থরে সাজানো বিচিত্র ফল দিয়ে। তাছাড়া নানা জাতের সবজি ও শাক কিনতে পারছেন ক্রেতারা। এগুলো শরীরের জন্য যেমন উপকারী, তেমনি সুস্বাদুও বলে জানান ক্রেতারা। খাঁটি মধু, জ্যাম, তেল কিনতেও মানুষের ভিড় লক্ষ্য করা গেছে।
তবে মেলায় সবচেয়ে বেশি দেখা যায় নানা জাতের পাহাড়ি আম। এই আমগুলোর আকার এবং রঙ রাজধানীর বাজাররে আমের সাথে মিলছে না। এসব আম একমাত্র পাহাড়েই চাষ করা সম্ভব বলে জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা। মেঝের ওপর কাঁদি কাঁদি লাল রঙের সুস্বাদু সূর্যমুখী কলা, কাঠাল ও আনারস স্তূপ করে রাখা হয়েছে।
বেতের বড় বড় ঝুড়ি ভর্তি লংগান, আনারস, রাঙগুই আম, চিয়াংমাই আম, কিং অব চাকাপাদ আম, লাল ড্রাগন ফল, বড় আকারের লটকন, পাকা পেঁপে, কাউফল, পেয়ারা, কাঁঠালসহ সবকিছুই মিলছে এই পাহাড়ি ফল মেলায়।
এ ছাড়া মেলায় রয়েছে পাহাড়ে উৎপন্ন বিন্নি চাল, জুমের চাল, বাঁশের কোরাল, জুমের মিষ্টিকুমড়া, পাহাড়ি কাজুবাদাম, আচার, পাহাড়ি মরিচ, পাহাড়ি মধু, চিংড়ির বালাচাও, পাহাড়ি নারকেল, তেজপাতা, শুকনা রোজেলাসহ নানা রকম পাহাড়ি খাবার; যা স্টল ও মান ভেদে ভিন্ন ভিন্ন দামে বিক্রি হচ্ছে। দাম তুলনামূলক বেশি হওয়ায় অনেক ক্রেতা-দর্শনার্থী পার্বত্যনিউজের এ প্রতিবেদকের কাছে অভিযোগ করেছেন। তবে স্টল মালিকরা বলছেন, তারা কিছু ফল নিজেদের বাগানে চাষ করেছেন এবং কিছু কিছু পণ্য পাহাড়ের দুর্গম এলাকা থেকে সংগ্রহ করে নিয়ে এসেছেন। তাদের ফল উৎপাদনে যে খরচ হয় এবং দুর্গম পাহাড়ি এলাকা থেকে অন্যান্য পণ্য সামগ্রি কিনে এনে এখানে বিক্রি করতে অনেক খরচ ও সময় ব্যয় হয়ে যায়। তাই তুলনামূলক দাম একটু বেশি। তবে তাদের ফল ও অন্যান্য সামগ্রির মানের ব্যাপারে শতভাগ নিশ্চয়তা দিচ্ছেন। তারা বলছেন, পাহাড়ের খাদ্য সামগ্ররে বেশি দাম বলে যারা অভিযোগ করছেন তারা আমাদের কথাটা একটু ভাবুন। আমাদের উৎপাদন খরচের কথা চিন্তা করুন। উদ্যোক্তারা বলছেন, তাদের কঠোর পরিশ্রম তো আছেই, তার ওপর বাগানে কর্মচারী খাটাতে হয়, পরিচর্যায় টাকা খরচ হয়।
রাঙামাটির ‘জুমঘর’ স্টলের বিক্রেতা নিপায়ন চাকমা জানান, এসব সুস্বাদু ফল কেউ কিনতে চাইলে রাজধানীর বাজারে পাওয়া যাবে না। কারণ এসব ফলের বিশেষত্ব হলো এগুলো বৃহত্তর বাণিজ্যের উদ্দেশে সমতলের কেমিক্যালযুক্ত ফল নয়, সবুজ পাহাড়ের প্রাকৃতিক তরতাজা ফল। ফলের স্বাদ, গুণ ও ঘ্রাণ সমতলের ফলের চেয়ে ভিন্ন। এসব ফল সম্পূর্ণ বিষমুক্ত। কিছু ফল আছে, যেগুলো সমতলের চেয়ে পাহাড়ি মাটিতে বেশি ভালো হয়।

















