কবি মাহামুদুল হাসান নিজামী আর নেই


রাঙামাটি পার্বত্য জেলার কাউখালী উপজেলার সন্তান জাতীয় কবিতা মঞ্চের সভাপতি ও কাউখালী প্রেস ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি কবি, সাহিত্যিক ও সাংবাদিক মাহামুদুল হাসান নিজামী ইন্তেকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৫৫ বছর।
গত বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) সকালে রংপুরে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তিনি। মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন তার ছোট ভাই আরিফুল হক মাহবুব। মাহামুদুল হাসান নিজামীর মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে।
মাহামুদুল হাসান নিজামীর মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানসহ রাঙামাটি জেলার বিভিন্ন রাজনৈতিক সামাজিক সংগঠন।
গুণি এই ব্যক্তির বিদায়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আবেগঘন স্ট্যাটাস দিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক ধর্ম উপদেষ্টা আ ফ ম খালেদ হোসাইনসহ বিভিন্ন মহল শোক প্রকাশ করেন।
মাহমুদুল হাসান নিজামী ছিলেন একাধারে কবি, সাংবাদিক, গীতিকার ও সুরকার। তিনি জাতীয় কবিতা মঞ্চের প্রতিষ্ঠাতা এবং সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়া তিনি দৈনিক দেশজগত পত্রিকার সম্পাদক এবং দৈনিক ডেসটিনির ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ছিলেন।
আরবি, ফার্সি, উর্দু ও ইংরেজিসহ একাধিক ভাষায় তার অসাধারণ দখল ছিল। তিনি বিশ্বসাহিত্যের ধ্রুপদী কবি শেখ সাদী, ফরিদ উদ্দিন আত্তার ও ইমরুল কায়েসের কবিতাগুলোর প্রথম বাংলা কাব্যানুবাদ করে বিশেষ পরিচিতি লাভ করেন।
মাহমুদুল হাসান নিজামীর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় ১৪০টি। এছাড়া তিনি ৫ হাজারেরও বেশি কবিতা ও গান রচনা করেন। বাংলা সাহিত্যে বানান সংস্কার ও গবেষণার নতুন ধারা তৈরিতে আমৃত্যু কাজ করে গেছেন।
মাহমুদুল হাসান নিজামী চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলার কালাপানিয়া এলাকায় জন্মগ্রহণ করলেও স্থায়ীভাবে বসবাস করতেন রাঙামাটি জেলার কাউখালী উপজেলা সদরে। তিনি দেশবরণ্য আলেম মরহুম মাওলানা আব্দুল্লাহ’র বড় ছেলে ও চট্টগ্রাম পুলিশ লাইনস জামে মসজিদের খতীব ইসলামী চিন্তাবিদ মাওলানা মনুসুরুল হক জিহাদীর বড় ভাই।
নিজামীর ছোটভাই আরিফুল হক মাহবুব জানান, ঢাকা থেকে একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে তাঁর ভাই রংপুরে যান। সেখানে হৃদরোগে আক্রান্ত হলে তার সঙ্গে থাকা সহকর্মীরা তাকে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান এবং সেখানকার কর্তৃব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। রাঙামাটি থেকে গিয়ে তার মরদেহ গ্রহণ করতে অধিক সময় ব্যয় হয়েছে।
তিনি আরো জানান, এই কবির প্রথম জানাযা শুক্রবার সন্ধ্যায় বাংলা একাডেমি অথবা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে, দ্বিতীয় জানাযা রাঙামাটির কাউখালী উপজেলায় এবং তৃতীয় জানাযা চট্টগ্রামের লালখান বাজারে অনুষ্ঠিত হবে। সবশেষ পিতা-মাতার কবরের পাশে কাউখালী কেন্দ্রীয় কবরস্থানে শেষ নিদ্রায় শায়িত করা হবে তাঁকে।
মাহমুদুল হাসান নিজামী ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙালি জনগোষ্ঠীর অধিকার, মর্যাদা ও সমঅধিকারের প্রশ্নে এক নির্ভীক ও প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। তিনি দৃঢ় বিশ্বাসে বলতেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম শুধু একটি গোষ্ঠীর অঞ্চল নয়, এটি বহু মানুষের জীবন, ইতিহাস ও সংগ্রামের অবিচ্ছেদ্য পরিসর। সেই বিশ্বাস থেকেই তিনি পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসকারী বাঙালি জনগোষ্ঠীর ন্যায়সংগত অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য দীর্ঘকাল অক্লান্তভাবে কাজ করেছেন।
তিনি ছিলেন প্রথম বাঙালি সংগঠন ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম গণ পরিষদ’ এর দীর্ঘকালীন মহাসচিব, প্রায় ২৮ বছর ধরে এই দায়িত্ব পালন করেন। পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত বাঙালিদের অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দাবিতে এই সংগঠনটি ছিল প্রথমদিকের গুরুত্বপূর্ণ সংগঠনগুলোর একটি। সংগঠনটির কার্যক্রমকে সুসংগঠিত ও শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। তিনি বিশ্বাস করতেন, সংগঠিত শক্তিই পারে অবহেলিত জনগোষ্ঠীর ন্যায়সঙ্গত দাবি রাষ্ট্র ও সমাজের সামনে তুলে ধরতে। তিনি তার জ্ঞান ভাণ্ডারকে কাজে লাগিয়ে বাঙালি জনগোষ্ঠীকে ঐকবদ্ধ করে অনেক আন্দোলন সংগ্রামের নেতৃত্ব দিয়েছেন৷ পাহাড়ে অনেক আন্দোলন হয়েছে বাঙালি তথা রাষ্ট্রের কল্যাণে। তার জন্য তাকে অনেক কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছে। তার মত শিক্ষিত নেতৃত্বকে বাঙালি আন্দোলন থেকে সরাতে অনেক গভীর ষড়যন্ত্র হয়েছে৷ আজকে পার্বত্য বাঙালিরা নেতৃত্বহীন, বাঙালি সংগঠনগুলো দুর্বল ও মেরুদণ্ডহীন।
স্থানীয়রা বলছেন, পার্বত্য অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড—হত্যা, অপহরণ, খুন-গুম ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে তিনি ধারাবাহিকভাবে প্রতিবাদ জানিয়ে গেছেন। পার্বত্য বাঙালিদের ওপর সংঘটিত বিভিন্ন সহিংসতা ও নির্যাতনের ঘটনা তিনি লেখনী ও বক্তব্যের মাধ্যমে প্রকাশ্যে তুলে ধরতেন। তার কলম ছিল প্রতিবাদের, তার কণ্ঠ ছিল ন্যায়বোধের। অন্যায়ের বিরুদ্ধে তিনি কখনো নীরব থাকেন নি।
জাতির জন্য কাজ করতে গিয়ে তাকে নানা প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হয়েছে। রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে তিনি বহু ক্ষেত্রে বঞ্চনার শিকার হয়েছেন। পাশাপাশি পার্বত্য অঞ্চলের কিছু প্রভাবশালী উপজাতি নেতৃত্বের পক্ষ থেকেও তাকে নানাভাবে কোণঠাসা করার চেষ্টা হয়েছে। এমনকি দুঃখজনকভাবে, স্থানীয় কিছু বাঙালি মহলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, ষড়যন্ত্র ও হিংসার শিকারও হতে হয়েছে তাকে। একজন সৎ ও নীতিনিষ্ঠ মানুষের জন্য এই বাস্তবতা ছিল অত্যন্ত বেদনাদায়ক।
সাহিত্যাঙ্গনেও তিনি ছিলেন এক নিবেদিতপ্রাণ সৃষ্টিশীল মানুষ। তার লেখা বহু গ্রন্থ, প্রবন্ধ ও কবিতায় দেশের মানুষের বাস্তবতা, জীবনসংগ্রাম, সামাজিক বৈষম্য, মানবিক আকাঙ্ক্ষা, ও ইসলামের চেতনা গভীর সংবেদনশীলতার সঙ্গে প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি তার শিক্ষা, জ্ঞান ও বৌদ্ধিক সামর্থ্যকে ব্যক্তিগত স্বার্থে নয়, বরং পার্বত্য বাঙালিদের কল্যাণে ব্যয় করেছেন।
তবুও নির্মম সত্য হলো—তার অবদান ও ত্যাগকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি। কাউখালী কিংবা পার্বত্য বাঙালি সমাজের বৃহৎ অংশ তার কর্মকে সেইভাবে স্মরণ বা সম্মান জানাতে পারেনি।
গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে একপ্রকার নীরব নিঃসঙ্গতায় জীবন কাটিয়েছেন। অভিমান ও কষ্টে তিনি ধীরে ধীরে নিজ এলাকা থেকে দূরে সরে যান এবং খুব একটা আর এলাকায় আসতেন না। কিন্তু তার মন, চিন্তা ও হৃদয় সবসময় পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং এখানকার বাঙালি মানুষের সঙ্গেই ছিল।
মাহমুদুল হাসান নিজামী ছিলেন বিচক্ষণ, মননশীল ও সাহসী এক বুদ্ধিজীবী। তিনি ছিলেন সেইসব মানুষের একজন, যারা ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে একটি জনগোষ্ঠীর মর্যাদা ও ন্যায়ের জন্য জীবনব্যাপী সংগ্রাম করেন। আজ তার মৃত্যুতে পার্বত্য বাঙালিরা হারালো এক দূরদর্শী চিন্তক, এক নিবেদিত সংগঠক এবং এক সাহসী কণ্ঠস্বর।

















