ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ : তেহরানের অভিজ্ঞতা জানালেন বাংলাদেশী শিক্ষার্থী

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফারসি ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর করে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে ২০২২ সালে তেহরানের আল-জাহরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী মুমতাহিনা খাতুন। ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরুর সময় তিনি ছিলেন তেহরানেই। রেড অ্যালার্ট জারির পর রাজধানী ছেড়ে ইরানের তুরস্ক সীমান্তবর্তী একটি শহরে আশ্রয় নেন। প্রতিমুহূর্তে মত্যুভয় নিয়ে কেটেছে তার আগের চারটা দিন। ইরানে ইসরায়েলি হামলার সময় সেই রুদ্ধশ্বাস দিনগুলোর কথা তুলে ধরছি এই প্রতিবেদনে।
বিকট শব্দ শুনে ঘুমটা ভেঙে গেল মুমতাহিনা খাতুনের। কিসের শব্দ তা তিনি বুঝতে পারলেন না। মুঠোফোনে তিনি দেখলেন, রাত সাড়ে তিনটা। হোস্টেলের অন্য কক্ষগুলোয় অনেকে উঠেও গেছে। এর মধ্যেই আবার কানফাটানো আওয়াজ। এ কি মেঘের গর্জন? বারান্দায় গিয়ে তিনি দেখলেন আকাশ পরিষ্কার, একবিন্দু মেঘও নেই। তাহলে কিসের শব্দ?
ততক্ষণে হইচই, চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু হয়ে গেছে। চারতলার বারান্দা থেকে নিচে তাকিয়ে তিনি দেখেন, অনেকেই মাঠে বেরিয়ে এসেছেন। তখনই তৃতীয়বারের মতো আবার শব্দ। এবার পরিষ্কার; এটা বিস্ফোরণের শব্দ। দূরে তাকিয়ে তিনি দেখলেন, আগুন জ্বলছে। যে এলাকায় আগুন জ্বলছে, সেটা আবাসিক এলাকা। অনেকটা ঢাকার গুলশানের মতো ভিআইপি এলাকা। সামরিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকসহ নানা পেশার শীর্ষ পদের মানুষদের এখানে বসবাস। দিনের আলো পরিষ্কার হওয়ার পর সেখান থেকে ধোঁয়া উড়তে দেখলেন তিনি।
এর মধ্যে চারতলা থেকে নিচে নেমে এলেন এই শিক্ষার্থী। হোস্টেলের লোকজন তাঁকে বললেন, ইসরায়েল ক্ষেপণাস্ত্র হামলা করেছে। সরকারের পক্ষ থেকেও পরে ইসরায়েলি হামলার কথা জানানো হলো।
ইরানে ইসরায়েলি হামলার খবর এই শিক্ষার্থীর রাজশাহীর বাড়িতেও পৌঁছে গেছে। তটস্থ হয়ে কল দিলেন মুমতাহিনা খাতুনের মা, তাঁর কণ্ঠে উদ্বেগ। সান্ত্বনা দিয়ে তিনি তাঁর মাকে বললেন, তাদের বিশ্ববিদ্যালয় তেহরানের তিন নম্বর অঞ্চলে। এখানে রাষ্ট্রীয় টিভি স্টেশন, বিভিন্ন দেশের দূতাবাসসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা আছে। হোস্টেলের পাশেই কোরীয় দূতাবাস। তাই এখানে হামলার আশঙ্কা নেই।
কিছুদিন পরই তাদের সেমিস্টার ফাইনাল। আপাতত ১৫ দিনের ছুটি। অনেকেই বাড়িতে চলে গেছে। ভারত, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক হোস্টেলে ছিলেন। ভোরে হামলার পর সারা দিন আর কোনো বিস্ফোরণের শব্দ কানে তারা পাননি। তবে তেহরানের বাইরে বিভিন্ন জায়গায় ইসরায়েলি আক্রমণের খবর পাচ্ছিলেন। ইরানও যে ইসরায়েলে পাল্টা আক্রমণ করেছে, সে খবরও তারা জানলেন। সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হলো।
রাতে আবার বিস্ফোরণের শব্দ কানে এল মুমতাহিনা খাতুনদের। নির্ঘুম রাত পার পারলেন। আর ভাবতে লাগলেন কবে এই এলাকা তিনি ছাড়তে পারবেন।
দিনগুলো মৃত্যুভয় নিয়ে কেটিছিল তাঁর। প্রতিমুহূর্তে মনে হতো, কখন না জানি একটা গোলা এসে তাদের ওপর পড়ে।
দিনের বেলাটা তাও মানুষের সঙ্গে দেখাশোনা, কথাবার্তায় কেটে যায়। রাত হলেই অস্থিরতা ভর করে। এর মধ্যে একটি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসও আক্রান্ত হলো। আতঙ্ক আরও বাড়ল। নিরাপত্তার কথা ভেবে তাদের অনেকেই বেজমেন্টে আশ্রয় নিল। সেখানে কোনোমতে থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। সবার মুখে আতঙ্ক, মৃত্যুভয়, কেউ কেউ কাঁদছে; মোটেও ঘুমানোর উপযোগী পরিবেশ নয়। সবার আতঙ্কিত চোখ-মুখ দেখে নিজেকে সেখানে স্বাভাবিক রাখাটাই কঠিন। কিছুক্ষণ সেখানে থেকে নিজের রুমেই চলে যান মুমতাহিনা খাতুন।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের বিষয়ে নির্বিকার। কোনো দিকনির্দেশনা নেই। বাধ্য হয়ে নিজে থেকেই যার যার দেশের দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলছিল শিক্ষার্থীরা।
১৫ জুন ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান ব্রডকাস্টিংয়ের (আইআরআইবি) ভবনে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হলো। এটি মুমতাহিনা খাতুনের ক্যাম্পাসের কাছেই। কাছাকাছি আরও সামরিক ও পারমাণবিক গবেষণাসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো। যখন-তখন বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে শুনতে কান যেন অভ্যস্ত হয়ে উঠল তাদের।
ইসরায়েলের পক্ষ থেকে বাসিন্দাদের তেহরান ছাড়তে বলা হলো। অজানা শঙ্কা নিয়ে তিনি চিন্তা করলেন কোথায় যাবেন।
তার এক বান্ধবীর বাড়ি ইরানের পূর্ব আজারবাইজান প্রদেশের তুরস্ক সীমান্তের কাছাকাছি। বান্ধবী আমন্ত্রণ জানালেন সে যেন তাদের বাড়িতে চলে আসেন। তেহরান থেকে দূরের শহরটা অনেকটাই নিরাপদ। আপাতত তাই সেখানেই যাওয়া ঠিক করলেন বাংলাদেশী এই শিক্ষার্থী। কিন্তু তার আগেই ১৬ জুন রাতে ক্যাম্পাসে হামলার আশঙ্কায় হাইকমিশনের তত্ত্বাবধানে এক কর্মকর্তার বাসায় আশ্রয় নিতে হলো। রাতটা কোনোমতে পার করে সকালেই ক্যাম্পাসে ফিরে ব্যাগটা নিয়ে তিনি ছুটলেন বাসস্ট্যান্ড।
পথে যেতে যেতে অন্য এক তেহরানকে দেখলেন জনবহুল ঢাকা ঈদের ছুটিতে যেমন সুনসান হয়ে যায়, অনেকটা তেমন। দু-একটা গাড়ি চলছে। কিন্তু পথচলতি মানুষের দেখা নেই। অথচ এ সময় স্কুলের পথ ধরে শিশু, কর্মচারীরা ছোটেন অফিসে।
বাসস্ট্যান্ডে কর্মচঞ্চল শহরের কিছুটা আঁচ পেলেন তিনি। ভীতসন্ত্রস্ত মানুষেরা এখানে এসে ভিড় করেছে। সবাই শহর ছাড়তে মরিয়া। বিভিন্ন গন্তব্যমুখী বাসগুলোয় গাদাগাদি করে উঠেছেন যাত্রীরা। তিনি একটি বাস পেলেন। কিন্তু হুড়মুড় করে এতে মানুষ উঠল যে অনেকে সিট না পেয়ে মাঝের জায়গাটাতেই ব্যাগ রেখে কোনোমতে বসে পড়লেন। এই দৃশ্য ইরানে কল্পনাও করা যায় না। সবার চোখেমুখে বাঁচার আকুতি।
বাড়িতে ফেরার অপেক্ষা
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফারসি ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর করে ২০২২ সালে তেহরানে মুমতাহিনা খাতুন। ইতিহাসে সমৃদ্ধ এই শহরের প্রতিটি কোণ যেন দেখার মতো। ইরানের অনেক শহর তিনি ঘুরেছেন। কিন্তু তেহরানের মতো এত পরিচ্ছন্ন ও গোছানো শহর আর তিনি দেখেননি। তাই তেহরানের প্রতি এক অদ্ভুত মায়া কাজ করে তার।
মায়ার সেই শহর ছেড়ে যাচ্ছিলেন। যেতে যেতে দেখলেন, ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে অনেক জায়গা, কোথাও কোথাও এখনো ধোঁয়া উড়ছে। নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা রাস্তায় টহল দিচ্ছেন। বাসে একবার তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখিও হতে হলো এই শিক্ষার্থীর। মুঠোফোন ঘেঁটে দেখেছিলেন তাঁরা।
এভাবেই পাড়ি দিলেন প্রায় এক হাজার কিলোমিটার। রাত এগারোটায় পৌঁছলেন তুরস্ক সীমান্তবর্তী পূর্ব আজারবাইজান প্রদেশের একটা শহরে।
বান্ধবীর বাসায় আশ্রয় নিলেন। জানতেন না কবে দেশে ফিরতে পারবেন। যদি বাংলাদেশ হাইকমিশন তুরস্ক বা অন্য কোনো দেশে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করে, তাহলে নিজেই সেখান থেকে দেশে ফেরার চেষ্টা করবেন মুমতাহিনা খাতুন।
যুদ্ধের কারণে এক মাসের জন্য তাদের ক্যাম্পাস বন্ধ হয়েছে। মুমতাহিনা খাতুনেরা আদৌ আবার ফিরতে পারব তো? শহরটা ছেড়ে আসতে আসতে তার হচ্ছিল, এই শহর কি এমনই থাকবে? নাকি বোমার আঘাতে একদিন পুরোপুরি বদলে যাবে?

















