বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তে রোহিঙ্গার চেয়েও বড় সংকট ধেয়ে আসছে

fec-image

গত এক দশক ধরে বাংলাদেশের মিয়ানমার নীতি মূলত একটি প্রশ্নেই ঘুরপাক খেয়েছে—রাখাইনে গণহত্যা ও জাতিগত নিধনের ফলে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গাকে কীভাবে সামাল দেওয়া হবে।

রোহিঙ্গা সংকট আজও গুরুত্বপূর্ণ, তবে একমাত্র বা সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ নয়। সবচাইতে বড় রূপান্তরটা ঘটছে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তে। মিয়ানমার জান্তার সঙ্গে যুদ্ধরত আরাকান আর্মি রাখাইন রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করছে। বস্তুত, বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমার সীমান্তের প্রায় পুরো অংশই বাহিনীটির নিয়ন্ত্রণে। ফলে বাংলাদেশ শুধু শরণার্থী সংকটই মোকাবিলা করছে না; সীমান্তে উত্থান ঘটা নতুন এক রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখে পড়েছে। এর মূল্য রোহিঙ্গা ইস্যুর চেয়েও বেশি। কারণ আরাকান আর্মি আঞ্চলিক নিরাপত্তা, আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্য, পরাশক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা এবং দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ভূগোলকে নাড়িয়ে দিচ্ছে।

বাংলাদেশ বছরের পর বছর মিয়ানমার রাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক রেখেছে। তাই সব সরকারই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের পরিবেশ গড়তে আন্তর্জাতিক সমর্থন খুঁজেছে। এর যুক্তি ছিল একবারে সরল—রাখাইন রাজ্য যেহেতু মিয়ানমার সরকার নিয়ন্ত্রণ করে, সমস্যার সমাধানও তারাই করবে।

সেই বাস্তবতা আজ অনেকটা বদলে গেছে। আধুনিক ইতিহাসের ট্র্যাজেডি হলো, ২০২১ সালের সামরিক ক্যু থেকে মিয়ানমার বর্তমানে সবচেয়ে বড় নাটকীয় ভাঙনের মুখোমুখি। দেশটির বিস্তৃত অংশজুড়ে সামরিক বাহিনীর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নেই।

আরাকান আর্মি অনেক সফল সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছে। একসময় সংগঠনটি ছিল অনেক আদিবাসীদের পরিচালিত ছোট একটি সশস্ত্র দল, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেটিই আজ সবচাইতে প্রভাবশালী সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। প্রধান শহরগুলো, পরিবহন পথগুলো, সীমান্ত পারাপার কিংবা অর্থনৈতিক করিডর সর্বত্রই নিয়ন্ত্রণ তাদের। অনেক এলাকা তারা সেনাবাহিনীর চেয়েও দক্ষতার সঙ্গে শাসন করছে। আন্তজার্তিক সম্প্রদায় পছন্দ করুক বা না-ই করুক, বাংলাদেশের পূর্ব সীমান্তজুড়ে আরাকান আর্মিই মূল নিয়ন্ত্রক।

তাই আরাকানের পরিস্থিতি ঢাকার জন্য এক কৌশলগত উভয়সঙ্কট। প্রথাগতভাবে, বাংলাদেশ পররাষ্ট্রনীতির ‘রাষ্ট্র বনাম রাষ্ট্র’ দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ করে। কেননা সরাসরি অরাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক গড়লে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ঝুঁকি থাকে। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি অস্বীকার করাও বড় ঝুঁকি।

যে কর্তৃপক্ষ সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ করে না, তার সঙ্গে বসে সীমান্ত নিরাপদ রাখা যায় না। যে প্রতিষ্ঠানের ভূখণ্ডগত নিয়ন্ত্রণ সামান্য, তার দ্বারা বাণিজ্যও সহজতর হয় না। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, সম্ভাব্য রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের টেবিলে আরাকান আর্মির অনুপস্থিতিতে যেকোনো আলোচনাই অর্থহীন হয়ে পড়বে।

সুতরাং অপ্রিয় সত্য এটাই যে, রাখাইন রাজ্যের ভবিষ্যৎ এখন মিয়ানমার সেনাবাহিনীর চেয়ে আরাকান আর্মির ওপর বেশি নির্ভর করছে। ক্ষমতার এই পালাবদল বাংলাদেশের সামনে নতুন ধরনের সংকট হাজির করছে। আগে যেখানে রোহিঙ্গা সংকট ছিল মূলত মানবিক, সেখানে নতুন রূপ নেওয়া এই সীমান্ত চ্যালেঞ্জটি এখন সম্পূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক।

আন্তঃসীমান্ত অপরাধ, অপহরণ, চোরাচালান, অস্ত্র পাচার এবং বর্ধিষ্ণু নিরাপত্তাহীনতা স্পষ্ট করছে যে বাংলাদেশের উদ্বেগ এখন শুধু কক্সবাজার শরণার্থী শিবিরেই সীমাবদ্ধ নেই। সশস্ত্র গোষ্ঠী, রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ ও বহুজাতিক অপরাধচক্রের ত্রিমুখী দ্বন্দ্বে সীমান্ত পরিস্থিতি ক্রমেই আরও জটিল রূপ নিচ্ছে।

ঝুঁকির পাশাপাশি এখানে সুযোগও রয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে রাখাইন দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থল; শেষ পর্যন্ত স্থিতিশীলতা ফিরলে এই বাণিজ্যপথের কল্যাণে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার তথা বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে। তবে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে চাইলে এই অঞ্চল নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বাস্তবসম্মত ও সুসংহত কৌশল নেওয়া প্রয়োজন।

এই সংকট বাংলাদেশের জন্য নতুন কিছু নয়। বিশ্বের অনেক জায়গায় অরাষ্ট্রীয় শক্তি বাস্তবে শাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত এবং বিভিন্ন দেশ সেই বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়েও নিয়েছে। ইরাকি কুর্দিস্তান, সোমালিল্যান্ড বা অন্য যেকোনো বিতর্কিত অঞ্চল—সব ক্ষেত্রেই নীতিনির্ধারকেরা বুঝেছেন যে, বাস্তবতা উপেক্ষা করে কোনো সমস্যার সমাধান করা যায় না। বাংলাদেশও আজ একই পরিস্থিতির মুখোমুখি। এমনকি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও এখন আর এই বাস্তবতা এড়িয়ে যেতে পারছে না।

বাংলাদেশের মিয়ানমার নীতি এখনও অনেকটাই ২০১৭ সালের সংকটের মধ্যে আটকে আছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ের আলোচনাগুলো মূলত শরণার্থী তদারকি ও প্রত্যাবাসন প্রশ্ন ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে। এসব বিষয় অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেগুলো মিয়ানমারের ভেতরের দ্রুত বদলে যাওয়া রাজনীতি থেকে ক্রমেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।

এখন মূল প্রশ্ন রোহিঙ্গাদের ফেরা উচিত কি না, তা নয়। তাদের অবশ্যই ফেরত পাঠাতে হবে। আসল প্রশ্ন হলো, তারা যে ভূখণ্ডে ফিরবে, সেটি আসলে কে শাসন করছে? সেখানে তাদের নিরাপত্তা কে নিশ্চিত করবে? আর যেকোনো চুক্তি হলে তা বাস্তবে কার্যকর করার ক্ষমতা কার হাতে থাকবে?

এসব প্রশ্নের উত্তর ভঙ্গুর জান্তা সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে পাওয়া সম্ভব নয়; কারণ সংশ্লিষ্ট ভূখণ্ডের বড় অংশই এখন তাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। ফলে যারা বাস্তবে ওই অঞ্চল শাসন করছে, তাদের হিসাবে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। তবে এর অর্থ আরাকান আর্মিকে দায়মুক্তি দেওয়া নয়। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে তাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। ভবিষ্যতের যেকোনো আলোচনায় সংখ্যালঘুদের অধিকার, নাগরিকত্ব, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা এবং জবাবদিহির বিষয়ে সুস্পষ্ট রূপরেখা থাকতে হবে। কিন্তু কৌশলগত বাস্তবতাগুলো কেবল রাজনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর বলে আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

এই শিক্ষা শুধু বাংলাদেশ বা মিয়ানমারের জন্য নয়। বিশ্বজুড়েই সার্বভৌমত্বের প্রচলিত ধারণা নানা কারণে আজ প্রশ্নবিদ্ধ। অনেক রাষ্ট্র খণ্ডিত হচ্ছে, অরাষ্ট্রীয় শক্তিগুলো বিস্তৃত ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছে, আর রাজনৈতিক কর্তৃত্ব চলে যাচ্ছে এমন সব সংগঠনের হাতে, যারা বিদ্রোহী গোষ্ঠী ও রাষ্ট্রের মধ্যবর্তী অবস্থানে রয়েছে। মিয়ানমার তারই এক স্পষ্ট উদাহরণ। বাংলাদেশের জন্য এর বার্তা পরিষ্কার; মিয়ানমার-নীতি আর শুধু নেপিদোর সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা বা শরণার্থী শিবির পরিচালনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। পূর্ব সীমান্তের ক্ষমতা যেখানে ধীরে ধীরে মিয়ানমার রাষ্ট্রের হাত থেকে অন্য শক্তির কাছে চলে যাচ্ছে, সেই নতুন বাস্তবতাকে এখন গ্রহণ করতে হবে।

রোহিঙ্গা সংকট আজও ঝুলে আছে; ১০ লাখের বেশি শরণার্থী বাংলাদেশে অবস্থান করলেও তাদের প্রত্যাবাসন নিয়ে সুস্পষ্ট কোনো দিশা নেই। তবে বাংলাদেশের সংকট আর শুধু রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সীমান্তের ওপারে দেশটি এক নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার উত্থান দেখছে। তাই ভবিষ্যতের জন্য এমন প্রস্তুতি রাখতে হবে, যেখানে মানচিত্র হয়তো অপরিবর্তিত থাকবে, কিন্তু ক্ষমতার চেহারা পুরোপুরি বদলে যাবে।

লেখাটি আরব নিউজ’ থেকে অনূদিত; এর লেখক ড. আজিম ইব্রাহিম একজন ব্রিটিশ ভূরাজনীতিক ও নীতি বিশেষজ্ঞ।

উৎস :  বিডিনিউজ২৪.কম থেকে নেওয়া।

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: কক্সবাজার, মিয়ানমার, রহিঙ্গা
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন