সিজেপি

ভারতের রাজনীতিতে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র উত্থান

fec-image

ভারতীয় রাজনীতিতে এক অদ্ভুত চরিত্রের আবির্ভাব হয়েছে- সেটি হলো ককরোচ বা আরশোলা, অথবা তেলাপোকা। একগুঁয়ে, যাকে নিশ্চিহ্ন করা অসম্ভব এবং মানুষ ভীষণভাবে অপছন্দ করে এমন এক কীটকে সামনে রেখেই তৈরি হয়েছে এক ধরনের ব্যঙ্গাত্মক প্ল্যাটফর্ম, যার নাম ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি।

এক সপ্তাহেরও কম সময়ে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম লাখ লাখ ফলোয়ার পেয়েছে এবং মূলধারার গণমাধ্যমের দৃষ্টিও আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। শুধু তাই নয়, এর আবির্ভাব প্রবীণ রাজনীতিবিদদেরও নড়েচড়ে বসতে বাধ্য করেছে বৈকি।

সদস্যপদের জন্য বেশ কয়েকটা শর্তও রয়েছে যা রসিকতায় মোড়া। যেমন সদস্য হতে গেলে বেকার, অলস, সারাক্ষণ অনলাইনে সক্রিয় থাকাটা আবশ্যক। একইসঙ্গে “পেশাগতভাবে র‍্যান্ট-এর ক্ষমতা”ও তাদের থাকতে হবে।

র‍্যান্ট বলতে বোঝায় নানা বিষয় নিয়ে অভাব-অভিযোগ তুলে ঘ্যান ঘ্যান করতে থাকা, বা উচ্চস্বরে ক্ষোভ প্রকাশ।

ককরোচ জনতা পার্টি-র নেপথ্যে রয়েছেন বোস্টন ইউনিভার্সিটির ছাত্র ও পলিটিক্যাল কমিউনিকেশন স্ট্র্যাটিজিস্ট অভিজিৎ দীপকে। পলিটিক্যাল কমিউনিকেশন স্ট্র্যাটিজিস্ট হলো এমন এক বিশেষজ্ঞ যিনি কোনো রাজনীতিবিদ, রাজনৈতিক দল বা অধিকার রক্ষা করে এমন সংগঠনের হয়ে বার্তা তৈরি ও জনসংযোগের কাজ করেন এবং তা বাস্তবায়নে সাহায্য করেন।

দীপকে জানিয়েছেন নেহাতই মজার ছলে বিষয়টা মাথায় এসেছিল তার। যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার আগে তিনি আম আদমি পার্টির সঙ্গে কাজ করতেন। ভারতের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই এই রাজনৈতিক সংগঠনের আবির্ভাব এক দশকেরও বেশি আগে। দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের হাত ধরে জন্ম নিয়েছিল আম আদমি পার্টি এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই দলের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো।

অভিজিৎ দীপকে বলেছেন, “আমি ভেবেছিলাম আমাদের সবার একত্রিত হওয়া উচিত, হয়তো একটা প্ল্যাটফর্ম শুরু করা যেতে পারে। এরপর যা ঘটে সেটা প্রত্যাশা করেননি মি. দীপকে।

মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই সিজেপি-র গুগল ফর্মের মাধ্যমে হাজার হাজার সদস্য যুক্ত হন। #ম্যায়ভিককরোচ (আমিও আরশোলা) এই ‘হ্যাশট্যাগ’ চালু হয় এবং তা বহু বিরোধী নেতাদের সমর্থনও পেতে শুরু করে। বুধবার, সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ পোস্ট করেন- বিজেপি বনাম সিজেপি।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বাইরেও ‘সিজেপি’ নিয়ে আলোচনা ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে তরুণ স্বেচ্ছাসেবকরা পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও প্রতিবাদ কর্মসূচিতে কিছুটা নাটকীয়ভাবে এবং প্রতীকী স্বরূপ আরশোলার বেশে হাজির হন।

বৃহস্পতিবার সিজেপি-র ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টের ফলোয়ার সংখ্যা এক কোটি ছাড়িয়ে যায়। সদস্য সংখ্যার দিক থেকে বিশ্বের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল হিসেবে পরিচিত বিজেপি-র অফিশিয়াল অ্যাকাউন্টকে ইতিমধ্যে টেক্কা দিয়েছে সিজেপি। ইনস্টাগ্রামে বিজেপির ফলোয়ারের সংখ্যা প্রায় ৮.৭ মিলিয়ন বা ৮৭ লাখ।

তবে, এক্স হ্যন্ডেলে সিজেপি-র অ্যাকাউন্ট অ্যাক্সেস করা যাচ্ছে না, যদিও এর দুই লাখের বেশি ফলোয়ার রয়েছে। যারা ওই অ্যাকাউন্ট খুঁজে দেখার চেষ্টা করছেন তাদের জানানো হচ্ছে “এক আইনি দাবির পরিপ্রেক্ষিতে” ওই অ্যাকাউন্ট স্থগিত রাখা হয়েছে।

সিজেপি-র উত্থানের গতি ও ব্যাপকতা অনেককেই অবাক করেছে। কিন্তু এই ককরোচ জনতা পার্টি মাঠপর্যায়ে ভারতের রাজনৈতিক পরিবর্তনে প্রভাব ফেলতে পারে- তেমন ইঙ্গিত কিন্তু এখনো মেলেনি।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফলোয়ারের নিরিখে সিজেপি অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোকে ছাড়িয়ে গেলেও বিজেপি এবং বিরোধী কংগ্রেসই কিন্তু ভারতের প্রভাবশালী রাজনৈতিক শক্তি। গোটা দেশে লক্ষ লক্ষ সক্রিয় সদস্য রয়েছে এই দলগুলোর। তা সত্ত্বেও, সিজেপি-র গতি বেড়েই চলেছে।

বহুলভাবে নিয়ন্ত্রিত এবং ভিন্ন মতাদর্শীদের কাছে সহজ নয়- এমন এক রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে সিজেপি অনেকটা “তাজা বাতাসের” মতো বলেই মনে করছেন সমর্থকেরা। এই সমর্থকদের মধ্যে মহুয়া মৈত্র এবং কীর্তি আজাদের মতো বিরোধী রাজনীতিবিদ যেমন আছেন, তেমনই রয়েছেন প্রবীণ আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ।

প্রধান বিচারপতির মন্তব্যের পরে আলোচনায় তেলাপোকা
ককরোচ জনতা পার্টি’ নামটা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) কথা মাথায় রেখে প্যারোডি বা বিদ্রূপ করেই দেওয়া বলে মনে হয়।

নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার ২০১৪ সাল থেকে কেন্দ্রে ক্ষমতায় রয়েছে। সমালোচকরা এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলো বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ করেছে যে এই সময়কালে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং নাগরিক অধিকার হ্রাস পেয়েছে। এই অভিযোগ অবশ্য বিজেপি অস্বীকার করে এসেছে।

গত সপ্তাহে ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের বিতর্কিত মন্তব্যের পর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে আরশোলা। এক মামলার শুনানি চলাকালীন প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত ও বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর বেঞ্চ এক আইনজীবীর আচরণে অসন্তুষ্ট হন।

ওই আইনজীবী অভিযোগ করেছিলেন যে দিল্লি হাইকোর্ট জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের তালিকাভুক্তি সংক্রান্ত সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশিকা বাস্তবায়ন করতে বিলম্ব করছে। তার দাবি ছিল, এর বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার সংক্রান্ত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। সেই আবেদন খারিজ করে দিয়ে আদালতের ওই বেঞ্চ জানায়, ‘সিনিয়র অ্যাডভোকেট’-এর পদমর্যাদা আদালতের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়, এটা কোনো মর্যাদার প্রতীক নয়।

বিচারপতি সূর্য কান্তের বেঞ্চ বলে, সমাজে ইতোমধ্যেই পরজীবী রয়েছে যারা ব্যবস্থার ওপর আক্রমণ করে। আপনিও কি তাদের দলে যোগ দিতে চান? এমন কিছু যুবক আছে যারা কর্মসংস্থানের অভাব এবং নিজেদের পেশায় জায়গা করে নিতে না পারার কারণে তেলাপোকার মতো সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। তাদের মধ্যে কেউ গণমাধ্যমে কাজ শুরু করে, কেউ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সক্রিয় হয়, কেউ আরটিআই (রাইট টু ইনফর্মেশন) কর্মী হয়, কেউ অন্য ধরনের অ্যাক্টিভিস্ট হয়ে ওঠে এবং তারপর সবাইকে আক্রমণ করতে শুরু করে।

পরে অবশ্য প্রধান বিচারপতি বিষয়টা স্পষ্ট করে দেন যে, তিনি মূলত ‘ভুয়া ও জাল ডিগ্রিধারী’ ব্যক্তিদের কথা বলছিলেন, বৃহত্তর অর্থে ভারতের যুবসমাজকে উদ্দেশ্য করে কিছু বলেননি। তার মন্তব্যকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে।

কিন্তু ততক্ষণে মন্তব্যগুলো অনলাইনে বিপুলভাবে ছড়িয়ে পড়েছে এবং একে কেন্দ্র করে একদিকে যেমন ক্ষোভ ও কৌতুক শুরু হয় তেমনই এর হাত ধরে জন্ম নেয় ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামক এক মজাদার রাজনৈতিক চিন্তার।

হাস্যরসের মাধ্যমে গুরুতর রাজনৈতিক দাবি
সিজেপির রয়েছে উপহাস করার প্রবণতা, ইচ্ছাকৃত রুক্ষ উপস্থাপনা এবং এমন ভাষা যেটাকে কোনো প্রতিষ্ঠানের ভাষ্যের চেয়ে বরং একটি অভ্যন্তরীণ রসিকতার মতো মনে হয়।

তবুও, এই হাস্যরসের ভেতরে লুকিয়ে রয়েছে চেনা সব রাজনৈতিক দাবি- জবাবদিহিতা, গণমাধ্যম সংস্কার, নির্বাচনী স্বচ্ছতা এবং নারীদের প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি। এগুলোর পাশাপাশি রয়েছে ‘ডুমস্ক্রলিং’ বা ক্রমাগত স্ক্রল করতে করতে নেচিবাচক কনটেন্ট দেখার প্রবণতা, বেকারত্ব এবং সামগ্রিক রাজনৈতিক ক্লান্তি নিয়ে আত্ম-বিদ্রূপধর্মী রসিকতা।

ব্যঙ্গ ও আন্তরিকতার মাঝামাঝি এই সুরটিই এর আকর্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রসিকতাগুলো কার্যকর হয়ে ওঠে, কারণ এর অন্তর্নিহিত হতাশাগুলো আমাদের কাছে পরিচিত—চাকরি, বৈষম্য, দুর্নীতি এবং রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতাকে কেন্দ্র করে সেগুলো গড়ে ওঠে।

অনেকের মতে সিজেপি তার প্রতিনিধিত্বের জন্য যে ম্যাসকট বা প্রতীকী চরিত্র বেছে নিয়েছে তা-ও অর্থবহ।

‘তেলাপোকা’ বীর নয়, উচ্চাকাঙ্ক্ষীও না। তবে এর কিছু বিশেষত্ব চোখে পড়ার মতো; যেমন এই জীব সহনশীল, অভিযোজনক্ষম এবং খুব কম প্রত্যাশা নিয়েও প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকতে সক্ষম।

তবে হাস্যরস এবং রাজনীতির এই মিশেল নতুন নয়। ইতালিতে, কৌতুক অভিনেতা বেপ্পে গ্রিলো ফাইভ স্টার মুভমেন্টে প্রতিষ্ঠা-বিরোধী হাস্যরসকে তুলে ধরেছিলেন। অন্যদিকে, ইউক্রেনে ভলোদিমির জেলেনস্কি টেলিভিশনে কাল্পনিক প্রেসিডেন্টের চরিত্রে অভিনয় থেকে বাস্তব নেতা ওঠেন।

আবার যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতায় থাকাকালীন বারবার এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে যে ব্যঙ্গ নিজেই এখন রাজনৈতিক বাস্তবতার নিচে চাপা পড়েছে; এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যেখানে বাস্তবকেই প্যারোডি বলে মনে হয়।

ভারতের অবশ্য সেটা আকার পেয়েছে অনলাইন মাধ্যমের হাত ধরে। হ্যাশট্যাগ এবং বিদ্রূপাত্মক হতাশা প্রকাশের মাধ্যম হয়ে উঠেছে মিম। আন্দোলনের মাধ্যম হয়ে উঠেছে পোকা-মাকড়ের থিমযুক্ত ককরোচ জনতা পার্টি।
প্রথম নজরে, একে অস্বাভাবিক বলে মনে হতে পারে। তবে ভারতীয় রাজনীতিতে এটা পুরোপুরি অযৌক্তিক নয়।

এখানকার রাজনীতিবিদদের দীর্ঘদিন ধরে হিমালয়ের গুহায় ধ্যান করতে দেখা গিয়েছে। বিধায়কদের বাসে আটকে রাখা বা হোটেলে লুকিয়ে রাখার পর তাদের দল বদলাতেও দেখা গেছে।

রাজনৈতিক দলগুলোর অনলাইন প্রচারাভিযান যাতে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে এবং ভিডিও ভাইরাল হয়ে যায় সেই ভাবে তৈরি করা। এই উদ্দেশ্যগুলো হাসিল করতে সেগুলো অতি সাবধানতার সঙ্গে কোরিওগ্রাফ করা। নজর কাড়া স্লোগানও রয়েছে বৈকি।

তরুণদের হতাশা প্রকাশের মাধ্যম?
এই পরিস্থিতিতে পোকা-মাকড়ের থিমযুক্ত রাজনৈতিক সমষ্টিকে অদ্ভুতভাবে বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হয়। কেন এত দ্রুত সিজেপি মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল তা-ও সহজে অনুমান করা যায়। এর কারণ এটা নয় যে ভারতীয় তরুণরা অন্য কোনো রাজনৈতিক দল চাইছে, বরং এটাই মনে হয় যে তারা নিজেদের হতাশা প্রকাশের ভাষা খুঁজছে।

মি. দীপকে বলেন, আমি মনে করি সিজেপি একটা সূচনা মাত্র। তরুণরা বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থায় বিরক্ত এবং আরো অনেক যুব সংগঠন এরপর এগিয়ে আসবে।অনেকেই অবশ্য এই প্ল্যাটফর্ম বা দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে সন্দিহান। তাদের মতে সিজেপি-র উত্থান যত দ্রুত, এর ম্লান হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও ততটাই।

তবে সে যাই হোক না কেন, সিজেপি ইতোমধ্যে ভারতীয় রাজনীতিতে অস্বাভাবিক কিছু একটা করে ফেলেছে- সংক্ষিপ্তভাবে হলেও এটা তরুণদের মধ্যে এই অনুভূতি এনে দিয়েছে যে তারা এখন দৃশ্যমান। এর আগের যুগে তরুণ প্রজন্ম ক্ষোভ প্রকাশ করতে ইশতেহার তৈরি করত; আর ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে তারা পোকা-মাকড়ের ম্যাসকট দিয়ে মিম-ভিত্তিক দল তৈরি করে। প্রতিবাদ যদিও একই থাকে।

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: ভারত, সিজেপি
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন