‘আসাম পুলিশ আমাকে এখানে পুশইন করে বিপদে ফেলেছে’

fec-image

গত বছরের জুন মাসের ঘটনা। রাজধানী ঢাকার মিরপুরের একটি রাস্তায় বৃষ্টির মধ্যে ভিজছিলেন এক বৃদ্ধা। ব্যথায় কোঁকাচ্ছিলেন তিনি, হাতটি ছিল ভাঙা। অসহায়ভাবে কাঁদতে থাকা এই বৃদ্ধাকে প্রথম দেখতে পান জাকিয়া বেগম নামের স্থানীয় এক নারী।

জাকিয়া বেগমের মেয়ে ক্লান্তি আক্তার জানান, “উনি কীভাবে এখানে এলেন, তা আমাদের গুছিয়ে বলতে পারছিলেন না। বাড়ি কোথায় জিজ্ঞেস করতেই শুধু বলছিলেন, ওনার বাড়ি ‘নলবাড়ি’। আমরা প্রথমে ভেবেছিলাম নলবাড়ি হয়তো ঢাকা বা বাংলাদেশেরই কোনো জায়গা।”

বৃদ্ধার এই করুণ দশা দেখে জাকিয়া বেগম ও তার মেয়ে তাকে নিজেদের ঘরে আশ্রয় দেন। পরবর্তীতে ক্লান্তি আক্তার গুগলে অনুসন্ধান করে জানতে পারেন যে, নলবাড়ি আসলে বাংলাদেশের কোনো জায়গা নয়, এটি ভারতের আসাম রাজ্যের একটি জেলা।

ভারতীয় গণমাধ্যম ‘স্ক্রল’ এর এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়, ৬৯ বছর বয়সী এই বৃদ্ধার নাম সাকিনা বেগম। আসামের নলবাড়ির বাসিন্দা সাকিনা কীভাবে ঢাকার মিরপুরে এসে পৌঁছালেন, তার স্পষ্ট কোনো স্মৃতি ওনার নেই। তবে তার আবছা মনে পড়ে, আসামের একটি থানা থেকে তাকে ভারতের বৃহত্তম ডিটেনশন সেন্টার ‘মাটিয়া’-তে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। এরপর সেখান থেকে রাতের আঁধারে ধুবড়ী জেলা সীমান্ত দিয়ে পুশইন করে (জোরপূর্বক) বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়।

সীমান্ত পার করার পরের দিনগুলো সাকিনার স্মৃতিতে কুয়াশাচ্ছন্ন। কোনোমতে একটি বাসে উঠে কন্ডাক্টরকে তিনি নলবাড়ি নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু নিয়তির পরিহাসে তিনি এসে পৌঁছান সীমান্ত থেকে ৫০০ কিলোমিটার দূরে রাজধানী ঢাকায়।

ভিডিও কলে নিজের আকুতি জানিয়ে সাকিনা বেগম বলেন, “আমি ওদের (জাকিয়া ও তার মেয়ে) বলেছিলাম, আমি জানি না আমি কোথায় আছি। ওরা আশ্রয় দেওয়ার আগে অনেক দিন আমি বৃষ্টির মধ্যে বাইরে পড়েছিলাম। ক্ষুধায় ও শীতে কাঁপছিলাম। ওরা আমাকে ওদের ঘরে থাকতে দেয়, খেতে দেয়, নামাজ পড়ার জায়গা দেয়। হাত ভাঙা থাকায় আমাকে গোসল পর্যন্ত করিয়ে দিয়েছে।”

ক্লান্তি আক্তার বলেন, “উনি একজন অসহায় বৃদ্ধা নারী। আমাদের ওনার প্রতি দয়া হয়েছিল। উনি ভারতীয়, চোর-ডাকাত তো নন। তাই আমরা ওনাকে সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছি।”

অসমীয়া ভাষা ছাড়া অন্য কোনো ভাষা না জানা সাকিনা বেগম এখন ক্লান্তি আক্তারের পরিবারের সাথেই থাকছেন। এর মধ্যে বাংলাদেশে তাকে কিছুদিন জেলও খাটতে হয়েছে। ভারত থেকে জোরপূর্বক তাড়িয়ে দেওয়ার এক বছর পরও তিনি নলবাড়ির বারকুরা গ্রামে নিজের বাড়িতে ফেরার জন্য ব্যাকুল হয়ে আছেন। তবে ভারতের আসামে থাকা তার পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, ওনাকে ফিরিয়ে নেওয়ার মতো কোনো সামর্থ্য বা উপায় তাদের জানা নেই।

সাকিনা বেগম ক্ষোভ ও দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, “আমি একজন অসমীয়া মানুষ, আমি বাংলাদেশের নই। আমি বাংলা বলতেও জানি না। আসাম পুলিশ আমাকে এভাবে এখানে পুশইন করে বিপদে ফেলেছে। এটা ওনাদের করা উচিত হয়নি। আমি কোনো অপরাধ করিনি।”

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: ভারত
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন