রাজনৈতিক সুপারিশে অনুমোদন পাচ্ছে আরো ১০ মেডিকেল কলেজ


রাজনৈতিক সুপারিশে নতুন করে ১০টি মেডিকেল কলেজ অনুমোদনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সদ্যসাবেক অন্তবর্তীকালীন সরকারের সময়ে আবেদন করা এসব কলেজের মধ্যে দুটির জন্য দায়িত্বে থাকা অবস্থায় সুপারিশ করেছিলেন তৎকালীন দুই উপদেষ্টা। এছাড়া অন্য দুটি কলেজের জন্য সুপারিশ করেছিলেন বর্তমান দুই মন্ত্রী; যারা সুপারিশের সময় মন্ত্রী ছিলেন না। ১০টি কলেজের মধ্যে ৯টির জন্যে সুপারিশ রাজনৈতিক নেতাদের। অন্য একটির জন্য সুপারিশ করেছেন প্রতিরক্ষা বাহিনীর একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা।
সুপারিশকারী সদ্যসাবেক দুই উপদেষ্টা হলেন—অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ এবং স্বরাষ্ট্র ও কৃষি উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। অন্য দুটির সুপারিশকারীদের মধ্যে একজন বিএনপি মহাসচিব ও বর্তমান স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। অন্যজন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।
জানা যায়, আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে মোট ৫২টি মেডিকেল কলেজ কার্যক্রম পরিচালনার অনুমোদন পেয়েছে। ২০১০ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে মাত্র ৫ বছরেই ৩৯টি প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদন দেওয়া হয়। বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানই অনুমোদন পেয়েছে রাজনৈতিক বিবেচনায়, যার মধ্যে দুই ডজনেরও বেশি ভুগছে এখন নানা সংকটে। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই নতুন করে রাজনৈতিক সুপারিশে আরো ১০টি কলেজের অনুমোদন দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
চিকিৎসকরা বলছেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় কোনো মেডিকেল কলেজের অনুমোদন হওয়া উচিত নয়। কারণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে এ ধরণের প্রতিষ্ঠান পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি এবং মান নিশ্চিত না করেই কার্যক্রম পরিচালনা করছে। শিক্ষার মান না থাকলে এসব প্রতিষ্ঠান থেকে যে চিকিৎসক বের হবে, তারা সবার জন্য ক্ষতির কারণ হবে।
নতুন মেডিকেল কলেজের আবেদনকারী হলেন যারা
নতুন করে যে দশটি মেডিকেলে কলেজ চালুর তোড়জোড় চলছে তার মধ্যে নয়টি সরকারি এবং একটি বেসরকারি। সরকারি মেডিকেল কলেজের জন্য আবেদন করা হয়েছে মুন্সিগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নাটোর, লক্ষীপুর, ভোলা, ঠাকুরগাঁও ও শেরপুরের জন্য। একমাত্র বেসরকারি মেডিকেল কলেজের আবেদন এসেছে দিনাজপুর থেকে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য শিক্ষা বিভাগের একাধিক সচিবের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েই এসব কলেজের লিখিত আবেদন জমা পড়ে। কেউ কেউ আবার নির্বাচনে জয় পেতে নিজ জেলায় মেডিকেল কলেজ স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দেন। সে অনুযায়ী চালুর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নতুন মেডিকেল কলেজ চালুর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি তোড়জোড় চলছে মুন্সিগঞ্জে। এ কলেজটি চালুর আবেদন করেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্র ও কৃষি উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। সরকারের পক্ষ থেকেও এই কলেজ স্থাপনের নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। ইতোমধ্যে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব প্রস্তুত করা হয়েছে।
নিজ জেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মেডিকেল কলেজ স্থাপনের আবেদন করেন অন্তবর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। গত বছরের ৩ আগস্ট নিজ জেলায় মেডিকেল কলেজ স্থাপনের জন্য তিনি চিঠি দেন তৎকালীন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নুরজাহান বেগমকে। চিঠিতে ড. সালেহউদ্দিন লিখেছেন, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ২৮ লাখের বেশি মানুষের জন্য প্রাচীন এ জেলায় মেডিকেল কলেজ হলে পার্শ্ববর্তী জেলা কুমিল্লা, হবিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ এবং নরসিংদীর কয়েকটি উপজেলার মানুষ এখানে চিকিৎসা সেবা নিতে পারবে।’ তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অর্থ উপদেষ্টার চিঠিতে উল্লিখিত নরসিংদী ছাড়া বাকি জেলাগুলোতে আগে থেকেই মেডিকেল কলেজ রয়েছে।
অন্যদিকে, উত্তরের জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে মেডিকেল কলেজ স্থাপনের আবেদন করেছেন বিএনপির মহাসচিব এবং বর্তমান স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ইতোমধ্যে সরেজমিনে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে হয়েছে পরিদর্শন।
নরসিংদীতে মেডিকেল কলেজ চালুর প্রক্রিয়া চলছে সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের আবেদনের ভিত্তিতে। ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর সাখাওয়াত হোসেন এখন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। সম্প্রতি মন্ত্রণালয়ের একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল নরসিংদীতে মেডিকেলে কলেজের প্রয়োজনীয়তা যাচাই করতে সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন।
নারায়ণগঞ্জে একটি মেডিকেল কলেজ চালুর আবেদন করেছেন জেলা গণসংহতি আন্দোলনের সমন্বয়কারী তারিকুল ইসলাম সুজন।
মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল চালুর তোড়জোড় চলছে শেরপুরেও। কলেজটি স্থাপনের পেছনে সামরিক বাহিনীর একজন শীর্ষস্থানীয় একজন কর্মকর্তা রয়েছেন বলে জানা গেছে।
স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর ও জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের একাধিক সূত্র জানায়, সামরিক বাহিনীর ওই কর্মকর্তা গত বছরের ২১ অক্টোবর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবরে মেডিকেল কলেজ চালু করতে চিঠি দেন। এ প্রেক্ষিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব সঞ্জীব দাস শেরপুর জেলা সদরে মেডিকেল কলেজের প্রয়োজনীয়তা আছে কিনা এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রদানের জন্য স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে একই বছর ২৭ নভেম্বর চিঠি প্রদান করেন। এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে চলতি বছরের গত ২২ ফেব্রুয়ারি স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালককে (প্রশাসন) প্রধান করে ছয় সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
নাটোরের ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট আধুনিক সদর হাসপাতালকে মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে রূপান্তরের দাবি দীর্ঘদিন ধরে। দাবিটি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর পরে তা সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য হাসপাতাল পরিদর্শন করেছেন স্বাস্থ্য বিভাগের ৭ সদস্যের একটি উচ্চ পর্যায়ের টিম।
বাকি চার জেলার মধ্যে নাটোরের জেলা সদর হাসপাতালটিকে মেডিকেল কলেজে রূপান্তরের জন্য সিভিল সার্জনের মাধ্যমে আবেদন করেছেন জেলার বিশিষ্টজনরা। এ বিষয়ে নাটোরের সিভিল সার্জন ডা. মোক্তাদির আরেফিন বলেন, ‘মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি দল হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ড, অপারেশন থিয়েটার, ডায়াগনস্টিক বিভাগ এবং অবকাঠামোগত সুবিধা সরেজমিনে পরিদর্শন করেছে। এছাড়া তারা চিকিৎসা সেবার মান, জনবল কাঠামো, যন্ত্রপাতির সক্ষমতা এবং সম্প্রসারণের সুযোগ-সুবিধা খতিয়ে দেখেন। হাসপাতালটির প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও জনবল সংক্রান্ত বিষয়গুলো মূল্যায়ন করে সবকিছু সন্তোষজনক হলে পরবর্তী ধাপে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে প্রয়োজনীয় সুপারিশ পাঠানোর কথা জানান।’
ভোলায় মেডিকেল কলেজ স্থাপনের আবেদন করা হয়েছে ‘আমরা ভোলাবাসী’ নামক একটি সংগঠনের পক্ষ থেকে। এ সংগঠনের আহ্বায়ক গোলাম নবী আলমগীর জেলা বিএনপির নেতৃত্বে রয়েছেন। সংগঠনটির সদস্য সচিব জেলা এনসিপির সদস্য মীর মোশারেফ অমি। সংগঠনের পক্ষ থেকে মেডিকেল কলেজের আবেদনে স্থানীয় জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন, বিজেপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা স্বাক্ষর করেছেন।
লক্ষ্মীপুরে মেডিকেল কলেজের আবেদনকারী হিসেবে একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের নাম শোনা গেলেও সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে এ বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দিনাজপুরে ইম্পেরিয়াল মেডিকেল কলেজ নামে একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজের আবেদন করা হয়েছে। জিয়া হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল ক্যাম্পাসে এটির অস্থায়ী ক্যাম্পাস করা হয়েছে। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রণালয়ের একটি টিম এটি পরিদর্শন করেছে বলে জানা গেছে।

















