স্ত্রী কন্যা ও জামাতার প্রতারণায় এক মুক্তিযোদ্ধার বনবাস
আরিফুল হক মাহবুব, কাউখালী (রাঙ্গামাটি):
রাঙামাটি লেকার্স পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজের পেছনে দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে বসবাস করেন রনাঙ্গনের ১নং সেক্টরের বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রশিদ (৬৫)। যুদ্ধে হানাদার বাহিনীর ছোড়া কামানের গোলার বিকট শব্দে কানের পর্দা ফেটে গিয়েছিল। ফলে তখন থেকে আর কানে শুনতে পাননা। স্বাধীনতা পরবর্তী রাঙামাটি বাজার ফান্ডের কাছ থেকে বরাদ্দ প্রাপ্ত সাড়ে ছয় শতক জায়গাই তার সর্বশেষ আশ্রয়স্থল। দৈনিক মুজুরীতে কাজ করে সংসার চালাতেন তিনি। চার মেয়ে, কোনো ছেলে সন্তান নেই। মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন অনেক কষ্টে।
স্ত্রী, তিন মেয়ে ও দুই জামাতার নজর পড়ে সহজ সরল মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রশিদের অনেক মূল্যবান জায়গার উপর। দীর্ঘদিন যাবৎ জায়গাটি বিক্রি করে অন্যত্র বাড়ী করার জন্য প্রলোভন দেখাতে থাকেন স্ত্রী রোকেয়া বেগম তার দুই জামাতা মোঃ আলম ও মোঃ রাসেল। কথা ছিল এ জায়গা বিক্রি করে অন্যত্র জায়গা কিনে বাড়ী করার। তাদের প্রলোভনে পড়ে ২০১৪ সালের এপ্রিল মাসে কোটি টাকা মূল্যের জায়গা বিক্রি করে দেন মাত্র ৩২ লক্ষ টাকায়। জায়গা বিক্রির মোটা অংকের টাকা আত্মসাতের জন্য স্ত্রী, তিন মেয়ে ও দুই জামাতা নানা কৌশল অবলম্বন করতে থাকেন। একজন সাধারণ মানুষের হাতে এতগুলো টাকার লোভ সইতে পারলেন না তারা। জমি বিক্রির টাকা আব্দুর রশিদের ব্যাংক একাউন্টে না রেখে দ্রুত তাকে নিয়ে বাসায় চলে যায়।
বাসায় নিয়ে স্ত্রী, তিন মেয়ে ও দুই জামাতা মিলে আব্দুর রশিদের কাছ থেকে জোরপূর্বক সাদা কাগজে স্বাক্ষর নেয়। একপর্যায়ে তার কাছে গচ্ছিত বত্রিশ লক্ষ টাকার মধ্যে স্ত্রী রোকেয়া বেগম চার লক্ষ, মেয়ে সামিনি আক্তার চার লক্ষ, মোমেনা আক্তার চার লক্ষ, কুলসুমা আক্তার চার লক্ষ, জামাতা মোঃ আলম এক লক্ষ, রাসেল এক লক্ষ টাকাসহ সর্বমোট আঠার লক্ষ টাকা তিন মাসের ধারের কথা বলে তার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়। এতেও তারা ক্ষান্ত হয়নি। ইসলামী ব্যাংক রাঙামাটি শাখায় রক্ষিত মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রশিদের অবশিষ্ট এগার লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেয়ার জন্য তার কাছে থাকা ব্যাংকের সব কাগজপত্র তারা কেড়ে নেয়। সব হারিয়ে একজন মুক্তিযোদ্ধা এখন দিশেহারা। টাকা ফেরৎ ও ন্যায় বিচারের আশায় সবার দরজায় কড়া নেড়েছেন তিনি, কিন্তু কোন কাজ হয়নি। উপায়ন্তর না দেখে অবশেষে তিনি আদালতের আশ্রয় নেন। টাকা ফেরৎ চেয়ে উল্লেখিত আসামীদের বিরুদ্ধে রাঙামাটি জজ কোর্টের এ্যাডভোকেট আবছার আলীর মাধ্যমে ফেব্রুয়ারীর ৪ ও ২৩ তারিখে পর পর দুটি উকিশ নোটিশ পাঠান।
১৬ ফেব্রুয়ারী উকিল নোটিশের জবাবে আসামীগণ টাকা ধার নেয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণ অস্বীকার করলেও ব্যাংকে রক্ষিত টাকার কাগপত্র তাদের কাছে রয়েছে বলে স্বীকার করেন এবং জবাব প্রাপ্তি ৭ দিনের মধ্যে রিসিভ কপির মাধ্যমে আসামীগণের কাছ থেকে ব্যাংকের কাগজপত্র নিয়ে যাওয়ার জন্য বলা হয়। উকিল নোটিশের জবাবে এ বিষয়ের উপর বারাবাড়ী ও মামলা মোকাদ্দমা না করে শান্তিপূর্ণ আপোষ মিমাংসার প্রস্তাবও দেয়া হয়। কিন্তু বাদীর প্রশ্ন হলো আসামী পক্ষ টাকাই যদি না নেয় তাহলে এখন আপোষের প্রস্তাব দিল কেন।
এব্যাপারে রাঙামাটিতে থাকা জামাতা মোঃ আলমের কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান, আমরা কোন টাকা পয়সা তার কাছ থেকে নেয়নি। বরং উল্টো আমরা তাকে বিভিন্ন ধরণের সহযোগীতা করেছি। তাহলে সবার বিরুদ্ধে উকিল নোটিশ কেন এ প্রশ্নের জবাবে আলম জানান, সব কথা মোবাইলে বলা সম্ভব না। অপর জামাতা রাসেল টাকার নেয়ার বিষয়টি অস্বীকার করলেও তাদের সাথে শ্বশুরের কিছু একটা সমস্যা আছে বলে স্বীকার করেন এবং তা দ্রুত আপোষ মিমাংসার মাধ্যমে শেষ করা হবে বলে জানান।
রাঙামাটি জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার রবার্ট টোনার পিন্টু ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে জানান, একজন সহজ লোকের সাথে তার পরিবারের সদস্যরা এমন প্রতরনা করবে ভাতেই পারেনি। লেখা পড়া না থাকায় তার সাথে এধরণের প্রতারনা করতে তাদের খুব একটা বেগ পেতে হয়নি। তিনি জানান, একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে টাকা গুলো উদ্ধারে তাকে আমাদের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহায়তা প্রদান করা হবে।
স্ত্রী, তিন মেয়ে ও দুই জামাতার খপ্পরে পড়ে নিজের সর্বশেষ আশ্রয়স্থল বাড়ি ভিটা হারিয়ে রাঙামাটি সদর ছেড়ে কাউখালীতে ছোট মেয়ে রুবেলের বাড়ীতে আশ্রয় নিয়েছেন সহজ সরল মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রশিদ। বয়সের ভারে ক্লান্ত আব্দুর রশিদ নিজের একাউন্টে থাকা টাকাও উত্তোলন করতে পারছেন না। ফলে দৈনন্দিন খরচ মেটানো ও চিকিৎসা নেয়াও সম্ভব হচ্ছেনা। আব্দুর রশিদ জানান, আমার সরলতার সুযোগে তারা আমার এত বড় প্রতারনা করবে ভাবতেই পারেনি। তাদের খপ্পরে পড়ে আজ আমি বনবাসে জীবন যাপন করছি। এসব কথা বলে বার বার আকাশের দিকে হাত উঁচিয়ে আল্লাহর কাছে বিচার প্রার্থনা করছেন রনাঙ্গনের একজন মুক্তিযোদ্ধা।



















