হামাস ও মিশরের নামে হত্যা থেকে শুরু করে ছাত্রদের বিক্ষোভে ইসরাইলের অনুুপ্রবেশ

fec-image

“ফলস ফ্ল্যাগ অপারেশন” (পরিচয় গোপন করার স্বার্থে অন্য দেশের পরিচয় ব্যবহার করে সাইবার জগতে যে তৎপরতা চালানো হয়) হল এমন এক অপারেশন যেটি সামরিক, আধাসামরিক, গোয়েন্দা বা রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান দ্বারা এমনভাবে পরিচালিত হয় যাতে ধারণা তৈরি হয় যে অন্যান্য গোষ্ঠী বা দেশগুলো এই অপারেশনগুলো চালিয়েছে।

যেমন যুদ্ধে লিপ্ত এক পক্ষের বাহিনী কর্তৃক অপর পক্ষের পতাকা ও সামরিক ইউনিফর্ম ব্যবহার করে একটি গ্রামের বাসিন্দাদের ওপর হামলা ও গণহত্যা চালানো এবং তারপর সেই পক্ষকে এই হত্যাকাণ্ডের জন্য অভিযুক্ত করা একটি ফলস ফ্ল্যাাগ অপারেশনের উদাহরণ।

এসব অভিযানের উদ্দেশ্য হল মূল অপরাধীদের পরিচয় গোপন করা বা অন্য পক্ষকে হেনস্তা করা এবং তার ওপর হামলা চালানোর অজুহাত তৈরি করা।

ইহুদিবাদী শাসকগোষ্ঠীর কুখ্যাত গুপ্তচর সংস্থা ‘মোসাদ’ বিভিন্ন দেশের বিরুদ্ধে এ ধরনের প্রতারণামূলক অভিযানের পরিকল্পনা ও তা বাস্তবায়নের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এমন ঘটনাগুলোর মধ্যে কিছু ঘটনা এখানে উল্লেখ করা যায়। সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের সরকারকে অভিযুক্ত করার লক্ষ্যে ইদলিবে রাসায়নিক হামলা চালানো হয়।

প্যারিসের উপকণ্ঠে ইরানে বিপ্লব বিরোধী সন্ত্রাসী গোষ্ঠী মোনাফেকিন গোষ্ঠীর একটি সভায় বোমা হামলার মিথ্যা কাহিনী ছিল ইরানের বিরুদ্ধে ইসরাইলের আরেকটি ষড়যন্ত্র।

২০১৮ সালের ৩০শে জুন প্যারিসের উপকণ্ঠে এই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সভার কয়েক ঘন্টা পর ফরাসি পুলিশ ঘোষণা করে যে ইসরাইলি তথ্য ব্যবহার করে এবং বেলজিয়াম, জার্মানি এবং অস্ট্রিয়ার নিরাপত্তা সংস্থাগুলো সহযোগে এই সভায় একটি বোমা হামলার প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দেয়া হয়।

এ ক্ষেত্রে বেলজিয়ামে ইরানি বংশোদ্ভূত এক দম্পতির গ্রেপ্তারের বরাত দিয়ে পশ্চিমা গণমাধ্যম দাবি করেছে, তারা বোমা হামলার চেষ্টা করেছিল। এই ইরানবিরোধী দৃশ্যের পরবর্তী পর্যায়ে একই পশ্চিমা মিডিয়া দাবি করেছে যে এই দম্পতি ভিয়েনায় অবস্থিত একজন ইরানী কূটনীতিকের সঙ্গে সম্পর্কিত। একই সঙ্গে জার্মানিতে ইরানি কূটনীতিককে গ্রেপ্তারের ঘোষণা দেওয়া হয়।

পরে ইরানি প্রতিষ্ঠানগুলো প্রকাশ করে যে এটি একটি ইসরাইলের ফলস ফ্ল্যাগ অপারেশনের অংশ। এদিকে, এর আগে ২০১৪ সালের জুলাই মাসে তেল আবিব সরকার হামাসের বিরুদ্ধে পশ্চিম তীরে বেশ কিছু ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীকে অপহরণের অভিযোগ এনেছিল। পরে ইহুদিবাদী কর্মকর্তাদের কথাবার্তার মাধ্যমে এটি প্রকাশ হয়ে পড়ে যে নিখোঁজ ইসরাইলিদের খুঁজে বের করার জন্য নজরদারি অভিযানটি পশ্চিম তীর এবং গাজা উপত্যকায় ফিলিস্তিনি ভূমি দখলের লক্ষ্যে একটি ফলম ফ্ল্যাগ অপারেশন।

১৯৫৪ সালের গ্রীষ্মে ইসরাইলি সেনাবাহিনীর কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স সংস্থা অপারেশন সুসানাহ নামে একটি গোপন অভিযানে তার এজেন্টদের মাধ্যমে মিশরে বোমা হামলা সংগঠিত করার চেষ্টা করে এবং এর জন্য মুসলিম ব্রাদারহুড এবং মিশরীয় কমিউনিস্ট সহ মিশরীয় গ্রুপগুলোর উপর দোষ চাপায়। মিশর, আমেরিকা এবং ব্রিটিশ অফিসে বোমা ফেলার জন্য মিশরীয় ইহুদিদের একটি দলকে নির্বাচন করা হয়েছিল।

ইসরাইলের সুসানাহ অপারেশনের উদ্দেশ্য ছিল মিশরে নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি করা যাতে ব্রিটেন সুয়েজ খাল অঞ্চলে তার সামরিক উপস্থিতি অব্যাহত রাখতে পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ইসরাইলের এই অভিযান ব্যর্থ হয় এবং তৎকালীন ইসরাইলের যুদ্ধমন্ত্রী পিনহাস ল্যভন পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।

এ ব্যাপারে বেশ কয়েকজন মিশরীয় ইহুদি ও ইসরাইলি এজেন্টকে গ্রেফতার করা হয়। ইউসেফ কারমন এবং মির ম্যাক্স বিনতে নামে দুই সন্দেহভাজনও কারাগারে আত্মহত্যা করেছে। যদিও ইসরাইল ৫১ বছর ধরে এই অপারেশনের দায়িত্ব স্বীকার করতে অস্বীকার করে আসছিল। তবে এ অভিযানে জড়িত বেঁচে থাকা ব্যক্তিরা ২০০৫ সালে ইসরাইলের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মোশে কাটসভের কাছ থেকে প্রশংসার পদক পেয়েছিলেন।

আরেকটি ঘটনায় ইসরাইলের বিমান বাহিনীর সৈন্য এবং নৌবাহিনীর সামরিক বোটগুলো ১৯৬৭ সালের ৪ জুনে আরব বাহিনীর নামে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত অনুসন্ধান জাহাজে হামলা চালিয়েছিল। আরব-ইসরাইলের ছয় দিনের যুদ্ধে এই হামলা চালানো হয়েছিল। এ হামলায় ৩৪ জন ক্রু সদস্য নিহত এবং ১৭১ জন আহত হয় এবং জাহাজটির ব্যাপক ক্ষতি হয়।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যাতে মিশরের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে এবং মিশরের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট গামাল আবদেল নাসেরকে ক্ষমতাচ্যুত করার লক্ষ্যে এই অভিযান চালানো হয়েছিল।

ইহুদিবাদীদের ইসরাইলের ফলস ফ্ল্যাগ অপারেশনের আরেকটি নতুন ঘটনা হলো গাজা যুদ্ধের শুরুতে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের ঘটনা। ইহুদিবাদীরা তাদের প্রোপাগান্ডা কোম্পানির সাহায্যে দাবি করেছে যে হামাস বাহিনী গাজা উপত্যকার কাছে রাইম গ্রামে একটি সঙ্গীত উৎসবে হামলা চালিয়ে বেশ কয়েকজনকে হত্যা করেছে। কিন্তু এই মিথ্যা খুব তাড়াতাড়ি প্রকাশ পায়।

ইসরাইলি পুলিশের তদন্তের উপর ভিত্তি করে ইহুদিবাদী সংবাদপত্র হারেজ এর প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে হামাস বাহিনী এমন একটি উৎসব আয়োজনের বিষয়ে জানত না বরং ইহুদিবাদী শাসক বাহিনীর হেলিকপ্টার সেই উৎসবে অংশগ্রহণকারীদের ওপর গুলি চালিয়েছিল। এই উৎসবে ৩৬৪ জনের মতো মানুষ নিহত হয়েছিল।

কিন্তু যাই হোক ফলস ফ্ল্যাগ অপারেশন কেবল সামরিক নয় কিছু প্রতিবেদনে দেখা যায় যে ইসরাইল দ্বারা সংগঠিত বাহিনী ফিলিস্তিনি সমর্থকদের সঙ্গে বিরোধের মাত্রা বাড়াতে এবং ফিলিস্তিনি সমর্থকদের প্রতি পশ্চিমের জনগণকে অসন্তুষ্ট করার জন্য ফিলিস্তিনি সমর্থকদের বিক্ষোভে অনুপ্রবেশ করে ভবন ধ্বংস করে, বিভিন্ন ব্যক্তিদের ওপর হামলা চালায় এবং রাস্তা অবরোধ করে।#

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: ইসরায়েল, ফিলিস্তিন, হামাস
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন