যুক্তরাষ্ট্রের যেসব অহংকার চূর্ণ করে দিয়েছে ইরান

fec-image

স্টারলিংক:
নেক্সট জেনারেশন টেকনোলজি নামে বিশ্বকে শাসন করার অঙ্গীকার নিয়ে স্টারলিংক প্রযুক্তি বাজারে এনেছিল মার্কিন ধনকুবের অ্যালন মাস্ক। ২০০ বিলিয়ন ডলারের এই প্রযুক্তির প্রধান বৈশিষ্ট্য তারবিহীন ইন্টারনেট সংযোগ, যা স্যাটেলাইটের মাধ্যমে গ্রাহকের ডিভাইসে সরাসরি সংযুক্ত থাকে। ফলে এই প্রযুক্তিকে বলা হয় সীমান্তবিহীন, বাঁধাহীন। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বিদ্যুৎবিহীনতা, দুর্গমতার কারণে যেখানে ইন্টারনেট সংযোগ দেয়া সম্ভব নয় সেখানে এই প্রযুক্তির কোন বিকল্প নেই। এছাড়াও সরকারি নিয়ন্ত্রণকে পাশ কাটিয়ে এই সংযোগ সচল রাখা যায় বলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আন্দোলনকারী ও বিদ্রোহী গোষ্ঠীর কাছে এই সংযোগের প্রবল জনপ্রিয়তা। এই বিশেষ প্রযুক্তিগত সুবিধার কারণে যুক্তরাষ্ট্র দেশে দেশে তার সাম্রাজ্যবাদী কার্যক্রম ছড়িয়ে দিতে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে আসছে।

২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ইরানের ২৭টি প্রদেশে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন ইস্যুতে অসন্তুষ্ট জনগণ রাস্তায় নেমে আসে। এ আন্দোলনকারীদের সমর্থনে এগিয়ে আসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। এদিকে আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে ইরান সরকার রাষ্ট্রীয় ইন্টারনেট সংযোগে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করলে যুক্তরাষ্ট্র সে দেশে স্টারর্লিংক সংযোগ চালু করে দেয়। হাজার হাজার স্টার লিংক রিসিভার অবৈধভাবে প্রবেশ ঘটায়। কিন্তু বিস্ময়কর ভাবে ইরান স্টারলিংক সংযোগ জ্যামিং করে দিতে সক্ষম হয়। বিশ্বের প্রযুক্তির ইতিহাসে এটাই প্রথম ঘটনা যেখানে কোন দেশ স্টারলিংক সংযোগ জ্যামিং করতে সক্ষম হয়। ধারণা করা হয়, চাইনিজ অথবা রাসান প্রযুক্তি ব্যবহার করে ইরান এই জ্যামিংয়ে সক্ষম হয়। এর মধ্য দিয়ে, অপ্রতিরোধ্য বলে দাবিকারি স্টারলিংকের গর্ব চূর্ণ হয়। ইরানের এই সাফল্যের পর বিশ্বের প্রযুক্তিবিদরা এ বিষয়টি নিয়ে আরো বিস্তর গবেষণা করবে এবং স্টারলিংক সংযোগ জ্যামিংয়ে আরও উন্নত এবং নতুন নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করবে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র তথা এলন মস্কের এই গর্বের প্রযুক্তি দর্প চূর্ণ হবে এবং একচেটিয়া ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী বাণিজ্যিক সম্ভাবনা হ্রাস পাবে।

বিমানবাহী যুদ্ধ জাহাজ :
যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বকে শাসন করার অন্যতম হাতিয়ার তার বিমানবাহী যুদ্ধ জাহাজগুলো। বিশ্বের মাত্র ১১টি দেশের কাছে বিমানবাহিনী যুদ্ধজাহাজ রয়েছে। দেশগুলো হলো, যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া, জাপান, ইতালি, স্পেন, ব্রাজিল, থাইল্যান্ড, তুরস্ক, দক্ষিণ কোরিয়া এবং আলজেরিয়া। এদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে সর্বোচ্চ ১১টি বিমানবাহিনী যুদ্ধ জাহাজ। এছাড়া চায়নার তিনটি, ভারতের দুইটি এবং অন্যান্য দেশের একটি করে যুদ্ধ জাহাজ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ নির্মিত এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার আব্রাহাম লিংকন এর নির্মাণ ব্যয় ১৩ বিলিয়ন ডলার। বিপুল নির্মাণ ব্যয় এবং পরিচালন খরচের কারণে অনেক দেশের পক্ষে ইচ্ছে করলেও বিমানবাহী যুদ্ধ জাহাজ নির্মাণ ও পরিচালনা করা সম্ভব নয়।

এই যুদ্ধ জাহাজগুলোকে বলা হয় ভাসমান যুদ্ধক্ষেত্র। এই যুদ্ধ জাহাজগুলোর সাহায্যে যুদ্ধবিমান মিজাইল ও হেলিকপ্টার লোড করে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যাপী দাপিয়ে বেড়ায়। প্যাসিফিক আটলান্টিক ইন্ডিয়ান ওশান যেখানে খুশি যুক্তরাষ্ট্র মুভিং ওয়্যারফিল্ড তৈরি করতে পারে। এক কথায় যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ব শাসনের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার এই এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ারগুলো। উপসাগরীয় যুদ্ধে এগুলো দারুণভাবে কার্যকারিতা প্রমাণ করেছে।

সাম্প্রতিক ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ আক্রমণের পূর্বে মার্কিন সরকার ৩টি এয়ার ক্রাফট ক্যারিয়ার উক্ত অঞ্চলে মোতায়েন করে। কিন্তু ইরান দাবি করেছে, তারা সফলভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে আধুনিক বিমানবাহী যুদ্ধ জাহাজ আব্রাহাম লিংকনে হামলা করতে সক্ষম হয়েছে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্র যখন আব্রাহাম লিংকনকে অগ্রবর্তী অবস্থান থেকে পিছিয়ে নেয় তখন ইরানের দাবির যৌক্তিকতা ও সত্যতা প্রমাণিত হয়।

এরপর এগিয়ে আসে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় বিমানবাহী যুদ্ধ জাহাজ জেরার্ড ফোর্ড। সম্প্রতি তারা দাবি করেছে, যুদ্ধ জাহাজটিতে লন্ড্রি সেকশন থেকে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এই আগুন নেভাতে তাদেরকে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছে। ফলে এ জাহাজটিকে তারা পিছিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র এই জাহাজে ইরানি আক্রমণের দাবি অস্বীকার করেছে, কিন্তু এরকম ফ্রন্ট লাইনে থাকা একটি বিমানবাহী অত্যাধুনিক যুদ্ধজাহাজে এ ধরনের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডকে বিশেষজ্ঞরা রহস্যময় বলে মনে করছেন এবং তারা যা বোঝার বুঝে নিয়েছেন।

ফলে প্রশ্ন উঠেছে, যুদ্ধের মাঠে নেতৃত্বদানকারী বিমানবাহী যুদ্ধ জাহাজের দিন কি ফুরিয়ে এসেছে? বিশেষ করে বহু বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের এ সমস্ত যুদ্ধবিমান যখন কয়েক হাজার থেকে কয়েক লাখ ডলার ব্যয় নির্মিত ড্রোন বা মিজাইলের মাধ্যমে আক্রমণ করা গেলে এই জাহাজগুলোর কার্যকারিতা ও উপযোগিতা নিয়ে অবশ্যই প্রশ্ন উঠবে। এছাড়াও আধুনিক হাইপারসনিক মিসাইলের আঘাত থেকে এই যুদ্ধজাজগুলোকে রক্ষার কোনো উপায় কারো জানা নেই। ফলে বিপুল ব্যয়ে নির্মিত এ সকল বিমানবাহী যুদ্ধ জাহাজ আগামী দিনের যুদ্ধে অপাংক্তেয় হয়ে পড়তে পড়তে পারে, যার শুরুটা হয়েছে ইরানের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ যুদ্ধের মাধ্যমে।

এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান :
কোন সন্দেহ ছাড়া এই মুহূর্তে বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক যুদ্ধবিমান হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি এফ-৩৫। বিশ্বে এটি একমাত্র যুদ্ধবিমান যেটি কোনো রানওয়ে ছাড়া উলম্বভাবে উড্ডয়ন ও অবতরণ করতে পারে। তবে এর মূল্য অত্যাধিক। প্রকারভেদে এই মডেলের একেকটি যুদ্ধ বিমানের দাম ৮ কোটি থেকে ১৩ কোটি ডলার পর্যন্ত হতে পারে। যা বাংলাদেশী টাকায় ১০০০ কোটি টাকার উপরে। এছাড়াও এই যুদ্ধবিমান পরিচালনায় বিপুল খরচ রয়েছে। এ কারণেই প্রস্তাব ও চাহিদা থাকা সত্ত্বেও ভারতের মতো দেশ এ যুদ্ধবিমান ক্রয় করতে পারছে না।

ট্রু ফিফথ জেনারেশন এবং শতভাগ স্টেলথ প্রযুক্তির এই যুদ্ধবিমান এখন পর্যন্ত বিশ্বের কোনো রাডারে ধরা পড়ার রেকর্ড নেই। অথচ ইরান সম্প্রতি এই যুদ্ধবিমান কেবল রাডারে সনাক্ত করেনি বরং তাকে আঘাত করে গ্রাউন্ডেড হতে বাধ্য করেছে। সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের বিমানবাহিনী ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বলে কিছু নেই দাবি করার কয়েক ঘণ্টা পরেই ইরান যুক্তরাষ্ট্রের গর্বের এই যুদ্ধবিমানকে আঘাত করতে সক্ষম হয়। বিশ্বের ইতিহাসে এটি সর্বপ্রথম ঘটনা। যুক্তরাষ্ট্র এই আঘাতের কথা স্বীকার করে নিলেও বিমানটিকে নিরাপদ অবস্থানে জরুরি অবতরণ করাতে সক্ষম হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

তবে এই ঘটনা আগামী দিনের বিশ্বব্যাপী পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমানের চাহিদায় ব্যাপক প্রভাব ফেলবে। যেমন অপারেশন সিন্দুরে পাকিস্তানি যুদ্ধবিমানের কাছে ভারত পরিচালিত ফ্রান্সের রাফায়েল যুদ্ধবিমান ভূপতিত হওয়ার ঘটনায় বিশ্বব্যাপী এই বিমানের চাহিদা ব্যাপকভাবে পড়ে যায়। একই সাথে অনেক দেশ এই বিমানের জন্য তাদের পূর্বের দেয়া অর্ডার বাতিল করে দেয়। শেয়ার মার্কেটেও নামে ধস। মার্কিন এফ-৩৫ যুদ্ধ বিমানে ইরানের এই আঘাতের ফলে একই পরিণতি হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা।

জিপিএস নেভিগেশন সিস্টেম :
আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় আকাশে ভাসমান স্যাটেলাইটের সাহায্যে পৃথিবীতে কোনো স্থান বা বস্তুর অবস্থান নির্ণয় করা হয়ে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রিত এই প্রযুক্তির নাম গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম (জিপিএস)। জিপিএস প্রযুক্তি বিশ্বব্যাপী এ ধরনের কাজে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও বহুল ব্যবহৃত প্রযুক্তি। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে কেবলমাত্র স্থির কোনো স্থান বা বস্তুর অবস্থান নির্ণয় করা হয় না বরং চলমান কোনো বস্তুর লাইভ অবস্থান নির্ণয় করা সম্ভব হয়। ফলে আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা, দিক ও অবস্থান নির্ণয় পুরোটাই গড়ে উঠেছে এই জিপিএস সিস্টেমের উপর ভিত্তি করে। সমরাস্ত্র প্রযুক্তিতেও এই জিপিএস সিস্টেমের ব্যবহার অপরিহার্য। বিশেষ করে বিমান ও মিসাইলের গতিপথ ও টার্গেট নিয়ন্ত্রণের একমাত্র উপায় হচ্ছে এই লাইভ নেভিগেশন সিস্টেম।

তবে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও রাশিয়া ও চায়নার কাছে রয়েছে এ ধরনের নেভিগেশন সিস্টেম। রাশিয়ান নেভিগেশন সিস্টেমের নাম হচ্ছে গ্লোবাল নেভিগেশন স্যাটেলাইট সিস্টেম বা গ্লোনাস (GLONASS). ১৯৮২ সাল থেকে আজ পর্যন্ত রাশিয়া পৃথিবীর কক্ষপথে সর্বমোট ২৫টি স্যাটেলাইট স্থাপনের মাধ্যমে এই নেভিগেশন সিস্টেম চালু করেছে। তবে এই সিস্টেম পরিচালনায় বিপুল ব্যয়ের সংস্থান করতে না পারায় রাশিয়ান এই নেভিগেশন সিস্টেম যথেষ্ট আপডেট তথ্য দিতে অনেক ক্ষেত্রে অপারগ।

অন্যদিকে চীনের তৈরি একই ধরনের নেভিগেশন সিস্টেমের নাম বাইদু (BDS). ২০০০ সাল থেকে শুরু করে ২০২০ সাল পর্যন্ত সর্বমোট ১৪০টি স্যাটেলাইটের মাধ্যমে এই সিস্টেম বিশ্বব্যাপী কার্যক্রম শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের জিপিএস এবং রাশিয়ার গ্লোনাস এর থেকে এই সিস্টেম সবচেয়ে বেশি নির্ভুল তথ্য দিতে পারে। এর এ্যাকুরেসি এক মিটারের কম হওয়ায় অন্যান্য প্রতিযোগিতায় থেকে নিজেকে এগিয়ে রেখেছে। বর্তমানে তৃতীয় প্রজন্মের বাইদু থ্রি কার্যকর রয়েছে। এই সিস্টেম নিজেই জ্যামিং প্রতিরোধই সিস্টেম হওয়ায় একে আটকানো কঠিন। এছাড়াও কোনো ধরনের মোবাইল নেটওয়ার্কের সহায়তা ছাড়াই এই সিস্টেমে ব্যবহারকারীকে টেক্সট মেসেজ পাঠানো যায়, যা অন্য কোন সিস্টেমে নেই।

২০২৫ সালের অক্টোবরের ইরান ইসরাইলের মধ্যে পরিচালিত যুদ্ধে ইরানি মিসাইলগুলো জিপিএস সিস্টেম ব্যবহার করায় ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র সহজেই জিপিএস নেভিগেশন ব্লক করে অথবা মিসডাইরেক্ট করে ইরানের পাঠানো ড্রোন অথবা মিজাইলগুলোকে নানাভাবে ব্যর্থ করে দিত। এই সীমাবদ্ধতা এড়ানোর লক্ষ্যে এবারে ইরান মার্কিন জিপিএস নেভিগেশন সিস্টেমের পরিবর্তে চাইনিজ বাইদু নেভিগেশন সিস্টেম ব্যবহার করছে। ফলে প্রিসিশন মিজাইল ও ড্রোন স্ট্রাইকের ক্ষেত্রে ইরান আগের থেকেও অনেক বেশি অ্যাকুরেসি অর্জন করেছে। তাছাড়া সিস্টেমটি এন্টি জ্যামিং প্রযুক্তির হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র বা ইজরাইলের পক্ষে আটকানো সম্ভব হচ্ছে না।

চাইনিজ বাইদু নেভিগেশন প্রযুক্তির কাছে যুক্তরাষ্ট্রের জিপিএস নেভিগেশন প্রযুক্তির এই পরাজয় বিশ্বের সামরিক শিল্পে জিপিএস নেভিগেশন সিস্টেম ব্যবহারের পরিবর্তে বাইদু নেভিগেশন সিস্টেম ব্যবহারের জনপ্রিয়তা ও চাহিদা বাড়াবে। বিশেষ করে ভূ-রাজনীতিতে মার্কিন ধারণার অনুসারী নয় এমন দেশ ও শক্তিগুলো জিপিএস এর পরিবর্তে বাইদুকে গ্রহণ করবে। অনেকে আবার বিকল্প হিসেবে জিপিএস এর সাথে বাইদুকেও অপশন হিসেবে রাখতে পারে। এতে বিশ্বে নেভিগেশন প্রযুক্তিতে মার্কিন জিপিএস এর একাধিপত্যে ধস নামাবে।

থাড ও অন্যান্য মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা :
Terminal High Altitude Area Defense (THAAD/থাড) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি একটি উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন ভূমি-ভিত্তিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। এটি বায়ুমণ্ডলের ভেতরে ও বাইরে স্বল্প এবং মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করতে সক্ষম। এটি মূলত আঘাত-ধ্বংস (hit-to-kill) প্রযুক্তিতে কাজ করে, যার অর্থ কোনো বিস্ফোরক ছাড়াই সরাসরি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করে ধ্বংস করে। এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে থাকা সবচেয়ে আধুনিক ব্যালেস্টিক মিসাইল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। একটি THAAD ব্যাটারিতে সাধারণত ৫টি লঞ্চার, ৭২টি ইন্টারসেপ্টর (ক্ষেপণাস্ত্র), একটি রাডার এবং ফায়ার কন্ট্রোল ইউনিট থাকে। অত্যন্ত ব্যয়বহুল এই প্রযুক্তি মার্কিন সেনাবাহিনী ছাড়াও এটি বিশ্বের বিভিন্ন মার্কিনী মিত্র দেশে ব্যবহার করা হয় বা মোতায়েন করা হয়েছে। প্রায় ২০০ কিলোমিটার পাল্লার মধ্যে এই সিস্টেম অত্যন্ত নির্ভুলভাবে প্রতিপক্ষের মিসাইল বা ড্রোনকে সনাক্ত করে ভূপাতিত করতে সক্ষম বলে দাবি করা হয়েছে।

কিন্তু সাম্প্রতিক যুদ্ধে ইরান ইসরাইল ছাড়াও কাতার আরব আমিরাত ও সৌদি আরবে মোতায়েনকৃত বেশ কিছু থাড সিস্টেমের রাডারে আঘাত হানতে সক্ষম হয়েছে। ফলে বিশ্বের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় থাড এর কার্যকারিতা ইতোমধ্যেই প্রশ্নবিদ্ধ হতে শুরু করেছে। এটি বিশ্বব্যাপী মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবসায় মারাত্মক ধস নামাবে। এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র কাতার, সৌদি আরব ও আরব আমিরাতে আর্লি ওয়ারনিং সিস্টেম মোতায়েন করেছে। এই ভূপৃষ্ঠে মোতায়েনকৃত আর্লি ওয়ারনিং সিস্টেমগুলো এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের চোখ ও কান হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। কয়েক বিলিয়ন ডলার মূল্যের এই সিস্টেমগুলো প্রায় ৫ হাজার কিলোমিটার রেঞ্জের মধ্যে যেকোনো উৎক্ষিপ্ত মিজাইলের গতি, উচ্চতা ও টার্গেট শুরুতে এই মুহূর্তের মধ্যে বিশ্লেষণ করে মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা যেমন থার্ড ও পেট্রিয়ট সিস্টেমে প্রেরণ করে। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যেকোনো উৎক্ষিপ্ত মিজাইল ধ্বংসে ১০ থেকে ১৫ মিনিট পর্যন্ত অতিরিক্ত সময়ে পেয়ে থাকে। সে কারণে এগুলোর সুরক্ষা ব্যবস্থাও অত্যন্ত শক্তিশালী।

তবুও গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, বিকেলে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের জনসংযোগ দপ্তর ঘোষণা করে যে, ইরানি বাহিনী কাতারে অবস্থিত এএন/এফপিএস-১৩২ আগাম সতর্কীকরণ রাডার স্থাপনাটিকে লক্ষ্য করে একটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। এই হামলাটির লাইভ ভিডিও প্রচারিত হয় এবং পরবর্তীতে স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যায় সামরিক স্থাপনাটি চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই কৌশলের অংশ হিসেবে এ অঞ্চলে মোতায়েনকৃত থাড সিস্টেমের সাথে সংযুক্ত এএন/টিপিওয়াই-২ এর বেশ কয়েকটি অবস্থানে ইরান সফলভাবে হামলা করে পূর্ণ বা আংশিকভাবে সেগুলো ধ্বংস করে দিতে সক্ষম হয়েছে। ফলে যুদ্ধের বর্তমান পর্যায়ে ইসরাইল, কাতার, কুয়েত ও আরব আমিরাতে ইরানের ছোঁড়া মিসাইল সাইরেন সতর্কিকরণের পূর্বেই আঘাত হানতে সক্ষম হচ্ছে।

গালফ কান্ট্রিজ গুলোতে মোতায়েনকৃত এই আরলি ওয়ার্নিং সিস্টেম আইআরজিসি পূর্ণাঙ্গ বা আংশিকভাবে ধ্বংস করে দেয়ার ফলে ইরানি মিসাইলগুলো টার্গেট কান্ট্রি অনেক ক্ষেত্রেই সনাক্ত করতে সক্ষম হচ্ছে না অথবা শনাক্ত করতে সক্ষম হলেও সময় স্বল্পতার কারণে প্রতিক্রিয়া দেখানোর পূর্বেই তা টার্গেটে আঘাত হানছে। ফলে মার্কিনী রাডার ও পেট্রিয়ট এবং থাড সিস্টেম এর মত যুক্তরাষ্ট্রের গর্বের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও প্রযুক্তি এই যুদ্ধে ইরানি মিসাইল এর কাছে ব্যাপকভাবে মার খেয়ে বিশ্বব্যাপী তার প্রতিযোগিতা হারিয়ে ফেলবে অনেকখানি কোনো সন্দেহ ছাড়াই। এতে করে বিশ্বে মার্কিনী সামরিক আধিপত্য ও এর উপরে দেশগুলোর ভরসা অনেকাংশে হ্রাস পাবে। এবং তারা বিকল্প অনুসন্ধান করবে। এতে অস্ত্র বাণিজ্যে যুক্তরাষ্ট্র আগামী দিনে পিছিয়ে পড়বে।

সমরাস্ত্র প্রযুক্তিতে এই মুহূর্তে বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্র সবার থেকে এগিয়ে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাওয়ার পর রাশিয়া এই প্রতিযোগিতায় কিছুটা পিছিয়ে পড়েছে। রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যবহৃত দুই দেশের সমরাস্ত্রগুলো মূলত সাবেক সোভিয়েত প্রযুক্তির। তবে ইউক্রেন সহায়তা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এফ-১৬ যুদ্ধবিমান, প্যাট্রিয়ট এয়ার ডিফেন্স মিসাইল নেটো দেশগুলো থেকে বেশ কিছু আধুনিক সমরাস্ত্র পেয়েছে। তবুও এই যুদ্ধে রাশিয়ান ইসকান্দার মিজাইলের আঘাতে মার্কিন পেট্রিয়ট এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম এবং এস ৪০০ এর আঘাতে এফ-১৬ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হতে দেখা গেছে। অন্যদিকে বিগত কয়েক বছরে সমরাস্ত্র শিল্পে চায়নার অবিশ্বাস্য উত্থান ঘটেছে। সবার আগে ষষ্ঠ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান উড়িয়ে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে চায়না। জে-২০, জে-৩৫ এর মত পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান গুলো আকাশে শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠায় প্রস্তুত। এছাড়াও সমরাস্ত্রে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এর ব্যবহার অনেকখানি এগিয়ে দিয়েছে। অপারেশন সিন্দুরে চাইনিজ প্রযুক্তি ও বিমান বিধ্বংসী মিসাইল এর সহযোগিতায় পাকিস্তান এয়ার ফোর্স কর্তৃক ফ্রান্সের রাফানের ঘায়েল হওয়া চাইনিজ প্রযুক্তির উৎকর্ষতার পরিচয় বহন করে। ইরানে স্থাপিত চাইনিজ এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমগুলো কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। তবে দীর্ঘদিন কোথাও যুদ্ধে জড়িত না হওয়ায় চাইনিজ সমরাস্ত্রের প্রায়োগিক মান নিয়ে বিশ্বে একটি প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। সাম্প্রতিক ইরান বনাম মার্কিন-ইসরাইল যুদ্ধে চায়না তার সমরাস্ত্র ও প্রযুক্তিগুলো পরীক্ষা করার সুযোগ পেয়েছে। একই সাথে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সমরাস্ত্র ও প্রযুক্তির ব্যবহার থেকে চায়না বিপুল পরিমাণ তথ্য সংগ্রহ করছে। এই তথ্যগুলো বিদ্যমান সমরাস্ত্র আধুনিকায়ন ও আগামী দিনের সমরাস্ত্র প্রযুক্তির উন্নয়নে চায়না ব্যবহার করবে এতে কোন সন্দেহ নেই। সামগ্রিকভাবে এটি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধ হলেও এখানে পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত রয়েছে চায়না ও রাশিয়া। এছাড়াও জার্মানি, ব্রিটেন, ফ্রান্স ও ইতালির মত দেশগুলো মধ্যপ্রাচ্যে থাকা তাদের ঘাঁটির সুরক্ষা এবং ঘাঁটি থাকা দেশগুলোর সুরক্ষার নামে এই যুদ্ধে জড়িত রয়েছে। তারাও ইরানি মিসাইল ও ড্রোনের হামলা থেকে নিজেদের ঘাঁটি এবং ঘাঁটি অবস্থিত দেশ রক্ষা করতে তারাও এয়ার ডিফেন্স মিসাইল ছুঁড়ছে। তারাও ইরানি প্রযুক্তি সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করছে।

সবচেয়ে বড় কথা, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ শক্তির বিরুদ্ধে এই অসম লড়াইয়ে ইরান যে দক্ষতা, সক্ষমতা এবং প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতা দেখিয়েছে তাতে সারা বিশ্বের সাথে খোদ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল নিজেরাও হতবাক হয়ে গিয়েছে। ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই বিষ্ময় চেপে রাখতে পারেনি। প্রকাশ্যেই তারা ইরানের সক্ষমতার স্বীকৃতি দিয়েছেন। এখানেই ইরান একপ্রকার জয়লাভ করেছে। বিশ্বের খ্যাতনামা সমরবিদগণ ইতিমধ্যেই ঘোষণা দিয়েছেন, এই যুদ্ধে ইরান হারবে না। এটাই ইরানের বিজয়।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও গবেষক

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: ইরান, প্রবন্ধ, ভারত
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন