পার্বত্য বিষয়ে সত্যের মুখোমুখি হতে ভয় কেন?

fec-image

পাহাড়ের শান্তি ও উন্নয়নের পথে যখন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে একটি সুসংগঠিত মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়িত হচ্ছে, ঠিক তখনই কিছু স্বার্থান্বেষী মহলের ইন্ধনে একদল তথাকথিত অধিকারকর্মী জাতীয় ঐক্য ও সংবিধানের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। গত ৩ মার্চ ২০২৬, রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সাগর-রুনী মিলনায়তনে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলন’ কমিটির ব্যানারে একটি সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। একজন সাংবাদিক এবং পার্বত্য বিষয় নিয়ে দীর্ঘকাল গবেষণা করা নাগরিক হিসেবে দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে আমি সেই সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত হই। কিন্তু সেখানে গিয়ে যা দেখলাম এবং যে পরিস্থিতির সম্মুখীন হলাম, তা কেবল অনাকাঙ্ক্ষিতই নয়—বরং রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের জন্য এক চরম অশনিসংকেত।

পেশাদারিত্ব বনাম উদ্দেশ্যমূলক প্রচারণা:
সংবাদ সম্মেলন কক্ষে প্রবেশ করে দেখলাম, মূলধারার গণমাধ্যমের সাংবাদিকের উপস্থিতি নেই বললেই চলে। দুটি মুলধারার ছাড়া তথা হাতেগোনা অখ্যাত অনলাইন পোর্টাল ছাড়া সেখানে পেশাদার সাংবাদিকদের সরব উপস্থিতি ছিল না। প্রশ্নোত্তর পর্বে আমি যখন আয়োজকদের সরবরাহকৃত লিখিত বক্তব্যের সূত্র ধরে এবং বাংলাদেশের সংবিধান ও পার্বত্য চুক্তির ধারা উল্লেখ করে প্রশ্ন করা শুরু করলাম, তখনই শুরু হলো বিপত্তি। আমার প্রশ্নের প্রতিটি তথ্য ও উপাত্ত আয়োজকদের জন্য এতটাই অস্বস্তিকর ছিল যে, তারা বারবার আমাকে থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু সত্যের পথ তো রুদ্ধ করা যায় না।

সংবিধান ও যুক্তির কাছে যখন তারা নিরুপায়:
সাংবাদিক হিসেবে আমার কাজ জনস্বার্থে প্রশ্ন তোলা। আমি অত্যন্ত শান্ত ও যুক্তিনির্ভরভাবে জানতে চেয়েছিলাম—বাংলাদেশ কি কোনো ফেডারেল বা রাষ্ট্রজোট? পাহাড় কি কাশ্মিরেরমত দেশের সংবিধান স্বীকৃত কোনো বিচ্ছিন্ন অঞ্চল? সংবিধানের ২৭, ২৮ ও ২৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দেশের প্রতিটি নাগরিকের সমান অধিকারের যে সুনিশ্চিত নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে, সেখানে একজন বাঙালিকে পার্বত্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নিয়োগের ফলে কোন আইনের লঙ্ঘন হয়েছে?

পার্বত্য চুক্তির ‘ঘ’ খণ্ডের ১৯ নম্বর ধারায় স্পষ্ট বলা আছে—উপজাতীয়দের মধ্য থেকে একজন পূর্ণ মন্ত্রী নিয়োগ করা হবে। সরকার সেই শর্ত মেনে দীপেন দেওয়ানকে মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। তবে ১৯ (১২) উপ-ধারায় যেখানে ৩ জন ‘অ-উপজাতীয়’ বা বাঙালি সদস্যসহ ১৪ সদস্যের উপদেষ্টা কমিটির কথা বিধিবদ্ধ আছে, সেখানে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে একজন বাঙালির অংশগ্রহণ চুক্তির মূল স্পিরিটের সাথে কীভাবে সাংঘর্ষিক হয়?

চুক্তির কোথাও প্রতিমন্ত্রী পদে বাঙালির নিয়োগে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। উপরন্তু, সংবিধানের ৫৬(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মন্ত্রিসভা গঠনের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর। অথচ এই ভুঁইফোড় কমিটি প্রধানমন্ত্রীর সেই সাংবিধানিক এখতিয়ারকেই চ্যালেঞ্জ করার ধৃষ্টতা দেখাচ্ছে। তাদের স্ববিরোধিতা এখানেই যে, তারা একদিকে ১৮০ কর্মদিবসের মধ্যে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পাহাড়ের সমস্যা সমাধানের দাবি জানাচ্ছে, আবার সরকার যখন সেই অগ্রাধিকার বাস্তবায়নে কর্মতৎপরতা বৃদ্ধি করতে প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ দিচ্ছে, তখন তারা তার বিরোধিতা করছে। এটি উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করার অপকৌশল বৈ আর কিছু নয়।

যুক্তি যখন শেষ, ‘মব’ আক্রমণ তখন শুরু:
আমার পরবর্তী প্রশ্ন ছিল আরও গভীর—চুক্তির ‘গ’ খণ্ডের ১১ নম্বর ধারাটি তো সরাসরি সংবিধানের ৭(২) ও ২৬(২) অনুচ্ছেদের সাথে সাংঘর্ষিক। সংবিধান যেখানে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন, সেখানে সংবিধানকে পদদলিত করে এমন চুক্তির একগুঁয়ে দাবি তোলা কি রাষ্ট্রদ্রোহিতার নামান্তর নয়? এছাড়া চুক্তির কোথাও ‘আদিবাসী’ শব্দটির অস্তিত্ব নেই, তবুও তারা কেন বারবার এই অসাংবিধানিক শব্দটি ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে?

এই প্রশ্নগুলোর কোনো যৌক্তিক বা আইনি উত্তর আয়োজক কমিটির কাছে ছিল না। তারা এ বিষয়ে উচ্চ আদালত জবাব দিতে পারবে বলে পাশ কাটিয়ে যাবার চেষ্টা করে। উত্তর দিতে না পেরে তারা কৌশলে আমাকে হেনস্তা করার পথ বেছে নেয়। আমি সেখানে একা হওয়ার সুযোগে একদল উগ্র যুবক (৭/৮জন চামকা যুবকসহ) আমাকে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরে ‘মব’ তৈরির চেষ্টা চালায়। পরবর্তীতে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তারা যে খণ্ডিত ভিডিও ছড়িয়েছে, সেখানে স্পষ্ট দেখা যায় তারা যুক্তি দিয়ে কথা না বলে উচ্চস্বরে চিৎকার করে এবং শারীরিকভাবে আমাকে লাঞ্ছিত করার জন্য ঘিরে ধরে একটি ‘মব’ তৈরির চেষ্টা চালায়। কিন্তু একা হয়েও সত্যের শক্তিতে আমি অবিচল ছিলাম এবং তাদের এই অগণতান্ত্রিক ও ফ্যাসিবাদী আচরণের মোকাবেলা করেছি।

ভয় ও অপপ্রচারের রাজনীতির আশ্রয় কেনো?
পাহাড় নিয়ে ষড়যন্ত্রকারীরা সত্যকে এতটাই ভয় পায় যে, সংবাদ সম্মেলনে আমার বাইরে মাত্র একজন সাংবাদিকের প্রশ্ন নিয়ে তড়িঘড়ি করে ইতি টেনেছে। আমি যখন আরও একটি সম্পূরক প্রশ্ন করতে চাইলাম, তখনই তাদের আসল চেহারা বেরিয়ে এল। তারা আমার সাংবাদিকতা পেশা ও পরিচয় নিয়ে বিতর্ক তোলার অপচেষ্টা শুরু করল। অথচ ২০০১ সাল থেকে আমি মূলধারার গণমাধ্যমে সাহসের সাথে কাজ করে আসছি। বর্তমানে ‘মানবাধিকার খবর’ পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। পেশাদার সাংবাদিক হিসেবে এর আগে দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ-এর জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক হিসেবে চিফ ক্রাইম রিপোর্টারের দায়িত্ব পালন করেছি। বাংলা টিভিতে সিনিয়র রিপোর্টার, দৈনিক আমার বার্তায় ডেপুটি এডিটর, পরিবর্তন ডটকম ও বাংলাদেশের খবরে প্রায় ৬ বছর এবং দৈনিক ইনকিলাবে টানা ৯ বছর দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। দেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে বিভিন্ন জনপ্রিয় চ্যানেলের লাইভ টকশোতে অংশগ্রহণ করে আমার অবস্থান সবসময়ই স্পষ্ট। দেশের বিশিষ্ট ২৫ ব্যক্তির দীর্ঘ সাক্ষৎকারভিত্তিক ৩১২ পৃষ্টার “মেরুকরণের রাজনীতি: শাহবাগ-শাপলা বির্তক” আমার একটা অত্যন্ত জনপ্রিয় বই। যা গুগলে নাম লিখে খুঁজলেও সত্যতা পাবেন।

আমি কেবল সাংবাদিকতা পেশাতেই নিবেদিত নই, বরং প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান ও তাত্ত্বিক ভিত্তি থেকেই রাষ্ট্রের সংকটগুলো বিশ্লেষণ করি। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর (মাস্টার্স) এবং আইনের স্নাতক (এলএলবি) ডিগ্রি সম্পন্ন করায় রাষ্ট্রীয় কাঠামো, শাসনব্যবস্থা এবং আইনের খুঁটিনাটি বিষয়ে আমার স্বচ্ছ ধারণা রয়েছে। ফলে সংবাদ সম্মেলনে আমার উত্থাপিত প্রশ্নগুলো কেবল আবেগপ্রসূত ছিল না, বরং সেগুলো ছিল আইন ও সংবিধানের নিরেট বাস্তবতার প্রতিফলন।

যারা আমার পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তুলে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছেন, তাদের উচিত গুগলে ‘সাংবাদিক, কলামিস্ট, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক এ এইচ এম ফারুক’ লিখে সার্চ দিয়ে আমার শত শত গবেষণাধর্মী নিবন্ধ ও সম্পাদকীয় পড়ে নিজেদের জ্ঞানকে ঝালাই করা।

আক্রমণ আমাকে দমাতে পারবে না:
দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে আমাকে দমাতে শারীরিক, মানসিক ও সামাজিকভাবে অসংখ্যবার আক্রমণ করা হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের ষড়যন্ত্রকারী গোষ্ঠীগুলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমাকে হত্যার হুমকি, এমনকি আমার পরিবারকে শেষ করে দেওয়ার অপপ্রচার চালিয়েছে।

২০০৯ সালে খাগড়াছড়ির পানছড়িতে আমাকে হত্যার উদ্দেশ্যে আওয়ামী সন্ত্রাসীরা হামলা করেছিল; সেদিন পুলিশ ও সেনাবাহিনীর যৌথ টহল দল আমাকে উদ্ধার করে। এমনকি বকে মিটিংয়ে যেহাতে লিখি আমার সে হাত কেটে ফেলার প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়েছিলেন একজন আওয়ামী লীগ নেতা। এসব রক্তচক্ষু আমার কাছে নতুন কিছু নয়, বরং এটি আমার দেশপ্রেমের পথে লড়াই করার জেদকে আরও বাড়িয়ে দেয়।

ষড়যন্ত্রের পদধ্বনি ও আমাদের দায়িত্ব:
এই তথাকথিত আন্দোলনকারীরা পাহাড়ের সাধারণ মানুষের প্রকৃত প্রতিনিধি নয়। ২৮ বছর ধরে আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যানের চেয়ারে অবৈধভাবে বসে থাকা প্রতিমন্ত্রী মর্যাদাপ্রাপ্ত সন্তু লারমা এবং তাঁর ভাড়ায় খাটা কিছু মানুষ ঢাকায় বসে এসব বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। তাদের মূল লক্ষ্য—পাহাড় থেকে সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করে সেখানে একচ্ছত্র আধিপত্য ও বিচ্ছিন্নতাবাদের বীজ বপন করা। বিশেষ মহলের ইন্ধনে আজ তারা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কল্যাণকর পরিকল্পনার বিরোধিতা শুরু করেছেন।

আমি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে স্পষ্টভাবে বলতে চাই—পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রতিটি ধূলিকণা বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং আমাদের অখণ্ড সার্বভৌমত্বের প্রতীক। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন হচ্ছে সংবিধান, আর সংবিধানকে পদদলিত করে সংবিধানের ঊর্ধ্বে কোনো চুক্তি বা গোষ্ঠীস্বার্থ কখনোই স্থান পেতে পারে না। দেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আমি ব্যক্তিগতভাবে কোনো আপস করিনি এবং ভবিষ্যতেও করব না। ভৌগোলিক ও বৈজ্ঞানিক মানদণ্ডে পাহাড়ে বসবাসরত প্রতিটি নাগরিকই ‘পাহাড়ি’। সেখানে ধর্মীয় পরিচয়ে কেউ মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ বা খ্রিস্টান হতে পারেন; আবার নৃ-তাত্ত্বিক পরিচয়ে কেউ চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা বা বাঙালি হতে পারেন—কিন্তু দিনশেষে আমরা সবাই একই ভূখণ্ডের অংশীদার। তাই কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর সংকীর্ণতা নয়, বরং পাহাড়ের সকল জাতি-গোষ্ঠীর সম-অধিকার এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করাই হোক আমাদের জাতীয় লক্ষ্য। পাহাড়ের শান্তি ও সমৃদ্ধি তখনই স্থায়ী হবে, যখন আমরা বিভাজন ভুলে সকলকে নিয়ে উন্নয়নের এই যাত্রায় শামিল হতে পারব।

পরিশেষে, দেশপ্রেমিক জনতার প্রতি আমার উদাত্ত আহ্বান—এই ভুঁইফোড় কমিটির ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সচেতন হোন। যারা সংবিধান মানে না, যারা সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্নের উত্তর দিতে না পেরে সাংবাদিকের ওপর চড়াও হয়, তারা কখনোই পাহাড়ের উন্নয়ন বা শান্তি চায় না। বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী প্রতিটি নাগরিকের সমান অধিকার থাকবে এবং এই সত্য উচ্চারণে কোনো অপশক্তি বা ‘মব কালচার’ আমাকে দমাতে পারবে না। জয় আমাদের হবেই, কারণ সত্য আমাদের পক্ষে।

লেখকঃ সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: পার্বত্য চট্টগ্রাম, রাজনৈনিক বিশ্লেষক, সাংবাদিক
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন