শতাধিক বিয়ে করা মোসাদ এজেন্টের কীর্তিকলাপ


ক্যাথরিন পেরেজ শাকদাম কাণ্ড
ইরানের এক সুন্দর সন্ধ্যাক্রান্ত রাতে মেহরাবাদ বিমানবন্দরের লাউঞ্জে বসা বোরকা আবৃত নারীটির হাতে একটা তসবিহ। ঠোঁট নড়ছে অবিরাম, যেন গভীর কোনো জিকিরে মগ্ন। ‘আল্লাহু- আল্লাহু’ জপ চলছে। পরম করুণাময়ের নামের জিকিরে আশপাশ পরিশুদ্ধ হচ্ছে। পাশ দিয়ে যাওয়া রেভোলিউশনারি গার্ডের সদস্য তাকে দেখলে শ্রদ্ধায় মাথা নিচু করছে—কারণ এই নারী ‘ক্যাথরিন শাকদাম’। আয়াতুল্লাহ খামেনির অতি প্রিয় এক কলমযোদ্ধা, যাঁর লেখায় পশ্চিমের আমেরিকান দম্ভ ধুলোয় মিশে যায়।
কিন্তু ক্যাথরিনের বুকের ভেতর তখন শাঁ শাঁ করে ঠান্ডা বাতাস বইছে। ব্যাগের গভীরে লুকানো একটা ফরাসি পাসপোর্ট, যার ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে আছে ইসরায়েলের ধুলিকণা। ঠিক শুনেছেন।
এই ক্যাথরিন এক বিশাল অপারেশন শেষ করে নিজের দেশ ইজরায়েল এ ফিরে যাবে। কিন্তু সে তো মুসলমান! ইমিগ্রেশন অফিসার যখন পাসপোর্টে সিলটা মারলেন, ক্যাথরিনের মনে হলো একটা দীর্ঘশ্বাস নিতেও তিনি ভুলে গেছেন। বিমানে সিটে হেলান দিয়ে যখন মেঘের ওপর দিয়ে উড়তে শুরু করলেন, তখন তিনি মনে মনে বললেন— “বিদায় তেহরান, তোমার সব গোপন কথা এখন আমার কাছে-সব চলে যাবে গোপন আস্তানায়, আমাকে বিশ্বাস করে ভুল করে ফেলেছ হে খামেনি!”
এই গোপন কথাগুলো আমাদের জানার সুযোগ নেই। আরেকজনের মনের খবর তো আমাদের জানার কথা নয়। কিন্তু এই ক্যাথরিনের মনের খবর সহজেই আন্দাজ করা যায়।
একজন প্রখ্যাত ব্যক্তি বলেছিলেন- “যুক্তি যেখানে শেষ হয়, মোসাদের চাতুরি সেখান থেকেই শুরু।” হয়তো কথাটা ক্যাথরিনের জন্যেই বলেছিলেন।
ক্যাথরিন পেরেজ শাকদামের জন্ম ফ্রান্সে, এক কট্টর ইহুদি পরিবারে। ছোটবেলা থেকেই তাঁর দুচোখে ছিল প্রচণ্ড বুদ্ধির ঝিলিক। কিন্তু নিয়তি তাঁকে নিয়ে গেল এক অদ্ভুত মোহনায়। লন্ডনে পড়াশোনার সময় তার পরিচয় হয় এক ইরানি বংশোদ্ভূত মুসলিম যুবকের সাথে। প্রেম হলো, বিয়েও হলো। ক্যাথরিন ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলেন। তবে সেটা কি আধ্যাত্মিক টান, নাকি মোসাদের ট্রেনিং সেন্টারে শেখানো নিখুঁত অভিনয়? হয়তো দ্বিতীয়টাই।
তিনি প্রথমে সুন্নি মুসলমান হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিতেন। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ শিখলেন দ্রুত। আশেপাশে দেখিয়ে দেখিয়ে নামাজ পড়ার খুব শখ ছিল তার। আশেপাশে কেউ হয়তো কাজ করছে- এদিকে ক্যাথরিন পরম করুণাময় আল্লাহর জিকিরে মগ্ন। কিন্তু ধীরে ধীরে সে শিয়া ইসলামের গভীর তত্ত্বে ডুবে গেল। কারবালার শোকগাঁথা নিয়ে তার লেখা পড়ে কট্টর শিয়া আলেমরাও চোখের জল ফেলত। তিনি হয়ে উঠলেন একজন প্রখ্যাত ‘ইসলামিক স্কলার’।
বিভিন্ন ওয়েবসাইটে তিনি ইসলাম নিয়ে যা যা লিখতেন- সেগুলো পড়ে যে কারো চোখে জল চলে আসতো। এমনই এক ইসলাম বিশেষজ্ঞ হয়ে গেল ক্যাথরিন।
কিন্তু পর্দার আড়ালে তেল আবিবের গোয়েন্দা দপ্তরে তখন অন্য কোন খেলা চলছে। সেই খেলা কেউ টের ও পেল না। ২০০৯ থেকে ২০১১ সালের মধ্যবর্তী সময়ে ইরানের রাজনৈতিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক মহলে নিজের জায়গা করে নিতে শুরু করে ক্যাথরিন। তবে তাঁর কর্মকাণ্ড এবং প্রভাব ব্যাপকভাবে দৃশ্যমান হতে শুরু করে ২০১২ সাল থেকে।
ইরান সরকার ভাবল, এক পশ্চিমা নারী ইসলামে অনুপ্রাণিত হয়ে খামেনির আদর্শ প্রচার করছে—এর চেয়ে বড় শক্তি আর কী হতে পারে! ক্যাথরিনের জন্য খুলে গেল তেহরানের সব রুদ্ধদ্বার। আমেরিকাকে পরাস্থ করতে ক্যাথরিনের সব লেখা হয়ে উঠল ইরানের এক একটা মিসাইল। ইরানের সবচেয়ে বিশ্বস্ত পত্রিকা তিনি Kham ene i . ir-এর মতো স্পর্শকাতর ওয়েবসাইটে নিয়মিত কলাম লিখতে শুরু করলেন।
আয়াতুল্লাহ খামেনির সাথে দেখা করার জন্যে বিভিন্ন পত্রিকাওয়ালা বা সম্পাদকের সাথে সম্পর্ক তৈরী করেছিলেন ক্যাথরিন। শর্ত ছিল খামেনির চোখে দিকে তাকানো ও যাবেনা। ক্যাথরিন এজন্যে শুধু কথার জালে আটকে ফেলেছিলেন খামেনিকে। আর তাতেই গলে যায় খামেনির মন।
আয়াতুল্লাহ খামেনির ঘনিষ্ঠ বলয়, এমনকি আইআরজিসি-র (IRGC) উচ্চপদস্থ জেনারেলদের ড্রইংরুমেও তাঁর অবাধ যাতায়াত তৈরি হলো।
ক্যাথরিন জানতেন, তথ্য আদায়ের সবচেয়ে সহজ পথ হলো মানুষের আবেগ আর দুর্বলতাকে স্পর্শ করা। আর এখানেই শুরু হয় তাঁর জীবনের সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায়— ‘মুতাহ’ বা অস্থায়ী বিয়ে।
ইরানি শিয়া আইনে ‘মুতাহ’ বিয়ের একটা বিধান আছে। ক্যাথরিন এই সুযোগটাকে মারণাস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করলেন। তিনি জানতেন, বালিশের পাশে মানুষ যতটা সত্য বলে, অফিসের ডেস্কে তার অর্ধেকও বলে না।
শোনা যায়, তিনি একে একে প্রায় ১০০ জনেরও বেশি প্রভাবশালী ইরানি কর্মকর্তার সাথে অস্থায়ী বিয়ে বা শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন। তার রূপ আর বুদ্ধির জাদুতে কুপোকাত হয়েছিলেন যারা, তাদের তালিকাটা দীর্ঘ। এর মধ্যে আছে ইরানের সংসদ সদস্য যাদের থেকে তিনি সরকারের অভ্যন্তরীণ আইনি জটিলতা জানতে পেরেছিলেন।
পারমাণবিক প্রকল্পের সাথে যুক্ত আমলারা ও ছিল ক্যাথরিনের জালে। যাদের অসতর্ক আলাপ থেকে ইসরায়েল জানতে পেরেছিল ইরানের সেন্ট্রিফিউজের গোপন অবস্থান।
এই লিস্টে আছে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতারা যারা খামেনির শোবার ঘর পর্যন্ত খবরাখবর রাখতেন।
ক্যাথরিন হয়ে উঠেছিলেন এক চলন্ত ব্ল্যাক হোল, যা ইরানের সব রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য শুষে নিচ্ছিল। অথচ তেহরানের কর্তারা তখন তাঁর প্রশংসায় পঞ্চমুখ!
২০২১ সালের শেষের দিকে রহস্যের কুয়াশা কাটতে শুরু করে। ইরানের গোয়েন্দা সংস্থা ‘এতেলাত’ বুঝতে পারে, তাদের অতি আদরের ক্যাথরিন আসলে ইসরায়েলের ‘ট্রোজান হর্স’। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। ক্যাথরিন চতুরতার সাথে ইরান ত্যাগ করেন।
ফ্রান্সে পা রেখেই তিনি বোমা ফাটালেন। টাইমস অফ ইসরায়েল-এ তিনি সবিস্তারে লিখলেন— কীভাবে তিনি খামেনির নাকের ডগায় বসে মোসাদের কাজ করেছেন। তিনি সগর্বে বললেন, “আমি কখনোই মুসলিম হইনি, ওটা ছিল স্রেফ আমার মিশন। প্রতিটা জিকিরে আমি ইয়াহোয়েহ’র নাম নিয়েছি। কিন্তু কেউ ধরতেই পারেনি। ”
ইরান প্রশাসন তখন এক অদ্ভুত লজ্জায় কুঁকড়ে গেল। যাদের সাথে ক্যাথরিন ‘মুতাহ’ করেছিলেন, তারা চতুরতার সাথে নিজেদের পরিচয় লুকিয়ে ফেলতে শুরু করল। খামেনির ওয়েবসাইট থেকে মুছে ফেলা হলো ক্যাথরিনের সব লেখা। কিন্তু ইতিহাসের পাতা থেকে সেই চড়টা মোছা গেল না।
ক্যাথরিনের এই ‘বিস্ফোরণ’ ইরানের শাসনব্যবস্থার ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল। হুমায়ূন আহমেদের ভাষায় বলতে গেলে— “মানুষের ভুল ধরতে যখন দেরি হয়ে যায়, তখন সেই ভুলের মাসুল দিতে হয় রক্ত দিয়ে, নয়তো চরম অপমান দিয়ে।” ইরানকে দ্বিতীয়টিই বেছে নিতে হয়েছিল।
ক্যাথরিন যখন প্যারিসে বসে হাসিমুখে তাঁর সফল গুপ্তচরবৃত্তির গল্প শোনাচ্ছেন, তেহরানে তখন চলছে প্রলয়। এই ঘটনার পর ইরান তাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তনগুলো এনেছিল।
ক্যাথরিনের সাথে যে ১০০ জনের বেশি কর্মকর্তার সম্পর্কের কথা শোনা যায়, তাঁদের চিহ্নিত করতে শুরু হয় এক বিশাল ‘উইচ হান্ট’। ইরানের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা পরিষদ একটি বিশেষ তদন্ত কমিটি গঠন করে।
ডজনখানেক উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তা এবং রাজনীতিবিদকে লোকচক্ষুর আড়ালে সরিয়ে দেওয়া হয়। অনেকের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতার অভিযোগ আনা হয়।
সবচেয়ে বড় ধাক্কা লাগে ধর্মীয় নেতাদের ওপর। যারা ক্যাথরিনকে ‘পবিত্র নারী’ হিসেবে তকমা দিয়েছিলেন, তাঁদের জনসম্মুখে মুখ দেখানো দায় হয়ে পড়ে। কারণ অনেকের সাথেই ক্যাথরিনের বিয়ে হয়েছিল। শারীরিক সম্পর্ক ও হয়েছিল। ফলে এনাদের সবাইকেই পর্দার আড়ালে নিয়ে যাওয়া হয়।
ক্যাথরিনের ঘটনার পর ইরান সরকার বিদেশি নারীদের, বিশেষ করে যারা ইসলাম গ্রহণ করে ইরানে আসতে চান, তাঁদের ওপর নজরদারি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। আগে যারা খুব সহজে খামেনির দপ্তরে বা আইআরজিসি-র (IRGC) ইভেন্টে প্রবেশাধিকার পেতেন, তাঁদের জন্য তৈরি করা হয় ‘মাল্টি-লেয়ারড স্ক্রিনিং’।
কোনো বিদেশি নারী সাংবাদিক বা গবেষককে ইন্টারভিউ দেওয়ার আগে এখন গোয়েন্দা সংস্থার অন্তত তিনটি স্তর পার হতে হয়।
সাইবার এবং তথ্য নিরাপত্তার দেয়াল। ক্যাথরিন দেখিয়েছিলেন যে কলম আর কথা দিয়ে কীভাবে তথ্য চুরি করা যায়। এর ফলে ইরান তাদের ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট বদলে ফেলেছে।
খামেনির ব্যক্তিগত ওয়েবসাইট (Khame nei. ir) এবং সরকারি সংবাদ মাধ্যমগুলোতে বিদেশি লেখকদের কন্টেন্ট আপলোড করার আগে তাঁদের পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড এবং রাজনৈতিক ইতিহাস যাচাই বাধ্যতামূলক করা হয়।
গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র ডিজিটাল থেকে আবারও এনালগ বা কাগজের ফাইলে ফিরিয়ে নেওয়া হয়, যাতে আর কোনো ‘ক্যাথরিন’ পেনড্রাইভে করে তা নিয়ে যেতে না পারেন।
এই ঘটনাটি ইরানের শিয়া আলেমদের জন্য ছিল চরম বিব্রতকর ও মানহানিকর। ক্যাথরিন প্রমাণ করেছিলেন যে, এই ধর্মীয় প্রথাকে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ‘হানিপট’ হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। এরপর থেকে সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য অস্থায়ী বিবাহের ক্ষেত্রে গোপন গোয়েন্দা অনুমতি বা কঠোর সামাজিক নজরদারির একটি অলিখিত নিয়ম চালু করা হয়। কেউ চাইলেই এখন মুতাহ করতে পারেনা। বিশেষত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা-যারা ইরানের মস্তিষ্ক হিসেবে আছেন।
কিন্তু সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসে ইরানের গোয়েন্দা বিভাগে। তারা বুঝতে পারে, তাদের নজরদারি কেবল ‘বাইরের শত্রুর’ ওপর ছিল, কিন্তু ‘ভেতরের বন্ধু’ সেজে থাকা শত্রুদের চেনার মতো চোখ তাদের ছিল না। মোসাদের এই কৌশলী অনুপ্রবেশ ঠেকানোর জন্য ইরান একটি নতুন ইউনিট গঠন করে, যাদের কাজ হলো শুধুমাত্র ইরানে অবস্থানরত বিদেশি ‘বন্ধু’দের সন্দেহজনক গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা।
সবচে বড় কথা- ক্যাথরিন একবার গোয়েন্দাদের নজরদারিতে পড়েও ছিল। কিন্তু সে কথার জালে জড়িয়ে ফেলেছিল গোয়েন্দাদের। ঠাণ্ডা মাথায় মোসাদের কাছে পাঠানো এনক্রিপ্টেড কোডকে নিজের পড়াশোনার সাবজেক্ট বলে চালিয়ে দিয়েছিল। টানা দুইদিন জিজ্ঞাসাবাদের পর ও তার কাছ থেকে কিছু জানা যায়নি। এভাবেই বোকা বনে গিয়েছিল ইরানের ইন্টেলিজেন্স টীম।
ক্যাথরিন শাকদাম চলে গেছে ঠিকই, কিন্তু সে ইরানের গোয়েন্দা ইতিহাসে এমন এক ক্ষত রেখে গেছেন যা কোনভাবে কয়েক দশকেও সারবেনা। তেহরানের অলিতে গলিতে-সরকারি ভবনগুলোর করিডোরে এখন সেই হাহাকার আর অবিশ্বাসের ছায়া। হয়তো কোথাও লুকিয়ে আছে অন্য কোন ক্যাথরিন! অন্য কোন নামে!
একটা প্রশ্ন- বাংলাদেশে এমন কোন মানুষ আছে যাকে আপনি সন্দেহ করেন?
(ফেইসবুক থেকে সংগৃহীত)

















