বারবার বাংলাদেশী জাহাজ আটকানো প্রসঙ্গে ইরানি রাষ্ট্রদূতের ব্যাখ্যা


টানা ৪০ দিন যুদ্ধের পর ৭ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়। এই যুদ্ধ বিরতির শর্ত অনুযায়ী ইরান প্রতিদিন ১৫টি বাণিজ্যিক জাহাজ হরমুজ প্রণালী অতিক্রমের অনুমতি দেয়। ৯ তারিখ বাংলাদেশের প্রায় সকল গণমাধ্যমের শিরোনাম, হরমুজ প্রণালী অতিক্রমের অনুমতি পেল না বাংলার জয়যাত্রা। যেহেতু ইরান বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিয়েছে, তখন এ ধরনের শিরোনামে পাবলিক পার্সেপশন তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হয় যে, এ ঘটনায় বাংলাদেশ সরকারের কূটনৈতিক ব্যর্থতা থাকতে পারে। বাস্তবতা ছিল, বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের অনুমতি প্রদানের বিষয়টি ইরানের দিক থেকে শর্তসাপেক্ষ ছিল। এই শর্তের মধ্যে ছিল, ইসরাইলকে লেবাননে হামলা বন্ধ করতে হবে। কিন্তু ইসরাইল লেবাননে হামলা বন্ধ না করায় ইরান হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত করেনি।
গত ১৫ এপ্রিল দৈনিক ইনকিলাবের জন্য বাংলাদেশে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূতের একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার গ্রহণ করি আমি। সে পর্যন্ত অর্থাৎ যুদ্ধবিরতির পরবর্তী সাতদিন পর্যন্ত মাত্র চারটি বাণিজ্যিক জাহাজ হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করতে পেরেছে। এর মধ্যে অন্যতম ছিল চাইনিজ বাণিজ্যিক জাহাজ।
গতকাল রাতে ইসরাইল লেবাননের সাথে যুদ্ধ বিরতিতে রাজি হলে ইরান সম্পূর্ণরূপে হরমুজ প্রণালী বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়। এ রাতেই পুনরায় বাংলার জয়যাত্রা জাহাজটি হরমুজ প্রণালী পার হওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু ইরান পুনরায় আটকে দেয়। সকালেই গণমাধ্যমে ব্রেকিং নিউজ, ‘আবারো অনুমতি পেল না বাংলার জয়যাত্রা’। ফলে আবারো একই ধরনের পাবলিক পারসেপশন তৈরি হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। বলা ভালো, তৈরি করা হচ্ছে। আলোচিত সোশ্যাল মিডিয়া সেলিব্রেটি পিনাকী ভট্টাচারিয়া এ ঘটনায় তার ফেসবুক পেইজে পোস্ট করেন, “খলিলুর রহমান আরেডা বিবৃতি দিক। বিম্পির পোভু আম্রিকা আর ইন্ডিয়া যৌথভাবে ইরানকে এইজন্য বকে দিবে।” আশা করি সবাই বুঝতে পারছেন, এ ঘটনাতে কি ধরনের পাবলিক পারসেপশন তৈরি হচ্ছে বা তৈরি করা হচ্ছে।
প্রকৃতপক্ষে ইরান হরমুজ প্রণালী মুক্ত করলেও এখানে বেশ কিছু শর্ত আরোপ করেছে। নিগোসিয়েশনে অংশ নেওয়া একজন ইরানি অধ্যাপকের মতে, হরমুজ প্রণালী অবাধে খুলে দেওয়া হয়নি এবং এর সাথে তিনটি শর্ত রয়েছে:
১. শুধুমাত্র বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করতে পারবে; সামরিক জাহাজ বা যুদ্ধরত পক্ষগুলোর কোনো পণ্যবাহী জাহাজকে যাতায়াতের অনুমতি দেওয়া হবে না।
২. কোন জাহাজগুলো যাতায়াত করতে পারবে, তার ব্যবস্থাপনা ও নির্ধারণের ক্ষমতা ইরানের হাতে থাকবে। এ ব্যাপারে আইআরভিসি নেভাল ফোর্স এর পূর্বানুমতি নিতে হবে। পূর্বানুমতি ছাড়া কোন জাহাজ যেতে পারবে না।
৩. এই যাতায়াত শুধুমাত্র ইরান কর্তৃক নির্ধারিত পথেই হবে। বাংলার জয়যাত্রা জাহাজটি দ্বিতীয়বারের মতো হরমুজ প্রণালী পার হতে ব্যর্থ হওয়ার মূল কারণটা এখানেই। কারণ জাহাজটি হরমুজ প্রণালী পার হওয়ার জন্য আইআরজিসি নেভাল ফোর্স এর কাছ থেকে পূর্বানুমতি নেয়নি। ফলে তারা জাহাজটি আটকে দিয়েছে। এটি কেবল বাংলাদেশি জাহাজের ক্ষেত্রে নয়। একই ঘটনা গত রাতে ঘটেছে ভারতীয় সহ অন্যান্য দেশের বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ক্ষেত্রেও।
কিন্তু মিডিয়ার শিরোনাম বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে সক্ষম ফটো কার্ডে অনুমতি না নেয়ার কথাগুলো অনুপস্থিত।
প্রশ্ন উঠতে পারে, বাংলার জয়যাত্রা জাহাজটি কেন বারবার ভুল পদক্ষেপে হরমুজ প্রণালী পার হওয়ার চেষ্টা করছে। এখানে দায় কার? এর মধ্য দিয়ে দুইটি সুযোগ নষ্ট করেছে জাহাজটি। কেননা
কিছুক্ষণ পরেই হরমুজ প্রণালী যুদ্ধবিরতির আগের অবস্থায় ফিরে গেছে এবং এটি আইআরজিসি-র কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে। ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) কেন্দ্রীয় কমান্ডের মুখপাত্র লে. কর্নেল ইব্রাহিম জুলফিকারি জানিয়েছেন, দুর্ভাগ্যবশত, বারবার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও আমেরিকানরা তথাকথিত অবরোধের আড়ালে জলদস্যুতা ও দস্যুবৃত্তি চালিয়ে যাচ্ছে।
এই কারণে, হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ তার পূর্বের অবস্থায় ফিরে এসেছে এবং এই কৌশলগত জলপথটি সশস্ত্র বাহিনীর কঠোর ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। যতদিন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ইরান থেকে তার গন্তব্যে এবং গন্তব্য থেকে ইরানে জাহাজ চলাচলের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করবে না, ততদিন পর্যন্ত হরমুজ প্রণালীর পরিস্থিতি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত এবং তার পূর্বের অবস্থায় থাকবে।”
গত ১৫ তারিখে দৈনিক ইনকিলাবের জন্য ইরানি রাষ্ট্রদূত জলিল রহিমি জাহানাবাদীর সাক্ষাৎকার নেয়ার সময় আমি প্রশ্ন করেছিলাম, বাংলাদেশের অধিকাংশ মুসলিম সুন্নি হওয়ার পরেও এই যুদ্ধে শিয়া অধ্যুষিত ইরানকে প্রায় শতভাগ সমর্থন করছে। আপনি ঢাকার রাস্তায় চলাফেরার সময় পেট্রোল পাম্পের সামনে মানুষের দুর্ভোগ দেখতে পেয়েছেন। এই অবস্থায় ইরান যখন বাংলাদেশী জাহাজ আটকে দেয় তখন জনগণের মধ্যে নেতিবাচক মনোভাব সৃষ্টি হতে পারে।
জবাবে ইরানি রাষ্ট্রদূত বলেছিলেন, বাংলাদেশের মানুষের এই অকুণ্ঠ সমর্থনের জন্য আমি এবং ইরান সরকার ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই। এটি আমাকে মুগ্ধ করেছে। ইরান সরকারও এটি জানে। এজন্য বাংলাদেশকে ইরানের বন্ধুত্বের তালিকায় অগ্রগণ্য তালিকায় বিবেচনা করা হয়।
তিনি আরো বলেন, তবে গণমাধ্যমে যেভাবে এসেছে বাস্তবতা তেমনটি নয়। যেমন বলা হয়েছে, বাংলাদেশের বিবৃতিতে ইরান সরকার ক্ষুব্ধ।
আসলে এটি সত্য নয়। আমরা জানি, আরব রাষ্ট্রগুলোতে বাংলাদেশের প্রায় ৭০ লক্ষ জনগণ চাকরি করে। এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশী গার্মেন্টসের গুরুত্বপূর্ণ বাজার। কাজেই প্রতিক্রিয়া দেখানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের এই সীমাবদ্ধতা ইরান সহানুভূতির সাথে বিবেচনা করে থাকে।
রাষ্ট্রদূত আরো বলেন, শুরুতে বাংলাদেশ যে তালিকা দিয়েছিল সেটিতে কিছু ভুল ছিল। পরবর্তীতে একটি সংশোধিত তালিকা দিয়েছে। কিন্তু ইতিমধ্যেই অন্যান্য দেশের তালিকা জমা পড়েছে। যেহেতু একটি নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থায় জাহাজ চলাচল উন্মুক্ত করা হয়েছে, সে কারণে এখানে একটি সিরিয়াল মেইনটেইন করতে হয়। যে আবেদনগুলো পূর্বেই জমা পড়েছে সেগুলো আগে ছাড়া হচ্ছে। এছাড়া আর কিছু নয়। ইরান বাংলাদেশের জনগণের কষ্ট লাঘবে সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছে। ইরান বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক মজবুত ভিত্তির উপর দাঁড় করাতে আমার মত একজন সুন্নি মুসলিমকে এদেশে রাষ্ট্রদূত করে পাঠিয়েছেন। উল্লেখ্য ইন্টারন্যাশনাল রিলেশন্স ও ফরেন
পলিসিতে ডক্টরেট ডিগ্রিধারী ইরানের এই রাষ্ট্রদূত একজন সুন্নী মুসলিম। ইরানের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৫ বছর শিক্ষকতার পাশাপাশি আফগানিস্তানের ইসলামিক আজাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে চার বছর চ্যান্সেলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়াও ৮ বছর ইরানের পার্লামেন্টে সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এ সময় তিনি পার্লামেন্টারি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত কমিটির সভাপতি দায়িত্ব পালন করেছেন।

















