পর্যটনের আড়ালে হামের থাবা ঙাহফা খুমে, পৌঁছেনি টিকা


পাহাড় চূড়ায় ঙাহফা খুম ত্রিপুড়া গ্রাম। আর তার ঠিক নীচে ঙাহ ফাখুমে জলপ্রপাত। নির্জন আর জলরাশিতে পানির তৈতুন শব্দ। কিন্তু পর্যটনের এই উচ্ছ্বাসের আড়ালে নীরবে বিস্তার লাভ করছে হাম। একে একে ঝেঁকে বসেছে হাম রোগ। আর পাড়া মাঝখানে একটি মাচাং ঘরে বারান্দায় বসে আছে কয়েকজন হামের রোগীরা। না আছে ঘরে ঔষধ না পেয়েছে কোন টিকা। টিকা থেকে যেমন বঞ্চিত হয়েছে তেমনি পরিবারগুলো আর্থিক অসচ্ছলতা কারণে গত দুই মাস থেকে হাম রোগে ভুগছেন।
ঙাহফা খুম ত্রিপুড়া গ্রামে বাসিন্দা পুদমা ত্রিপুরা। পড়ালেখা করছেন থানচিতে উপজেলা শহরে। গত দুই সপ্তাহ ধরে হাম রোগে ভুগছেন তিনি। দুরত্ব আর আর্থিক অসচ্ছলতা কারণে ঔষধ কিনতে পারেননি। দুর্বলতা শরীর নিয়ে টং ঘরে বারান্দায় বসে কাতরাচ্ছেন। যার কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুললেও হাম রোগের কারণে এখনো স্কুলে যেতে পারেনি সে।
তার দুর্বতলতা শরীর আর মুখের কষ্টে ছাপ নিয়ে পুদমা ত্রিপুরা বলেন, গ্রামে হাম রোগী বাড়ছে। শিশুসহ অনেক মানুষ হামে আক্রান্ত হচ্ছে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত ঙাফাহ খুম এলাকায় হামের টিকা আসেনি। দুর্গম হওয়াতেই শহরে গিয়ে ঔষধ কিনে আনতেও যেমন খরচ তেমনি যাতায়াতের খরচ দ্বিগুন। আর এখনো পর্যন্ত ডাক্তার বলতে কেউ আসেনি । আমি একা নয় এখানে প্রায় ২০ জনের অধিক হাম রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। ঔষধ বা টিকা না আসলে সামনে আরো বাড়বে।
নাফাখুম—প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের এক অনন্য গন্তব্য। প্রতিদিন শত শত পর্যটকের পদচারণায় মুখর থাকে এই এলাকা। কিন্তু আনন্দ আড়ালে গ্রামে একে একে হামে রোগে আক্রান্ত হচ্ছে শিশু থেকে কিশোরীসহ বিভিন্ন বয়সের মানুষ। ফলে শিশুদের একটি অংশ এখনও প্রয়োজনীয় টিকার আওতার বাইরে রয়ে গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা, সচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং রোগ শনাক্তকরণে কার্যকর উদ্যোগের অভাবে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। আর এখনো পর্যন্ত টিকা আওতায় আসেনি ঙাফাহখুম ত্রিপুড়া পাড়া,ঔলাওয়া পাড়া, থুইসা পাড়া, জিনা পাড়া। ঐসব দুর্গম এলাকায় টিকা না পৌছালে হাম রোগের আক্রান্ত ভয়াবহ আকারে ধারণ করবে বলে মনে করছেন এলাকাবাসীরা।
থানচি সদর থেকে তিন্দু ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ডের অবস্থিত এসব গ্রামগুলো। উপজেলা সদর থেকে ঙাহফাখুমের দুরত্ব প্রায় ৬০ কিলোমিটার আর রেমাক্রী থেকে সাড়ে সাত কিলোমিটার। দুর্গম ও যোগাযোগ বিহীন প্রত্যান্ত এসব এলাকাতে শতাধিক মানুষের বসবাস। সেখানে যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম ঝিড়ি পথ। প্রায় আড়াই ঘন্টা হাটার পর পাহাড় চূড়ায় দেখা মিলে ঙাহফাখুম পাড়া গ্রামটি। প্রতিদিনই সেখানে পর্যটকদের আনাগোনা বাড়লেও স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা ও টিকাদানে ঘাটতি সংক্রমণের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলছে। উন্নয়ন ও পর্যটন প্রচারে যতটা গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, দুর্গম জনগোষ্ঠীর মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ততটা কার্যকর উদ্যোগ কেন দেখা যাচ্ছে না সেটি নিয়ে প্রশ্ন স্থানীয়দের।
ঙাহফাখুমের জলপ্রপাত ঘেষে ত্রিপুড়া পাড়া গ্রাম। সেটির কয়েক মাইল দূরে আরো চারটি গ্রাম। সে গ্রামে ২৩ টি পরিবারে কয়েকশত মানুষের বসবাস। রেমাক্রী মুখ থেকে ওই এলাকায় আসা-যাওয়া সময় লাগে পাঁচঘন্টা। দুর্গম এই প্রত্যান্ত এলাকাতে গত দুই মাস ধরে বিভিন্ন বয়সের হামের রোগের আক্রান্ত হচ্ছে গ্রামের মানুষ। দুর্গম এলাকা ও যোগাযোগের বিছিন্ন হওয়ায় ঔষধ কিনতে পারছে তারা। এতে যেমন ঔষধ সংকট তৈরী হয়েছে তেমনি হামের প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়ছে। শুধু এই একটা গ্রাম নাহ ঔলাওয়া পাড়া, থুইসা পাড়া, জিনা পাড়া পাড়াতেও একই চিত্র।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ঙাহফাখুমের কয়েকটি গ্রামে শিশু থেকে বিভিন্ন বয়সের কিশোর হামের রোগে আক্রান্ত। কেউ বাড়িতে ঘুমিয়ে কাতরাচ্ছে আবার কেউ ঘরে বারান্দায় দুর্বলতা নিয়ে বসে আছে। পরিবারে মুখে কষ্ট আর দুঃখের ছাপ। ঔষধ, টিকা ও ডাক্তার না আসাতেই গ্রাম অধিকাংশ মানুষ চিন্তায় ভুগছে।
ঙাহফা খুম ত্রিপুড়া পাড়া,ঔলাওয়া পাড়া বাসিন্দা জয় ত্রিপুরা, অংজাই মারমাসহ আরো কয়েকজন বলেন, এলাকাতে হাম রোগ ছড়াচ্ছে। বেশীর ভাগ শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে। উপজেলা শহরে যেতে অনেক টাকা খরচ আর ঔষধ কিনতে খরচ বেশী। আর টিকা দুরের কথা, ডাক্তার বলতে কেউ আসেনি।
তিন্দু চেয়ারম্যান ভাগ্যরাম ত্রিপুরা বলেন, এলাকায় হাম আক্রান্ত হয়েছে সেটির বিষয়ে পাড়াবাসীরা জানাইনি। আমাকে যদি জানাতো তাহলে মেডিক্যাল টিম নিয়ে যেতে পারতাম আর ডাক্তার’র সাথে কথা বলে চিকিৎসা দেয়ার ব্যবস্থা করা হবে।
থানচি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ওয়াহিদুজ্জামান মুরাদ বলেন, ওই এলাকাতে হাম ছড়িয়েছে সেটা আমরা জানি না। আর মেডিকেল টিম সেখানে যাবার কথা। যদি না যায় তাহলে হামের টিকা দেয়ার জন্য মেডিকেল টিম সেখানে পাঠানো ব্যবস্থা নেয়া হবে।

















