শুধু মাইকিং নয়, অবৈধ পাহাড় কাটা এবং দখলের বিরুদ্ধে কঠোর হোন

fec-image

গত দুই দশকে বাংলাদেশে পাহাড়ধসে প্রায় ৫০০ জনের বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। প্রধানত নির্বিচারে পাহাড় কাটা পাহাড়ধসের অন্যতম প্রধান কারণ বলে চিহ্নিত হয়েছে। কেননা নির্বিচারে পাহাড় কাটা পরিবেশের জন্য একটি মারাত্মক হুমকি। অপরিকল্পিত উন্নয়ন, ইটভাটার চাহিদা এবং ভূমিদস্যুদের লোভের কারণে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো অঞ্চলে নির্বিচারে পাহাড় ও টিলা কাটা চলছে। এতে জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হওয়ার পাশাপাশি প্রতি বর্ষায় প্রাণঘাতী পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটছে।

অপরিকল্পিত বসতি স্থাপনও পাহাড় ধসের আরেকটি বড় কারণ। ভবিষ্যৎ ঝুঁকির কথা না ভেবে, সরকারি নিয়ম-কানুন ও নকশা ছাড়া যত্রতত্র বাড়িঘর ও অবকাঠামো নির্মাণ হচ্ছে। এটি পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করছে এবং নাগরিক জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে। অপরিকল্পিত বসতির মূল কারণ জনসংখ্যা বৃদ্ধি। জনসংখ্যার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ আবাসন ব্যবস্থা না থাকা, নিয়ম না মানা বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নিয়ম ও মাস্টারপ্ল্যান অনুসরণ না করে এসব বসতি স্থাপন করা হচ্ছে। বর্জ্য ও পয়ঃনিষ্কাশন সংকটের ফলে সুনির্দিষ্ট ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে।

তাছাড়া পাহাড়ে জুম চাষের জন্য আগুন দিয়ে জঙ্গল পরিষ্কারের ফলে মাটির উপরের স্তরের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষামূলক গাছপালা ও ঘাস ধ্বংস হয়ে যায়। এতে মাটির পানি ধারণক্ষমতা ও বাঁধন কমে যায়। পরবর্তীতে ভারি বর্ষণে ওই আলগা মাটি সহজেই ধসে পড়ে, যা পাহাড় ধসের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এছাড়া পাহাড় অঞ্চলে বাঁশ কোড়ল খাওয়া বা বাঁশের কচি অংশ সংগ্রহ করা ইঁদুরের একটি স্বাভাবিক স্বভাব। ইঁদুরের গর্ত মাটির অভ্যন্তরীণ কাঠামোকে দুর্বল করে ফেলে, যার ফলে ভারী বর্ষণে সহজেই পাহাড় বা বাঁধ ধসে যাচ্ছে। গর্তগুলোর ভেতর দিয়ে বৃষ্টির পানি পাহাড়ের গভীরে প্রবেশ করে মাটির ধারণক্ষমতা নষ্ট করে দিচ্ছে।

পাহাড় ধসের আরেকটি কারণ জলবায়ু পরিবর্তন। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং চরম আবহাওয়ার সৃষ্টি হচ্ছে। বাংলাদেশসহ পুরো বিশ্বে এটি কৃষি, বাস্তুতন্ত্র, জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতিতে মারাত্মক ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলছে।জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবসমূহপ্রাকৃতিক দুর্যোগ ও চরম আবহাওয়া: বন্যা, খরা, তাপদাহ এবং ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের তীব্রতা ও পুনরাবৃত্তি অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে।

টানা ভারী বর্ষণের ফলেই এ ধরনের মারাত্মক বিপর্যয় ও প্রাণহানি ঘটছে। মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে কয়েকদিন ধরেই বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টি হচ্ছে। নদনদীর পানি বেড়ে অনেক জায়গায় আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছে, ঘটেছে পাহাড়ধসের ঘটনাও। টানা ভারী বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য জেলার অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হওয়ায় সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে। পাশাপাশি বেড়েছে পাহাড় ধসের শঙ্কাও।

পাহাড়ধসের এই দুর্যোগ প্রতিরোধে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি উচ্ছেদ একান্ত জরুরি। তাছাড়া পাহাড়ের পাদদেশে বা খাড়া ঢালে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারী পরিবারগুলোকে স্থায়ীভাবে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। তাছাড়া পাহাড়ের উপরিভাগের মাটি ধরে রাখতে দেশীয় প্রজাতির গাছ ও বাঁশ রোপণ করা এবং কাটা পাহাড়ের ঢালগুলোতে প্রাকৃতিক বা কৃত্রিম সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।

অবৈধভাবে পাহাড় কাটা বন্ধ করতে হবে। পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া এবং মনিটরিং জোরদারে এখনো উদ্যোগ নিতে হবে। সচেতনতা বৃদ্ধি করে মানুষের মাঝে বর্ষা মৌসুম আসার আগেই সতর্ক করে তুলতে হবে। একই সাথে এসব দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখার বিষয়ে সরকারের নজর দিতে হবে।

যদিও অবৈধভাবে পাহাড় কাটা বন্ধে সরকার বর্তমানে ‘জিরো টলারেন্স’ বা কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী, যেকোনো পাহাড় বা টিলা কাটা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং এর সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা, জেল, জরিমানা ও জব্দ করতে হবে।

পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী, পাহাড় কাটা দণ্ডনীয় অপরাধ। সারাদেশে, বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য অঞ্চলসহ বিভিন্ন স্থানে অবৈধভাবে পাহাড় কাটা চক্রের বিরুদ্ধে আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

শুধু মাইকিং আর বিজ্ঞপ্তি জারি করেই জেলা প্রশাসনের দায়িত্ব শেষ করলে চলবে না। অবৈধ পাহাড় কাটা এবং দখলের বিরুদ্ধে কঠোর হতে হবে। পাহাড় কাটা সব মহলের জন্যই ‘নাজায়েজ’ ঘোষণা করতে হবে। কাউকেই ছাড় দেয়া উচিৎ নয়। প্রভাবশালী মহলের সহযোগিতায় যারা পাহাড় কাটছে, পরিবেশ ধ্বংস করছে, তাদের বিরুদ্ধে সমানভাবে আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

লেখক : সাংবাদিক ও গবেষক।

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: নজরুল ইসলাম বশির, প্রবন্ধ
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন