ঐতিহাসিক ‘হেজাজ রেলওয়ে নেটওয়ার্ক’ পুনরুজ্জীবিত করছে সৌদি আরব ও তুরস্ক: প্রভাব ছড়িয়ে পড়বে সারা বিশ্বে

fec-image

ইসরাইলের প্ররোচনায় ইরানে হামলা করে যুক্তরাষ্ট্র তার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ভুলটি করেছে। এটি এমন একটি ভুল, যা আর ফিরিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা তাদের হাতে নেই। এটি কেবল মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্যের বিদায়ঘণ্টাই বাজায়নি, বরং মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র, ভূরাজনীতি, নিরাপত্তা, শত্রু ও মিত্রতার ধারণা, বাণিজ্য এবং যোগাযোগ ব্যবস্থাসহ সবকিছু পরিবর্তন করে দেবে। এককথায় বলা যেতে পারে, মার্কিন এই ভুলটি বিশ্ব মানচিত্রে এক নতুন মধ্যপ্রাচ্যের জন্ম দিতে চলেছে এবং এই পরিবর্তন কেবল মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, এর ঢেউ ছড়িয়ে পড়বে বিশ্বজুড়ে। সেই পরিবর্তনের এক বৈপ্লবিক ধারণা গত মঙ্গলবার (৯ জুন) সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্যে সম্পাদিত হয়েছে। এই ধারণার আলোকেই দেশ দুটি শত বছরেরও বেশি সময় পূর্বে বন্ধ হয়ে যাওয়া ‘হেজাজ রেলওয়ে নেটওয়ার্ক’ পুনরুজ্জীবনের জন্য একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে। এরই অংশ হিসেবে তুরস্ক ও সৌদি আরব মঙ্গলবার (৯ জুন) রসদ ও রেল খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণের জন্য দুটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে; কারণ উভয় দেশই উপসাগরীয় অঞ্চলকে তুরস্ক ও ইউরোপের সাথে সংযুক্তকারী নতুন স্থলপথ অন্বেষণ করছে। প্রকল্পটি সৌদি আরবের বিখ্যাত ভিশন-২০৩০ এর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ মোতাবেক, ৯ জুন রিয়াদে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনার পর তুরস্কের পরিবহন ও অবকাঠামো মন্ত্রী আবদুলকাদির উরালোগলু এবং সৌদি আরবের পরিবহন ও লজিস্টিক পরিষেবা মন্ত্রী সালেহ বিন নাসের আল-জাসের চুক্তিগুলোতে স্বাক্ষর করেন। এই বিশাল নেটওয়ার্কটি সিরিয়া ও জর্ডানের মধ্য দিয়ে সৌদি আরব ও ওমান পর্যন্ত বিস্তৃত হবে এবং হরমুজ প্রণালীকে পাশ কাটিয়ে ও ইরানের প্রভাব এড়িয়ে সুদূর পশ্চিমে পথ তৈরি করে ইউরোপকে মধ্যপ্রাচ্যের সাথে সংযুক্ত করবে। কল্পনা করুন, আপনি এমন একটি ট্রেনে চড়েছেন যা আপনাকে মক্কার সুউচ্চ পর্বতমালা থেকে শুরু করে মদিনার সবুজ খেজুর বাগান পেরিয়ে, তারপর তাবুকের সোনালি বালুকারাশি অতিক্রম করে প্রাচীন আম্মানে নিয়ে থামাবে এবং সবশেষে সুগন্ধি জুঁই ফুলে ভরা দামেস্ককে আলিঙ্গন করে এক অবিরাম যাত্রায় এগিয়ে যাবে। যাত্রা এখানেই শেষ নয়; এটি আনাতোলিয়ার সুবিশাল সমভূমি অতিক্রম করে মনোমুগ্ধকর ইস্তাম্বুলে গিয়ে শেষ হবে, যেখানে বসফরাসের তীরে দুই সভ্যতার মিলন ঘটেছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এমনই একটি স্বপ্ন বাস্তবায়িত হতে চলেছে, যাতে ব্যয় হবে ৫৫০ বিলিয়ন রিয়াল। এটি সৌদি আরব ও তুরস্কের যৌথ প্রচেষ্টায় ঐতিহাসিক ‘হেজাজ রেলওয়ে নেটওয়ার্ক’ এর পুনরুজ্জীবন ঘটাবে।

হেজাজ রেলওয়ে নেটওয়ার্ক কী?

হেজাজ রেলওয়ে বিশ শতকের শুরুর দিকে উসমানীয় সাম্রাজ্য কর্তৃক নির্মিত একটি ঐতিহাসিক এবং কৌশলগত রেললাইন। এটি মূলত সিরিয়ার দামেস্ক থেকে শুরু করে বর্তমান সৌদি আরবের মদিনা মোনাওয়ারা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। ১৯০০ সালে উসমানীয় সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদ এই রেললাইন নির্মাণের নির্দেশ দেন। দুটি বড় উদ্দেশ্য নিয়ে এই প্রজেক্ট শুরু হয়েছিল: প্রথমত, সে সময় উটের পিঠে চড়ে দামেস্ক থেকে মদিনা যেতে প্রায় ৪০ দিন সময় লাগত, যা ছিল অত্যন্ত কষ্টকর এবং ঝুঁকিপূর্ণ। রেললাইন চালুর পর এই সময় মাত্র ৫ দিনে নেমে আসে। দ্বিতীয়ত, আরব উপদ্বীপে উসমানীয় সেনাবাহিনীর দ্রুত যাতায়াত নিশ্চিত করা এবং দূরবর্তী এই অঞ্চলে নিজেদের শাসন ব্যবস্থা মজবুত করা ছিল উসমানীয়দের অন্যতম লক্ষ্য। সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদের নির্দেশে এবং জার্মান প্রকৌশলী হাইনরিখ অগাস্ট মেইসনারের তত্ত্বাবধানে ১৯০০ সালে এই রেললাইনের নির্মাণকাজ শুরু হয়। বিশ্বজুড়ে মুসলমানদের অনুদানের টাকায় এটি নির্মিত হয়েছিল। মরুভূমির তীব্র গরম, পানির অভাব এবং স্থানীয় বেদুইনদের আক্রমণের মুখেও অত্যন্ত দ্রুততার সাথে এই রেললাইনের কাজ শেষ করা হয়। প্রায় ১,৩০০ কিলোমিটার দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে রেললাইনটি মদিনা পর্যন্ত পৌঁছায়। ১৯০৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর সুলতানের সিংহাসন আরোহণের বার্ষিকীতে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করা হয়।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে এই রেললাইনটি উসমানীয় সেনাবাহিনীর রসদ সরবরাহের মূল লাইফলাইন হয়ে ওঠে। ফলে এটি ব্রিটিশ ও আরব বিদ্রোহীদের প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় বিখ্যাত ব্রিটিশ গোয়েন্দা অফিসার টি. ই. লরেন্স (লরেন্স অব অ্যারাবিয়া) এবং শরিফ হুসাইনের নেতৃত্বাধীন আরব বিদ্রোহীরা উসমানীয় বাহিনীকে দুর্বল করতে এই রেললাইনের ওপর ব্যাপক গেরিলা আক্রমণ চালায়। তারা ডিনামাইট দিয়ে রেললাইন, সেতু এবং ট্রেন উড়িয়ে দেয়। যুদ্ধের পর উসমানীয় সাম্রাজ্যের পতন ঘটে এবং হেজাজ রেলওয়ে নেটওয়ার্কটি বিভিন্ন নতুন দেশের (সিরিয়া, জর্ডান ও সৌদি আরব) সীমানায় বিভক্ত হয়ে পড়ে। মদিনা রুটের সৌদি অংশটি এরপর আর কখনোই পুরোপুরি চালু করা সম্ভব হয়নি।

এদিকে ইরান-যুদ্ধ পরবর্তী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সৌদি আরব মধ্যপ্রাচ্যের নতুন অর্থনীতি, রাজনীতি ও সহযোগিতার ধারণায় যে পুনর্মূল্যায়ন করছে, রেলপথ ও লজিস্টিকস ক্ষেত্রে তুরস্কের সাথে এই চুক্তিটি সেই রূপান্তরের একটি সুস্পষ্ট উদাহরণ। প্রকল্পটি শুধু পণ্য পরিবহনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি তুরস্ক, সিরিয়া এবং জর্ডানের মধ্য দিয়ে উপসাগরীয় অঞ্চলকে ইউরোপের সাথে সংযোগকারী একটি কৌশলগত করিডোর স্থাপন করবে, যা এই অঞ্চলকে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের একটি অধিকতর নিরাপদ ও স্থিতিশীল বিকল্প প্রদান করবে। প্রকল্পটির প্রকৃত ব্যাপ্তি অর্থনীতি ছাড়িয়ে ভূরাজনৈতিক ক্ষেত্র পর্যন্ত বিস্তৃত, যা এই অঞ্চলকে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে একটি লজিস্টিকস কেন্দ্রে রূপান্তরিত করছে এবং একই সাথে সৌদি আরব আঞ্চলিক বিনিয়োগ ও উন্নয়নে একজন নেতা হিসেবে তার ভূমিকা সুদৃঢ় করছে। এই পদক্ষেপটি সংকট ব্যবস্থাপনার পর্যায় থেকে সুযোগ সৃষ্টি এবং দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের পর্যায়ে অঞ্চলের উত্তরণকে প্রতিফলিত করে। এই নেটওয়ার্ক কেবল সংযোগ নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্য তথা বিশ্ব রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরবর্তীতে ওমান সালতানাতের সোহর বন্দরের সাথে সংযোগ স্থাপন করা হবে এবং পাকিস্তানের বন্দরগুলোর সাথে সম্পর্ক আরও জোরদার হবে। এই নেটওয়ার্ক পরবর্তীতে ইরাক পর্যন্ত যুক্ত হবে এবং অন্যদিকে ইউরোপকে সৌদি আরবের সাথে সরাসরি সংযুক্ত করে দেবে। এটি একটি বিশাল অর্থনৈতিক পথ, যা অভূতপূর্ব দক্ষতা ও গতিতে এশিয়া এবং ইউরোপের মধ্যে বাণিজ্যের দ্বার উন্মুক্ত করবে। একই সাথে এই করিডোরটি আমিরাতি-ইসরায়েলি আইএমইসি (IMEC) করিডোরের জন্য একটি বড় ধাক্কা, যা আমিরাতের জেবেল আলি বন্দর এবং ইসরায়েলের হাইফা বন্দরের মধ্য দিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল।

সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর তুরস্কের পরিবহন মন্ত্রী উগলু গণমাধ্যমকে বলেন, এই বিশাল প্রকল্পটি তিন বছরের মধ্যে সিরিয়া ও জর্ডানের মাধ্যমে তুরস্ক এবং সৌদি আরবকে সংযুক্ত করবে। উগলু পরবর্তীতে এই প্রকল্পে ইরাকের যোগদানের সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছেন। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে এটি একটি বহুমুখী প্রকল্প হবে, যার সাথে ভবিষ্যতে সড়ক নেটওয়ার্ক তৈরির বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। ইতোমধ্যে তুরস্ক ও সৌদি আরব আলাদা আলাদাভাবে রেল যোগাযোগ বিস্তৃত করার লক্ষ্যে জর্ডান ও সিরিয়ার সাথে চুক্তি করেছে।

ঐতিহাসিক হেজাজ রেল নেটওয়ার্ক পুনরুজ্জীবনের এই প্রকল্প নিয়ে সৌদি আরব ও তুরস্কের জনগণের মধ্যে ব্যাপক ইতিবাচক মনোভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। নবি আলিব রাহিম নামে এক সৌদি নাগরিক সোশ্যাল মিডিয়া ‘এক্স’-এ এই প্রকল্প সম্পর্কে তার প্রতিক্রিয়ায় লিখেছেন, “নাগরিক হিসেবে আমরা আমাদের দুই ভ্রাতৃপ্রতিম রাষ্ট্র, সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্যে রেল খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হওয়ায় আনন্দিত। তবে আমরা আশা ও আগ্রহের সাথে এই স্মারকটিকে শীঘ্রই—ইনশাআল্লাহ—একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তিতে রূপান্তরিত করার জন্য অপেক্ষা করছি। এই চুক্তিটি একটি যুগান্তকারী প্রকল্পের জন্ম দেবে, যা ১২০ বছর আগে নির্মিত পুরোনো রেললাইনটিকে একটি আধুনিক ও সমসাময়িক নকশার মাধ্যমে পুনরুজ্জীবিত করবে। এই প্রকল্পটি তার অর্থনৈতিক, লজিস্টিক, শিল্প এবং ভূরাজনৈতিক ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করবে এবং আঞ্চলিক পরিবহন ও বাণিজ্যের মানচিত্রকে নতুন রূপ দেবে। এটি আগামী দশকের মধ্যে একটি সংযুক্ত রেল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সৌদি আরবকে সরাসরি ইউরোপীয় বাজারের সাথে যুক্ত করবে এবং একটি মাল্টিমোডাল পরিবহন প্ল্যাটফর্মসহ একটি বিশিষ্ট আঞ্চলিক কেন্দ্রে রূপান্তরিত করবে। এটি ঘটবে পূর্ব ও পশ্চিম এশিয়াকে ইউরোপ ও আফ্রিকার সাথে সংযুক্তকারী তার পরিবহন ব্যবস্থা সম্পন্ন হওয়ার পর, যা সিঙ্গাপুর ও নেদারল্যান্ডসের অর্জনের অনুরূপ, কিন্তু আরও অনেক বৃহত্তর ভৌগোলিক পরিসরে। এটি সৌদি ভিশন ২০৩০-এর উদ্দেশ্যগুলোর সাথে সরাসরি সামঞ্জস্যপূর্ণ, যার লক্ষ্য হলো রাজ্যের ভৌগোলিক অবস্থানকে একটি সুপ্ত সুবিধা থেকে অর্থনৈতিক আয়ের একটি টেকসই উৎসে রূপান্তরিত করা, যা দীর্ঘমেয়াদে কিছু তেল খাতের গুরুত্বের সমতুল্য হবে।”

লেখকঃ সিনিয়র সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, গবেষক, সম্পাদক পার্বত্যনিউজ। 

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: তুরস্ক, মধ্যেপ্রাচ্য, রেল যোগাযোগ
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন