পার্বত্য চট্টগ্রামে কোটা বিতর্ক : বৈষম্য বিলোপ ও ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা

fec-image

বাংলাদেশের কোটা সংস্কার আন্দোলনের ফলস্বরূপ গঠিত চব্বিশের সরকার বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এরই অংশ হিসেবে সরকারি চাকরিতে বিদ্যমান কোটা ব্যবস্থা পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। যেখানে মেধার ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে পার্বত্য চট্টগ্রামের নিয়োগ কোটা নিয়ে একটি নতুন বিতর্ক সামনে এসেছে। সেই বিতর্কের জেরেই পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্প্রতি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়ে এই বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা চেয়েছে।

সংবিধান ও আইনের আলোকে কোটা: উদ্দেশ্য ও সীমাবদ্ধতা
বাংলাদেশের সংবিধানের ২৯ অনুচ্ছেদে সকল নাগরিকের জন্য সরকারি চাকরিতে সমান সুযোগের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। তবে, একই অনুচ্ছেদের ৩(ক) উপধারায় বলা হয়েছে, ‘নাগরিকগণের যে কোন অনগ্রসর অংশকে উন্নীত করিবার জন্য রাষ্ট্র কর্তৃক বিশেষ বিধান প্রণয়ন হইতে এই অনুচ্ছেদের কোন কিছুই প্রতিবন্ধক হইবে না।’ এই বিধানটিই কোটা ব্যবস্থার আইনি ভিত্তি। এর মূল লক্ষ্য হলো সমাজের সেই অংশগুলোকে মূলধারায় ফিরিয়ে আনা, যারা ঐতিহাসিক, সামাজিক বা অর্থনৈতিক কারণে পিছিয়ে পড়েছে।

অন্যদিকে, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন, ১৯৮৯ (সংশোধিত ১৯৯৮) অনুযায়ী, পার্বত্য জেলায় বসবাসকারী উপজাতি বাসিন্দাদের চাকরিতে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিধান রয়েছে। এই আইনগুলো পার্বত্য অঞ্চলের উপজাতিদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও পরিচিতি রক্ষার জন্য প্রণীত হয়েছিল। দীর্ঘদিন ধরে এই আইনগুলো কার্যকর আছে কিন্তু কোটা সংস্কার আন্দোলনের পর নতুন করে এর কার্যকারিতা এবং প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বাস্তবতার আলোকে বিতর্ক: উপজাতি বনাম বাঙালি
কোটা ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য ছিল পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে সহায়তা করা। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বহু বছর আগেই সফলতার স্বাক্ষর রেখেছে কোটা ব্যবস্থা। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান বাস্তবতায় দেখা যায়, এই কোটা ব্যবস্থা তার মূল উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হয়েছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে, পার্বত্য অঞ্চলের উপজাতি জনগোষ্ঠীর, বিশেষ করে চাকমাদের মধ্যে শিক্ষার হার জাতীয় গড়ের চেয়েও বেশি। শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে উপজাতিরা, বিশেষত চাকমা, ত্রিপুরা ও মারমারা, পাহাড়ে বসবাসকারী বাঙালিদের তুলনায় অনেক এগিয়ে আছে। রাজনৈতিক দিক থেকেও বেশ উন্নতি হয়েছে উপজাতীয়দের। তবে কিছু ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী এখনো তুলনামূলক পিছিয়ে আছে প্রধান প্রধান উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর তুলনায়।

অন্যদিকে, পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী বাঙালিরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হয়ে পিছিয়ে আছে। ভূমির অধিকার, চাকরি এবং শিক্ষায় তারা প্রায়শই বৈষম্যের শিকার হয়। উপজাতিদের জন্য বিদ্যমান ‘অগ্রাধিকার কোটা’ পাহাড়ে বসবাসকারী বৃহত্তর জনগোষ্ঠী বাঙালিদের তাদের প্রাপ্য অধিকার থেকে চরমভাবে বঞ্চিত করছে। এই বৈষম্য পার্বত্য অঞ্চলে জাতিগত ভারসাম্য নষ্ট করছে এবং স্থানীয় বাঙালিদের মধ্যে ক্ষোভের জন্ম দিচ্ছে। জাতীয়ভাবে আন্দোলনের ফলে ২০২৪ সালের সরকারি প্রজ্ঞাপনে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জন্য ১% কোটা নির্ধারণ করা হলেও, পার্বত্য জেলার বিশেষ আইনে উপজাতিদের জন্য অগ্রাধিকারের বিষয়টি এখনও সমাধান হয়নি।

বৈষম্য বিলোপ ও মেধার অগ্রাধিকার প্রতিষ্ঠা
২০২৪ সালের গণ অভ্যুত্থানের পর বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার যে আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি হয়েছে, তার মূল ভিত্তি হলো মেধার অগ্রাধিকার। এই নীতি পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়া উচিত। যদি কোটার উদ্দেশ্য হয় অনগ্রসর জনগোষ্ঠীকে সামনে আনা, তাহলে যে জনগোষ্ঠী ইতিমধ্যেই শিক্ষায় ও কর্মসংস্থানে এগিয়ে আছে, তাদের জন্য বিশেষ কোটা রাখা কেবল বৈষম্যই বাড়িয়ে তুলবে। বরং, পিছিয়েপড়া পার্বত্য বাঙালিদের জন্য যদি বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তা বৈষম্য বিলোপের চেতনার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হবে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের হাতে এখন একটি ঐতিহাসিক সুযোগ এসেছে। তারা যদি ২০২৪ সালের কোটা সংস্কারের প্রজ্ঞাপনটি পার্বত্য চট্টগ্রামের নিয়োগ, শিক্ষাসহ সকল ক্ষেত্রে বলবৎ করে, তবে তা পাহাড়ের সকল বাসিন্দার জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবে। এর মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল নিয়োগে ৯৩% মেধা, ৫% শহিদ মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনার সন্তানদের জন্য এবং ১% ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী, শারীরিক প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের জন্য ১% নিশ্চিত করা সম্ভব। এটি শুধুমাত্র নিয়োগ প্রক্রিয়াকে ন্যায্য করবে না, বরং দীর্ঘদিনের জাতিগত বৈষম্যের অবসান ঘটিয়ে পাহাড়ে শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

ভবিষ্যৎ এবং আশঙ্কার দিক
পার্বত্য চট্টগ্রামের কোটা নিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের হাতে যে দায়িত্ব অর্পিত, সে ব্যাপারে তারা কী সিদ্ধান্ত নেবেন সেটার উপর নির্ভর করছে অনেককিছু। তারা চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে প্রতি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন তাহলে একদিকে যেমন বৈষম্যহীন বাংলাদেশের চেতনাকে প্রতিফলিত হবে, তেমনি পাহাড়ের সকল জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিদ্যমান বৈষম্যের অবসান ঘটাতে সহায়ক হবে। তবে, এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পথে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। কিছু প্রভাবশালী মহল কোটা ব্যবস্থা জিঁইয়ে রাখতে আগ্রহী হতে পারে, যা বৈষম্যের কালো মেঘকে আরও ঘনীভূত করবে। তাই, সরকার এবং সমাজের সকল স্তরের মানুষের এই বিষয়ে সজাগ ও সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

পার্বত্য চট্টগ্রামের কোটা বিতর্ক একটি জটিল সমস্যা, যা কেবল আইনি সমাধানের চেয়েও বেশি কিছু দাবি করে। এটি সামাজিক ন্যায়বিচার, সমতা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজের মূল ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলে। জুলাই বিপ্লবের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে যদি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়, তবে তা কেবল পার্বত্য চট্টগ্রামের কোটা সমস্যার সমাধানই করবে না, বরং বাংলাদেশের সকল নাগরিকের জন্য একটি ন্যায় ও বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার পথে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। পাহাড়ের বাসিন্দারা আর যেন বৈষম্যের শিকার না হয় এবং মেধার ভিত্তিতে তাদের প্রাপ্য অধিকার লাভ করতে পারে, তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

লেখক: সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
[email protected]

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন