পার্বত্য চট্টগ্রামে সন্তু লারমা চান সেনা প্রত্যাহার ও বাঙালী অপসারণ


২ ডিসেম্বর ২০২৫, পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তির ২৮ বছর পূর্তি। প্রতিবারের মতো এবারেও শুনব টকশোতে র্যালীতে পাহাড়ি উপজাতিরা কান্নাকাটি করবে ‘মুই হিচ্ছু ন পেই’, চুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়ায় ‘আমা জাদর অধিকার ন পেই’। হয়ত শহীদ মিনারে পথ নাটক হবে- সেনাবাহিনী কর্তৃক কল্পিত ধর্ষণের চিত্র। বলা হবে জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করা হচ্ছে। এখানে ধর্মান্তরিত বলতে তারা মুসলিম বোঝায়। খৃস্টান হলে সেটা ধর্মান্তকরণ হয় না।
পাহাড়ি উপজাতিদের সব বয়ানে ৩টি উপাদান খুব দৃশ্যমান- ‘সেনাবাহিনী’, ‘সেটেলার’, ‘ইসলাম’! ‘ইসলাম ‘ইসলাম’ বললেই শাহবাগী চেতনা দৃঢ় হয়ে উঠে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও মিডিয়া ভিত্তিক একটি গোষ্ঠীর কাছে ‘ইসলামী’ চুলকানি খুব প্রিয়। পাহাড়ি দলগুলোর মাতৃ সংগঠন দেশের কমিউনিস্ট বা বামপন্থীদের কাছে ইসলাম এবং সেনাবাহিনীকে ‘ডগ পেইন্ট’ দেওয়া খুব পছন্দের। আর পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনী এবং বাঙালীরা যেহেতু ইসলাম ধর্মাবলম্বী তাই গালি দিতে আন্তর্জাতিক প্রেরণা পায়। আজ বলবে শান্তি চুক্তির মৌলিক বিষয়গুলোর বাস্তবায়ন হয়নি। তা মৌলিক বিষয় কোনগুলো?
ভূমি সমস্যার সমাধান সেনাবাহিনীকে ৬টি সেনাক্যাম্পে শিকলবন্দী করা।
সন্তুলারমা চুক্তির পরপরই ‘চুক্তি বাস্তবায়ন হচ্ছে না,আমরা আবার পাহাড়ে চলে যাব, আন্দোলন শুরু করব বলে হুমকি-ধামকি দিতেন। সে ধারা এখনো আছে। তিনি দাবি করতেন চুক্তির বাইরে কিছু সমঝোতা হয়েছিল আর তা ছিল বাঙালীদের এখান থেকে সরিয়ে নেওয়া। সরকার বা আওয়ামী লীগ কখনো তা স্বীকার করেনি।
সাপ্তাহিক ২০০০’র সাথে এক সাক্ষাৎকারে তাকে এনিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি একটা ভাববাদী উত্তর দেন- ‘সব কিছু কি আর লিখে হয়, ঈমান থাকতে হয়।’ যাই হোক তিনি শেখ হাসিনার ‘ঈমানের’ উপর ভরসা রেখে চুক্তি করলেন। এখন তার পর্যালোচনা করা উচিত শেখ হাসিনার ঈমান কী রকম। এত দিনে তিনি তা বুঝেছেন। ২২ বছর সশস্ত্র সংঘাতে লিপ্ত থেকে তিনি তার দলকে বাঙালী নিধনে মূলত ব্যবহার করেছেন। ১৯৭৩ সালে দীঘিনালা জুড়ে তিনি পোস্টারিং করে বাঙালী নিধনে উৎসাহ দিতেন “পাহাড়িরা অস্ত্র ধর, বাঙালীরা পাহাড় ছাড়ো” “বাঙালীর রক্ত নিবা পাহাড়িরা স্বাধীন হবা”। (সূত্র মহিউদ্দিন আহমেদ, পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি বাহিনী জিয়া ও মন্জুর হত্যা)
অথচ সরকারিভাবে ২.৫/৩ লাখ বা তার অধিক বাঙালীর পুনর্বাসন প্রক্রিয়া শুরু হয় ১৯৭৮’র শেষার্ধ থেকে। যা ১৯৮২/৮৩ সালে বন্ধ হয়। পুনর্বাসিত বাঙালীর অর্ধেক শান্তি বাহিনীর হত্যার শিকার বা আতংকে, ম্যালেরিয়ার আক্রমণ, অনিশ্চিত জীবিকার জন্য হয় মারা পড়েন, না হয় এলাকা ছেড়ে চলে যান। এখন ৪৭ বছর পরে বাঙালী জনগোষ্ঠীর যাদের বয়স ৪৫ বা তার নীচে তারা স্রেফ এখানের পাহাড়ের কোলে জন্ম নিয়ে বেড়ে উঠা। এরাও ম্যালেরিয়া ও শান্তি বাহিনী উভয় প্রতিকূলতা ছাপিয়ে নতুন এক সম্প্রদায় হিসেবে স্হিত হয়েছে। এরা জন্মগতভাবে পাহাড়ের সন্তান ‘পাহাড়ি বাঙালী’। সন্তু লারমার মত সেও চেঙ্গীনদীর শ্রোতে সাঁতার কাটা পাহাড়িও বটে।
সন্তু লারমা বাঙালীদের খেদাতে চান দু’ভাবে। এক. সশস্ত্র পন্থায় বা ভীতি ছড়িয়ে। দুই. চুক্তির মধ্যে থাকা ভূমি বিষয়ক অস্পষ্ট ধারার মাধ্যমে। প্রথম পন্থার মধ্যে নিরস্ত্র বাঙালীদের উপর শতাধিক আক্রমণের মাধ্যমে পাহাড় থেকে উচ্ছেদ কার্যক্রম ব্যর্থ হওয়ার পর তারা অপেক্ষায় আছে সেনাবাহিনীর প্রত্যাবর্তনের পর বাঙালীরা অরক্ষিত হয়ে গেলে তাদেরকে ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে তিন পার্বত্য এলাকা ছাড়া করা। দ্বিতীয় পন্থার মধ্যে আছে পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি বাঁধা গ্রস্ত করার জন্য ভূমি জরীপের কাজ শুরু করতে বাধা দেওয়া। পার্বত্য চট্টগ্রামে বনভূমি, আবাদী ভূমি, খাস জমি ও পতিত জমিকে চিহ্নিত করা গেলে বাঙালীদের দেওয়া বা বাঙালী কর্তৃক কোনো পাহাড়ি জমি আছে কিনা তা নিরূপণ করা যাবে। সন্তু লারমার এই ক্ষেত্রে আপত্তি- তিনি চান আগে ভারত প্রত্যাগত শরনার্থীদের নিজ নিজ ভূমিতে পুনঃস্হাপন।
এই রকম অচলাবস্থায় বাঙালীরা স্হায়ী সনদের অভাবে ভোটার তালিকায় নিজেদের নাম অন্তর্ভুক্ত করতে না পারলে ভোটাধিকার হারাবে। তাছাড়া পাহাড়ি উপজাতিদের দাবি বৃটিশ প্রণীত পার্বত্য চট্টগ্রাম রেগুলেশন এ্যাক্ট ১৯০০’র বিধান বলে পার্বত্য চট্টগ্রামে সুনির্দিষ্ট কয়েকটি উপজাতি ব্যতীত সকল সমতলবাসীদের প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ করা। স্বাধীন বাংলাদেশে সকল নাগরিকদের দেশের যে কোনো স্থানে বসবাসের অধিকার থাকলেও এই বিধি সংবিধানের জনগণের মৌলিক অধিকারের বিরুদ্ধে।
সকল বাঙালীকে ঝেটিয়ে বিদায় করতে পাহাড়ি উপজাতিদের অহর্নিশ চেষ্টা বিদ্যমান। এই ক্ষেত্রে তাদের সস্তা অস্ত্র ভূয়া ধর্ষণের অভিযোগ এনে স্থানীয় পরিবেশকে উত্তপ্ত করা। সারাদেশে এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একথা প্রমাণ করা এখানে দিনে রাতে শত শত ‘রেইপ’ হচ্ছে। সেনাবাহিনীর কার্যক্রমকে বাধা দিতে রাস্তায় নেমে উত্তেজনার সৃষ্টি করা, সেনাবাহিনীকে প্ররোচিত করা যেন তারা বল প্রয়োগ করে। সেনাবাহিনীর কোনো ধরনের এ্যাকশনের ভিডিও ছড়িয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে মিলিটারাইজেশন চলছে, ধর্ষণ হচ্ছে, মানবাধিকার লংঘন হচ্ছে বলে ঝড় তুলে জাতিসংঘের স্যাংশন আরোপ করার মতো বড় করে তোলা।
উপজাতি এ্যাক্টিভিস্ট চাকমা রানী ইয়ান ইয়ান মনে করেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জাতিসংঘ মিশন বন্ধ হয়ে যাবে এই ভয়ে ভীত হয়ে কোনোরূপ তড়িৎ ব্যবস্থা নিবে না। এরকম অবস্থায় তারা গহীন জঙ্গলের মতো পাহাড়ের রাস্তায় এবং রাজধানীতে নেমে আসবে তীব্র সেনাবিদ্বেষের বিষবাষ্প ছড়িয়ে দিতে। আজ বাংলাদেশের চারিদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামকে ঘিরে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র পরিস্কার হয়ে যাচ্ছে। গ্রেটার ত্রিপুরা ল্যাণ্ডের মহাপরিকল্পনায় পার্বত্য চট্টগ্রাম অন্তর্ভুক্ত। ত্রিপুরা মহারাজা খ্যাত প্রদ্যুত মানিক্য ভারতের সেভেন সিস্টারসকে নিয়ে জোট করেছেন ‘ওয়ান নর্থইস্ট’ নামে এবং তার প্রকাশ্য ঘোষণা চট্টগ্রাম বন্দর তাদের লাগবে।
এই মহাপরিকল্পনা সাধনে বাধা সেনাবাহিনী ও পার্বত্য চট্টগ্রামে জনসংখ্যার ভারসাম্য সৃষ্টিকারী মুসলিম বাঙালী। আজ যতই বলা হোক পার্বত্য চট্টগ্রামে উপজাতিরা তাদের অধিকার পায়নি তা তারা ততদিন বলতে থাকবে যতদিন না তারা ‘ওয়ান নর্থইস্ট’ গ্রেটার তিপরা ল্যান্ড, কুকিল্যান্ড বা জুম্মল্যান্ডের আওতাধীন হয়। উনিশ শতক থেকে ইউরোপীয় ইভানজেলিস্টদের কল্পরাজ্য ‘ক্রাউন ল্যান্ড’ এখন বাস্তবতায় আসতে চায়। ভারতের আয়তনের ৭.৮৭% অংশ নিয়ে প্রায় ৪% জনগণের এই বৃহওর পরিকল্পনা বাস্তবে আসতে চট্টগ্রাম বন্দর অপরিহার্য। আর তার জন্য এদেশীয় উপজাতিদের ভূমিকা অগ্রগণ্য। তাদের দাবি এবং আকাঙ্ক্ষার শেষ হবে না। ৭৮% শিক্ষার হার নিয়ে চাকরির কোটা পেয়ে পাহাড়ি সমাজে বিরাট একটা মধ্যব্ত্তি সমাজের উত্থান ঘটছে। তারা প্রথাগত জুম কৃষিতে নিজেদের ভবিষ্যৎ দেখছে না। তারা ক্রমান্বয়ে হতাশ হয়ে পড়ছে শিক্ষার সাথে কর্মসংস্থানের ‘মিসম্যাচ’ দেখে। শত শত পাহাড়ি সরকারি চাকরি করলেও তাদের প্রত্যাশা ‘আরো আরো মোরে দাও প্রাণ’!
আর তাই তাদের দরকার ‘রাজনৈতিক স্বাধীনতা’। এই স্বাধীনতার মূল অন্তরায় সেনাবাহিনী। পাহাড়ি উপজাতিরা কতটা সুফল পেয়েছে তার একটা উদ্ধৃতি দেখা যায় ‘মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার স্মরণ সংকলন ২০২২’ সংখ্যায় রুমেন চাকমার লেখা “পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী সমাজের মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশ” প্রবন্ধে (পৃ.২৪-২৫)।
“১৯৯৭ সালে ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর পার্বত্য চট্টগ্রামে সামরিক বাহিনীর সাথে অধিকার কর্মীদের আনুষ্ঠানিক ভাবে সশস্ত্র সংঘাতের অবসান হলে পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে থাকে। এর ফলে নিম্নোক্ত পরিবর্তন সমূহ পরিলক্ষিত হয়-
(১) যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন
(২) শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধি
(৩) বণিক পুঁজির অবাধ প্রবেশ।
(৪) পর্যটন বৃদ্ধি।
(৫) বহুমাত্রিক ব্যবসার সৃষ্টি।
তিনি উল্লেখ করেন মূলত চুক্তির পর থেকেই পার্বত্য চট্টগ্রামে একটি বৃহৎ মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থান ঘটেছে। কেননা সেই সময়ই মূলতঃ মানুষজন সরকারি বেসরকারি চাকরিতে প্রবেশ করা শুরু করে এবং ধীরে ধীরে শহরমুখী হয় আর ভূমির সাথে সম্পর্কহীন হয়ে উঠে। পাহাড়ে একটা তরুণ শিক্ষিত বেকার শ্রেণি তৈরি হয়েছে, এই তরুণদের সামনে ছুঁড়ে দেওয়া হয়েছে তাদের মুক্তির সনদ “সেটেলার হটাও সেনা হটাও”! গত ৫৪ বছরে বাংলাদেশ শাসনামলে পাহাড়িরা যা অর্জন করেছে তা সংযুক্ত ছবিগুলো দেখলেই বোঝা যায়।
লেখক : পার্বত্য গবেষক ও সামরিক বিশ্লেষক, ২ ডিসেম্বর ২০২৫

















