পার্বত্য চট্টগ্রামের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে পিসিজেএসএসের মিথ্যাচার


গত ১ জুলাই, ২০২৫ সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস) ‘জানুয়ারি-জুন ২০২৫ : পার্বত্য চট্টগ্রামের মানবাধিকার পরিস্থিতির উপর অর্ধ-বার্ষিক প্রতিবেদন’ শিরোনামে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে দাবি করেছে যে, ‘২০২৫ সালের জানুয়ারি হতে জুন মাস পর্যন্ত পার্বত্য চট্টগ্রামে নিয়োজিত নিরাপত্তা বাহিনী ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী, সেনা-মদদপুষ্ট সশস্ত্র সন্ত্রাসী গ্রুপ, সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী গোষ্ঠী, মুসলিম বাঙালি সেটেলার ও ভূমিদস্যুদের দ্বারা ১০৩টি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা সংঘটিত হয়েছে এবং এসব ঘটনায় ৩১৫ জন জুম্ম মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়েছে। এতে ৪৯ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এছাড়া বহিরাগত কোম্পানী, প্রভাবশালী ব্যক্তি ও সেটেলার কর্তৃক কমপক্ষে ৩০০ একর ভূমি বেদখল করা হয়েছে।’
পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক নিরপেক্ষ গবেষণা সংস্থা সিএইচটি রিসার্চ ফাউন্ডেশনের (সিএইচটিআরএফ) উল্লেখিত সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনার ১১৩টি সংবাদ নথিভুক্ত করে বিশ্লেষণ করে পিসিজেএসএস-এর প্রতিবেদনের ঢালাও অভিযোগের কোনো সত্যতা পায়নি। তাছাড়া পিসিজেএসএস-এর প্রতিবেদনে যেসব ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সেসব ঘটনার অধিংকাশ ক্ষেত্রেই কোনো তথ্য-প্রমাণ নেই। এমনকি সেসব ঘটনা নিয়ে উল্লেখযোগ্য কোনো গণমাধ্যমে সংবাদও প্রকাশ হয়নি। বেশিরভাগই ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ছড়ানো প্রপাগান্ডাকে ভিত্তি করেই এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। বিশেষ করে, পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি আঞ্চলিক সংগঠনগুলো পরিচালিত বিভিন্ন স্যোশাল মিডিয়া পেইজ, গ্রুপ ও আইডিতে চালানো সিন্ডিকেটেড অপপ্রচারগুলোকে ভিত্তি ও তথ্য ধরে তাদের এ রিপোর্ট প্রণীত হয়েছে। যেমন উল্লেখিত সময়ে ৩০০ একর ভূমি দখলের অভিযোগ করা হয়েছে, অথচ বাস্তবে এর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাছাড়া, পার্বত্য চট্টগ্রামে অশান্তি সৃষ্টির পেছনে পিসিজেএসএস এবং অন্যান্য পাহাড়ি সশস্র সংগঠনগুলোই যেখানে মূলত দায়ী, সেখানে তাদের প্রতিবেদনে সেসবের কোনো উল্লেখই করা হয়নি। তারা শুধু উল্লেখ করেছে যেসব ঘটনায় নিজেদের ভিক্টিম হিসেবে উপস্থাপন করা যায় সেসব ঘটনা।
বর্তমান তথ্য-প্রযুক্তির এইযুগে মোবাইল-ইন্টারনেট মানুষের মৌলিক ও মানবাধিকার। অথচ, উপজাতীয় সন্ত্রাসীদের চাঁদাবাজি, মোবাইল টাওয়ারে হামলা-নাশকতা এবং মোবাইল কোম্পানির টেকনেশিয়ানদের অপহরণের কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের লক্ষ লক্ষ মানুষ মোবাইল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে, সেইসব কথা তাদের রিপোর্টে নেই। গত ১৯ এপ্রিল খাগড়াছড়ির মানিকছড়ি থেকে একটি মোবাইল কোম্পানির ২ জন টেকনেশিয়ানকে উপজাতীয় সন্ত্রাসীরা অপহরণ করে, আজও যাদের খোঁজ পাওয়া যায়নি। সেই বিষয়টিও তাদের প্রতিবেদনে নেই। ২৬ জুন রাতে রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৭-৮ জন উপজাতীয় সশস্ত্র সন্ত্রাসী চাঁদার জন্য মহড়া দিয়েছে, যার ভিডিও ফুটেজ ভাইরাল হয়েছে। অথচ, এরও কোনো উল্লেখ নেই তাদের প্রতিবেদনে।
পাহাড়ের পিসিজেএসএস-সহ অন্তত ছয়টি সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠি চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করছে। এসব দমনের জন্য নিরাপত্তা বাহিনীকে নিয়মিত টহল দিতে হয়। সেসব টহল কোনো পাহাড়ি পাড়া দিয়ে গেলেও সেটাকে তারা পাড়াবাসীর মানবাধিকারের লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করেছে তাদের প্রতিবেদনে, কিন্তু নিরাপত্তা বাহিনীর টহলসহ সন্ত্রাসবিরোধী তৎপরতায় আশ্বস্ত হয়ে ইতোমধ্যে বান্দরবানের ২৮টি পাড়ার ১২১টি বম পরিবারের ৩২৮ জন সদস্য নিজ নিজ বসত বাড়িতে ফিরে এসেছে, তাদের চিকিৎসা এবং পুনর্বাসনসহ যাবতীয় সহযোগিতা করছে নিরাপত্তা বাহিনী, অথচ, সেইসব ঘটনাও তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
তাদের প্রতিবেদনে গ্রেফতারের বিষয়টি উল্লেখ করে এটিকে তারা নিজেদের মানবাধিকার লঙ্ঘন বলে দাবি করেছে। অথচ, পার্বত্য চট্টগ্রামে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠি সক্রিয় আছে এবং তাদের কারণেই পাহাড়ে অশান্তি লেগে আছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত বিভিন্ন জনগোষ্ঠির সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে এসব সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার করতে হবে, এতে কোনো ছাড় দেয়ার সুযোগ নেই। তাছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা যে শুধু বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীর দ্বারাই গ্রেফতার হচ্ছে, বিষয়টি তা-ও নয়; বরং মাঝে মধ্যেই তারা ভারতের ত্রিপুরা, আসাম এবং মিজোরামেও গ্রেফতার হয়ে থাকে। যেমন বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি মিজোরামের লুংলাইতে তিনজন পিসিজেএসএস সদস্য অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার হয়। গত ৩ জুন ভারতের ত্রিপুরা থেকে পিসিজেএসএসের আরো ১৩ সদস্য আটক হয়, যারা চিকিৎসার কথা বলে ভারতে গিয়ে ত্রিপুরার বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের তত্ত্বাবধানে অস্ত্র প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলেন। এসব ঘটনার কোনো উল্লেখ নেই তাদের প্রতিবেদনে। অথচ, পিসিজেএসএস প্রণীত এ ধরনের রিপোর্টগুলো বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকবৃন্দ, আন্তর্জাতিক সংস্থা, মিডিয়া ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোতে প্রেরণ করা হয়। যার ভিত্তিতে তারা তাদের বাংলাদেশ বিষয়ক রিপোর্ট প্রকাশ করে থাকে।
এদিকে চলতি ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত পার্বত্য তিন জেলা রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতে সংঘটিত আইনশৃঙ্খলাজনিত ও মানবাধিকার বিষয়ক বিভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষিতে প্রকাশিত ১১৩টি সংবাদ নথিভুক্ত করে বিশ্লেষণ করেছে সিএইচটি রিসার্চ ফাউন্ডেশন (সিএইচটিআরএফ)। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সিএইচটিআরএফ-এর নথিভুক্ত সংবাদগুলো পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, উল্লেখিত সময়ের মধ্যে বিভিন্ন ঘটনায় তিন পার্বত্য জেলায় ৪০ জন নিহত হয়েছেন। একই সময়ে আহত হয়েছেন ৮১ জন, অপহরণের শিকার হয়েছেন ৫৬ জন, ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১১ জন নারী এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় একই সময়ে ৩০টি অত্যাধুনিক অস্ত্র এবং ২৩৯ রাউন্ড বিভিন্ন অস্ত্রের গুলি উদ্ধার হয়েছে।

নিহত ৪০ জনের মধ্যে উপজাতি কর্তৃক উপজাতি নিহত হয়েছেন ১১ জন, বাঙালি কর্তৃক বাঙালি নিহত হয়েছেন ৪ জন, উপজাতি কর্তৃক বাঙালি নিহত হয়েছেন ১ জন। উল্লেখিত সময়ে বাঙালি কর্তৃক কোনো উপজাতি নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেনি। এছাড়াও অগ্নিকাণ্ডে নিহত হয়েছেন ১ জন, সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১২ জন, পানিতে ডুবে মৃত্যু হয়েছে ৬ জনের এবং অন্যান্য কারণে মারা গেছেন আরও ৫ জন।
আহত ৮১ জনের মধ্যে উপজাতি কর্তৃক উপজাতি আহত হয়েছেন ৬ জন, বাঙালি কর্তৃক বাঙালি আহত হয়েছেন ৬ জন, উপজাতি কর্তৃক বাঙালি আহত হয়েছেন ১৩ জন, তবে উল্লেখিতি সময়ে বাঙালি কর্তৃক কোনো উপজাতি আহত হননি, আওয়ামী লীগের আভ্যন্তরীণ কোন্দলে আহত হয়েছেন ১ জন, সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন ৪৩ জন, মাইন বিস্ফোরণ ও অন্যান্য কারণে আহত হয়েছেন ১২ জন।
চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে পার্বত্য তিন জেলায় অপহরণের শিকার হয়েছেন ৫৬ জন মানুষ। এর মধ্যে উপজাতি কর্তৃক উপজাতি অপহরণের শিকার হয়েছেন ৭ জন এবং উপজাতি কর্তৃক বাঙালি অপহরণের শিকার হয়েছেন ৪৯ জন। একই সময়ে বাঙালি কর্তৃক কোনো উপজাতীয় ব্যক্তি অপহরণের শিকার হননি।
২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে পার্বত্য চট্টগ্রামে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ১১টি। এর মধ্যে উপজাতি কর্তৃক উপজাতি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ২টি, বাঙালি কর্তৃক বাঙালি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৭টি, বাঙালি কর্তৃক উপজাতি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ১টি, বাঙালি ধর্ষককে গ্রেফতার করে জেল হাজতে পাঠিয়েছে পুলিশ এবং অপর একটি ঘটনায় উপজাতি এক নারী ধর্ষিত ও নিহত হয়েছেন, কিন্তু গভীর জঙ্গলে ঘটনা ঘটায় এর জন্য দায়ী ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
পার্বত্য চট্টগ্রামে উল্লেখিত সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালিয়ে ৩০টি অস্ত্র এবং ২৩৯ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করেছে। এর মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) সন্তু গ্রুপের সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের কাছ থেকে ৫টি অস্ত্র এবং ১৮ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। অপরদিকে, প্রসীত বিকাশ খীসার নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড ড্যামোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) এর সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের কাছ থেকে ১৪টি অস্ত্র এবং ২১৭ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়াও বিভিন্ন স্থান থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় ১১টি অস্ত্র ও ৪ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়েছে।
পিসিজেএসএস এবং সিএইচটিআরএফ-এর উল্লিখিত দুইটি রিপোর্ট তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, পিসিজেএসএস প্রণীত রিপোর্ট অতিরঞ্জিত ও অনেকক্ষেত্রেই ভিত্তিহীন।

















