প্রসঙ্গ : পার্বত্য মন্ত্রীর পদত্যাগ

fec-image

পার্বত্য মন্ত্রী জনাব দীপেন দেওয়ান সাহেবের পদত্যাগ এবং এর পর থেকে পার্বত্য অঞ্চলের রাজনীতি ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোঃ হেলাল উদ্দিন ভাইকে জড়িয়ে যে সব আলোচনা-সমালোচনা চলছে, তা আমার নজরে এসেছে। একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে এই বিষয়ে কিছু কথা বলা প্রয়োজন মনে করছি।

মন্ত্রী সাহেবের পদত্যাগের পর পাহাড়ের কিছু উপজাতি / পাহাড়ী আঞ্চলিক সংগঠন দাবি করছে যে, প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর হেলাল নাকি মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান সাহেবকে ‘পুতুলের মতো’ রাখতে চেয়েছিলেন এবং সবকিছুতেই তার আধিপত্য ছিল। এমনকি রাঙ্গামাটি সিটি কর্পোরেশনের মেয়র প্রার্থী নিয়েও নাকি তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব ছিল! অথচ এই দুটি দাবির সপক্ষে আজ পর্যন্ত কোনো প্রমাণ (Evidence) কেউ উপস্থাপন করতে পারেনি।

দীপেন দেওয়ান সাহেব দীর্ঘদিন বিচারক হিসেবে অত্যন্ত সুনামের সাথে কাজ করেছেন। তিনি বিএনপি’র একজন প্রবীণ কেন্দ্রীয় নেতা। দলের সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিজের যোগ্যতা ও বিশ্বস্ততা প্রমাণ করেই তিনি মন্ত্রী হয়েছেন। সুতরাং, তার মতো একজন ব্যক্তিত্বকে ব্যারিস্টার মীর হেলাল নিয়ন্ত্রণ করতেন এই দাবিটি একেবারেই অমূলক । তাছাড়া, একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারক এবং পূর্ণ মন্ত্রীকে যদি অন্য কেউ আসলেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তবে তো পূর্ণ মন্ত্রীর সেই পদে থাকার মানসিক দৃঢ়তা নিয়েই প্রশ্ন ওঠে। আমি নিজে দীপেন দেওয়ান সাহেবের অনেক বক্তব্য শুনেছি, তিনি অত্যন্ত জ্ঞানী একজন মানুষ। আমরা ব্যক্তিগতভাবে জানি যে উনি বেশ কিছুদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন এবং তিনি তার পদত্যাগ পত্রেও স্পষ্ট করে অসুস্থতার কথাই জানিয়েছেন।

দ্বিতীয়ত, আমার জানামতে ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থানীয় রাজনীতিতে একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করতে চান বলে যে প্রোপাগন্ডা ছড়ানো হচ্ছে তাও ভিত্তিহীন বা তার সেই সময়ও নেই। তিনি তার নিজের হাটহাজারী আসন নিয়ে ব্যস্ত। চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে যে বিশাল দায়িত্ব, তা নিয়ে ব্যস্ত। একই সাথে তিনি দুটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। এর বাইরে জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশন, মিডিয়া সেল, “আমরা বিএনপি পরিবার” সহ বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। সুতরাং, কেউ যদি দাবি করে যে তিনি এতসব গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় ও দলীয় দায়িত্ব ফেলে রাঙ্গামাটির মেয়র কে হবে তা নিয়ে মন্ত্রীর সাথে মনোমালিন্যে জড়িয়েছেন, তবে এগুলো সোশ্যাল মিডিয়ার “খাজুইড়া আলাপ” ছাড়া আর কিছুই নয়।

বাস্তবতা হলো, ব্যারিস্টার মীর হেলাল প্রধানমন্ত্রী নিজেই পার্বত্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিয়েছেন। তিনি লবিং করে এই পদ নেননি। চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে কাজ করার সুবাদে তিন পার্বত্য জেলার সিনিয়র নেতৃবৃন্দের সাথে তার দীর্ঘদিনের কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে। এই অঞ্চলের রাজনীতি, অর্থনীতি ও আইন সম্পর্কে তিনি প্র্যাক্টিক্যালি অবগত। নিজ দলের ভেতরের কোন্দল ঠেকানো এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা রাখতেই প্রধানমন্ত্রীর একজন বিশ্বস্ত, অভিজ্ঞ এবং আইনজ্ঞ ব্যক্তির প্রয়োজন ছিল, যা ব্যারিস্টার মীর হেলালের মধ্যে রয়েছে।

দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তার বিরুদ্ধে অনেক প্রোপাগান্ডা হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনো সংবাদ সম্মেলন, বক্তব্য বা টকশোতে তিনি একপাক্ষিক বা বিতর্কিত কোনো মন্তব্য করেননি। তার কোনো সিদ্ধান্তে বা স্টেটমেন্টে কোনো পক্ষের প্রতি বৈষম্য করা হয়েছে এমনটা কেউ দেখাতে পারবে না।

আবার অন্যদিকে, কিছু বাঙালী সংগঠন বা সমমনা সংবাদকর্মীদের অতি-উৎসাহী প্রশংসা এবং তোষামোদি শুনে মনে হচ্ছে, ব্যারিস্টার মীর হেলাল ভাই যেন কেবল তাদেরই লোক বা তাদের নির্দেশেই কাজ করছেন।

তারা আবার জনাব দীপেন দেওয়ান সাহেবকে আঞ্চলিক সংগঠন ‘জেএসএস’ এর এজেন্ট বানিয়ে দিচ্ছে এবং দাবি করছে যে, তিনি তাদের এক্সপেক্টেশন পূরণ করতে না পেরেই পদত্যাগ করেছেন। এভিডেন্স ছাড়া এই ধরনের অভিযোগ পার্বত্য অঞ্চলের শান্তি-শৃঙ্খলার জন্য মোটেও সুখকর নয়।

স্পষ্ট করে বলতে চাই যে জনাব দীপেন দেওয়ান সাহেব এবং ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন ভাইয়া দুজনেই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) পরীক্ষিত ও বিশ্বস্ত নেতা। তারা কোনো আঞ্চলিক, উপজাতি বা বাঙালি সংগঠনের এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য কাজ করেন না। তারা কোনো রাষ্ট্রীয় সংস্থাকে সন্তুষ্ট করতেও দায়িত্ব নেননি। তারা জনগণের সেবক এবং এখন পর্যন্ত বৈষম্যহীনভাবে পার্বত্যবাসীর কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছেন। দয়া করে অযথা তাদেরকে নির্দিষ্ট কোনো পক্ষের ট্যাগ দিয়ে অন্য পক্ষকে উসকে দেবেন না।

এটা সত্য যে, পার্বত্য রাজনীতিতে মেইনস্ট্রিম দলগুলোর পাশাপাশি আঞ্চলিক দল, বিচ্ছিন্নতাবাদী দল, কখনো পাহাড়ে বসবাস করেনি এমন কিছু সুশীল, বামপন্থী সংগঠন, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা/এনজিও এবং রাষ্ট্রীয় একটি বিশেষ বাহিনী ও তাদের সমর্থিত আঞ্চলিক দলের প্রভাব রয়েছে। তবে বিএনপি সরকার, জনাব দীপেন দেওয়ান সাহেব এবং ব্যারিস্টার মীর হেলাল ভাই দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে এই অঞ্চলের কোনো পক্ষই বৈষম্যের শিকার হয়েছে বলে মনে হয় না।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আমি মনে করি, জনাব দীপেন দেওয়ান সাহেবের উচিত দ্রুত একটি প্রেস কনফারেন্স করে তার পদত্যাগের প্রকৃত কারণটি পরিষ্কার করা। এতে করে দলের ভেতরের এবং বাইরের অতি-উৎসাহী মহল যারা জলঘোলা করার চেষ্টা করছে, তারা থামতে বাধ্য হবে।

প্রকৃত পক্ষে, পার্বত্য চট্টগ্রামে অনেক বিতর্কিত ও বৈষম্যমূলক আইন রয়েছে, পলিসি রয়েছে । একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারক এবং একজন দক্ষ ব্যারিস্টার যখন এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছিলেন, তখন আমি আশা করেছিলাম যে এই আইনগুলো সংশোধন ও আধুনিকায়ন করা যাবে। কিন্তু অত্যন্ত সম্ভাবনাময় এই জুটির মধ্য থেকে একজনের আকস্মিক পদত্যাগে আমি সত্যিই ব্যথিত ও মর্মাহত।

আশা করি, সব অপপ্রচার বন্ধ হবে এবং পাহাড়ে শান্তি ও উন্নয়নের ধারা বজায় থাকবে।

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: পার্বত্য চট্টগ্রাম, পার্বত্য মন্ত্রী
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন