অসমে ধর্মের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব দেয়ার চেষ্টা মেনে নেয়া হবে না: আমসু

fec-image

ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে ধর্মের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব দেয়ার চেষ্টা হলে কোনোভাবেই তা মেনে নেয়া হবে না বলে ‘অল অসম মাইনরিটি স্টুডেন্টস ইউনিয়ন’ বা ‘আমসু’র পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। জাতীয় নাগরিকপঞ্জি’র (এনআরসি) চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশিত হওয়ার পরে সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ অসম সফরে এসে নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল (ক্যাব) পাসের আশ্বাস দেয়ায় ‘আমসু’র পক্ষ থেকে ওই প্রতিক্রিয়া জানানো হলো।

আজ (বুধবার) ‘আমসু’ উপদেষ্টা আজিজুর রহমান রেডিও তেহরানকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘অসমে অনেক দল ও সংগঠন নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলের বিরোধিতা করেছে। আমরাও নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলের বিরোধিতা করব এজন্য যে, ধর্মের ভিত্তিতে যদি কাউকে নাগরিকত্ব দেয়ার চেষ্টা হয় আমরা তা কোনোমতেই মেনে নিতে পারি না। ভারত ‘সেক্যুলার’ দেশ হওয়ায় সেক্যুলারিজমকে অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে। আমরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্দেশ্যে আহ্বান জানাচ্ছি, ওনারা যেন এরকম সংবিধানবিরোধী বিল যাতে সংসদে উত্থাপন না করেন। এজন্য অসম ও উত্তরপূর্ব ভারতে যাতে বিরূপ প্রতিক্রিয়া না হয় তা লক্ষ্য রাখবেন বলে আমরা আশাবাদী।’

অসমে অমিত শাহ
কেন্দ্রীয় বিজেপি সরকার বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে আসা সংখ্যলঘুদের (হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, জৈন ও পার্সি) ভারতে আশ্রয় দিতে ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইন পরিবর্তন করতে চাচ্ছে। এ সংক্রান্ত বিলে প্রস্তাব করা হয়, ওই তিন দেশ থেকে ভারতে আসা ‘অমুসলিমরা’ ১২ বছরের পরিবর্তে ৬ বছরের মধ্যেই নাগরিকত্ব পাবেন। কিন্তু এভাবে ধর্মীয়ভিত্তিতে নাগরিকত্ব প্রদানের চেষ্টা নিয়ে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। এরফলে স্থানীয় আদি বাসিন্দাদের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হওয়াসহ বিভিন্ন সঙ্কট সৃষ্টি হবে বলে নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলের বিরোধীরা আশঙ্কা করছেন।

ভারতের উত্তর–পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন রাজ্যকে নিয়ে গঠিত বিজেপি নেতৃত্বাধীন নর্থ ইস্ট ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্সের (নেডা) সাম্প্রতিক বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেছেন, ‘নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল (ক্যাব) উত্তর-পূর্বাঞ্চলের স্থানীয় মানুষের সাংস্কৃতিক ও জাতিগত অস্তিত্বের রক্ষাকবচ হিসেবে থাকা বর্তমান আইন ও একইসঙ্গে ৩৭১ ধারাকে ক্ষুণ্ণ করবে না।

কিন্তু গত (সোমবার) অসমে ‘নেডা’র সম্মেলনে নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল আইনে পরিণত হলে এই অঞ্চলের স্থানীয় মানুষের জীবনে চরম হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে মেঘালয়, মিজোরাম ও নাগাল্যান্ডের মুখ্যমন্ত্রীরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

‘নেডা’র সম্মেলনে মিজোরামের মুখ্যমন্ত্রী জোরামথাঙ্গা ‘ক্যাব’-এর আওতা থেকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে বাদ দিতে স্বরাষ্টমন্ত্রীকে অনুরোধ জানিয়ে বলেন, কোনও রাজনৈতিক দল ওই বিল সমর্থন করলে সেটা আত্মহত্যার তুল্য হবে।

মিজোরামের মুখ্যমন্ত্রী জোরামথাঙ্গা
মুখ্যমন্ত্রী জোরামথাঙ্গা বলেন, ‘ক্যাব’ অত্যন্ত স্পর্শকাতর ইস্যু। অধিকাংশ রাজ্যে যেসব রাজনৈতিক দল এটাকে সমর্থন করছে তারা আসলে আত্মঘাতী পথই বেছে নিচ্ছে।

তিনি বলেন, আমরা দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের নিয়ে নানা সমস্যায় ভুগছি। বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীরা উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলোর বিভিন্ন এলাকায় বাস করতে শুরু করেছে। এরফলে স্থানীয় ছেলেমেয়েরা কাজের থেকে বঞ্চিত হওয়াসহ হেনস্থার সম্মুখীন হচ্ছে। ‘ক্যাব’ পাস হলে অনুপ্রবেশকারীরা আমাদের অধিকার ছিনিয়ে নেবে।

নাগাল্যান্ডের মুখ্যমন্ত্রী নেইফিউ রিও বলেন, ‘আমরা মনে করি ‘অত্যন্ত বিতর্কিত’ ‘ক্যাব’ উত্তরপূর্বের জনবিন্যাসই পাল্টে দিতে পারে কেন্দ্রীয় সরকার যদি তা রূপায়ণ করে। আমাদের বাস্তব পরিস্থিতি বোঝার প্রয়োজন রয়েছে বলেও রিও মন্তব্য করেন।

‘নেডা’র সম্মেলনে মেঘালয়ের মুখ্যমন্ত্রী কনরাড সাংমা নাগরিকত্ব আইন নিয়ে উদ্বেগ প্ৰকাশ করে বলেন এই বিল নিয়ে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে একটা ভীতি রয়েছে। ক্যাবের পরে কী ঘটবে? বাংলাদেশ থেকে মানুষের স্রোত বইবে কী? উত্তর-পূর্বের মানুষের মধ্যে এ জাতীয় কিছু ভয়-ভীতি কাজ করছে বলে কারনাড সাংমা মন্তব্য করেন।

তরুণ গগৈ
এদিকে, অসমের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও কংগ্রেসের সিনিয়র নেতা তরুণ গগৈ ‘ক্যাব’-এর বিরোধিতা করে এধরণের বিলে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মানুষদের ক্ষতি করবে বলে মন্তব্য করেছেন।

অন্যদিকে, সারা অসম বাঙালি ছাত্র ফেডারেশনের পক্ষ থেকে গতকাল (মঙ্গলবার) নয়াদিল্লীতে ইন্ডিয়া গেটের সামনে অসমে এনআরসি থেকে বাদ পড়া বিশেষ করে হিন্দুদের নাম বিনাশর্তে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন। সংগঠনটির অন্যতম কর্মকর্তা কমল চৌধুরী বলেন, বিদেশি ট্রাইব্যুনাল ভারতীয় বলে রায় দেয়ার পরেও বহুসংখ্যক হিন্দু বাঙালির নাম এনআরসিতে নথিভুক্ত হয়নি। ভারতীয় হওয়া সত্ত্বেও একজন লোককে কেন ট্রাইব্যুনালের দ্বারস্থ হতে হবে? হয়রানি করার উদ্দেশ্যে সরকার এধরণের পদক্ষেপ নিয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

অসম বিধানসভার ১২৬ আসনের মধ্যে কমপক্ষে ৪৫/৫৫ টিতে বাঙালিদের ভালো উপস্থিতি রয়েছে। হিন্দু বাঙালিরা বিজেপির অন্যতম শক্তি হলেও এনআরসিতে কয়েক লাখ হিন্দু বাঙালির নাম বাদ পড়েছে বলে খবর ছড়ানোয় সংসদে দ্রুত যদি ‘ক্যাব’ না পাস করানো যায় তাহলে রাজ্যে বিজেপির ভিত দুর্বল হয়ে যেতে পারে বলে দলটির মধ্যে আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে।

সূত্র: পারসটুডে

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: অল অসম মাইনরিটি স্টুডেন্টস ইউনিয়ন, আমসু, এনআরসি
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

17 − eleven =

আরও পড়ুন