এবারও অনিশ্চিত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন

fec-image

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় মিয়ানমারের ‘ক্লিয়ারেন্স’ পাওয়া ১ হাজার ৩৭টি পরিবারের ৩ হাজার ৪৫০ জন রোহিঙ্গার মধ্যে ২৩৫টি পরিবারের প্রধান গত দুদিনে সাক্ষাৎকারে অংশ নিয়েছেন। এরা যদি স্বেচ্ছায় স্বদেশ মিয়ানমারে ফিরে যেতে চান, তাহলে তাদের আজ বৃহস্পতিবার (২২ আগস্ট) প্রত্যাবাসন করা হবে।

বুধবার (২১ আগস্ট) সন্ধ্যায় কক্সবাজারে শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. আবুল কালাম সাংবাদিকদের ব্রিফিং করে এ কথা জানান। মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর দমন-পীড়নের মুখে দেশটির রাখাইন রাজ্য থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা জনগোষ্ঠীটির লোকজনকে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার সবশেষ পরিস্থিতি জানাতে নিজের কার্যালয়ে এ ব্রিফিংয়ের আয়োজন করেন আবুল কালাম।

তিনি বলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। টেকনাফ জাদিমুরা শালবাগান থেকে ঘুমধুম পর্যন্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। রোহিঙ্গাদের বহনের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে পাঁচটি বাস এবং তাদের মালামাল পরিবহনের জন্য রয়েছে তিনটি ট্রাক।

মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর বর্বরোচিত দমন-পীড়নের মুখে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে বাংলাদেশ অভিমুখে লাখো রোহিঙ্গার ঢল নামে। এর আগেও বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা। সবমিলিয়ে এখন ১১ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করছে উখিয়া এবং টেকনাফের ৩২টি অস্থায়ী আশ্রয় শিবিরে। মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের এভাবে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য করায় তাদের স্বদেশে ফেরত পাঠাতে বিভিন্নভাবে কূটনৈতিক তৎপরতার শুরু করে বাংলাদেশ।

শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. আবুল কালাম সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন। দু’দেশের জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন হয়। সেই গ্রুপের সিদ্ধান্ত মোতাবেক গত বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি ৩০টি পরিবারের ১৫০ রোহিঙ্গাকে রাখাইনে প্রত্যাবাসনের জন্য ঢাকা-নেপিদো প্রক্রিয়া শুরু করলেও আশ্রিতদের বিক্ষোভের মুখে তা শেষ পর্যন্ত সম্পন্ন হয়নি। এরপর প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া থমকে যায়।

বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিকভাবে কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রাখা হলেও এখন পর্যন্ত একজন রোহিঙ্গাকেও মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো যায়নি। এর ১৮ মাস পর বাংলাদেশের পাঠানো প্রায় ৫৫ হাজার রোহিঙ্গার তালিকা থেকে ৩ হাজার ৪৫০ জনকে ফিরিয়ে নিতে সম্প্রতি সম্মত হয় মিয়ানমার। সেই প্রক্রিয়াই গড়িয়েছে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত।
কিন্তু রোহিঙ্গারা রাজি না হলে বৃহস্পতিবারও প্রত্যাবাসন শুরু করা যাবে কি-না তা নিয়ে সংশয় কাটছে না।

জানা গেছে, রোহিঙ্গাদের নানা দাবীর কারণে অনেকটা অনিশ্চয়তার মধ্যে চলছে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া। প্রত্যাবাসনের তালিকায় থাকা রোহিঙ্গাদের সাক্ষাতকার পর্বের মাধ্যমে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার চুড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে জানিয়েছেন ইউএনএইচসিআর ও শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কার্যালয়ের কর্মকর্তারা।

টেকনাফের নয়াপাড়া শালবন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ২৬নং ইনচার্জ খালেদ হোসেন জানান, মঙ্গলবার ২১ পরিবার ও বুধবার ২১৪ পরিবারে সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। প্রত্যাবাসন তালিকায় থাকা ৩হাজার ৪শ ৫০জনের মধ্যে কয়েকজন রোহিঙ্গাদের সাথে কথা বলতে গেলে নুর হাশেম (৩২) অনেক ভয়ে কথা বলা শুরু করে।

পরে পাশ্ববর্তী স্থানে ওঁৎপেতে থাকা রোহিঙ্গা উগ্রপন্থী সংগঠনের নেতাদের তৎপরতায় ভয়ে পিতার নাম পর্যন্ত বলতে পারেনি।

তাদের দাবী, তাদের কিছু শর্ত রয়েছে যা মানলে তারা মিয়ানমারে ফেরত যেতে রাজী। অন্যথায় তারা ফিরবে না। এমনকি গুলি করে মেরে ফেললেও তারা শর্তপূরণ ছাড়া ফিরতে রাজী নয়।

এনভিসি কার্ড নয় সরাসরি নাগরিকত্ব প্রদান, ভিটে-বাড়ি ও জমি-জমা ফেরত, আকিয়াব জেলায় আশ্রয় শিবিরে থাকা রোহিঙ্গাদের নিজ বাড়ীতে ফেরত, কারাগারে বন্দী রোহিঙ্গাদের মুক্তি, হত্যা, ধর্ষণের বিচার, অবাধ চলাফেরা, নিরাপত্তা প্রদানসহ একাধিক শর্ত পূরণ না হলে স্বদেশ ফিরবে না রোহিঙ্গারা।

ক্যাম্প কর্তৃপক্ষ ও ইউএনএইচসিআর’র লোকজন রোহিঙ্গাদের ঘরে ঘরে গিয়ে জানিয়ে দিচ্ছে ২২ আগস্ট স্বদেশে ফিরে যাওয়ার বার্তা। এসময় অনেক রোহিঙ্গা ঘর ছেড়ে পালিয়ে যান। আবার অনেকে এসব শর্ত জুড়ে দেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সম্ভ্রান্ত কয়েকজন রোহিঙ্গা বলেন, যারা আরাকানে ৬টা ছাগল চড়ায়নি তারাও এখানে ১শ’র বেশি রোহিঙ্গা পরিবারের মাঝি গিরি করছে। তাদের কারণে আমরা নিজ দেশে ফিরতে পারছি না।

প্রত্যাবাসনের তালিকায় থাকা মো. জুবাইর জানান, ইউএনএইচসিআর’র একটি প্রতিনিধি দল সকালে এসে পারিবারিক ডাটা কার্ড খুঁজে। প্রত্যাবাসনের বিষয়ে কিছু জানায় নি। পরে জানতে পারি প্রত্যাবাসনের তালিকায় আমার নাম রয়েছে।

মিয়ানমারের বুচিডং চাংচিপ্রাং এলাকার জোবাইর স্বদেশ ফিরবে কিনা এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি কয়েকটি শর্ত জুড়ে দিয়ে বলেন, নিজের দেশে ফিরতে ব্যাকুল হয়ে আছি। নাগরিকত্ব, ভিটে-বাড়ি ও জমি-জমা ফেরত, অবাধ চলাফেরা ও নিরাপত্তা দিলেই ফিরব। এভাবে গেলে মরণ নিশ্চিত। এরচেয়ে এদেশে মৃত্যুই ভাল হবে।

তালিকায় থাকা হাসিনা বেগম বলেন, স্বামী-সন্তানদের নিরাপত্তা কে দিবে? ওখানে গিয়ে আশ্রয় শিবিরে রাখবে, অবাধ চলাফেরা করা যাবে না, রোহিঙ্গা স্বীকৃতি দেবেনা, তবে কি নিয়ে আমরা স্বদেশ ফিরব।

প্রত্যাবাসন তালিকায় নাম থাকা আরেক রোহিঙ্গা বলেন, একদিন আগেমাত্র সকালে ক্যাম্প ইনচার্জের প্রতিনিধিরা ঘরে এসেছেন। তারা বলেছেন তালিকায় আমার পরিবারের নাম রয়েছে। সাক্ষাৎকার দিতে বিকালে ক্যাম্পে যাওয়ার জন্য বলেছেন। কিন্তু আমরা মিয়ানমারে ফেরত যাবো না। যে দেশ থেকে নির্যাতনের শিকার হয়ে এসেছি, সেখানে ফিরে যেতে চাই না। নির্যাতনের বিচার পেলেই কেবল ফিরে যাবো।

একই ব্লকের জয়নব বেগম বলেন, মিয়ানমার সরকারকে বিশ্বাস করা যায় না। এর আগেও তারা অনেকবার বিশ্বাস ভঙ্গ করেছে। তাই সরাসরি নাগরিকত্ব প্রদান করলেই আমরা ফিরতে পারি।

শালবন ক্যাম্পের ডি ব্লকের রোহিঙ্গা মাঝি নুর মোহাম্মদ রোহিঙ্গাদের দাবীর সাথে একমত পোষণ করে বলেন, মিয়ানমারে ১৩৫টি জাতিগোষ্ঠীর মতো রোহিঙ্গাদের স্বীকৃতি দিতে হবে। পূর্ণ নাগরিকত্ব দিয়ে গোটা মিয়ানমারে অবাধে চলাফেরার স্বাধীনতা দিতে হবে।

এদিকে প্রত্যাবাসনের তালিকায় থাকা কিছু রোহিঙ্গা মঙ্গলবার ও বুধবার ২৬ নং ক্যাম্পের সিআইসি (ক্যাম্প ইনচার্জ) অফিসের কাছে বিক্ষোভ করেছে। এসময় নিজেদের দাবী তুলে ধরে বেশ কিছুক্ষণ বিক্ষোভ করেন রোহিঙ্গারা। বিক্ষোভে অংশ নেওয়া মোস্তফা কামাল, শফিকা একই শর্ত জুড়ে দেন।

আবার সাধারণ রোহিঙ্গাদের কেউ কেউ জানান, ক্যাম্পে তারা স্বাধীন মতামত দিতে পারছেন না। রোহিঙ্গা স্বশস্ত্র গ্রুপ সবসময় তাদের উপর নজরদারী করেন।

এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনকে এগিয়ে নিতে ইউএনএইচসিআর ও সরকারের পক্ষ থেকে ক্যাম্পের অভ্যন্তরে রোহিঙ্গাদের কাছে লিফলেট বিতরণ করেছে।
লিফলেটে স্বদেশ ফিরে গিয়ে কোথায়, কিভাবে রাখা হবে এবং পরবর্তীতে কি কি করণীয়, সে সম্পর্কে ধারণা রয়েছে।

প্রত্যাবাসনের জন্য টেকনাফের কেরুনতলী ও নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুমে দুটি ট্রানজিট ঘাট আগেই তৈরি করা ছিল। বাকী ছিল তালিকায় থাকা রোহিংগাদের সাক্ষাৎকার পর্ব তথা মতামত নেয়া।

প্রসঙ্গত, ২০১৭ সালে ২৫ আগস্ট রাখাইনের নিরাপত্তা চৌকিতে একযোগে হামলার ঘটনা ঘটে। প্রতিক্রিয়ায় মিয়ানমার সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন শুরু করে। ফলে প্রাণ বাঁচাতে প্রায় সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা। পুরনোসহ উখিয়া-টেকনাফের ৩৩টি ক্যাম্পে এখন ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে।

তবে জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, এই সংখ্যা ১১ লাখ ৮৫ হাজার ৫৫৭। তাদের মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যাই বেশি।

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: রোহিঙ্গা ক্যাম্প, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

three × 4 =

আরও পড়ুন