পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি অস্তাচলে-৩ (শেষ পর্ব)

পানছড়ির জীবনম্বয়ীর মতো কত পাহাড়ি তরুণীর স্বপ্ন যে ভেঙে যাচ্ছে তার হিসাব কেউ জানে না

fec-image

রাজীব চাকমাকে গ্রেফতার করা খুবই জরুরী হয়ে পড়েছে। পানছড়ির শক্তির ভর কেন্দ্র কলেজ গেট এলাকায় তার সশস্ত্র মহড়ায় এরই মধ্যে দু’জন মারা গেছে। কিন্তু রাজীবকে সামনে পেলেও চিনবো কেমন করে? ওতো আমাদের এক টহল দলের সামনে পড়ার পরেও তাকে না চেনার কারণে একবার হাত ফসকে বেরিয়ে গেছে। মজার ব্যাপার হলো লতিবান এলাকায় একটা চায়ের দোকানে আড্ডারত কয়েক যুবককে দেখে টহল অধিনায়ক রাজীবকেই জিজ্ঞেস করে, ‘তোমার নাম কি?’

রাজীব যথেষ্ট আত্মপ্রত্যয়ের সাথে অন্য একটি নাম বলে নিজের পরিচয়কে আড়াল করে সেখান থেকে সটকে পড়ে। দোকানী ও অন্য যুবকদের চোখে মুখে এমন একটা ভাব যেন রাজীব কোন ওসামা বিন লাদেন, যাকে তাদের চেনা তো দূরের কথা জন্মেও ও রকম নাম শুনেনি।

রাজীব দেখতে কেমন, তার চলন-বলন কেমন, তার একটা ধারণা পেতে রাজীবের বাড়িতে একটা সার্চ অপারেশনের পরিকল্পনা করি। যদি তার বাড়িতে কোনো ছবি পাওয়া যায়। তাছাড়া তার বাড়িতে গেলে ওর উপর মানসিক চাপ বাড়বে। এসব ভেবেই এক মধ্যরাতে তার বাড়ির চারপাশে অবস্থান নেই। লতিবান ব্রিজ পেরিয়ে হাতের বামে বেশ কিছুদূর গেলেই রাজীবের পাড়া। মাটির বাড়ি, চারপাশে প্রতিবেশীদের বাড়িগুলো একটু দূরে দূরে। তাই কুকুরের উপদ্রুব নেই। পথ প্রদর্শককে দিয়ে স্থানীয় একজন মুরুব্বিকে তার বাড়ি থেকে ডেকে আনি, ঘরে ঢুকবো বলে।

তল্লাশীর সময় তিনি আমাদের সাথে থাকবেন। এটা সতর্কতামূলক ব্যবস্থা, তা নাহলে দেখা যাবে, সকালেই খাগড়াছড়িতে খবর যাবে। তারপর হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সোনালী চাকমা সংবাদ সম্মেলন করে বলবে-
১. রেইপ করেছি।
২. গলার হার ছিনিয়ে নিয়েছি।
৩. মারধর করেছি।
৪. হালের বলদ নিয়ে গেছি ইত্যাদি ইত্যাদি।

মুরুব্বিকে সাথে নিয়ে রাজীবের উঠোনে এসে দাড়াঁলাম। সদ্য তোলা মাটির দেওয়াল ঘরের বাড়ি। এখনো অনেক কাজ বাকী। কাঠের দু’পাট করা জানালার ফাঁক দিয়ে ঠিকড়ে বের হচ্ছিলো আলো।
এত রাতে ঘরে আলো জ্বলছে দেখে কৌতূহলের মাত্রা বেড়ে গেল। জানালার ফাঁক দিয়ে চোখ গলিয়ে দিলাম-
২২/২৩ বছরের এক তরুণী মা বিছানায় বসে এক দৃষ্টিতে বাতির দিকে তাকিয়ে আছে। এক হাতে পায়ের নখ খুঁটছে। কুপির আলো কেঁপে কেঁপে তার মুখে পড়ছে, খুবই বিষণ্ন মুখ। তার দুটো বাচ্চার একটি ঘুমিয়ে, আরেকটি মায়ের সাথে জেগে আছে।
এতো রাতে এখনো ঘুমায়নি কেন? ও কি ভাবছে এতো গভীর রাতে?

মুরুব্বিকে ইশারায় ডেকে দরজায় টোকা দিতে বলি। আমরা কেউ ডাকলে তরুণী মায়ের মনে আতংক ঢুকে যাবে। তিনি বার কয়েক কাশি দিয়ে দরজার লোহার ছিটকিনি নাড়িয়ে আওয়াজ করলেন, আর মেয়েটিকে নাম ধরে ডাকলেন, ‘জীবনম্বয়ী,  দরহান খোল, ইদু আর্মি এইজজুন, তোর লগে আর্মিগুন কথা খবাক।’ একটু বিরতি দিয়ে দ্বিতীয়বার একই প্রক্রিয়ায় তিনি মেয়েটিকে ডাকলেন।

একটু পর খুট করে শব্দ করে দরজাটা খুলে হাতে কুপি নিয়ে জীবনম্বয়ী দেখা দিলো। এরই মাঝে মুরুব্বি জানালেন, রাজীবের বাবা এঘরেই থাকে, প্রায় অন্ধ এবং কানেও কম শুনে।
তার ঘরে প্রবেশ করে এতো রাতে এখনো কেন জেগে আছে জিজ্ঞেস করলাম,
‘এদো রেদোত কি গরর? এতক্ষণ কি ঘুম ন জর?’

তাকে অভয় দিলাম, তোমার স্বামী সম্পর্কে একটু কথা বলবো। আমার পাশের রুমেই বেড়ায় ঠেস দিয়ে ওয়ার্লেস অপারেটরকে বসিয়ে জীবনম্বয়ীর সাথে কথা বলা শুরু করলাম।
একটু একটু করে আমার প্রশ্নের জবাবের পরিপ্রেক্ষিতে তার জীবন-সংগ্রামের চিত্র ফুটে উঠতে থাকলো। বাচ্চাদের নিয়ে তার উৎকণ্ঠা, রাজীবের মৃত্যু আশংকাজনিত কারণে উদ্বেগ ও হতাশাই তার নিদ্রাহীনতার কারণ। একাই সামলে যাচ্ছে পরিবার। ঘরের এবং বাইরের সব কাজ তাকে একাই করতে হয়। হলুদ ক্ষেতের পরিচর্যা, পানি তোলা, রান্না, নিজের দুটি শিশু আর অন্ধ শ্বশুরের দেখাশোনাসহ দৈনন্দিন সব কাজের দায়িত্ব তার ওপর।

খোলামেলা আলাপে এক পর্যায়ে সে বেশ সহজ হয়ে উঠলো। আমিও সে সুযোগে রাজীবকে নিয়ে প্রশ্ন করতে লাগালাম, রাজীবের ইউপিডিএফে যোগদানের কারণ, তার সাথে রাজীবের বিয়ের পূর্বাপর কাহিনী, এখনকার দাম্পত্য জীবনসহ অনেক কিছুই জানা গেল। আরো জানতে পারলাম, রাজীবের অস্ত্র বহনের পদ্ধতি এবং কোথায় সে দেখা করে এসবও।

জীবনম্বয়ীকে রাজীব অনেকটা জোর করে দলের প্রভাব খাটিয়ে বিয়ে করে। জীবনম্বয়ী এসএসসি পাশ করেছে। বিয়ের কারণে এবং রাজীবের পার্টি  করার কারণে সে লেখাপড়াকে আর এগিয়ে নিতে পারেনি।

রাজীবের খুনাখুনির জীবন নিয়ে সে খুবই আতঙ্কিত। তার এসব অপছন্দ।
আমি তার মানসিকতা বুঝতে পেরে রাজীবকে আত্মসমর্পণ করানোর ব্যাপারে রাজী করাতে তার সহযোগিতা চাইলাম।

কথায় কথায় বুঝতে পারলাম, আমার ওপর জীবনম্বয়ীর কিছুটা আস্থা জন্মেছে, সে কারণেই আমি বলি, ‘আমাদের কাছে আত্মসমর্পণ করলে সে বড়জোর জেলে যাবে, কয়েক মাস পরে ছাড়া পাবে। কিন্তু এভাবে প্রকাশ্যে থাকলে আজ হোক কাল হোক সে তার প্রতিপক্ষের হাতে মারা পড়বে। এতে তার সন্তানদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মাঝে পড়বে।’

জীবনম্বয়ী সে কথা জানে, ‘আর্মির হাতে পড়লে তো তোমরা ওকে অ্যারেস্ট করবে, কিন্তু ওদের (জেএসএস) হাতে পড়লে তো ওকে আর আস্ত রাখবে না।’

দীর্ঘ আলাপচারিতায় রাত প্রায় শেষ অধ্যায়ে পৌঁছায়। আমি তাকে আমার লেখা একটি চিঠি রাজীবকে দেওয়ার জন্য প্রস্তাব করি এবং রাজীবকে আস্থায় আনার জন্য তাকে ভূমিকা রাখতে বলি।

ঘণ্টা তিনেক আলোচনার পরম নিজেকে একজন ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট মনে হতে লাগলো। একেবারে অচেনা অজানা উর্দিপরা একজন সেনাকর্মকর্তার কাছে জীবনম্বয়ী এতো তাড়াতাড়ি সব মনের কথা শেয়ার করেছে, এটা ভেবে সারারাতের ঘুম বিসর্জনকে অহেতুক মনে হয়নি।

তবে আমি চিঠি লিখে প্রস্তাব করলে কালকেই রাজীব নাচতে নাচতে অস্ত্র ছেড়ে দেবে, তেমন প্রত্যাশা আমি করিনি। কারণ, যে একবার অস্ত্র হাতে নিয়ে অপরের জীবন সংহার করেছে, তার পক্ষে অস্ত্রের উপর নির্ভরশীলতা ত্যাগ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা সহজ নয়। কেননা, অস্ত্র মানুষের স্বাভাবিক নৈতিক সাহসের উৎস বিবেক-বিবেচনাবোধ কে নষ্ট করে দেয়।

বহু বছর আগে মমতাজউদ্দীনের লেখা বিটিভির স্বর্ণ যুগের, ‘আমাদের মন্টু’ নামক নাটকের একটি সংলাপে আসাদুজ্জামান নূরকে বলতে শুনেছিলাম,
‘আমার বাবার একটি বন্দুক আছে, বন্দুক হাতে নিলে কিন্তু বেশ লাগে, বুকের মাঝে একসাথে জমা হয় অনেক সাহস।’

হঠাৎ করে সে সাহসের উৎসকে মাড়িয়ে গান্ধীর মতো অহিংসার পথ ধরা অচিন্তনীয়। সন্ত্রাসের পথ একটা একমুখ বদ্ধ টানেলের মতো, একবার প্রবেশ করলে আর ফেরার পথ থাকে না।

ভোরের দিকে নিজের নোট বুকের পাতায় রাজীবকে উদ্দেশ্য করে তার স্ত্রীর সাথে আমার আলাপচারিতার কথা উল্লেখ করে আমার প্রস্তাবটি নিয়ে ভাবনাচিন্তা করতে বলি। একই সাথে পরবর্তী চিঠিতে বিস্তারিত লিখে জানাবো, এরকম একটা একমুখী প্রস্তাব রেখে কারো নজরে পড়ার আগেই রাজীবের গৃহ ত্যাগ করি।

চিঠি পড়ে রাজীব একেবারে গলে যাবে সে আশা না করলেও এটা ভেবে স্বস্তি পেলাম, যাক, সে ভাবুক, আমি ওর বাড়ির উঠোন ছেড়ে ওর ভাবনাচিন্তার উঠোনে স্থান করে নিয়েছি।
ব্যক্তি মানুষের মন থেকে সন্দেহ ও সংশয় দূর করে তাকে আত্মসমর্পণ পরবর্তী সময়ে সহায়তা দেওয়ার প্রশাসনিক সক্ষমতা তো আমার নেই। তারপরও যদি একটু একটু করে ওর ভাবনাচিন্তার জগতে পরিবারের ভবিষ্যতের কথা মনে আসে সেটাই বা কম কী।
তাছাড়া, একটি রাজীবকে অস্ত্রহীন করা গেলে পানছড়ির কলেজ গেট এলাকায় সেই ২০০৩ সালের আগস্টের সন্ধ্যায় দেখা বিধানের বুক থেকে গড়িয়ে পড়া রক্তের শ্রোত তো কিছুটা হলেও কমবে।

দিন দশেক পরে সোর্সের মাধ্যমে খবর পেলাম রাজীব চিঠি পেয়েছে, চিঠি পড়ে তার ছোট্ট মন্তব্য ছিলো, ‘এটা কী করে সম্ভব হবে?’

আমি এবার অনেক দীর্ঘ একটা টাইপ করা চিঠি লিখি। এ চিঠিতে তিনটি অংশ ছিলো:
মানবিক অংশ: পরিবারের বর্তমান দুঃখ-দুর্দশার বিবরণ।
আইনী অংশ: কী মামলা হতে পারে এবং কীভাবে সে তা মোকাবিলা করবে।
শেষ অংশে ছিল পুনর্বাসন প্যাকেজ।
এবার উওর পেলাম, ‘আচ্ছা আমি ভেবে দেখবো।’

এরপর বেশ কিছু দিন ইউপিডিএফের কার্যক্রমে একটু ধীর ভাব ছিলো। আমার সোর্সের পর্যবেক্ষণ, “ওরা দীঘিনালা-মহালছড়িতে বিশেষ অভিযানে আছে, ওর ভাষায় ‘ক্ষেপ খেলতে’ গেছে।”

এদিকে আমারও খেলার সময় ফুরিয়ে গেছে। অনেকদিন পর মিলিটারি সচিব আমার ফাইল খুঁজে দেখেন, পাহাড়ের দ্বিতীয় অধ্যায়ে আমি ইতোমধ্যে তিন বছর পার করে ফেলেছি।
‘ওরে ঢাকায় নিয়ে আসো, ওর তো শিকড় গজায় গেছে।’

রাজীবের সন্ত্রাসের শিকড় কাটার সাফল্য অর্জন করতে পারিনি। আমি চলে আসার কয়েক বছর পর সন্ত্রাসের অবধারিত পরিণতি সন্ত্রাসের মৃত্যুই সে বরণ করে। ঢাকায় বসে যখন তার মৃত্যু সংবাদ পাই, তখন আমার মনের পর্দায় মধ্যরাতে ২৩ বছরের জীবনম্বয়ীর ঘুমহীন সেই মুখচ্ছবিটাই ভেসে উঠেছিলো। যার একটি ছোট্ট স্বপ্ন ছিলো সবুজ পাহাড়ের ঢালে স্বামীকে নিয়ে একটা জুম ঘরে শান্তিতে ঘুমাবে বলে,
‘আশা ছিলো মনে মনে প্রেম করিমু তোমার সনে
তোমায় লইয়া ঘর বান্ধিমু গহীন বালু চরে, গহীন বালু চরে।’

১৯৯১ সালে তরুণ অফিসার হিসেবে যখন প্রথমবার পাহাড়ে যাই, তখন পাহাড়িদের দল ছিলো একটি ‘জেএসএস (জন সংহতি সমিতি)। দ্বিতীয় বার ( ২০০৩) গিয়ে দল পেলাম দুটি, নতুন করে যুক্ত ইউপিডিএফ (ইউনাইটেড পিপলস অব ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট )।

এই লেখাটি যখন লিখছি, তখন পাহাড়িদের দল চারটি: জেএসএস (সন্তু), জেএসএস (সংস্কারপন্থী), ইউপিডিএফ (প্রসীত) এবং ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক)। এই চার দলের খুনোখুনিতে পানছড়ির জীবনম্বয়ীর মতো এরকম কত শত পাহাড়ি তরুণীর স্বপ্ন যে ভেঙে যাচ্ছে, তার হিসাব কেউ জানে না।

পানছড়ির পশ্চিমে সন্ধ্যায় ঢলে পড়া ২০০৩ সালের ২৭ আগস্টের সূর্যটাকে আমার এ কারণেই অস্তাচলে ঢলে পড়া শান্তি মনে হয়।।

(ঢাকা, ১৮-০২-২০২২)

লেখকের আরো লেখা পড়ুন

দিনের আলোয় বিদ্বেষ ছড়ালেও রাতে সেনাবাহিনীর কাছে নিরাপত্তা চাইতেন জেএসএস নেতা

ইউপিডিএফ ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে গেল আজকের হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে

পাহাড়ের লাভ জিহাদ এবং ধর্মান্তকরণের ফ্যাক্ট ও মিথের চিত্র

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nineteen − 4 =

আরও পড়ুন