পার্বত্যবাসীর অকৃত্রিম বন্ধু এবং মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ড. ফেরদৌস আহমেদ কোরেশী আর নেই

fec-image

প্রথিতযশা সম্পাদক-সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ড. ফেরদৌস আহমেদ কোরেশী আর নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সাবেক ভিপি এবং ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সভাপতি ছিলেন তিনি। সবশেষ প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক দলের (পিডিপি) চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে তাঁর আরো একটি পরিচয়, তিনি ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসীদের অকৃত্রিম বন্ধু।

সোমবার ৩১ আগস্ট ২০২০ দুপুর আড়াইটায় অসুস্থ অবস্থায় রাজধানীর ক্যান্টমেন্টের ভাড়া বাসায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। ইন্নালিল্লাহি ওয়াইন্নইলাহি রাজিউন।

ড. ফেরদৌস আহমদ কোরেশীর বড় মেয়ে অনিন্দিতা শবনম তার বাবার মৃত্যুর তথ্য গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, বাসায় অসুস্থ হয়ে পড়লে বাবাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানকার কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

ড. ফেরদৌস আহমেদ কোরেশীর জন্ম ১৯৪১ সালের ১৪ জানুয়ারি। ষাটের দশকের মেধাবী ছাত্রনেতা ড. কোরেশী তৎকালীন অবিভক্ত পাকিস্তান ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন। এরপর তিনি ১৯৬১ সালে ডাকুসর ভিপি নির্বাচিত হন। জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশে তার অবদান ছিল অসামান্য। ৬ দফা ও ১১ দফাভিত্তিক ছাত্র ও গণআন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে ফেরদৌস আহমেদ কোরেশী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মুক্তাঞ্চল থেকে মুক্তিযুদ্ধের মুখপাত্র হিসেবে দৈনিক দেশবাংলা পত্রিকা বের করেন ড. কোরেশী। ওই সময় থেকেই তিনি পত্রিকাটির সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন।

সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) গঠন করলে ওই দলের প্রথম যুগ্ম মহাসচিব পদে ছিলেন ড. কোরেশী। ২০০৭ সালে তিনি প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক দল (পিডিপি) দল গঠন করেন। আমৃত্যু তিনি দলটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন।

২০১৫ সালের ২১ অক্টোবর ব্রেন স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন কোরেশী। প্রায় অর্ধমাস ওই হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে ছিলেন। এরপর থেকে বিছানা হয় তার একমাত্র ঠিকানা। শরীরের একটি অংশ অচল হয়ে পড়লে শেষ দিনগুলোতে ইশারায় কথাবার্তা বলে অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়েছে একসময়ের মাঠ কাঁপানো এই ছাত্রনেতাকে।

ড. ফেরদৌস আহমেদ কোরেশীর কয়েকটি প্রবন্ধ


আদিবাসী প্রসংগে কিছু কথা

পার্বত্য চট্টগ্রামে মেডিকেল কলেজ ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রসঙ্গে

পার্বত্য চট্টগ্রাম, খ্রিস্টান মিশনারি ও বৌদ্ধধর্মের ভবিষ্যৎ-১

পার্বত্য চট্টগ্রাম, খ্রিস্টান মিশনারি ও বৌদ্ধধর্মের ভবিষ্যৎ-২

পার্বত্য চট্টগ্রাম, খ্রিস্টান মিশনারি ও বৌদ্ধধর্মের ভবিষ্যৎ-৩


ড. ফেরদৌস আহমেদ কোরেশী ছাত্র জীবন থেকেই পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসীদের সাথে পরিচিত ছিলেন। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘পঞ্চাশের দশকের শেষ দিকে আমি যখন চট্টগ্রাম কলেজে ভর্তি হই তখন ১০-১৫ জন চাকমা ছাত্র আমাদের সতীর্থ ছিল। এর মধ্যে একজন ছিল আরএল খিসা, সম্পর্কে মানবেন্দ্র লারমার চাচা। খিসা খুব ভালো কবিতা লিখত।’

ড. কোরেশী আরো লিখেছেন,‘নানা কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রতি আমার বিশেষ দুর্বলতা ও সহমর্মিতা রয়েছে। ১৯৬১-৬২ সালের দিকে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কারণে প্রকল্প এলাকায় নদীর পানি জমে বিশাল জলাধার তৈরি হয়, এতে চাকমা সম্প্রদায়ের একটা বড় অংশ তাদের জোতজমি হরিয়ে সর্বশান্ত হয়। পাকিস্তান সরকার তাদের ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের জন্য যে অর্থ বরাদ্দ করেছিল, সেটাও তাদের হাতে ঠিকভাবে পৌঁছেনি। এই ক্ষতিগ্রস্ত পাহাড়িদের দুর্দশার চিত্র তুলে ধরে একটি প্রচারপত্র বিলি করেছিলেন মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা। লারমা তখন চট্টগ্রাম কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র। এই প্রচারপত্র বিলির অভিযোগে ‘ডিফেন্স অফ পাকিস্তান রুলস’ (ডিপিআর)-এ তাকে গ্রেফতার করে। আমি তখন চট্টগ্রাম কলেজেই চতুর্থ বর্ষের ছাত্র। চাকমা ছাত্ররা লারমার মুক্তি দাবি করে একটি বিবৃতি দেয়ার জন্য রাজনৈতিক নেতাদের কাছে ধরণা দেন। কিন্তু কেউ সে সময় এ ব্যাপারে মুখ খুলতে চাননি। তখনকার দিনে ইত্তেফাকের চট্টগ্রাম প্রতিনিধি ছিলেন অগ্রজ-প্রতিম মঈনুল আলম। এখন তিনি কানাডায় অবসর জীবনে আছেন। তার অনুপ্রেরণায় আমি চট্টগ্রামের ছাত্রসমাজের পক্ষ থেকে চাকমা সম্প্রদায়ের সমস্যা তুলে ধরে এবং লারমার মুক্তির দাবি করে একটি বিবৃতি দিয়েছিলাম। বিবৃতিটি বেশ ফলাও করে দৈনিক ইত্তেফাকে ছাপা হয়েছিল।‘

ড. কোরেশী একজন ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে সব সময় পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা ও রাজনীতি সম্পর্কে সব সময়ই ছিলেন অত্যন্ত সচেতন। শুধু যে পার্বত্য পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে গেছেন তাই নয়, বরং যখনই প্রয়োজন মনে করেছেন তখনই মতামত দিয়েছেন, বিশ্লেষণ করেছেন, করণীয় সম্পর্কে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। নিজের অভিজ্ঞতা ও বিচক্ষণতা দিয়ে সমস্যা সমাধানের পথ অনুসন্ধান করেছেন। তিনি মতামত প্রকাশের সময় পাহাড়ি এবং বাঙালিকে আলাদাভাবে দেখতেন না, বরং সবাইকে সমান মনে করতেন, সবাইকে ভালোবাসতেন। নিজের বিবেকের কাছে যা সত্য ও ন্যায় মনে করতেন তাই লিখতেন, সেভাবেই মতামত বিশ্লেষণ করতেন। পার্বত্যনিউজের আর্কাইভে তার কিছু গুরুত্বপূর্ণ মতামত ও বিশ্লেষণ সংরক্ষিত আছে।

পার্বত্যবাসীদের অকৃত্রিম বন্ধু ড. ফেরদৌস আহমেদ কোরেশীর মৃত্যুতে আমরা গভীর শোক প্রকাশ করে তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। পাশাপাশি মরহুমের পরিবার-পরিজনদের জন্য সমবেদনা প্রকাশ করছি।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

14 + 7 =

আরও পড়ুন