বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার প্রত্যাশা অনেক

fec-image

বাংলাদেশ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার অ্যাগ্রিমেন্ট অন বিডি-ইউএস রেসিপ্রোকাল ট্রেড মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পণ্য রফতানিতে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখাসহ বিশ্বের সাথে বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও সার্বিকভাবে অর্থনৈতিক সুফল বয়ে আনবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস।

রোববার (১৫ ফেব্রুয়ারি) রাতে এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে তিনি এমন আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

বাংলাদেশের শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়া পণ্যের তালিকায় বিভিন্ন ধরনের ওষুধ, কৃষিপণ্য, প্লাস্টিক, কাঠ ও কাঠজাত পণ্য রয়েছে বলে জানান তিনি।

জানা যায়, বাংলাদেশের ট্যারিফ লাইনে মোট পণ্যের সংখ্যা ৭ হাজার ৪৫৮টি। এর মধ্য থেকে ৩২৬টি বাদে যুক্তরাষ্ট্রের সব পণ্যকে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেবে বাংলাদেশ। গত ৯ ফেব্রুয়ারি চুক্তি সইয়ের আগে যুক্তরাষ্ট্রের ৪৪১টি পণ্য বাংলাদেশে শুল্কমুক্ত সুবিধা পেত।

যুক্তরাষ্ট্রকে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়া ৭ হাজার ১৩২টি পণ্যের মধ্যে চুক্তি সইয়ের দিন থেকেই ৪ হাজার ৯২২টি পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা কার্যকর করেছে বাংলাদেশ।

বাকিগুলোর মধ্যে ১ হাজার ৫৩৮টি পণ্যের শুল্কহার পাঁচ বছরের মধ্যে শূন্য করা হবে। এর মধ্যে প্রথম বছর শুল্কহার ৫০ শতাংশ কমানো হবে। পরের চার বছরে বাকি ৫০ শতাংশ সমানুপাতিক হারে কমিয়ে শূন্যে নামানো হবে।

আর ৬৭২টি পণ্যের শুল্কহার ১০ বছরের মধ্যে শূন্য করবে বাংলাদেশ। এর মধ্যে প্রথম বছর ৫০ শতাংশ শুল্ক হ্রাস করাসহ পরের নয় বছরে অবশিষ্ট ৫০ শতাংশকে সমানুপাতিক হারে কমিয়ে শূন্য করা হবে।

ফেসবুক স্ট্যাটাসে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে যেসব পণ্য ক্রয়ের অঙ্গীকার করেছে, সেসব পণ্য অন্য উৎস থেকে কেনা হয়। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের প্রধান গন্তব্য বিধায় সে বাজার ধরে রাখার জন্য তাদের বাজার থেকে ক্রয়ের অঙ্গীকার করা হয়েছে; এতে বাংলাদেশের অতিরিক্ত ব্যয় হবে না। শুধু উৎসের পরিবর্তনের মাধ্যমে দেশের রফতানি বাজার সুরক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র এ পর্যন্ত মালয়েশিয়া, যুক্তরাজ্য, সুইজারল্যান্ড ও বাংলাদেশসহ প্রায় ১৫টি দেশের সঙ্গে পাল্টা শুল্ক (রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ) চুক্তি করেছে জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা লিখেছেন, যেসব চুক্তি অনলাইনে উন্মুক্ত করা হয়েছে তার মধ্যে মালয়েশিয়া ও কম্বোডিয়ার সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তির সঙ্গে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন বিডি-ইউএস রেসিপ্রোকাল ট্রেড’-এর (এআরটি) কতিপয় মিল রয়েছে।

তবে কয়েকটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে। যেমন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মালয়েশিয়া ও কম্বোডিয়ার সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তিতে বলা হয়েছে, ওই দুটি দেশ ডিজিটাল ট্রেড-সংক্রান্ত কোনো চুক্তি সই করতে চাইলে সেক্ষেত্রে তাদেরকে উক্ত চুক্তি স্বাক্ষরের আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চূড়ান্তকৃত এআরটির খসড়ায় এ ধরনের কোনো বিধান নেই।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ যে চীন, রাশিয়াসহ নন-ইকোনমিক মার্কেটের দেশগুলোর সঙ্গে কোনো বাণিজ্য চুক্তি করতে পারবে না, সে বিষয়ে কোনো কিছুর উল্লেখ করেননি প্রধান উপদেষ্টা।

তিনি লিখেছেন, রুলস অভ অরিজিনের টেক্সটের মধ্যে বিদেশি বা স্থানীয় মূল্য সংযোজনের পরিমাণ নির্ধারিত নেই। ফলে টেক্সট অনুযায়ী পণ্য রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়া সহজ হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদিত তুলা ও কৃত্রিম তন্তু ব্যবহার করে উৎপাদিত পণ্য দেশটিতে রফতানির ক্ষেত্রে পণ্যের শুল্কমুক্ত সুবিধা প্রদানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

এআরটির আওতায় গুরুত্ব পাওয়া বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে কাগজবিহীন বাণিজ্য, মেধা সম্পদ অধিকার নিশ্চিতকরণ, ই-কমার্স লেনদেনের ওপর কাস্টমস শুল্ক আরোপে স্থায়ী স্থগিতাদেশ, বাণিজ্যে কারিগরি ও অশুল্ক বাধা কমানো, বাণিজ্য সহজীকরণ, কনফর্মিটি অ্যাসেসমেন্ট সার্টিফিকেট, সুশাসন, এবং পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর, ফুয়েল রড বা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ক্রয়। এছাড়া ৯টি আইপিআর-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক কনভেনশনে সমর্থন দিতেও নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে বাংলাদেশ।

এ চুক্তিতে ই-কমার্সে শুল্ক আরোপে স্থায়ী স্থগিতাদেশকে সমর্থন দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র থেকে চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ফার্মাসিউটিক্যালস আমদানিতে ইউএস ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যামিনিস্ট্রেশনের (এফডিএ) সনদ থাকা সাপেক্ষে মার্কেট অথরাইজেশনের জন্য পূর্বানুমতির প্রয়োজন হবে না।

পুনরুৎপাদন করা পণ্য আমদানিতে নিয়ন্ত্রণ আরোপ না করা; খাদ্য ও কৃষিপণ্য আমদানিতে যুক্তরাষ্ট্রের স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারি উদ্যোগকে স্বীকৃতি প্রদান; ডেইরি পণ্য, মাংস ও পোল্ট্রি পণ্য আমদানিতে মার্কিন সনদকে স্বীকৃতি প্রদানের বিষয়সমূহের উল্লেখ রয়েছে চুক্তিতে।

কৃষি বায়ো-টেকনোলজি নিবন্ধন প্রক্রিয়া নির্দিষ্ট সময়ে সম্পন্ন, উক্ত প্রযুক্তির খাদ্য ও কৃষিজাত পণ্যকে (নন-লিভিং মডিফাইড অরগানিজম না থাকা শর্তে) স্বীকৃতি; জীবন্ত পোল্ট্রি ও এর সংশ্লিষ্ট পণ্য আমদানিতে আন্তর্জাতিক পদ্ধতি অনুসরণ এবং ম্যাক্সিমাম রেসিডিউ লিমিটকে স্বীকৃতি; প্ল্যান্ট এ প্ল্যান্ট পণ্য আমদানিতে বাজার প্রবেশ প্রক্রিয়া ২৪ মাসের মধ্যে সম্পাদন করার কথাও বলা হয়েছে।

এছাড়া চুক্তিতে ইন্স্যুরেন্স, তেল, গ্যাস ও টেলিযোগাযোগ খাতে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগে ইকুইটি সীমা উদার করা, দুর্নীতিবিরোধী-সংক্রান্ত বিধি-বিধানের যথাযথ প্রয়োগ, ডব্লিউটিও-এর অ্যাগ্রিমেন্ট অন ফিশারিজ সাবসিডিকে গ্রহণ করা ও অবৈধ আনরিপোর্টেড ও আন্ডাররেগুলেটেড (আইইউইউ)-এর ক্ষেত্রে ভর্তুকি প্রদান না করার কথা বলা হয়েছে। আন্তর্জাতিক শ্রম-সংক্রান্ত বিধি-বিধান অনুযায়ী বাংলাদেশের শ্রম আইনকে হালনাগাদ করার বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে।

ডিজিটাল ট্রেড ও প্রযুক্তিতে ক্রস-বর্ডার প্রাইভেসি রুলস, প্রাইভেসি রিকগনিশন ফর প্রসেসরস, পার্সোনাল ডাটা প্রটেকশন ইত্যাদি বিষয়কে স্বীকৃতি, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যু সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ এবং দেশটি হতে বোয়িং ক্রয়, এলএনজি, এলপিজি, সয়াবিন, গম, তুলা, সামরিক সরঞ্জাম আমদানি বৃদ্ধির প্রচেষ্টা করার বিষয়সমূহ খসড়া চুক্তিতে উল্লেখ রয়েছে।

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: আমেরিকা, বাণিজ্য চুক্তি, বাংলাদেশ
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন