ভারী বৃষ্টিতে ফের বন্যার আশঙ্কা, বাড়বে তাপপ্রবাহ

fec-image

উত্তর-পূর্ব ও উত্তরাঞ্চলে বন্যার ধাক্কা সামলে ওঠার মধ্যে ফের কয়েকটি অঞ্চলে স্বল্প থেকে মধ্যমেয়াদি বন্যার পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। এর সঙ্গে চলতি জুলাই মাসে দেশজুড়ে নিম্নচাপ এবং বিচ্ছিন্নভাবে মৃদু তাপপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে বলে জানানো হয়েছে।

সোমবার (১ জুলাই) দীর্ঘমেয়াদী আবহাওয়ার এ পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, চলতি মাসে সামগ্রিকভাবে দেশে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা আছে।

এ বছর বর্ষার শুরুতে জুনের দ্বিতীয়ার্ধে দেশের অভ্যন্তরে ভারি বর্ষণ ও উজানের ঢলে ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়ে উত্তর-পূর্বাঞ্চল।

ঈদের উৎসবের আগে ও পরে দুই সপ্তাহ ধরে দুর্ভোগে থাকে সিলেট, সুনামগঞ্জসহ আশপাশের জেলার বাসিন্দারা। এর মধ্যে উত্তরাঞ্চলেও পানি বেড়ে নিম্নাঞ্চল তলিয়েছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক আজিজুর রহমান স্বাক্ষরিত দীর্ঘমেয়াদী পূর্বাভাসে বলা হয়, এ মাসে বঙ্গোপসাগরে এক-দুইটি লঘুচাপ সৃষ্টি হতে পারে, যার মধ্যে একটি মৌসুমী নিম্নচাপে পরিণত হতে পারে। চলতি মাসে দেশের উত্তর, উত্তর-পশ্চিম ও মধ্যাঞ্চলে তিন-চারদিন বিজলিসহ মাঝারি ধরনের বজ্রঝড় হতে পারে। এছাড়া সারা দেশে পাঁচ থেকে ছয় দিন বিজলিসহ হালকা বজ্রঝড় হতে পারে।

অপরদিকে দীর্ঘমেয়াদী পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, এ মাসে এক থেকে দুইটি বিচ্ছিন্নভাবে মৃদু তাপপ্রবাহ (৩৬-৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস) বয়ে যেতে পারে। সেই সঙ্গে দিন এবং রাতের তাপমাত্রা কিছুটা বাড়তে পারে। ভারি বৃষ্টিপাতের কারণে দেশের উত্তরাঞ্চল, উত্তর পূর্বাঞ্চল, উত্তর-মধ্যাঞ্চল, উত্তর পশ্চিমাঞ্চল এবং মধ্যাঞ্চলের বেশ কিছু জায়গায় স্বল্প থেকে মধ্যমেয়াদি বন্যার সৃষ্টি হতে পারে।

এর সঙ্গে দেশের দক্ষিণ-পূর্ব পার্বত্য অববাহিকায় আকস্মিক বন্যা দেখা দিতে পারে।

এদিকে আগামী ৪৮ ঘণ্টায় দেশের উত্তরাঞ্চলের তিস্তা, ধরলা, ও দুধকুমার নদ-নদীর পানি সমতল বৃদ্ধি পেয়ে কিছু পয়েন্টে বিপৎসীমা অতিক্রম করে সংশ্লিষ্ট নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদী বন্যা হতে পারে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।

কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য দিয়ে বলা হয়, আগামী ৭২ ঘণ্টায় ব্রহ্মপুত্রের পানি সমতল বেড়ে কিছু পয়েন্টে বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে।

এছাড়া উত্তরাঞ্চলে যমুনা নদীর পানি সমতল বাড়ছে, যা আগামী ৭২ ঘণ্টা অব্যাহত থাকতে পারে। অন্যদিকে কুশিয়ারা ব্যতীত দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রধান নদীগুলোর পানি সমতল বাড়ছে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র বলছে, কয়েকদিন ধরে চলমান বৃষ্টিপাতের প্রভাবে উত্তরাঞ্চল, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নদ-নদীর পানি বিশেষ দ্রুত বাড়তে পারে। এতে আগামী ২৪ ঘণ্টায় সিলেট, সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোনা জেলার কিছু নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা অবনতি হতে পারে।

ভারতের চেরাপুঞ্জিতে বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢল অব্যাহত থাকায় দ্বিতীয় ধাপে বাড়তে শুরু করেছে সিলেট ও সুনামগঞ্জের নদ-নদীর পানি। এরইমধ্যে নিম্নাঞ্চলে পানি প্রবেশ করে অনেক এলাকা পুরোপুরি ডুবে গেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় কুশিয়ারা নদীর পানি সামান্য কমলেও বিপৎসীমা ছাড়িয়েছে সুরমা। দুই দফা বন্যার রেশ কাটতে না কাটতেই ফের বন্যার কবলে পড়তে যাচ্ছেন সিলেট ও সুনামগঞ্জের বাসিন্দারা।

সোমবার (১ জুলাই) সকালে সুরমা নদীর পানি কানাইঘাট পয়েন্টে বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে বলে জানিয়েছে সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ড। আবার পাহাড়ি ঢলের কারণে পানি যাদুকাটা নদী হয়ে তাহিরপুর-সুনামগঞ্জ সড়কের আনোয়ারপুরের একটি অংশ প্লাবিত করেছে। তাই খেয়া নৌকা ব্যবহার করছেন স্থানীয়রা।

এ দিকে রোববার সকাল ৬টা থেকে সোমবার সকাল ৬টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ৩৯ দশমিক ৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। কিন্তু আজ সকালে বৃষ্টিপাত আরও বেড়েছে। সোমবার সকাল ৬টা থেকে ৯টা পর্যন্ত তিন ঘণ্টায় ৬৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে সিলেটে।

আবহাওয়া অধিদপ্তর থেকে এ অঞ্চলে ভারী বর্ষণের সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, রোববার বিকেল চারটা থেকে পরবর্তী ৭২ ঘণ্টা সিলেট বিভাগের ভারী (২৪ ঘণ্টায় ৪৪ থেকে ৮৮ মিলিমিটার বৃষ্টি) থেকে অতি ভারী (২৪ ঘণ্টায় ৮৯ মিলিমিটারের ওপরে) বৃষ্টি হতে পারে।

এ বিষয়ে সিলেট আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ শাহ মো. সজীব হোসাইন বলেন, ‘সোমবার তিন ঘণ্টায় ৬৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আরও ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে।’

সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা যায়, সোমবার সকাল ৯টায় সুরমা নদীর পানি কানাইঘাট পয়েন্টে বিপৎসীমার ৩০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। এর আগে সকাল ৬টায় বিপৎসীমার ৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এই পয়েন্টে পানির বিপৎসীমা ১২ দশমিক ৭৫ সেন্টিমিটার। রোববার সন্ধ্যায় বিপৎসীমার ১৯ সেন্টিমিটার নিচে দিয়ে প্রবাহিত হয়।

সিলেট জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, জেলায় ১৩টি উপজেলার মধ্যে ১০টি উপজেলার আশ্রয়কেন্দ্রে রোববার পর্যন্ত ১০ হাজার ৯০৩ জন আশ্রয় নিয়েছেন। জেলায় ৬৫৩টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রয়েছে। এর মধ্যে ২১৯টি আশ্রয়কেন্দ্রে লোক উঠেছেন। তবে সিলেট সিটি করপোরেশন ও সদর উপজেলায় আশ্রয়কেন্দ্রে লোকজন নেই।

এ দিকে গত ২৪ ঘণ্টায় ভারী বৃষ্টি ও চেরাপুঞ্জিতে ১৮৬ মিলিমিটার বৃষ্টি হওয়ায় পাহাড়ের পাদদেশের নিচু এলাকায় পানি প্রবেশ করেছে। তাহিরপুর-সুনামগঞ্জ সড়কের বড় অংশ ফের তলিয়ে যাওয়ায় জেলা শহরের সঙ্গে সরাসরি যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। যাত্রী ও এলাকাবাসীকে চলাচলে ব্যবহার করতে হচ্ছে নৌকা।

সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় চেরাপুঞ্জিতে বৃষ্টি হয়েছে ১৮৬ মিলিমিটার। এ দিকে সারারাত সুনামগঞ্জে বৃষ্টি হওয়ায় কারণে উজানের পানিতে সীমান্তের নিচু সড়ক প্লাবিত হয়েছে। এতে স্বল্পমেয়াদি বন্যার আশঙ্কা রয়েছে।

পাউবো সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী দীপক রঞ্জন দাশ বলেন, বিপৎসীমা ছাড়িয়ে সুরমা নদীর পানি ৩০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। কুশিয়ারার পানি বাড়লেও তা বিপৎসীমা অতিক্রম করেনি। কুশিয়ারা নদীতে জুড়ী নদী ও শেরপুরের মনু নদের পানি এসে মিলিত হয়। একই নদীতে আরও দুটি নদীর পানি মিলিত হওয়ায় পানি বেড়ে যায়। ফলে কুশিয়ারার পানি বিপৎসীমার নিচে নামতে সময় লাগে। এ ছাড়া নিম্নাঞ্চল প্লাবিত থাকায় এবার পানি ধীরগতিতে নামছে।

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: তাপপ্রবাহ, বন্যার, ভারী বৃষ্টি
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন