মহেশখালীতে দেশের প্রথম শীর্ষ অস্ত্রের কারিগর আত্মসমর্পণ করবে শনিবার

fec-image

জলদস্যু, পাহাড়ি সন্ত্রাসী, চিহ্নিত ডাকাত রাষ্ট্রের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করলেও অস্ত্র তৈরীর শীর্ষ কারিগর আত্মসমর্পণ করার ঘটনা দেশে এই প্রথম। শনিবার (২৩ নভেম্বর) আত্মসমর্পণের জন্য মধ্যস্থতাকরীর সেভহোমে আসা অপরাধীদের মধ্যে কূখ্যাত অস্ত্রের শীর্ষ কারিগর জাফর আলম সহ আরও ১২ জন অভিজ্ঞ ও দক্ষ অস্ত্রের কারিগর রয়েছে। কোন অবৈধ অস্ত্র সরবরাহ করা হলে সেটি ‘Made in Zafor’ লেখা থাকলে সেটি তুলনামূলক বেশি দামে বিক্রি হতো বলে আত্মসমর্পণের জন্য মধ্যস্থতাকারীর সেভ হোমে সশস্ত্র একজন অস্ত্রের কারিগর এই পার্বত্যনিউজকে জানিয়েছেন। তারমতে, মহেশখালীর ‘জাফর’ আর্মস কারখানায় তৈরি করা অস্ত্র সারাদেশে সরবরাহ করা হতো।

অস্ত্র তৈরীর এসব শীর্ষ কারিগর জলদস্যু, দাগী অপরাধী, বহু মামলার পলাতক আসামীদের সাথে আত্মসমর্পণ করতে যাচ্ছে। বিশ্বস্ত সূত্র মতে, দেশে এর আগে আর কোনদিন অস্ত্র তৈরীর কারিগর রাষ্ট্রের কাছে স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করেনি।

অস্ত্রের কারিগর ও জলদস্যু এই আত্মসমর্পণের একমাত্র মধ্যস্থতাকারী প্রাইভেট টিভি চ্যানেল আনন্দ টিভি’র বিশেষ প্রতিনিধি, আকরাম হোসাইন জানান, শীর্ষ অস্ত্রের কারিগরদের কারখানা পর্যন্ত পৌঁছাতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হয়েছে। কক্সবাজার জেলা পুলিশের সহযোগিতা ও উৎসাহে এ দুঃসাহসিক কাজে সফল হতে পেরে নিজে তৃপ্তি অনুভব করছি। অশান্ত উপকূলকে শান্ত করতে, এলাকার মানুষকে জিম্মি দশা থেকে  মুক্ত করতে তার এ প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে বলেও জানান সাংবাদিক আকরাম হোসাইন।

এই আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান এমপি, পুলিশের আইজি ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী বিপিএম (বার) যথাক্রমে প্রধান ও বিশেষ অতিথি হিসাবে অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে শনিবার ২৩ নভেম্বর সকাল ৯টায় প্রথম ফ্লাইটে কক্সবাজার পৌঁছাবেন। সেখান থেকে তাঁরা কিছুক্ষণের জন্য সার্কিট হাউসে অবস্থান করে জলদস্যু আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানের সামগ্রিক বিষয়াবলী জ্ঞাত হবেন। এরপর শনিবার সকাল সোয়া ১০টার দিকে সমুদ্র পথে স্পীডবোট যোগে জলদস্যু ও অস্ত্রের কারিগর আত্মসমর্পণের জন্য নির্ধারিত মাঠ কালারমারছরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের উদ্দেশে রওয়ানা দেবেন।

কক্সবাজার জেলার সবচেয়ে বেশি অপরাধপ্রবণ এলাকা হিসাবে পরিচিত এই মহেশখালী উপজেলার কালামারছরা ইউনিয়নসহ পার্শ্ববর্তী এলাকা। খুন, রাহাজানি, দস্যূতা, অপহরণ, চাঁদাবাজি সহ সব জগন্য অপরাধকর্ম সংগঘটিত হওয়া কালারমারছরার জন্য একেবারে নিত্তনৈমিত্তিক ব্যাপার। মহেশখালীর চিহ্নিত অস্ত্রের কারিগর ও কূখ্যাত বেশ ক’টি জলদস্যু বাহিনীর সর্দার, অস্ত্রের শীর্ষ কারিগর ও বাহিনীর সদস্যরা এদিন স্বদলবলে আত্মসমর্পণ করছেন। আত্মসমর্পণকারীদের মধ্যে কূখ্যাত খউস্বর বর গ্রুপ, কালারবর গ্রুপ, আইয়ুব বাহিনী সহ ৮টি পৃথক জলদস্যু বাহিনীর প্রধান, সদস্যরা, অস্ত্রের কারিগরদের সর্দার, দাগী পলাতক আসামীরা আত্মসমর্পণ করতে মধ্যস্থতাকারীর নিয়ন্ত্রণে সেভহোমে চলে এসেছে। এসব কূখ্যাত বাহিনী আত্মসমর্পণ করলে অপরাধের স্বর্গরাজ্য হিসাবে পরিচিত কালারমারছরা সহ উপকূলীয় এলাকায় সাধারণ মানুষ কিছুটা হলেও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। স্থানীয় লোকজন এসব বিষয়ে সাহসের সাথে এখন মুখ খুলতে চেষ্টা করছেন।

এই আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে কক্সবাজার-২ আসনের সংসদ সদস্য আশেক উল্লাহ রফিক, কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন, স্থানীয় অন্যান্য সংসদ সদস্যগণ, র‍্যাবের কর্মকর্তা, বিজিবি’র রিজিওন কমান্ডার, কোস্টগার্ডের প্রতিনিধি, মহেশখালী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শরীফ বাদশা, কালারমারছরার ইউপি চেয়ারম্যান তারেক বিন ওসমান শরীফ সহ আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা যোগ দেবেন বলে সিবিএন-কে বিশ্বস্ত সুত্র নিশ্চিত করেছেন। কক্সবাজার জেলা পুলিশ আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এ.বি.এম মাসুদ হোসেন বিপিএম সভাপতিত্ব করবেন।

বিশ্বস্ত সূত্রমতে, শীর্ষ অস্ত্রের কারিগর ও জলদস্যুরা দেড় শতাধিক অবৈধ অস্ত্র, প্রায় ২ হাজার গোলাবারুদ, ধারালো ভয়ংকর অস্ত্র, অস্ত্র তৈরীর সরঞ্জাম সহ আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করবেন।

প্রসঙ্গত, ২০১৮ সালের ২০ অক্টোবর মহেশখালীতে অনুরূপভাবে ৪৩ জন সশস্ত্র জলদস্যু আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করেছিলো। সেখানে ৪৩ জনের মধ্যে বর্তমান আনন্দ টিভি’র বিশেষ প্রতিনিধি এমএম আকরাম হোসাইনের একক মধ্যস্থতায় ৩৭ জন জলদস্যু আত্মসমর্পণ করেছিলো। আত্মসমর্পণকারী মহেশখালী, কুতুবদিয়া, পেকুয়া, চকরিয়ার সমুদ্র উপকূলের ভয়ংকর জলদস্যুরা কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে স্বাভাবিকজীবনে ফিরে এসেছে। এছাড়া চলতি বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি ১০২ জন ইয়াবাকারবারী টেকনাফে চ্যানেল ২৪ টিভি’র তৎকালীন সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার এম.এম আকরাম হোসাইনের একক মধ্যস্থতায় দেশে প্রথম মাদক কারবারি আত্মসমর্পণ করেছিলো। সেদিনের মাদক কারবারী আত্মসমর্পণ করা ছিলো এ দেশের জন্য একটা ইতিহাস ও রেকর্ড। একটি সূত্র জানান, জলদস্যুদের আত্মসমর্পণের এটা একটা বিরাট সুযোগ। যারা এই সুযোগ কাজে লাগাবে না তাদেরকে কঠোর আইনের আওতায় আনা হবে। এরমধ্যে গত বছরের ২০ অক্টোবর মহেশখালীতে আত্মসমর্পণ করা ৪৩ জন জলদস্যু সরকারের কাছ থেকে প্রতিজন এক লক্ষ টাকা করে আর্থিক অনুদান পেয়ে তারা কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে এখন ক্ষুদ্র ব্যবসা বাণিজ্য করে স্বাভাবিক জীবন যাপন করছেন।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

fifteen + four =

আরও পড়ুন