মহেশখালীতে ১৪ জন মিলে তরুণীকে ধর্ষণ!

fec-image

মহেশখালী উপজেলার কালারমারছড়া ইউনিয়নের চালিয়াতলী এলাকায় এক চাকরিজীবী তরুণীকে গণধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। ওই এলাকার ১৪জন যুবক মিলে গত ৭ জুলাই পাহাড়ে তুলে ওই তরুণীকে ধর্ষণ করেছে।

এই ঘটনা নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে তীব্র তোলপাড় বিরাজ করছে। তবে এই চাঞ্চল্যকর ধর্ষণের ঘটনাটি ধামাচাপা দেয়ার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে একটি প্রভাবশালী মহল। তাই এখন পর্যন্ত আইনী সহযোগিতা নিতে পারেনি ওই তরুণীর পরিবার। এমনকি তাকে আটকে রাখারও অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে।

জানা গেছে, ধর্ষণের শিকার ওই তরুণীর বাবার বাড়ি চকরিয়ার ডুলাহাজারায়। নানার বাড়ি মারতাবাড়িতে। পিতার সাথে বিয়ে ভেঙ্গে যাওয়ায় মা দ্বিতীয় বিয়ে করেন মাতারবাড়িতে। একসময় মায়ের দ্বিতীয় সংসারে আশ্রিত থাকলেও কয়েক বছর ধরে চট্টগ্রামে চাকরি করে সে। সম্প্রতি মুঠোফোনে গোরকঘাটার এক ছেলে সাথে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওই তরুণীর। ওই ছেলে সাথে দেখা করতে চট্টগ্রাম থেকে মহেশখালী এসেই এই নিষ্ঠুর ঘটনার শিকার হয় ওই তরুণী।

ধর্ষিতা মেয়েটির বরাত দিয়ে চালিয়াতলী স্টেশনের লাইনম্যান রশিদ জানান, ধর্ষণের শিকার মেয়েটি গত ৭ জুলাই সকাল ১০টার দিকে চালিয়াতলী স্টেশনের এসে নামে। তার উদ্দেশ্য ছিলো প্রেমিকের সাথে দেখা করতে গোরকঘাটায় যাওয়া। তার আগে সে মাতাবাড়ি যায়। সেই মোতাবেক নলবিলা দরগাহপাড়া এলাকার শাহ আলমের পুত্র ওসমান গণির চালিত সিএনজিটি রিজার্ভ নেয় তরুণীটি।

প্রথমে মাতারবাড়ি গিয়ে ফের একই সিএনজি করেই গোরকঘাটায় যায় ওই তরুণী। কিন্তু তার সঙ্গে প্রতারণা করেছে ওই প্রেমিক ছেলেটি। গোরকঘাটা সিএনজি স্টেশনে প্রায় দেড়ঘন্টা অপেক্ষা করলেও শেষ পর্যন্ত কথা রাখেনি ওই প্রতারক প্রেমিক। কথা ছিলো-সব গাড়ি ভাড়া ওই প্রেমিকই দেয়ার। কিন্তু প্রেমিক না আসায় অর্থ সংকটে সমস্যা পড়ে যায় তরুণীটি।

তার ভাষ্য মতে, প্রেমিক না আসায় একই সিএনজিতে করে আবার চালিয়াতলী ফিরে যায় ওই তরুণী। সেখানে ভাড়া দিতে না পারায় চালকের তার বেশ বাকবিতণ্ডা হয়। এক পর্যায়ে নিজের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন দিয়ে ভাড়া মেটায় সে। তবে বাকবিতণ্ডার কারণে জড়ো হয়ে যায় অনেক। ওই জড়ো হওয়াদের মধ্যে ছিলো স্থানীয় চালিয়াতলী এলাকার মৃত আবুল হাছির পুত্র আমির সালাম, মোস্তাক আহমদের পুত্র এনিয়া এবং নলবিলা দরগাহপাড়ার মোক্তার আহমদের পুত্র আদালত খাঁ।

মেয়েটির দাবি, ভাড়া নিয়ে তার সাথে বাক-বিতণ্ডার এক পর্যায়ে সেখানে জড়ো হন আমির সালাম, এনিয়া ও সিএনজি চালক আদালত খাঁ (পরে চিহ্নিত)। ভাড়ার সমস্যা মিটে গেলে অন্যান্য লোকজন চলে যায়। কিন্তু সহযোগিতার প্রলোভন দিয়ে ওই তিনজন মিলে মেয়েটিকে চালিয়াতলী বালুরডেইল পাহাড়ি ঝিরি দিয়ে নিয়ে যায়। ততক্ষণে সন্ধ্যা হয়ে যায়। পরে তাদের সাথে সিএনজি চালক ওসমানসহ আরো ১১জন যোগ দেয়।

পরদিন ৮ জুলাই ভোরের শেষ মুহুর্তে মাতারবাড়ি-চালিয়াতলী সড়কের দরগাহঘোনা স্থানে মেয়েটিকে দেখতে পান স্থানীয় সুজন নামে এক মৎস্য ঘের ব্যবসায়ী। তখন মেয়েটির ছিলো অনেকটা ভীত-সন্ত্রস্ত এবং পোশাক ছিলো অস্বাভাবিক। এই অবস্থায় মেয়েটিকে দেখতে পেয়ে তার কারণ জানতে চান মৎস্য ঘের ব্যবসায়ী সুজন। মেয়েটি তাকে জানান, পাহাড়ে আটকে রেখে ১৪জন মিলে তাকে রাতভর ধর্ষণ করেছে। ধর্ষণের পর তার বোরকা, হাতব্যাগ, ঘড়ি কেড়ে নেয় ধর্ষকেরা। মেয়েটিকে কিছু টাকা দিয়ে মাতারবাড়ি গাড়িতে তুলেন সুজন।

ওই দিনই এই ঘটনা জানাজানি হয়ে যায়। এই নিয়ে সর্বত্র তোলপাড় সৃষ্টি হয়। প্রতিবাদের ঝড় উঠে সবখানে। ঘটনাটি জানাজানি হলে তা ধামাচাপা দেয়ার দৌড়ঝাঁপ শুরু ধর্ষকেরা। ধামাচাপা দেয়ার জন্য তারা একটি প্রভাবশালী মহলের আশ্রয় নেন। ওই মহলের প্রধান হোতা হলেন-চালিয়াতলী স্টেশনের লাইনম্যান রশিদ। ঘটনা ধামাচাপা দিতে ধর্ষকদের পক্ষ হয়ে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেন তিনি। এই তিনি স্থানীয় মেম্বার লিয়াকত আলী ও মাতারবাড়ি মহিলা মেম্বার শামীমার শরণাপন্ন হন। এই দুই মেম্বারকে নিয়ে সমঝোতার ‘মিশন’ শুরু হয়।

অভিযোগ উঠেছে, রশিদের মাধ্যমে ম্যানেজ হয়ে মেম্বার লিয়াকত আলী ও মহিলার মেম্বার শামীমা ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে চেষ্টা করছেন। এর মধ্যে ধর্ষিতার পরিবার অভিযোগ নিয়ে দুইবার থানায় যান। তবে দুই মেম্বারের কারণে থানায় অভিযোগ জমা করতে পারেনি তারা। মীমাংসার আশ্বাস দিয়ে তাদেরকে দুইবারই ব্যর্থ করা হয়। ঘটনা মীমাংসের জন্য শালিসের ব্যবস্থা করেন দুই মেম্বার। দুই দফা শালিস বসান এবং মেয়েটিকে ‘জিম্মা’য় নেন শামীমা।

সর্বশেষ গত ১০ জুলাই বিকালে ‘চূড়ান্ত’ শালিসের বৈঠক মেম্বার লিয়াকত আলীর অফিসে। সেখানে শালিসের রায়ে ধর্ষকদের কয়েকজনকে লাঠিপেটা করা হয় এবং ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। তবে এখন পর্যন্ত জরিমানা ওই টাকাও পায়নি ধর্ষিতা।

এদিকে, সাধারণ মানুষের চাপের মুখে ভয়ে রয়েছে ধামাচাপার চেষ্টাকারীরা। তারা ঘটনাটি পুরোদমে চুকিয়ে ফেলতে নানাভাবে চেষ্টা-তদবির অব্যাহত রেখেছে। এর অংশ হিসেবে ধর্ষিতাকে মাতারবাড়ির মহিলা মেম্বার শামীমার বাড়িতে ‘হেফাজত’র নামে আটকে রাখা হয়েছে বলে স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে। তাই চাপে ও ভয়ে আইনী আশ্রয় নিতে পারছে না ধর্ষিতার পরিবার।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে নিজের সংশ্লিষ্টতার কথা অস্বীকার করেন চালিয়াতলী স্টেশন লাইনম্যান রশিদ। তিনি এর সাথে জড়িত নেই দাবি করে বলেন, ‘ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর মেয়েটি মাতারবাড়ির মহিলা মেম্বার শামীমার কাছে গিয়ে আশ্রয় নেয়। শামীমাকে মা ডেকে বিষয়টি তাকে জানান। পরে মেম্বার শামীমা মেয়েটিকে নিয়ে চালিয়াতলীর মেম্বার লিয়াকত আলীর কাছে যান। তখন লিয়াকত আলী টাকার বিনিময়ে ঘটনাটি মীমাংসের প্রস্তাব দিলে তা মেনে নেন মেম্বার শামীমা। তবে টাকার অংক নিয়ে তাদের মধ্যে বনিবনা হয়নি।’

জানতে চাইলে চালিয়াতলী এলাকার মেম্বার লিয়াকত আলী বলেন, ‘ধর্ষণের ঘটনাটি সত্য। এটি একটি ন্যাক্কাজনক ঘটনা। কিছু সিএনজি চালকসহ কয়েকজন নষ্ট ছেলে এই ঘটনা ঘটিয়েছে। এই ঘটনার মূলহোতা লাইনম্যান রশিদ।’

নিজের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি আরো বলেন, ‘ঘটনাটি আমি জেনেছি গত পরশু (১০জুলাই)। ওই দিন মাতারবাড়ির মহিলা মেম্বার শামীমা ঘটনাটি আমাকে জানান। তখন আমি তাকে থানায় মামলা করার পরামর্শ দিয়েছি।’ অভিযোগের ব্যাপারে জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করেও মাতারবাড়ির মহিলা মেম্বার শামীমার সাথে যোগযোগ করা সম্ভব হয়নি।

মহেশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জামিরুল ইসলাম বলেন, ‘ঘটনাটি আমি আজকে (শুক্রবার) অবহিত হয়েছি। এটা অত্যন্ত বর্বরোচিত ঘটনা। এটা কখনো মীমাংস হতে পারে না। বিষয়টি আমি দেখছি।’

 

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: ধর্ষণ, মহেশখালীতে
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

twenty + one =

আরও পড়ুন