মানবতার উন্মেষ ঘটুক ঈদ উৎসবে

fec-image

ঈদ; আনন্দের দিন, উৎসবের দিন। পরস্পর সৌহার্দ্য ও প্রীতি বন্ধনের দিন। পৃথিবীতে প্রতিটি জাতি ও প্রত্যেক ধর্মাবলম্বীদের জন্যই বছরে এমন কিছু দিন নির্ধারিত থাকে, যে দিনগুলোতে তারা তাদের প্রিয়জনদের নিয়ে আনন্দ-উৎসব যাপন করে থাকে। মহান রাব্বুল আলামিন পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি মুসলিম জাতিকে বছরে দুটি দিন নির্ধারণ করে দিয়েছেন, যে দুটি দিনকে আরবি ভাষায় ঈদ অর্থাৎ উৎসবের দিন বলা হয়—১. ঈদুল ফিতর, ২. ঈদুল আজহা।

এই দুদিনে মুসলিম নর-নারী, যুবক-বৃদ্ধ, শিশু-কিশোর সবার হৃদয়ে আনন্দের এক হিল্লোল বয়ে চলে। শিশু-কিশোররা আনন্দে মেতে ওঠে। সামর্থ্য অনুযায়ী প্রত্যেকেই ভালো ও নতুন জামা কাপড় পরিধান করার চেষ্টা করে। প্রত্যেক পরিবারে কমবেশি ভালো খাবারের আয়োজন হয়। এ দুটি দিনকে ঘিরে রয়েছে মুসলমানদের অনেক আয়োজন। একসঙ্গে ঈদগাহে যাওয়া, ঈদগাহে ছোট-বড় সবাই সমবেত হয়ে রবের শ্রেষ্ঠত্ব ও মহত্ব বর্ণনা করা। নামাজ শেষে একে অপরের সঙ্গে সাক্ষাৎবিনিময় ও পরস্পরে সৌহার্দ্য, প্রীতির বন্ধন ও ভ্রাতৃত্ববোধকে জাগিয়ে তোলা।

ইসলামও আমাদের ঈদের আনন্দ-উৎসব উপভোগ করতে উৎসাহিত করেছে। আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) বলেন, ঈদের দিন আবু বকর (রা.) আমার ঘরে এলেন। সেখানে তখন দুজন মেয়ে বুআস যুদ্ধের গান গাইছিল। তারা পেশাদার গায়িকা ছিল না। আবু বকর (রা.) ওই মেয়ে দুটোকে শক্ত ধমক দিয়ে বললেন, ‘শয়তানি করো, তাও রাসুলের ঘরে!’ তখন নবীজি (সা.) বললেন, ‘আবু বকর! ওদের ছেড়ে দাও। প্রতিটি জাতিরই ঈদ ও খুশির দিন থাকে। আজ আমাদের ঈদের দিন।’ (বোখারি : ৯৫২)।

তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, আমরা যেন কোনোভাবেই নবীজি (সা.)-এর সুন্নত ও ইসলামি সংস্কৃতি বিরোধী অযথা, অশ্লীল, শরিয়ত পরিপন্থী কোনো কাজ বা আনন্দ-উৎসবে না জড়াই। কারণ, এটা অন্যায় ও মারাত্মক গোনাহের কাজ। যা আমাদের ঈমানকে বিপথগামী করে তুলবে।

ঈদ নিছক আনন্দ-ফুর্তি ও উৎসবের নামই নয়, ঈদ আমাদের দেয় মানবতার বার্তা। আমাদের প্রিয় নবীজি (সা.)-ও স্বয়ং পরিবার-পরিজনদের নিয়ে ঈদের আনন্দ-খুশি উদযাপন করতেন ঠিকই; কিন্তু কখনও এতিম, অসহায়-নিঃস্ব ও বিধবাদের ভুলে যেতেন না। তাদের মাঝেও তিনি বিলিয়ে দিতেন ঈদের অনাবিল সুখ। মহান রাব্বুল আলামিনও গরিব-অসহায় মানুষদের মাঝে ঈদের খুশি বণ্টন করতে ধনীদের ওপর ফরজ করেছেন জাকাত ও সদকাতুল ফিতরের বিধান।

বর্ণিত আছে; একবার নবীজি (সা.) ঈদের দিনে ঈদগাহের কোনো এক কোণে বসে এক শিশুকে কাঁদতে দেখলেন। তিনি অবাক হলেন এ খুশির দিনেও কান্না! জেগে উঠল নবীজির মর্মবেদনা। তিনি ছেলেটিকে কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করলে ছেলেটি বলল, ‘আমার বাবা-মা নেই। আমাকে আদর ও ভালোবাসা দেওয়ার মতো কেউ নেই।’ নবীজি (সা.) তখন তাকে সঙ্গে করে বাড়ি ফিরলেন। আয়েশা (রা.)-কে বললেন, ‘আয়েশা! তোমার জন্য উপহার নিয়ে এসেছি।’ আয়েশা (রা.) ছেলেটিকে সুন্দর করে গোসল করিয়ে নতুন জামা পরিয়ে দিলেন। সুগন্ধি মেখে দিলেন। নবীজি (সা.) বললেন, ‘আজ থেকে আমি তোমার বাবা, আয়েশা তোমার মা।’ ছেলেটি আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেল।

আমাদের আশপাশেও এমন বহু মানুষ বাস করে, যারা ঈদের খুশি থেকে বঞ্চিত। কত অসহায়, অভাবী, পথশিশু, বিধবা ও প্রতিবন্ধীরা ঈদের সুখ উপভোগ করা থেকে বহুদূরে। ঈদ উৎসবে মানবিকতা, সহনশীলতা ও সমবেদনার হাত প্রসারিত করা আমাদের উচিত। আমাদের প্রিয় নবীজি (সা.) সবসময় অসহায়, অভাবী এবং প্রতিবেশীর খোঁজখবর রাখতেন। হাদিসে বর্ণিত আছে; মহানবী (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি দুনিয়ায় অপরের একটি প্রয়োজন মিটিয়ে দেবে, পরকালে আল্লাহতায়ালা তার ১০০ প্রয়োজন পূরণ করে দেবেন। বান্দার দুঃখ-দুর্দশায় কেউ সহযোগিতার হাত বাড়ালে আল্লাহতায়ালা তার প্রতি করুণার দৃষ্টি দেন।’ (মুসলিম : ২৫৬৬)।

ঈদ আমাদের জীবনে বয়ে আনুক অনাবিল সুখ। নিছক আনন্দ-ফুর্তিতে না কাটুক। ঈদ খুলে দিক মানবতার ঋদ্ধ দুয়ার। ঈদ আমাদের মাঝে নতুন করে জাগিয়ে তুলুক পরস্পরের ভ্রাতৃত্ববোধ, সমাজবদ্ধতা, ঐক্য, সাম্য, ন্যায়পরায়ণতা ও মানবিকতার মহৎ গুণ। উন্মেষ ঘটুক মানবতার।

সূত্র: জাগোনিউজ

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: ঈদ, উৎসব, উন্মেষ
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

15 + eleven =

আরও পড়ুন