মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে দেশে ঢুকছে ভারী অস্ত্র

fec-image

মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকছে অবৈধ ভারী অস্ত্র। এসব আগ্নেয়াস্ত্র উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পভিত্তিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর হাতে যাচ্ছে। এরই মধ্যে ক্যাম্পে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্র জব্দ করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এর মধ্যে একাধিক মিলিটারি আর্মস রয়েছে।

শনিবার (১৮ মে) আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দুজন শীর্ষ কর্মকর্তা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

র‍্যাব জানায়, গত বুধবার ভোররাতে উখিয়ার দুর্গম লাল পাহাড়ে মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান স্যালভেশন আর্মির (আরসা) একটি আস্তানায় অভিযান চালিয়েছে র‍্যাব। অভিযানে আরসার আস্তানা থেকে বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ, গ্রেনেডসহ নানা অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। আস্তানায় র‍্যাবের উপস্থিতি টের পেয়ে আরসা সন্ত্রাসীরা গুলি ছোড়ে। এতে র‍্যাবের সঙ্গে আরসার গুলি বিনিময় হয়। এ সময় আরসার বাংলাদেশ কমান্ডার মো. শাহানুর প্রকাশ মাস্টার সলিম (৩৮) ও তার সহযোগী মো. রিয়াজকে (২৭) গ্রেফতার করা হয়। হাকিমপাড়া আশ্রয়শিবিরের পশ্চিমে দুর্গম লাল পাহাড়ে বেশ কয়েক ঘণ্টার অভিযানে আরসার আস্তানা থেকে পাঁচটি গ্রেনেড, তিনটি রাইফেল গ্রেনেড, ১০টি দেশে তৈরি হ্যান্ড গ্রেনেড, ১৩টি ককটেল, একটি বিদেশি রিভলবার, একটি এলজিসহ বিপুল গোলাবারুদ ও কার্তুজ উদ্ধার করা হয়।

পুলিশ জানায়, তাদের কাছে গোপন সংবাদ ছিল অস্ত্র ব্যবসায়ীরা মিয়ানমার থেকে আগ্নেয়াস্ত্র ও গুলি বাংলাদেশে এনে সন্ত্রাসীদের কাছে হস্তান্তরের জন্য সংঘবদ্ধ হয়েছে। এর সূত্র ধরে গত বৃহস্পতিবার উখিয়ার মাদারবুনিয়া এলাকার গহীন পাহাড়ে দুর্ধর্ষ ডাকাত মোস্তাকের বাড়িতে অভিযান চালায়। এ সময় মোস্তাক, রবি আলম, কাশেম এবং মোস্তাকের স্ত্রীকে দুটি এলজি, ৭৭ রাউন্ড গুলি এবং ২৪টি গুলির খোসাসহ গ্রেফতার করা হয়। তাদের সহযোগী বেলাল টেকনাফ থেকে পালিয়ে নিজ এলাকা মহেশখালী যাওয়ার সময় গ্রেফতার হয়। বেলালের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে টেকনাফের শাপলাপুর এলাকায় সমুদ্র তীরবর্তী ঝাউবাগানের মধ্যে বালুর নিচে রাখা একটি বিদেশি জি থ্রি রাইফেল, একটি ম্যাগাজিন ও ১৫ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়।

পুলিশ বলছে, গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিরা সংঘবদ্ধ অস্ত্র ব্যবসায়ী। তারা মিয়ানমার থেকে ভারী অস্ত্রগুলো এনে রোহিঙ্গা ক্যাম্পভিত্তিক সন্ত্রাসীদের হাতে পৌঁছে দিচ্ছে। এর মধ্যে জার্মানির তৈরি জি থ্রি রাইফেল ও রকেট সেলের মতো ভারী আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে। জব্দ করা বেশিরভাগ অস্ত্রই বিদেশি।

ওই দিন বিকালে কক্সবাজার পুলিশ সুপার কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার মো. মাহফুজুল ইসলাম বলেন, ‘আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদসহ পাঁচ অস্ত্র ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মোস্তাক একাধিক ডাকাতি, অস্ত্র ও মাদক মামলার আসামি। তার বিরুদ্ধে চার মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা আছে। অস্ত্র ব্যবসায়ী রবির বিরুদ্ধে চারটি মামলা রয়েছে। অন্যদের বিরুদ্ধেও একাধিক অস্ত্র মামলা আছে। এ ঘটনায় উখিয়া ও টেকনাফ থানায় অস্ত্র আইনে দুটি মামলা করা হয়েছে। আসামিদের রিমান্ডের আবেদন করে আদালতে পাঠানো হয়েছে। সেইসঙ্গে অস্ত্র ব্যবসায়ী চক্রের অপর আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত আছে।’

কীভাবে এসব ভারী অস্ত্র বাংলাদেশে ঢুকছে জানতে চাইলে পুলিশ সুপার মো. মাহফুজুল ইসলাম বলেন, ‘রোহিঙ্গা ক্যাম্পভিত্তিক একাধিক সন্ত্রাসী সংগঠন সক্রিয় আছে। মূলত ক্যাম্পে আধিপত্য বিস্তারের জন্য মিয়ানমার থেকে অস্ত্র-গোলাবারুদ সংগ্রহ করে অবৈধপথে বাংলাদেশে নিয়ে আসছে তারা। এজন্য মাঝেমধ্যে হত্যাকাণ্ডও ঘটছে। আমরা তাদের ধরতে গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদার করেছি। যাতে তারা ক্যাম্পে সক্রিয় হতে না পারে, সেজন্য অভিযান চালানো হচ্ছে।’

গত ২৮ এপ্রিল ভোররাতে উখিয়া উপজেলার কুতুপালং ২-ওয়েস্ট নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ডি-৯ ব্লকে অভিযান চালিয়ে দেশি-বিদেশি অস্ত্র ও গুলিসহ পাঁচ রোহিঙ্গাকে গ্রেফতার করে এপিবিএন।

রোহিঙ্গা ক্যাম্প ঘিরে আরসা ও অন্যান্য সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর তৎপরতার বিষয়ে জানতে চাইলে ১৪ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) অধিনায়ক অতিরিক্ত উপ-মহাপরিদর্শক মোহাম্মদ ইকবাল বলেন, ‘গ্রেফতারকৃত বেশিরভাগই রোহিঙ্গা ক্যাম্পভিত্তিক সশস্ত্র সন্ত্রাসী সংগঠনের সক্রিয় সদস্য। ক্যাম্পের নিয়ন্ত্রণ এবং আধিপত্য বিস্তারের জন্য আরসার সদস্যরা নানা অপরাধে জড়ায়। এর মধ্যে মুক্তিপণের জন্য অপহরণসহ হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও রয়েছে। তথ্য পেলেই আমরা অভিযান চালিয়ে তাদের দমন করি।’

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরগুলো ঘিরে আশপাশের এলাকা ও পাহাড়ে আস্তানা গড়েছে একাধিক সশস্ত্র সন্ত্রাসী সংগঠন। তাদের হাতে মিলিটারি আর্মস পাওয়া উদ্বেগজনক।

এ ব্যাপারে র‍্যাব-১৫-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এইচ এম সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ‘তাদের কাছে এমন কিছু ভারী অস্ত্র আমরা পেয়েছি, যেগুলো মিলিটারি আর্মস হিসেবে পরিচিত। এর মধ্যে আর্জেস ও রাইফেল গ্রেনেড আছে। সাধারণত এগুলো যুদ্ধের সময় বিভিন্ন দেশের সেনাবাহিনী ব্যবহার করে। এ ঘটনায় আরও যারা জড়িত, তাদের নজরদারিতে রাখা হয়েছে। কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বাকিদের গ্রেফতার করা হবে। সেইসঙ্গে সীমান্ত দিয়ে যাতে এসব অস্ত্র ঢুকতে না পারে, সেজন্য গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করেছি আমরা।’

র‍্যাব অধিনায়ক বলেন, ‘মাস্টার সলিম বাংলাদেশে আরসার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিল। তার নেতৃত্বে আশ্রয়শিবিরগুলোতে আবারও আরসার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় হত্যাকাণ্ড শুরু হয়েছিল। এজন্য পাশের দেশ মিয়ানমার থেকে অস্ত্র গোলাবারুদ সংগ্রহ করে রোহিঙ্গা শিবিরে ত্রাস সৃষ্টি করেছিল তারা। সলিম ২০১৭ সালের মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে এসে বালুখালী আশ্রয়শিবিরে বসবাস শুরু করে। আরসা প্রধান আতাউল্লাহ আবু আম্মার জুনুনির দেহরক্ষী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে আরসা নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়ায় তাকে আরসার প্রধান সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তার বিরুদ্ধে তিনটি হত্যাসহ একাধিক মামলা রয়েছে। তার সহযোগী রিয়াজের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা রয়েছে।’

৮-এপিবিএন বলছে, চলতি বছরের পাঁচ মাসে রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে হ্যান্ড গ্রেনেডসহ ৪৭টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এসব অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় ৩৫ মামলায় ৪২ জনকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। শুধু মে মাসে ক্যাম্পগুলোতে ১৭টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে আরসাবিরোধী চার রোহিঙ্গা নেতাও আছেন।

ক্যাম্পে দায়িত্বরত ৮-এপিবিএনের অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ আমির জাফর বলেন, ‘ভারী অস্ত্র উদ্ধারের পর ক্যাম্পে টহল জোরদার করেছি আমরা। সীমান্ত পেরিয়ে যাতে কোনও অস্ত্র ও সন্ত্রাসীরা ক্যাম্পে ঢুকতে না পারে, সেজন্য অভিযান অব্যাহত রেখেছি। ক্যাম্পগুলো নজরদারিতে আছে।’

স্থানীয় বাসিন্দারা প্রশ্ন তুলেছেন, সীমান্তে কঠোর নজরদারি ফাঁকি দিয়ে এত ভারী অস্ত্র দেশে ঢুকছে কীভাবে? এর জবাব দিয়েছেন সীমান্তে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) এক কর্মকর্তা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই বিজিবি কর্মকর্তা বলেছেন, ‘অবৈধ ভারী অস্ত্রের চালান দেশে ঢোকার পেছনে আন্তর্জাতিক চোরাচালান চক্রের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক কাজ করছে। তারাই সীমান্ত পার করে দেশে অস্ত্রের চালান প্রবেশ করাচ্ছে। এর সঙ্গে সীমান্তে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কারও যোগসূত্রও থাকতে পারে। এই নেটওয়ার্ক ভাঙা অসম্ভব না হলেও বেশ কঠিন।’

তবে অস্ত্রের চোরাচালান ঠেকাতে সীমান্তে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিশেষ করে বিজিবিসহ সব সংস্থা গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করেছে বলে জানিয়েছেন জেলা পুলিশ সুপার মাহফুজুল ইসলাম।

সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: টেকনাফ, মিয়ানমার
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন