পাহাড়ে সপ্তাহের ব্যবধানে তিন হামলা

শান্তিচুক্তির দীর্ঘদিন পরেও পাহাড়ী সন্ত্রাসীদের কেন টার্গেটে সরকার ও সেনাবাহিনী?

fec-image

সিএইচটি রিসার্চ ফাউন্ডেশনের গবেষণায় দেখা গেছে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পার্বত্যচট্টগ্রামে আগস্ট ২০১৯ সাল পর্যন্ত নিরাপত্তা বাহিনীর ৩৬০ জন সদস্য নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন ৪৩৩ জন এবং অন্যান্য ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ২২৭ জন।একই পরিসংখ্যানে দেখা গেছে শান্তিচুক্তির পূর্বে শান্তি বাহিনীর সাথে যুদ্ধে নিরাপত্তা বাহিনীর ৩৪৩ জন সদস্য নিহত হয়েছেন‌।  এর মধ্যে সেনাবাহিনীর ১৭৩ জন বিজিবি ৯৬ জন পুলিশের ৬৪ জন এবং আনসার ভিডিপির ১০ জন। নিহত সেনা সদস্যদের মধ্যে অফিসার ৫ জন, জেসিও ৩জন এবং বাকিরা সৈনিক।এছাড়াও দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় সড়ক দুর্ঘটনা, ম্যালেরিয়াসহ বিভিন্ন রোগ, ভূমিধস প্রভৃতি কারণে মারা গেছে আরো অনেকে। এর মধ্যে শান্তি চুক্তির পূর্বে শুধু ম্যালেরিয়ায় নিরাপত্তা বাহিনীর ১৬৯ জন এবং চুক্তির পরে ৮১ জন মারা গেছে। উভয় কারণে আহত বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিপুলসংখ্যক নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য। তবে শান্তি চুক্তির পরে পার্বত্য চট্টগ্রামে নানা কারণে নিরাপত্তা বাহিনীর মোট ১৭ জন সদস্য মারা গেছে।এর মধ্যে আঞ্চলিক উপজাতীয় সন্ত্রাসী সংগঠনের সাথে যুদ্ধে মারা গেছে ১২ জন এবং ৫ জন রাঙ্গামাটির ভূমিধসে মারা গেছে। নিহতদের মধ্যে সেনাবাহিনীর ৯ জন, বিজিবি ২জন, পুলিশের ২জন ও আনসার ভিডিপির ৪ জন রয়েছে। এই বিপুল ক্ষয়ক্ষতির পর ও পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনী রয়ে গেছে দেশের স্বার্থে। বিস্তারিত দেখুন- https://bit.ly/33OKI7l

পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে এক সপ্তাহের ব্যবধানে নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর উপজাতীয় সন্ত্রাসীদের পরপর তিনটি হামলা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। এসব ঘটনায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে একজন সেনাসদস্য প্রাণ হারিয়েছেন। অফিসারসহ ২জন আহত হয়েছেন। এতে অবশ্য চার সন্ত্রাসীও নিহত হয়েছে।

শান্তিচুক্তির দীর্ঘ ২২ বছর পর হঠাৎ করে পাহাড়ে শান্তিশৃঙ্খলায় নিয়োজিত সেনাবাহিনীকে এভাবে একের পর এক  টার্গেট সংশ্লিষ্টদের ভাবিয়ে তুলেছে। স্থানীয়দের মাঝে বিরাজ করছে চাপা আতঙ্ক। হঠাৎ করে সেনাবহিনীকে টার্গেট করার পেছনে মোটিভ কি থাকতে পারে তা নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে।

উদ্বেগের বিষয় হলো, ওই তিন ঘটনায় উপজাতীয় সন্ত্রাসীদের কাছ থেকে অত্যাধুনিক ভারী ভারী অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। আঞ্চলিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কাছে এত ভারী অস্ত্র কোথা থেকে আসছে তা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। এমতাবস্থায় পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নতুন করে ঢেলে সাজানো এখন সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবি।

সর্বশেষ সোমবার (২৬ আগস্ট) সকাল ১০ টার দিকে খাগড়াছড়ি জেলার দিঘীনালা উপজেলার বরাদম এলাকায় ৭-৮ জনের সশস্ত্র সন্ত্রাসী দল সেনাবাহিনীর একটি টহল দলের ওপর অতর্কিত গুলিবর্ষণ শুরু করে। সেনাবাহিনীও আত্মরক্ষার্থে পাল্টা গুলি বর্ষণ করে। সন্ত্রাসীদের সাথে প্রায় ১৫ মিনিট ধরে গোলাগুলি চলে। এসময় তিন সন্ত্রাসী নিহত হয়। গোলাগুলি শেষে সেনাবাহিনী দ্রুত ঘটনাস্থলে তল্লাশী চালায় এবং ৩ জনের মৃতদেহ, ২টি পিস্তল (৮ রাউন্ড গুলিসহ), ১টি আমেরিকান এম-৪ অটোমেটিক কার্বাইন (৪ রাউন্ড গুলি ও ২ রাউন্ড খালি খোসাসহ) উদ্ধার করে। নিহত ৩ জন শান্তিচুক্তি বিরোধী পাহাড়ি সংগঠন ইউপিডিএফ এর সশস্ত্র শাখার সদস্য বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।

এরআগে গত শুক্রবার (২৩ আগস্ট) রাঙামাটির বাঘাইছড়িতে সেনাবাহিনীর ওপর সন্ত্রাসীদের দ্বিতীয় দফায় হামলার ঘটনা ঘটে। উপজেলার সাজেক ইউনিয়নের রেতকাঠা মুখের দুপতা নামক এলাকায় সেনাবাহিনীর গাড়ী লক্ষ্য করে উপজাতীয় সন্ত্রাসীরা ব্রাশ ফায়ার শুরু করে। এসময় সেনাবাহিনীর পাল্টা জবাবে ঘটনাস্থলেই ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট- ইউপিডিএফের শীর্ষ সন্ত্রাসী শান্তিময় চাকমা ওরফে সুমন চাকমা ওরফে লাকীর বাপ(৪০) নিহত হয়। সন্ত্রাসীদের ছোঁড়া গুলিতে সেনাবাহিনীর গাড়ীর সামনের গ্লাস ও বাটনার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ৫-৬ মিনিট গুলি বিনিমিয়ের এক পর্যায়ে পিছু হটে সন্ত্রাসীরা।

পাহাড়ে শান্তি শৃঙ্খলা ও সম্প্রীতি রক্ষায় নির্লসভাবে কাজ করে যাওয়া সেনাসদস্যদের ওপর প্রথম প্রাণঘাতি হামলার ঘটনা ঘটে ১৮ আগস্ট রাঙামাটির রাজস্থলীতে। সন্ত্রাসীদের অতর্কিত হামলায় প্রাণ হারান এক সেনাসদস্য। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) তথ্যমতে, রাঙামাটি রিজিয়নের রাজস্থলী আর্মি ক্যাম্প হতে চার কিঃ মিঃ দক্ষিণে পোয়াইতুমুখ নামক এলাকায় আনুমানিক সকাল ১০টার দিকে সেনাবাহিনীর একটি নিয়মিত টহল দলের উপর সন্ত্রাসীরা অতর্কিতভাবে গুলিবর্ষণ শুরু করে।

এতে সৈনিক নাসিম (১৯) গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হয়। আহত সেনাসদস্যকে তৎক্ষণাৎ হেলিকপ্টারযোগে চট্টগ্রাম সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। এরপর ঘটনাস্থলে তল্লাশি চালানোর সময় পেতে রাখা বিষ্ফোরকের বিষ্ফোরনের আঘাতে এক সেনাকর্মকর্তাসহ দুইজন আহত হয়।

সপ্তাহের ব্যবধানে উল্লিখিত তিন ঘটনায় পাহাড়ের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে ভাববার সময় এসেছে। অবশ্য এর আগে ২০১৯ সালের ১৮ মার্চ বাঘাইছড়িতে ৫ম উপজেলা নির্বাচনী দায়িত্ব পালন শেষে ফেরার পথে শান্তিবাহিনীর অতর্কিত হামলায় পুলিশ ও নির্বাচনী কর্মকর্তাসহ ৮জন নিহত হয়।এ ঘটনায় কমপক্ষে আরো ১৬জন আহত হয়। শান্তিচুক্তির পর সরকারী কর্মকর্তাদের উপর এটাই সবচেয়ে বড় হামলা।

১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত ছিল অস্ত্র সমর্পণ করা। শান্তিচুক্তি ইতোমধ্যে পার করেছে ২২ বছর। চুক্তি অনুযায়ী অবকাঠামোসহ পাহাড়ে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। যার বেশিরভাগ সুফল ভোগ করছে সেখানে বসবাসরত পাহাড়ি জনগোষ্ঠী। চুক্তির দীর্ঘবছর পর যখন শান্ত পরিস্থিতি বিরাজ করছে তখন নতুন করে সেনাবাহিনীর ওপর হামলা এবং ভারী অস্ত্রের উপস্থিতি যে চুক্তির স্পষ্টত লঙ্ঘন তা নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই।

উল্লিখিত বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার পূর্বে পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তিবাহিনী কর্তৃক নিরাপত্তা বাহিনী, আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও অন্যান্য সরকারী কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের উল্লেখযোগ্য হামলার একটি চিত্র তুলে ধরতে চাই।

১৯৭৬ সালের ১৮ জুলাই থেকে শান্তিবাহিনীর পার্বত্য চট্টগ্রামে তাদের সশস্ত্র যুদ্ধ শুরু করে।এদিন শান্তিবাহিনী বিলাইছড়ি থানা রক্তনালীর কাছে মাল মিয়া পাহাড়ে সকাল ১১ টায় রাঙ্গামাটি থেকে আগত পুলিশ পেট্রোল পাটির উপর আক্রমণ করে যুদ্ধ শুরুর জানান দেয়।

১৯৭৭ সালের ৬মে: সুবেদার রইস উদ্দিনের নেতৃত্বে বান্দরবান থেকে রুমা যাওয়ার পথে ২ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একটি প্লাটুন মুরাগু বাজারের নিকটবর্তী স্থানে সাঙ্গু নদীতে শান্তিবাহিনীর এর শিকার হয়। এতে সি কিউ এইচ আব্দুল কাদের সহ মোট ৫ জন সেনা সদস্য নিহত হয়।

১৯৭৭ সালের ১০ অক্টোবর: একটি বেসরকারি যাত্রীবাহী লঞ্চ এর উপর রেংক্ষিয়ং খালের এস বাঁকের স্থানে শান্তিবাহিনী অ্যামবুশ করে। শান্তিবাহিনী আগে থেকেই গোপনে জানতে পারে যে লঞ্চে খাগড়াছড়ি জেলার মহালছড়ি থানা সদরে অবস্থিত আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন এর অধিনায়ক এসপি পুলিশ এসকর্টসহ যাচ্ছেন। এম্বুস এর ফলে চারজন পুলিশ ও ৫ জন বেসামরিক ব্যক্তি নিহত হয়। ১০ জন পুলিশ ও ৪ জন বেসামরিক ব্যক্তি আহত হয়। শান্তিবাহিনীর ২ টি ৯ মি.মি এসএমজি, ৩০৩ রাইফেল এবং হাজারখানেক গুলি লুট করে নিয়ে যায়।

১৯৭৭ সালের ২৫ অক্টোবর: ৩১ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একটি টহল দল মেজর নিরঞ্জন ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে আলীকদম থেকে ২২ মাইল দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত একটি স্থানে শান্তিবাহিনীর এম্বুস এর শিকার হলে নায়েক আব্দুল গনি মিয়া, নায়েক সাত্তার, নায়েক আরিফুর রহমান, সিপাহী লুৎফর রহমান, সিপাহী আলী হোসেন, সিপাহী আব্দুল খালেক মুন্সি নিহত হয়।

১৯৭৯ সালের ২ ফেব্রুয়ারি: ৭ রাইফেল ব্যাটালিয়নের একটি পেট্রোল পার্টি সাঙ্গু নদী পথে মোদক থেকে থানচি যাওয়ার পথে মিবাখিয়া নামক স্থানে শান্তিবাহিনীর শিকার হলে একজন নিহত ও চারজন আহত হয়। নিরাপত্তা বাহিনীর প্রচুর অস্ত্র ও গোলাবারুদ খোয়া যায়। এসময় নৌকার উপজাতীয় তিনজন মাঝি আহত হয়।

১৯৭৯ সালের ৫ জুলাই: কাপ্তাই উপজেলার নতুন বাজার থেকে সেনাবাহিনীর সঙ্গে দায়িত্ব পালন করা দুই আনসার সদস্যকে অপহরণ করে নিয়ে হত্যা করে।

১৯৭৯ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর: একটি দেশীয় নৌকার উপর হামলা চালিয়ে শান্তিবাহিনী দীঘিনালা সেনানিবাসের এস এস ডি নায়েক রুহুল আমিন কে হত্যা করে।

১৯৭৯ সালের ১৪ অক্টোবর: ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একটি টহল দল বা পেট্রোল পার্টি শান্তিবাহিনীর অ্যামবুশ বা আক্রমণের শিকার হয়। এতে ৫জন নিহত হয় এবং ১২ জন আহত হয়।

১৯৭৯ সালের ২৭ ডিসেম্বর: শান্তিবাহিনীর আনুমানিক ৪০ জনেরও বেশি সদস্যের একটি দল জরিপ কাজে ব্যস্ত সরকারি দলের উপর হামলা চালিয়ে তাদের তাবু বাইনোকুলার, ব্যারোমিটার, থার্মোমিটার, গ্রাউন্ড শিট, টেবিল, চেয়ার, বিদেশিদের পাসপোর্ট, টাকা-পয়সাসহ অন্যান্য জিনিসপত্র লুট করে নিয়ে যায়। সেই সাথে ৫জন বিদেশি এবং ৯ জন বাঙ্গালীকে অপহরণ করে নিয়ে যায়।

 ১৯৮০ সালের ২৩ জানুয়ারি: শান্তিবাহিনী খাগড়াছড়ি জেলার পশ্চিম সীমান্তে অবস্থিত তানাক্কাপাড়া বিওপিতে হামলা চালায় একজন নায়েক একজন ল্যান্সনায়েক ও একজন সিপাহী এতে নিহত হয় এবং একজন নায়েব সুবেদার দুইজন হাবিলদার ও তিনজন আহত হয় এ সময় একটি সরকারি ৩০৩ রাইফেল ছিনতাই হয়।

১৯৮০ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি: শান্তিবাহিনীর আনুমানিক দশ জন সশস্ত্র সদস্য পাবলাখালী ফরেস্ট অফিসের ডেপুটি রেঞ্জ অফিসারের বাড়ি লুট করে তার রিভলবার, টর্চ, হাতঘড়ি প্রভৃতি নিয়ে যায়।

১৯৮০ সালের ১ মার্চ: ৯ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একটি কোম্পানি থানচি থেকে বন্দুকছড়ি ফেরত আসার পথে ঘন্টি ছড়া নামক স্থানে শান্তিবাহিনীর এম্বুস এর শিকার হয়। এতে মেজর মহসিন আলম নামের একজন অফিসার ও একজন জেসিও সহ আরো ২০জন নিহত হয়।

১৯৮০ সালের ২১ এপ্রিল: রাইফেল ব্যাটালিয়নের একটি দল গোপন সংবাদের ভিত্তিতে শান্তি বাহিনীর একটি ক্যাম্প করার জন্য যায়। কিন্তু সেখানে পৌঁছে কিছুই না পেয়ে পুনরায় নিজেদের ক্যাম্পের দিকে রওনা হয়। ফেরার পথে তারা ফালাডাউং পাড়া নামকস্থানে শান্তিবাহিনীর আক্রমণের শিকার হয়। এতে ব্যাটেলিয়নের ২০ জন সৈন্য নিহত হয় এবং ২ জন আহত হয়। সেইসাথে ৩০৩ রাইফেল, এসএমজি, এলএমজি, মর্টারসহ প্রচুর অস্ত্র ও গোলাবারুদ খোয়া যায়।

১৯৮০ সালের ১৪ জুলাই: শান্তিবাহিনীর একটি দল জুরাছড়ি থানায় চাকরিরত দু’জন পুলিশ কে দেবছড়ি নামক স্থান থেকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। ২৪ জুলাই ১৯৮০ তারিখে বন্দুকছড়ি এর কাছাকাছি নামক স্থানে একটি নৌকার উপর তাদের মৃতদেহ পাওয়া যায়।

১৯৮১ সালের ২৭ জানুয়ারি: আবুল ফজল বজল আহমেদ এবং মাহবুবুল আলম নামে তিনজন ফরেস্টারকে কাপ্তাইয়ের দক্ষিণে এবং রাজস্থলীর উত্তর আবুল পাহাড় নামক স্থান থেকে শান্তিবাহিনীর সদস্যরা অপহরণ করে নিয়ে যায়। পরে তাদের আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।

১৯৮৪ সালের ২৮অক্টোবর: শান্তিবাহিনী চিম্বুক রেস্ট হাউজ এলাকা থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের সদস্য (অর্থ) সুলতান মাহমুদ চৌধুরীকে তার দুইজন আত্মীয়সহ এবং বান্দরবান সড়ক ও জনপথ বিভাগের সেকশন অফিসার জনাব রেজাউল হককে অপহরণ করে নিয়ে যায়। তাদের মুক্তিপণ হিসেবে চার লাখ টাকা দাবি। করে পরে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থের বিনিময়ে ৭ নভেম্বর তাদেরকে মুক্ত করা হয়।

১৯৮৬ সালের ১৯ জুলাই: দীঘিনালা থানা এলাকায় দায়িত্ব পালনরত ৪১ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একটি পিক আপ টহল দানের সময় শান্তিবাহিনীর এমবুসের শিকার হয়। এতে একজনের মৃত্যুসহ সাত ব্যক্তি আহত হয়।

১৯৮৬ সালের ৭ আগস্ট: জামতলি এলাকার রোড প্রোটেকশন পার্টি সড়ক নিরাপত্তা দল শান্তিবাহিনীর শিকার হলে দুইজন আনসার নিহত হয় একজন আহত হয় শান্তি বাহিনীর সদস্যরা তাদের অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুট করে নিয়ে যায়।

১৯৮৬ সালের ৯ সেপ্টেম্বর: পানছড়ি থানা সদরের কিছু দক্ষিনে অবস্থিত নলকাটা নামক গ্রামের নিকট বি ডি আর এর জিপের উপর শান্তি বাহিনী কর্তৃক গুলি চালানো হলে পিডিবির জনৈক প্রকৌশলী এবং অপর একজন বাঙ্গালী নিহত হয়। আহত হয় আরো দুজন।

১৯৮৬ সালের ১৬ নভেম্বর: বনশিল্প উন্নয়ন কর্পোরেশন এর ৩২ জন শ্রমিক সিদ্দিকছড়ি থেকে বাঘাইহাটে যাওয়ার সময় শান্তিবাহিনী কর্তৃক অপহৃত হয়। দুইদিন পরে জঙ্গলের মধ্যে ২৪ জনের মৃতদেহ পাওয়া যায় এবং একজনকে আহত উদ্ধার করা হয়।

১৯৮৬ সালের ৩ ডিসেম্বর: শান্তিবাহিনীর একটি বড় দল রামগড় এবং রামগড় পুলিশ স্টেশনে হামলা চালায় এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে প্রত্যক্ষ গুলিবিনিময় ব্যস্ত থাকে। এসময় তারা বিভিন্ন বাঙালি পাড়া ও বাজারে হামলা করে বিপুল পরিমাণ হতাহত ও অগ্নিসংযোগ ঘটায়।

১৯৮৭ সালের ২ জানুয়ারি: শান্তিবাহিনীর তিনটি ভিন্ন দল মাটিরাঙ্গা সেনাক্যাম্প নিকটস্থ মুসলিম পাড়া নিরাপত্তা পোস্ট এবং মাটিরাঙ্গা থানায় হামলা চালায়। এতে নিরাপত্তা বাহিনীর একজন সদস্য নিহত হয় এবং শান্তিবাহিনীর দুইজন আহত হয়।

১৯৮৭ সালের ২১ জুন: বিলাইছড়ি সদর থানা থেকে তিন মাইল পশ্চিমে অবস্থিত লুইছং ঘাট থেকে নাড়াইছড়ি ক্যাম্পে ফেরার পথে নিরাপত্তাবাহিনীর আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের ১৩ সদস্যের একটি দল রাত দশটায় শান্তিবাহিনীর এম্বুস এর শিকার হলে নায়েক আব্দুর রাজ্জাক কনস্টেবল ইসমাইল এবং কনস্টেবল নিহত হয় এবং কনস্টেবল মাসুদ কাউসার গুলিবিদ্ধ হয়।

১৯৮৭ সালের ২৪ নভেম্বর: জুড়াছড়ি থানার শিলছড়ি সেনা ক্যাম্পে সেনাবাহিনীর টহল দল ও শান্তিবাহিনীর মধ্যে প্রত্যক্ষ গুলিবিনিময় হয়। ২জন সেনা সদস্য নিহত হয়।

১৯৮৯ সালের ৩০ জানুয়ারি: খাগড়াছড়ি ও চট্টগ্রাম সীমান্তের দক্ষিণে অবস্থিত কাঞ্চননগর রাবার বাগান হতে শান্তিবাহিনী তিনজন সরকারি কর্মকর্তাকে অপহরণ করে এবং মুক্তিপণ হিসেবে ছয় লাখ টাকা দাবি করে।

১৯৮৯ সালের ২০ মে: শান্তিবাহিনীর একটি সশস্ত্র দল থানচি থানা সদরে অবস্থিত টিএন্ডটি অফিসে গুলি বর্ষণ করে। এতে একজন নিহত ও তিনজন আহত হয়। এই সংবাদ পেয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর একটি দল সেখানে পৌঁছার পূর্বে শান্তিবাহিনীর সদস্যরা ১১ জনকে অপহরণ করে নিয়ে যায় এবং প্রসিং পাড়া নামক স্থানে তাদের কে হত্যা করে।

৮ সেপ্টেম্বর ১৯৮৯: লক্ষ্ণীছড়িতে শান্তিবাহীনির সাথে বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে নিহত হন লে. মুশফিক। তাকে বীরোত্তম খেতাব দেয়া হয়।

১৯৮৯ সালের ২ নভেম্বর: শিলছড়িতে সেনা টহলে হামলায় নিহত হন ২ সেনাসদস্য।একই বছরে বান্দরবানের থানচিতে ১১ সেনাসদস্যকে অপহরণ করে নিয়ে হত্যা করে শান্তিবাহিনী।

১৯৯২ সালের ২৯ জুন: খাগড়াছড়ির মহালছড়িতে রাঙামাটি সড়কে নিরাপত্তা বেঞ্চের ওপর অতর্কিত হামলা চালালে নিহত হন ২ সেনাসদস্য।

শান্তিচুক্তির পর সেনাবাহিনী ও সরকারী সম্পদ এবং লোকবলের উপর হামলা আশাতীতভাবে কমে আসে। এসময় উল্লেখযোগ্য হামলার মধ্যে রয়েছে,

২০০৬ সালে নানিয়ারচরের ঘিলাছড়ি ক্যাম্প কমান্ডার ক্যাপ্টেন নুরুল আলম গাজীকে হত্যা করে শান্তি বাহিনী।

সিএইচটি রিসার্চ ফাউন্ডেশনের গবেষণায় দেখা গেছে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পার্বত্যচট্টগ্রামে আগস্ট ২০১৯ সাল পর্যন্ত নিরাপত্তা বাহিনীর ৩৬০ জন সদস্য নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন ৪৩৩ জন এবং অন্যান্য ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ২২৭ জন।

একই পরিসংখ্যানে দেখা গেছে শান্তিচুক্তির পূর্বে শান্তি বাহিনীর সাথে যুদ্ধে নিরাপত্তা বাহিনীর ৩৪৩ জন সদস্য নিহত হয়েছেন‌।  এর মধ্যে সেনাবাহিনীর ১৭৩ জন বিজিবি ৯৬ জন পুলিশের ৬৪ জন এবং আনসার ভিডিপির ১০ জন। নিহত সেনা সদস্যদের মধ্যে অফিসার ৫ জন, জেসিও ৩জন এবং বাকিরা সৈনিক।

এছাড়াও দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় সড়ক দুর্ঘটনা, ম্যালেরিয়াসহ বিভিন্ন রোগ, ভূমিধস প্রভৃতি কারণে মারা গেছে আরো অনেকে। এর মধ্যে শান্তি চুক্তির পূর্বে শুধু ম্যালেরিয়ায় নিরাপত্তা বাহিনীর ১৬৯ জন এবং চুক্তির পরে ৮১ জন মারা গেছে। উভয় কারণে আহত বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিপুলসংখ্যক নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য। তবে শান্তি চুক্তির পরে পার্বত্য চট্টগ্রামে নানা কারণে নিরাপত্তা বাহিনীর মোট ১৭ জন সদস্য মারা গেছে।

এর মধ্যে আঞ্চলিক উপজাতীয় সন্ত্রাসী সংগঠনের সাথে যুদ্ধে মারা গেছে ১২ জন এবং ৫ জন রাঙ্গামাটির ভূমিধসে মারা গেছে। নিহতদের মধ্যে সেনাবাহিনীর ৯ জন, বিজিবি ২জন, পুলিশের ২জন ও আনসার ভিডিপির ৪ জন রয়েছে। এই বিপুল ক্ষয়ক্ষতির পর ও পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনী রয়ে গেছে দেশের স্বার্থে। বিস্তারিত দেখুন- https://bit.ly/33OKI7l

হঠাৎ করে সেনাবাহিনীর ওপর একের পর এক হামলার নেপথ্যে কারা রয়েছে? তাদের মোটিভ কি?- তা উদঘাটন করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া এখন সময়ের দাবি। সন্ত্রাসীদের পেছনে কোনো স্বার্থান্বেশী গোষ্ঠীর ইন্ধন রয়েছে কিনা এবং তাদের সাথে বিদেশি কোনো জঙ্গি গোষ্ঠীর যোগসাজস রয়েছে কিনা তাও খতিয়ে দেখতে হবে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সেনাসদস্যদের একের পর এক টার্গেট স্থানীয়দের মাঝে গুরুতর আতঙ্ক তৈরি করেছে। এই ধরনের হামলা আরও ঘটতে থাকলে ব্যাপক পর্যটন সম্ভাবনাময়ী পার্বত্য চট্টগ্রামে আগত পর্যটকদের মাঝে ভীতি তৈরি করবে। ফলে পর্যটন ব্যবসায় বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নিয়ে পাহাড়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নতুন করে ঢেলে সাজাতে হবে। যেসব এলাকা থেকে ক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়েছে সেসব জায়গায় পুনরায় ক্যাম্প স্থাপন করতে হবে। পাশাপাশি যেসব জায়গায় নতুন করে ঝুঁকি দেখা দিয়েছে সেসব জায়গাও ক্যাম্প স্থাপন করে সৈন্য সমাবেশ বৃদ্ধি করতে হবে এবং পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

আঞ্চলিক সন্ত্রাসীদের সাথে বিদেশি কোনো গোষ্ঠীর যোগসাজস রয়েছে কিনা পাহাড়ে দায়িত্বরত সকল গোয়েন্দা সংস্থাকে তা গুরুত্বের সাথে পর্যবেক্ষণ করে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। বিশেষ করে রোহিঙ্গা-বাংলাদেশ সম্পর্কের জটিলতার প্রভাব পার্বত্য চট্টগ্রামে কতটুকু পড়তে পারে, পার্বত্য চট্টগ্রামের গহীন অরণ্যে কোনো রোহিঙ্গা সশস্ত্র বিদ্রোহী গ্রুপ আত্মগোপন করে আছে কিনা? তাদের অস্ত্র, শক্তি, সামর্থ, যোগাযোগ, এলায়েন্স, বাংলাদেশের প্রতি তাদের মনোভাব, দূরবর্তী ও নিকটবর্তী পরিকল্পনা, বিদেশী শক্তিগুলোর সাথে সম্পর্ক প্রভৃতি সম্পর্কে বিস্তারিত গবেষণা প্রয়োজন।

সন্ত্রাসীদের ভারী অস্ত্রের সরবরাহ বন্ধে অরক্ষিত সীমান্তে নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেইসাথে অবৈধ অস্ত্রে উদ্ধারে যৌথবাহিনীর উদ্যোগে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করতে হবে, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো সেনা টহল জোরদার করতে হবে।  পাহাড়ে রাষ্ট্রদ্রোহী গোষ্ঠী নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে কিনা সে বিষয়ে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়াতে হবে। সন্ত্রাসীদের আর্থিক সরবরাহ বন্ধে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে প্রশাসনকে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। যে কোনো ধরনের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সরকারকে শূন্য সহনশীল নীতি দেখাতে হবে।

শান্তিচুক্তির পর পাহাড়ে অবৈধ অস্ত্র ও পাহাড়ি সন্ত্রাসী গ্রুপ থাকার কথা নয়। কেননা, চুক্তির জন্য সন্তু লারমার তরফ থেকে সরকারের কাছে দেয়া একমাত্র শর্ত। কিন্তু তিনি সেই শর্ত পালন করেননি। টিভি স্বাক্ষাৎকারে তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন, তার লোকেরা পুণরায় অস্ত্র তুলে নিয়েছে। এর দায় তাকে নিতে হবে। শান্তিচুক্তি অকার্যকর করার দায়ে তাকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। তার আয়-ব্যয়ের তথ্য দুদক দিয়ে তদন্ত করাতে হবে। সরকারকেও চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন করে যুগোপোযোগী করতে হবে। এটাই সময়ের দাবী।

লেখক: সম্পাদক, পার্বত্যনিউজ, সহকারী সম্পাদক, দৈনিক ইনকিলাব, চেয়ারম্যান, সিএইচটি রিসার্চ ফাউন্ডেশন।

 


লেখকের পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আরো লেখা

 

 

 

 

 

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

four + one =

আরও পড়ুন